বিবাহ-শাদীতে যত কুসংস্কার, কুপ্রথা
মাওলানা আমিনুল ইসলাম : আলেম সমাজ সব সময় চেষ্টা করেন, শরিয়াতের গণ্ডির মধ্যে থেকে সব কাজ করার জন্য। শরিয়াতের খেলাফ কাজ থেকে তারা দুরে থাকার চেষ্টা করেন। দৈনন্দিন সকল কাজ কর্ম, মুয়ামালা -মুয়াশারা, চলাফেরা, ব্যবসা -বাণিজ্য, বিবাহ- শাদী, সব কিছুতেই ইসলামী বিধি- বিধান মানার চেষ্টা করে যান।
আজকাল তো আমরা অনেকেই শরয়ী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অনেক দুরে। বিবাহ – শাদীতে আমরা ইসলা্র বাসা বেঁধে আছে। বিবাহতে এখন আর শরীয়াতের নিয়ম কানুন তোয়াক্কা করা হয় না।
আমাদের এই সমাজে বহু কু প্রথা চালু রয়েছে।যে গুলোর সাথে শরীয়াতের কোন সম্পর্ক নেই। বরং ওসব কাজ গুলো শরয়ী দৃষ্টি কোণ থেকে খুবই নিন্দনীয়।
এক, মেয়ে দেখা, আমাদের সমাজে মেয়ে দেখার জাহেলী নিয়ম চালু রয়েছে। মেয়ে দেখতে গেলে ইসলামী নিয়ম মানা হয় না। যিনি বিয়ে করবেন, তার সাথে এক গাদা পুরুষ লোক মেয়ে দেখতে যান।
অথচ ইসলামী নিয়ম হলো, যিনি বিয়ে করবেন, শুধু তিনি মেয়েকে দেখতে পারবেন। অন্য কোন পুরুষের জন্য মেয়ে দেখা শরীয়াতে সমর্থন করে না। দুই. গায়ে হলুদ, বিবাহ- শাদীতে গায়ে হলুদের প্রথা মহামারি আকারে ধারণ করেছে। গায়ে হলুদকে কেন্দ্র করে যত বেশরা কাজ আমাদের দেশে হয়।
অথচ ইসলামী পরিভাষায় গায়ে হলুদের কোন নিয়ম নেই।
তিন. অধিক পরিমাণ মহর নির্ধারণ, বর্তমানে নিজেদের প্রেজষ্টিজ রক্ষার্থে অধিক পরিমাণ মহর নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু মহর আদায় করা হয় না।
অথচ মহরটা তো স্ত্রীর হক। কিন্তু তাকে ফাঁকি দেওয়া হয়। ইসলামী শরীয়াতে স্ত্রীকে মহর ফাঁকি দেওয়া নয়।বরং মহর আদায় করতে হবে। যেটা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটা আদায় করা জরুরি।
চার. বিয়ে শাদীতে আড়ম্বরী বেশী করা হয়, বেশী আড়ম্বরপুর্ণ বিবাহ ইসলাম সাপোর্ট করে না। হাদীস শরীফে আছে, ইন্না আজামান নেকাহে বারাকাতান আইছারুহু মায়ুনাতান
অনাড়ম্বর বিয়েটাই বেশী বরকতপূর্ণ।
কিন্তু আমাদের এই সমাজে মহা ধুমধাম এর সাথে বিবাহ কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। টাকা না থাকলেও ধার কর্য করে, টাকা সুদি করে বিয়ের জমকাল আয়োজন করা হয়। যেটা খুবই অপছন্দনীয় কাজ।
পাঁচ. বিয়েতে মেয়ে পক্ষকে চাপ প্রয়োগ করা হয়, বরের পক্ষ থেকে মেয়ে পক্ষকে চাপ প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। অগণিত বরযাত্রীকে আপ্যায়নের জন্য কনে পক্ষকে চাপ প্রয়োগ করা হয় বারবার। কনে পক্ষের সামর্থ্য না থাকলেও বরযাত্রীদের বহর কে আপ্যায়ন করতে বাধ্য করা হয়। অথচ এটা শরীয়ত সম্মত নয়। এটা জঘন্যতম কাজ।
ইসলামী শরীয়াতে মেয়ে পক্ষকে কোন চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে বিপদে ফেলা জায়েয নেই।
আরেকটা বিষয় হলো, মেয়ের বাড়িতে কিসের এত বড় অনুষ্ঠান? অনুষ্ঠান তো হবে ছেলের বাড়ীতে। বিয়ের পর ওলীমার আয়োজন করবে ছেলে পক্ষ।
কিন্তু বর্তমানে হয়েছে সম্পূর্ণ উল্টো। মেয়ের পক্ষ থেকে আয়োজন হয়। আর ছেলে পক্ষ ওলীমার আয়োজন করে না।
ছয়. বিয়ে শাদীতে বেপর্দার সয়লাব, শরীয়াতের হুকুম অমান্য করে, জাহেলী কুপ্রথা জারি করা হয়েছে বর্তমান সময়ের বিয়েতে। বেপর্দা নারী পুরুষের অবাধ চাল- চলন হয়।
যুবক যুবতীগণ এক সঙ্গে খাওয়া দাওয়া। আবার পর পুরুষে বউ দেখা। সে গুলো ভিডিও করে অন্য মানুষকে দেখান। এসব গর্হিত কাজ ইসলামে নেই।
সাত. যৌতুক নেওয়া হয় বিয়েতে, যৌতুক নেওয়া একটা জঘনতম কাজ।কিন্তু আজকাল বিয়েতে এসব বিষয় মানা হয় না।
লক্ষ লক্ষ টাকা যৌতুক ধার্য হচ্ছে বিয়েতে।বিভিন্ন আসবাব পত্রের জোর দাবী করা হচ্ছে।
এভাবে মেয়ে পক্ষ থেকে জোর জুলুম করে যৌতুক নেওয়া হয়।
আট, বিয়েতে গান- বাজনা,, বিয়ে শাদীর মত পবিত্র অনুষ্ঠানে গান বাজনার সয়লাব। বিভিন্ন ধরনের গান বাজনার আসর বসে আজকালের বিয়েতে। একটা পবিত্র মজলিসকে কলুষিত করা হচ্ছে।
নয়. খাদ্যের অপচয়, এক শ্রেণীর মানুষ খাদ্যের অপচয় ঘটায় বিয়েতে। প্রচুর পরিমাণ খাবার নষ্ট হয়। বিশেষ করে, এক শ্রেণীর মানুষ, খাদ্য -খাবার ইচ্ছা কৃত নষ্ট করে প্রচুর।
দশ. উশৃঙ্খল যুবক যুবতীর বাড়াবাড়ী। বিয়েকে কেন্দ্র করে এক শ্রেণীর যুবক যুবতী বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
এগার. মাহরাম ছাড়া অন্য মানুষকে ওকিল বানানো। যেটা পর্দার খেলাফ হয় কঠিন ভাবে। শরীয়াতের নিয়ম হলো, ওকীল হতে হবে মেয়ের মাহরাম। যার সাথে দেখা দেওয়া জায়েয আছে।
এভাবে বর্তমান সময়ে বিবাহ শাদীতে বহু কুপ্রথা চালু রয়েছে। জাহেলী নিয়ম কানুন সমাজের মানুষের রন্ধ্রে রন্ধে ঢুকে পড়েছে। বিবাহটা যে একটা বরকতপুর্ণ কাজ সেটা আর কেউ খেয়াল করছে না।
এজন্য বিবাহ শাদীতে কুসংস্কার, কুপ্রথা এবং শরয়ী নিয়েমের খেলাফ কাজ হয়ে থাকে ব্যাপক ভাবে। যেটার কোন হদিস নেই, সেটা করা হয় খুব বেশী।
তাই আসুন! শরীয়াতের খেলাফ কাজ থেকে আমরা বিরত থাকার চেষ্টা করি। ইসলামী নিয়ম নীতির উপর নিজেকে চালানোর চেষ্টা করা সকলের জন্য জরুরি।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাওফিক দিন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক ও সমাজ বিশ্লেষক


