বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের গণহত্যা : করণীয় কী?
হুসাইন আহমদ বাহুবলী : ইসলাম। একটি পরশ পাথরের নাম। বিপরীত সত্তাকে আপন সত্তায় রূপান্তরে ইসলামের জুড়ি মেলা ভার। ইসলামের সাথে দূরতম সম্পর্ক রক্ষাকারী হয়ে উঠেন আপন মহিমায় উজ্জ্বল। এমনকি শত্রুতা পোষণকারীও এক সময় হয়ে উঠেন ইসলামের পরম বন্ধু। শত্রুতার সুবাদে ইসলামকে যতটুকু জানতে পারেন এতটুকুই হয়ে ওঠে তাঁর ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট।
একটু পেছন থেকে আসি। পঞ্চম হিজরী। ৮ জিলকদ। ৬২৭ খ্রিস্টাব্দ। শীতের মৌসুম।
মদীনাতুর রাসুল আক্রমণ করে বসে বহুজাতিক সামরিক জোট। তৎকালীন আরবে মক্কার কোরাইশ গোত্রের মুশরিকরা, মদীনার বনু নযীর, বনু কুরায়যা, বনু কাইনুকার ইহুদি সম্প্রদায়, বনু ওয়ায়েল , বনু সুলাইম, বনু গাতফান, বনু মুররা, পুজারা, আসজাআ ছিল এই সামরিক জোটের অংশীদার।
৩০০ অশ্বারোহী, ৬০০ উষ্ট্রারোহী, ৪০০০ পদাতিক সহ মোট ১০ হাজারের বাহিনী। দীর্ঘ ২৭ দিন ধরে মদীনাকে অবরুদ্ধ করে রাখে। তাদের অতর্কিত আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্য কি প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেয়া যায়? নবীজি এ বিষয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক ডাকলেন।
বৈঠকে একপক্ষ থেকে বদর-অহুদ যুদ্ধের অনুকরণে, শহরের বাইরে অবস্থান করে, যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর মোকাবেলা করার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করা হলো।
আরেক পক্ষ মদিনার ভেতরে থেকেই শত্রুর মোকাবেলা করার সুযোগ হাতছাড়া না করার জন্য, গেরিলা আক্রমণ করার পক্ষে মত দিলেন।
নবীজির কাছে দ্বিতীয় মতটিই যুক্তিসংগত মনে হল। সিদ্ধান্ত হল মদিনার ভেতরে থেকেই শত্রুর মোকাবেলা করা হবে। শত্রুরা যদি শহরের ভিতরে ঢুকে আক্রমণ করতে চায়? তাদেরকে প্রতিরোধ করার জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়?
প্রবীণ সাহাবী হযরত সালমান ফারসী রাযিআল্লাহু তা’আলা আনহু পরামর্শ দিলেন মদিনার উত্তর দিকে খন্দক বা পরিখা খনন করে, শত্রুকে শহরের বাইরে আটকে দেয়ার যাবে।
মদিনায় যুদ্ধে সক্ষম মাত্র ৩০০০ সাহাবী ছিলেন। মদিনার আউস-খাজরাজের আনসার ও মক্কার মুহাজিরীন। তাঁরা ছয় দিনে ছয় মাইল প্রস্থ ও দশ হাত দৈর্ঘ্যের এক বিশাল পরিখা খনন করেন। শত্রুরা আটকে গেল ওপারে।
দীর্ঘ ২৭ দিনের অবরোধ মোকাবেলায় নবীজী যুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য পর্যায়ক্রমে তাঁর সাথে আরও ৫ জনকে বাছাই করলেন।
(১) নবীজির পর সেনাপতির দায়িত্বেয় আসবেন
(২) হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযিয়াল্লাহু আনহু। এরপর নেতৃত্ব দিবেন,
(৩) হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তালা আনহু। এরপর সেনাপতির দায়িত্ব আঞ্জাম দিবেন,
(৪) হযরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু।
পরিশেষে
(৫) হযরত সালমান ফারসী রাযিআল্লাহু তা’আলা আনহুর নেতৃত্বে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটবে।
অপরদিকে সম্মিলিত সামরিক জোটের নেতৃত্বে জন্য তারা সাতজন নেতা নির্বাচন করল। প্রথমেই
(১)আবু সুফিয়ান বিন হারব। এরপর আসবে
(২) ইকরিমা ইবনে আবুজাহল এর পালা। এরপর,
(৩) উয়াইনা বিন হিসন। এরপর,
(৪) হারিস ইবনে আউফ । এরপর,
(৫) মিশআর ইবনে রুহাইলা। এরপর,
(৬) হুয়াই বিন আখতব। এরপর,
(৭) কা’ব বিন আসাদ
একদিন প্রচন্ড এক ঘূর্ণিঝড় এসে সম্মিলিত সামরিক জোটকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়লো।
২৭ দিনের অবরোধে মুসলিমদের পক্ষ থেকে ছয়জন শাহাদাতবরণ করেন এবং সামরিক জোটের মৃত্যু বরণ করে দশজন।
মজার বিষয় হচ্ছে, যে ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য এত ঘটা করে যুদ্ধের আয়োজন। অল্প দিনের ব্যবধানে এই সম্মিলিত সামরিক জোটের দুই শীর্ষ নেতা আবু সুফিয়ান এবং ইকরিমা ইবনে আবুজাহল সেই ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন।
হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ইসলামের নবীর গর্দান উড়াতে এসে আপন গর্দান ন্যাস্থ করে দেন নবীজির পদতলে। ইসলাম এমন এক পরশ পাথর যা তার দুশমন কেও তার রঙ্গে রঙ্গিন করে ফেলে।
ইসলাম বধে এসে নিজেই কুপোকাত হয়ে যাওয়া হযরত ওমর রা.’র সুন্নত আজও চলমান।
ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসে নেতৃত্বদানকারী বজরংও শিবসেনার উগ্র নেতারা আজ কোন প্রকার রাখ-ডাক না করেই ইসলাম গ্রহণ করছেন।
ইসলামের ধর্মগ্রন্থ আল কুরআনে ভুল ধরতে এসে ডঃ মরিস বুকাইলির মত কতশত গবেষকের আশ্রয় হয়েছে ইসলামে, এর সঠিক হিসাব রাখা সত্যিই দুরূহ ব্যাপার।
ইসলামকে কাছ থেকে উপলব্ধি করতে পারলে এই ধর্ম উপেক্ষা করার সাধ্য কারো থাকেনা।
ভারতীয় পাইলট অভিনন্দন পাকিস্তানে গ্রেফতার হওয়ার পর সেখানকার সৈন্যদের সেবাদান, আন্তরিকতা, আপ্যায়ন অভিনন্দনকে বিমোহিত করেছিল। অবস্থা স্বাভাবিক থাকলে অভিনন্দন ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা করার কথা ছিল। তাই অভিনন্দন ভারত ফেরার সাথে সাথে মোদি সরকার তাকে জবাই করবে বলে গুঞ্জন উঠেছিল।
কিন্তু ভারত সরকার হয়তো তা উপলব্ধি করেই লাজ রক্ষার জন্য তাকে কাছে ভিড়াবার চেষ্টা করে। বীর বল, বীর উত্তম ইত্যাদি বিভিন্ন উপাধিতে ভূষিত করে, তার মনোরঞ্জন করে দমিয়ে দেয় পাকিস্তান থেকে পাওয়া অভিনন্দনের অনুপ্রেরণাকে।
কাশ্মীর আজ অবরুদ্ধ। বাহ্যিকভাবে আক্রমনকারী ভারত হলেও মূলত ভারতের সহযোগিতায় ইসরাইল এবং তাদের মিত্র দেশগুলো গোপনে গোপনে যেমন অর্থ অস্ত্র দিচ্ছে, ঠিক তেমনি ভাবে অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করছে। যেমনটা তারা করেছিল আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলিম নিধনে মায়ানমার সরকারকে।
ভারতের পক্ষে যুদ্ধে আসা ইসরাইলের পাইলট পাকিস্তানে বন্দি হওয়া অন্তত এটাই প্রমাণ করে।
বাড়ি বাড়ি তল্লাশি দিয়ে কাশ্মীরের যুবকদেরকে গ্রেফতার করে চোখ বেঁধে গোপন স্থানে নেওয়া হচ্ছে। হত্যা করে গণকবর দেয়া হচ্ছে বলে গুঞ্জন উঠেছে। রাতের বেলা কাশ্মীরি যুবতীদের ষকে উঠিয়ে নিয়ে ধর্ষণ করা হচ্ছে। কাশ্মীরের জমির ফসল ধ্বংস করার পর এবার বাগানের ফল ধ্বংস করতে ভারতীয় সৈন্যরা করাত মেশিনে আপেল, আঙ্গুর, ডালিমের গাছগুলো গোড়ায় কেটে কেটে উল্টে দিচ্ছে।
ও, আই, সি, জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি সহ আন্তর্জাতিক সকল মানবিক সংস্থা নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে।
কাশ্মীরা আজ বড় অসহায়। ইসলামের ইতিহাস বলছে, যে যত বড় অসহায়, আল্লাহ তার জন্য তত বড় সহায়ক। মোদীর নেতৃত্বে আজ যারা কাশ্মীরী মুসলমানদেরকে নিশ্চিহ্ন করতে মরিয়া, কালের পরিক্রমায়
তারাই যে আবার ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণের জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠবে না এই গ্যারান্টি কে দেবে?
কারণ ইসলাম যে এক পরশ পাথরের নাম।
দৃঢ়-অবিচল থেকে কাশ্মীরীদের প্রতিরোধ-আত্মদান, হয়ে উঠতে পারে আক্রমনকারীদের ইসলামে উদ্বুদ্ধকরণের মূলমন্ত্র। অবরুদ্ধ মদিনাবাসী থেকে শিক্ষা নিয়ে, কাশ্মীরীরা ইসলামে আকৃষ্ট করতে পারে গোটা মোদী বাহিনীকে।
লেখক : শিক্ষক ও সমাজ বিশ্লেষক


