বে-টার্মিনাল : আধুনিক বন্দরের যাত্রা
মো: জাহাঙ্গীর আলম খান : বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর গত বছরগুলোতে ক্রমাগতভাবে ১২-১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। চট্টগ্রাম বন্দরের এই অব্যাহত প্রবৃদ্ধি দেশের সার্বিক উন্নয়নের প্রতিচ্ছবি। চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম আরো সম্প্রসারণ করা গেলে বর্তমান অবকাঠামোগত সুবিধার সর্বোচ্চ ব্যবহার হলে এই প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য পতেঙ্গার উত্তরে বে-টার্মিনাল নির্মাণের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তায় চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়নে ৩০ বছর মেয়াদী একটি স্ট্র্যাটেজিক মাস্টারপ্লান প্রণয়ন করা হয়েছে। সেই ‘মাস্টারপ্লান’ অনুযায়ী চট্টগ্রাম বন্দরের পরিকল্পিত উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। স্ট্র্যাটেজিক মাস্টারপ্লানে পতেঙ্গার উত্তরে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বে-টার্মিনাল (কন্টেইনার) নির্মাণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশের ক্রমবর্ধমান প্রবৃদ্ধির জন্য পশ্চাৎভূমির সাথে বিদ্যমান মাল্টিমোডাল সংযোগ সুবিধার জন্য বে-টার্মিনাল দেশের উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে বে-টার্মিনাল উদ্বোধন করেছেন।
চট্টগ্রাম বন্দর সমুদ্র মোহনা হতে ১১ কিলোমিটার অভ্যন্তরে অবস্থিত। কর্ণফুলী নদীর দুটি বাঁক এবং নাব্যতা চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশের জন্য পণ্যবাহী জাহাজের দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করে। এ বন্দরে নিরাপদে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করতে মোহনায় এবং নদীতে ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। ২০১৪ সালে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে কর্ণফুলি চ্যানেলের নাব্যতা ৯.২ মিটার হতে ৯.৫ মিটারে বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে বন্দরে চলাচলকারী জাহাজের দৈর্ঘ্য ১৮৬ মিটার হতে বর্তমানে ১৯০ মিটারে উন্নীত হয়েছে। বন্দরে বড়ো ধরনের জাহাজ ভিড়তে পারায় কন্টেইনার/ পণ্য পরিবহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং এর সক্ষমতা সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছাবে ২০১৯ সালে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর মোট ২৬.৬৭ লক্ষ টিইইউস (বিশ ফুট দৈর্ঘ্যরে কন্টেইনার) কন্টেইনার হ্যান্ডল করেছে। পরামর্শকের হিসাব অনুযায়ী নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালে (এনসিটি) ১০টি শীপ-টু-শোর গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন করে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হলে চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং এর সক্ষমতা আরো বৃদ্ধি পাবে এবং বিদ্যমান অবস্থায় প্রতিবছর ১০ হাজার টিইইউস করে সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে ৬টি শীপ-টু-শোর গ্যান্ট্রি ক্রেন এনসিটিতে যুক্ত হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর হতে ৬ কিলোমিটার দূরে বে-টার্মিনালের অবস্থান। প্রস্তাবিত স্থানটি চট্টগ্রাম বন্দরের পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে উত্তর হালিশহর এলাকায় অবস্থিত। স্থানটির পূর্বে পোর্ট এক্সেস রোড ও রেল লাইন এবং পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর দ্বারা বেষ্টিত। পোর্ট এক্সেস রোড হতে বঙ্গোপসাগরের উচ্চ জোয়ারের সীমারেখা পর্যন্ত স্থানটি প্রস্তাবিত বে-টার্মিনালের স্থান।
উপকূল সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ১১ কিলোমিটার প্রলম্বিত চর জেগে উঠেছে। বঙ্গোপসাগর উপকূলে জেগে ওঠা চরটি ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দৃশ্যমান ছিলনা। ধীরে ধীরে পলির জমাট প্রক্রিয়ায় চরটি সমুদ্র উপকূল হতে ৮০০ মিটার দূরে জেগে ওঠে। চরটির মাটির প্রকৃতিতে বালির আধিক্য রয়েছে। গঠিত চর ও উপকূল তীররেখার মধ্যে প্রকৃতিভাবে একটি চ্যানেলের সৃষ্টি হয়েছে।
চ্যানেলটির গভীরতা ৭ থেকে ১০ মিটার। অন্যদিকে চরের পশ্চিম পাশেই চট্টগ্রাম বন্দরের বহিঃনোঙ্গর এবং সেখানে পানির গভীরতা ১২-১৩ মিটার। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ১৯৯০ সাল হতে পরিচালিত জরিপে দেখা যায় বালির চরটি সময়ের সাথে ক্রমান্বয়ে জেগে উঠছে এবং চরটি স্থায়ী প্রকৃতির। বর্তমানে বালির চরটি ভাটার সময় সম্পূর্ণভাবে দৃশ্যমান হয়।
লেখক : কলামিস্ট
২৬.১১.২০১৮


