নিজস্ব প্রতিবেদক :: বহুল আলোচিত নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন ইস্যুতে দেশব্যাপী নানামুখী আলোচনা-সমালোচনায় অস্বস্তিতে রয়েছে সরকার। আইনটি বাস্তবায়ন হলে পণ্যমূল্য বাড়বে বলে আলোচনা হচ্ছে সংসদেও। এমন পরিস্থিতিতে শেষ দিকে এসে বিকল্প ভাবছে সরকার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গ্যাস, বিদ্যুৎসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ও স্বল্প আয়ের ভোক্তার ব্যবহার উপযোগী পণ্য ও সেবায় ভ্যাট ছাড় দিয়ে আইনটি বাস্তবায়নের উপায় খোঁজা হচ্ছে। এজন্য ভ্যাট অব্যাহতির সীমা আরও বাড়ানো হতে পারে। বিদ্যমান ১৯৯১ সালের ভ্যাট আইনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নতুন আইনে সংযুক্ত করা হতে পারে। এ ছাড়া কিছু সময়ের জন্য আইনটির বাস্তবায়ন পিছিয়েও দেয়া হতে পারে। এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গেলে এ খাত থেকে রাজস্ব আয়ে কী প্রভাব পড়তে পারে, তাও আলোচনায় আসছে। শেষ দিকে এসে ফের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অর্থমন্ত্রী, এনবিআর চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক ঊর্ধŸতন কর্মকর্তার বৈঠকও হয়েছে। বাজেট পাসের আগে প্রধানমন্ত্রীর সমাপনী বক্তব্যে এ বিষয়ে ঘোষণা দিতে পারেন তিনি। বুধবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রীও বলেছেন, ২৮ জুন এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে। এদিকে আইনটি নিয়ে ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদদের পাশাপাশি খোদ সরকার দলের সংসদ সদস্যরাও নতুন সমালোচনায় সরব হয়েছেন। বিশেষত আগামী নির্বাচনের আগে আইনটি কার্যকর হলে মূল্যস্ফীতির কারণে জনমনে ক্ষোভের আশঙ্কা করা হচ্ছে বিভিন্ন মহলে। অথচ আইনটি বাস্তবায়ন হতে আর দশদিনও সময় হাতে নেই। আইনটি বাস্তবায়নের ঠিক আগে এমন সরব আলোচনায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এনবিআরের কর্মকর্তাদের মধ্যেও। এনবিআরের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশই সব পণ্য ও সেবায় ঢালাও ১৫ শতাংশ ভ্যাটের পক্ষে নন।
তারা বলছেন, আইনটির প্রয়োজন আছে। কিন্তু এজন্য ছাড় দেয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। অন্যথায় আইনটির সুফল ঘরে তোলা যাবে না। বিশেষত রেয়াত নেয়া সব ব্যবসায়ীর পক্ষে সম্ভব হবে না বলেই মনে করছেন অনেকে। সঠিক হিসাব তথা চালান দেখাতে না পারলে রেয়াত পাওয়া যাবে না। ফলে বাড়তি ভ্যাটের ভার যাবে ভোক্তার ওপরই। অন্যদিকে, এনবিআর ব্যবসায়ীদের ভর্তুকি মূল্যে ইসিআর মেশিন দেয়ার ঘোষণা দিলেও এখনো কার্যত ফল শূন্য। ২০১২ সালে আইনটি পাস হওয়ার পর থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকেও আইনটি বাস্তবায়ন শুরু হলে পণ্যমূল্য বাড়ার আশঙ্কার কথা জানিয়ে এনবিআরকে জানানো হয়েছে। বাজেট প্রস্তাবের পর সম্প্রতি এনবিআর চেয়ারম্যানকে পাঠানো এক চিঠিতে ব্যবসায়ীদের এ শীর্ষ সংগঠনের পক্ষ থেকে বেশকিছু পণ্য ও সেবার নাম উল্লেখ করা হয়, যার দাম বাড়তে পারে। এসব পণ্য ও সেবায় এতদিন ধরে সঙ্কুচিত ভিত্তিমূল্যে ও ট্যারিফ মূল্যের ভিত্তিতে হ্রাসকৃত হারে ভ্যাট দিয়ে আসছিলেন উদ্যোক্তারা।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, প্লাস্টিক খাত, রি-সাইক্লিং খাত, প্লাস্টিক ও রাবারের হাওয়াই চপ্পল, প্লাস্টিকের খেলনা, রিয়েল এস্টেট ও নির্মাণ খাত, বিলেট, এম এস রড, জুয়েলারি, বিভিন্ন ধরনের সেবা খাত, হাতে তৈরি পাউরুটি, বিস্কুট, পণ্য পরিবহন ও আউটসোর্সিং, অ্যালুমিনিয়াম, টেক্সটাইল প্রিন্টিং ও ফিনিশিং, জুট মিল ও টেক্সটাইল মিলের স্পেয়ার পার্টস, সরিষার তেল ছাড়াও বিদ্যুতের দর বাড়বে। এফবিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় শিল্পের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে, অপরদিকে বিদ্যুৎ বিলের ওপর ৫ শতাংশের পরিবর্তে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপিত হওয়ায় শিল্প খাতের খরচ দুভাবে বেড়ে যাবে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য কমা সত্ত্বেও সরকার জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় না করায় শিল্পের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। পরিণামে সকল বৃদ্ধির ভার ভোক্তার ওপরই বর্তায়। প্রসঙ্গত, নতুন আইনে সব পণ্য ও সেবার ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। সঙ্কুচিত ভিত্তিমূল্যে দেড় থেকে সাড়ে সাত শতাংশের মধ্যে অর্থাৎ হ্রাসকৃত হারে ভ্যাট দেয়ার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে। বাতিল হয়েছে ট্যারিফ মূল্যের ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ভ্যাটের ব্যবস্থাও। অপেক্ষাকৃত ছোট ব্যবসায়ীদের প্যাকেজ পদ্ধতির ভ্যাট (বার্ষিক একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ভ্যাট) ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এ নিয়ে ব্যবসায়ীদের তীব্র আপত্তি রয়েছে।


