সচেতনতা। রাসনা হাসনাহেনা
ভয়ংকর মানসিক ঝুঁকিতে ভিটিলিগো ভিকটিম
ভিটিলিগো মানুষের শরীরের রং উৎপাদনকারী মেলানোসাইড কোষের অটোইমিয়্যুন ডিজঅর্ডার, যার ফলে মেলানোসাইড কোষ দ্বারা উৎপাদিত মেলানিন বা ত্বকের রং উৎপাদন ব্যাহত হয়। এই পরিস্থিতিতে ভিকটিমের ত্বক ক্রমান্বয়ে সাদা হয়ে ক্রমান্বয়ে তিনি “সৌন্দর্য প্রতিবন্ধী”তে রূপ নেয়। এই অবস্থাকে ভিটিলিগো ভিকটিম বলা হয়, বাংলায় যা ‘শ্বেতী’ নামে বহুল পরিচিত। জাতিসংঘ এটিকে ডিসএ্যাবিলিটি ইস্যু হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
ভয়ংকর মানসিক ঝুঁকিতে রয়েছে প্রায় ৬০ লক্ষ ভিটিলিগো ভিকটিম। এদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। আত্মহত্যা প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ এক জনস্বাস্থ্য সমস্যা, যা মনের স্বাস্থ্য-সংকটের জরুরি এক অবস্থা। মানসিক রোগাক্রান্তদের মাঝে আত্মহত্যার হার বেশি, যা এখন গবেষণালব্ধ প্রতিষ্ঠিত সত্য। এই প্রেক্ষিতে ভিটিলিগো ভিকটিমরা ভয়ংকর এক মানসিক ঝুঁকিতে জীবন যাপন করছে। ভিটিলিগো ভিকটিমদের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে বিষন্নতা রোগ। এছাড়া অন্যান্য মানসিক রোগ যেমন: পোস্ট- ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার বা বিপর্যয় পরবর্তী সময়ে মানসিক চাপজনিত রোগ, জেনারালাইজড অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার বা অত্যাধিক দুশ্চিন্তা জনিত রোগ, মাদকাসক্তি, ব্যক্তিত্বের সমস্যা বা পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার এবং মাইন্ড অটোইমিয়্যুন ডিজঅর্ডারে ভিটিলিগো ভিকটিম বা আক্রান্ত হয়।
ভিটিলিগোতে আক্রান্ত নারীরা সমাজ ও পরিবারে থাকে ভাগ্যহত। রোগহীন শরীর, ছোঁয়াচে নয়-এমন ভিটিলিগো ভিকটিমরা নিরবে মৃত্যু যন্ত্রণা সহ্য করে।
নারী ও শিশুরা আমাদের সমাজে এখনো পিছিয়ে, আর ভিটিলিগো ভিকটিম নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরো বেশি ভয়ংকর। এ ক্ষেত্রে একজন নারী ভিকটিম নিজেকে সর্বদা আড়াল করে রাখতে চায়। জনসম্মুখে আসতে চায় না কারন তার আশ পাশের বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশি সকলেই ভিটিলিগো নিয়ে নানাবিধ প্রশ্ন ও মন্তব্য করতে থাকে, একজন নারী ভিকটিমের জন্য খুবই অস্বস্তিকর।
শিশু ভিটিলিগো ভিকটিম বেশি সমস্যায় ভোগে অসচেতনতার অভাবে। ৫-১০ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুরা এ বিষয় কিছুই জানে না, অথচ সমাজে বিরাজমান কুসংস্কারের কারণে শিশুদের অনেক যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতি শিকার হতে হয়। ফলে কুসংস্কারচ্ছন্ন আমাদের সামাজিক পরিমন্ডলে ভিটিলিগো অজ্ঞতা এক মারাত্মক দুর্ভোগ। এটি কোনো রোগ নয় অথচ বিনা রোগে ভুগতে হয় ভিটিলিগো ভিকটিমদের। একইভাবে ভুগতে হয় ভিটিলিগো ভিকটিমদের আত্মীয়-স্বজন, প্রিয়জন ও শুভাকাঙ্খীদেরও। ভিটিলিগো ছোঁয়াচে নয়, এটিও আমাদের সমাজের মানুষ বিশ্বাস করতে চায় না।
ভিটিলিগোকে কেন্দ্র করে কুসংস্কারের পাশাপাশি প্রতারণাও রয়েছে সেই প্রাচীন কাল থেকেই। প্রথমেই ধর্মের কথায় আসা যাক, প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ “বেদ” এ নাকি উল্লেখ আছে “ভিটিলিগো ঈশ্বরের অভিশাপ”। ফলে সমাজে প্রাচীনকাল থেকেই ছড়িয়ে পড়েছে যে, ভিটিলিগোরা অভিশপ্ত। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে চলে আসছে ঝাড়ফুক, যাদু-টোনা, কবিরাজদের প্রচলিত প্রতারণা। মূলতঃ একজন ভিটিলিগো ভিকটিমকে প্রতারণার বিভিন্ন সামাজিক জালে আবদ্ধ থাকতে হয় বিভিন্নভাবে।
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বব্যাপী ভিটিলিগো ভিকটিমরা নিজেদের সমস্যার প্রতি জাতিসংঘের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য আন্দোলন করছিল। ভিটিলিগো সেলিব্রেটি মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যুর পর সেই আন্দোলন আরো বেগবান হয়। অবশেষে ২০১৬ সালে জাতিসংঘ মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যু দিবস ২৫শে জুনকে বিশ্ব ভিটিলিগো দিবস ঘোষনা করে। ভিটিলিগো বিষয়ে গবেষনা ও সচেতনা সৃষ্টির জন্য মূলত এ দিবসের স্বীকৃতি। জাতিসংঘের আহবানে সাড়া দিয়ে প্রতি বছর ২৫শে জুন পালিত হয় বিশ্ব ভিটিলিগো দিবস। ভিটিলিগো ভিকটিম জনগোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে নিজেদেরকে একটি প্লাটফর্মে নিয়ে এসেছে। যেখানে তারা তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা নিয়ে একে অপরের সাথে মতবিনিময় করছে। এক্ষত্রে বিশেষ করে ব্রজিল, আমেরিকা, ফ্রান্স, কানাডা, যুক্তরাজ্য, ভারত, বাংলাদেশ এগিয়ে আছে।
২০১৭ সালের ২৫শে জুন প্রথম বারের মতো সারা বিশ্বে একযোগে বিশ্ব ভিটিলিগো দিবস পালিত হয়। বাংলাদেশেও দিবসটি উদযাপিত হয় The Vitiligo World (TVW), Women Vitiligo World (WVW), Vitiligo Research Centre (VRC) এর উদ্যোগে।
ভিটিলিগো মেলানোসাইড ডিজঅর্ডার ও অটোইমিয়্যুন ডিজএ্যাবিলিটি গবেষণা করার জন্য দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে Vitiligo Research Centre (VRC)। ২০১৭ সালে ২৫ জুন ঠজঈ এর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয় সাতক্ষীরা জেলার, কলারোয়া উপজেলার, ৭ নং চন্দনপুর ইউনিয়নের সীমান্ত গ্রাম হিজলদী’তে। এর আওতায় প্রথমবারের মত বাংলাদেশে ভিটিলিগো (শ্বেতী) ভিকটিমদের ডাটাবেজ প্রস্তুত করা এবং জাতীয় তথ্যভান্ডারে সংযুক্ত করার সাথে সাথে প্রচলিত তাচ্ছিল্য ও আতঙ্কের ‘শ্বেতী’ শব্দ বিলুপ্ত করে ‘ভিটিলিগো’ শব্দের প্রচার ও প্রসার ঘটানো এ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য। পাশাপাশি বাজারের প্রচলিত ঔষধ ও চিকিৎসার সত্যতা পরীক্ষা করার জন্য বহুমুখী গবেষণা প্রকল্প গ্রহণ এবং পরীক্ষিত ঔষধ ও চিকিৎসাকে সনদ (Approval) প্রদান করার লক্ষ্য নিয়েও প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে।
বিশ্ব ভিটিলিগো দিবস ঘোষণার পর থেকে সারা বিশ্বে ভিটিলিগো ভিকটিমদের সংগঠন গুলো বিভিন্ন সচেতনতা মূলক প্রোগ্রাম চালু করেছে। TVW, WVW, VRC বাংলাদেশেও এ সংশ্লিষ্ট দুই তিনটি প্রতিষ্ঠান দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম পরিচালনা করছে, যা সকলের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টিতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। গণমাধ্যমগুলো এ ক্ষেত্রে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে। আমাদের সকলের সচেতনতা ও সহমর্মিতা ভিটিলিগো ভিকটিমদের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন যাপনে সহায়তা করতে পারবে। এখন শুধু প্রয়োজন ভালোবাসা নিয়ে আমাদের এগিয়ে আসা।
লেখক : কলামিস্ট


