মহারাষ্ট্রে প্রাদেশিক সরকার গঠনে বিজেপির চমক
সগীর আহমদ চৌধুরী : রাজনীতি একটা জটিল ও কূটিল বিষয়, এটা একটা চাল ও কৌশলের নাম। এটা একটা খেল, দাবার মতো; ভাবাবেগের বিষয় নয়, বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা ও প্রজ্ঞার ব্যাপার। ধর্মান্ধ বলুন কিংবা ধর্মভিত্তিক বলুন বা বলতে পারেন সাম্প্রদায়িক; এমন একটা দল হচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। বিজেপি ধর্মান্ধ, ধর্মভিত্তিক ও সাম্প্রদায়িক হওয়া সত্ত্বেও রাজনীতিতে তারা ধর্মীয় ভাবাবেগের ঊধ্র্বে ওঠে উচ্চ পর্যায়ের পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়ে থাকে। মহারাষ্ট্রে প্রাদশিক সরকার গঠনে সেটাই তারা প্রমাণ করল।
আমি একজন রাজনীতিক কর্মি, বাংলাদেশ তো বটে, অন্যান্য দেশ বিশেষত ভারত-পাকিস্তানের প্রত্যেকটি রাজনীতিক ও নির্বাচনী ঘটনা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে থাকি। আমি মনে করি, একজন সচেতন রাজনীতিক কর্মি হিসেবে এটি সবার জন্য প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাজনীতিক কর্মি তো দূরে থাক, আমাদের ইসলামপন্থি বড় বড় নেতৃবৃন্দও এ বিষয়ে সম্পূর্ণ বেখবর থাকেন।
মহারাষ্ট্রের প্রাদেশিক নির্বাচনে বিজেপির সাথে আরেক উগ্র হিন্দুত্ববাদী শিবসেনা জোট বেঁধে লড়েছিল। ২৮৮ আসনের বিধান সভা নির্বাচনে বিজেপি ও শিবসেনা যথাক্রমে ১০৫ ও ৫৬টি আসন পেয়েছিল। সরকার গড়তে প্রয়োজন হয় ১৪৫টি আসনের। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী পদ ইস্যুতে বিজেপি-শিবসেনার ত্রিশ বছরের পুরোনো মৈত্রিতায় ফাটল ধরে। এই পরিপ্রেক্ষিতে শিবসেনা, এনসিপি ও কংগ্রস মিলে সরকার গঠনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সব ঠিকটাক চলছিল, গতকাল রাত পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল। কিন্তু কে জানত পর্দার আড়ালে ভয়ংকর চাল চালছিল বিজেপি। সকাল হতেই সবাইকে সারপ্রাইজ দিয়ে তারা মুখ্যমন্ত্রীর শপথ গ্রহণ করে।
আর এটাই হচ্ছে, রাজনীতি। ভাবাবেগের কোনো স্থান নেই এখানে, সাধুতা-ভদ্রতার জায়গা নেই, এটা স্রেফ খেল, বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা ও প্রজ্ঞার সাথে খেলতে হবে শুধু। ইসলামপন্থিরা কি এই খেলে অভ্যস্ত? ভবিষ্যতে কি তা রপ্ত করতে পারবে? এই খেল কি তবে না-জায়িয? মুসলিম শাসক, সুলতান ও খলীফাদের জীবনী পড়ে অভিজ্ঞতা নিতে হবে। তাঁদের জীবনে-জীবনীতে এমন খেলের নজির ভুরি ভুরি মিলবে।
শিবসেনা একটা উগ্রপন্থি দল, ধর্মীয় ভাবাবেগে উন্মাদ; এতোটা উন্মাদ যে, রাজনীতিক খেলে এরা অভ্যস্ত হতে পারেনি, মার মার কাট কাটে বিশ্বাসী শিসবেনার ফুরসতই হয়নি রাজনীতির জটিল-কূটিল প্যাচ রপ্ত করতে। বিজেপিকে শিক্ষা দিতে চেয়েছিল, বিজেপি শিবসেনাকে তো বটে, সঙ্গী দলসমূহকেও সম্পূর্ন কুপোকাত করে ছেড়েছে। এই একই অবস্থা আমাদের ইসলামপন্থি দলসমূহের।
আরও একটি ব্যাপার, শিবসেনার প্রধান দাবি ছিল মুখ্যমন্ত্রী হবে শিবসেনার। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, শিবসেনা প্রধান উদ্ধব ঠাকরে নিজের জন্য কিন্তু এই মুখ্যমন্ত্রিত্ব দাবি করেননি। অথচ দল ও দলীয় অনুসারীদের কাছে এই ঠাকরে পরিবার পূজনীয় তো বটে, দেবতার সমতুল্য আরাধ্য। এনসিপি ও কংগ্রেস শিবসেনার কাছাকাছি আসন পাওয়া সত্ত্বেও মুখ্যমন্ত্রিত্ব দাবি করেনি, এই মুখ্যমন্ত্রিত্ব যখন শিবসেনার দাবি অনুযায়ী তাদেরকে দেওয়া হয় যৌথসভায়, তখন সবাইকে অবাক করে দিয়ে সেই মুখ্যমন্ত্রিত্বের পদ তিনি দলের কোনো জ্যেষ্ঠ নেতার পক্ষে ছেড়ে দেবার কথা বলেন। আমি বিষ্ময়াবিভূত হই, এ কেমন ত্যাগ, তাও অমুসলিমদের! এই জায়গায় একজন ইসলামপন্থিকে কল্পনা করতে পারি আমরা? না, কখনো পারি না।
লেখক : রাজনীতিক


