মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও নগরায়ণ
মীর মোহাম্মদ আসলাম উদ্দিন :: বাংলাদেশ সরকারের উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের নিমিত্ত স্বল্পতম সময়ে দারিদ্র্য হ্রাস করার জন্য স্থিতিশীল এবং সুরক্ষিত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এমতাবস্থায় সরকার স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ অর্জনের জন্য জাপান সরকারের সহায়তায় “পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্লান ২০১০” প্রস্তুত করে যাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শক্তি সুরক্ষা এবং পরিবেশগত সুরক্ষা একসাথে অর্জন করা যায় এবং বাংলাদেশ সরকারের অন্যতম ভিশন ও মিশন “২০২১ সালের মধ্যে সকলের কাছে সাশ্রয়ী এবং নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ” অর্জন সম্ভব হয়। ‘পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্লান ২০১০’ পর্যালোচনা করে ‘পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্লান ২০১৬’ করা হয়েছে। যেখানে ২০৪১ সালের মধ্যে কয়লা হতে ৩৫ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।
পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের বেশিরভাগ বিদ্যুৎ কেন্দ্র গ্যাস দ্বারা পরিচালিত। পশ্চিম অঞ্চলের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি ব্যয়বহুল আমদানি করা তেল দ্বারা পরিচালিত এবং দেশের দক্ষিণাঞ্চলে কোনো কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নেই। গ্যাসের ক্রমবর্ধমান সংকটের কারণে নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য জ্বালানির বৈচিত্র্য (Fuel diversification) জরুরি। এ কারণে বিভিন্ন স্থানে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা দরকার। ‘পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্লান-২০১০’ এবং জাইকা, জাপান এর মাধ্যমে পরিচালিত “The Preparatory Survey on the Chittagong Area Coal Fired Power Plant Development Project” এর আলোকে বাংলাদেশ সরকার কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ি ও ধলঘাটা ইউনিয়নে, মাতারবাড়ি ২x৬০০ মেঃওঃ আল্ট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফায়ার্ড পাওয়ার প্রজেক্টটি গ্রহণ করা হয়।
মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়িতে ২x৬০০ মে:ও: ক্ষমতার আল্ট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফায়ার্ড পাওয়ার প্লান্ট নির্মাণের মাধ্যমে দেশের বিদ্যুতের ঘাটতি হ্রাস করতে সহায়তা করবে। উচ্চদক্ষতা ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। পরিবেশ ও ইকো-সিস্টেম রক্ষাসহ উন্নত এবং কস্ট ইফেকটিভ প্রযুক্তি নিশ্চিত করে জাতীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করবে।
“মাতারবাড়ি ২x৬০০ মেঃওঃ আল্ট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফায়ার্ড পাওয়ার প্রজেক্ট”টি বাস্তবায়ন করছে কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড। প্রকল্পটি জুলাই ২০১৪ থেকে জুন ২০২৩ সময়ের মধ্যে বাস্তবায়িত হবে। প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়েছে ১২ আগস্ট ২০১৪ তারিখে। প্রাথমিকভাবে অনুমোদিত ডিপিপিতে প্রায় ৩৫ হাজার ৯শত ৮৫ কোটি টাকা ছিল, যা পরবর্তীতে সংশোধিত করা হয়। ভ্যাট-ট্যাক্স ব্যতীত ইপিসি চুক্তি করা হয়েছে ৩৬২৯৯.৮৮ কোটি টাকা।
বিদ্যুৎ কেন্দ্র আল্ট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির ৬০০ মেঃ ওঃ ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি ইউনিট নির্মাণ করা হবে এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্র সংলগ্ন সমুদ্রে ১৪.৩০ কি.মি. দীর্ঘ, ২৫০ মি. প্রশস্ত ও ১৮.৫ মি. গভীর চ্যানেল নির্মাণ করে কয়লা ও তেল আনলোডিং এর জন্য একটি জেটি নির্মাণ এবং Exhaust Gas নির্গমনের জন্য ২৭৫ মি. উঁচু চিমনি নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের সুবিধার্থে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১০ মি. উঁচু ভূমি উন্নয়ন, ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং পল্লি বিদ্যুতায়ন ও নগরায়ন করা হবে। দ্বিতীয় পর্যায়ে ৬০০ মেঃ ওঃ ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি ইউনিট নির্মাণের জন্য প্রকল্প এলাকায় প্রয়োজনীয় ভূমির সংস্থান করাও প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে। এছাড়াও ইপিসি কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে- চ্যানেল ড্রেজিং ও সেডিমেন্ট মিটিগেশন ডাইক নির্মাণ, পাওয়ার ব্লকের ভূমি উন্নয়ন, কোল ইয়ার্ডের ভূমি উন্নয়ন, Oil এবং Heavy equipment unloading jetty এর পাইলিং কাজ, ডিএমএম পদ্ধতিতে বাঁধের সয়েল ট্রিটমেন্ট/ইমপ্রুভমেন্ট কাজ ও সি ওয়াল নির্মাণের কাজ ইত্যাদি। বর্তমানে EPC কাজের ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ২৮ শতাংশ যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৩.৮০ শতাংশ।
১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয়গ্রীডে যুক্ত হওয়ার ফলে সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। আল্ট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে জ্বালানি সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন, উচ্চদক্ষতা, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। পরবর্তীতে মাতারবাড়ি ২য় ফেজের ১২০০ মেগা ওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ দ্রুত সময়ে সম্পন্ন করা হবে। মাতারবাড়ি পাওয়ার প্রকল্পের আওতায় নির্মিতব্য চ্যানেল ও পোর্টের অবকাঠামোগত সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে মাতারবাড়ি বাণিজ্যিক বন্দর প্রকল্প দ্রুতই বাস্তবায়িত করা হবে। এই প্রকল্পের চ্যানেল অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে কোল ট্রান্সশিপমেন্ট টার্মিনাল (CTT) নির্মাণের মাধ্যমে অন্যান্য কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রেও কয়লা সরবরাহ করা হবে।
এছাড়াও প্রকল্পের অবকাঠামোগত সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে মহেশখালি-মাতারবাড়ি সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম (Moheshkhali-Matarbari Integrated Infrastructure development initiative-MIDI) এর আওতায় মহেশখালি-মাতারবাড়ি এলাকায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/সংস্থার উন্নয়ন প্রকল্পসমূহের বাস্তবায়নের ফলে জাতীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরো ত্বরান্বিত হবে। এই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ঘিরে ব্যাপক কর্মসংস্থান ও নগরায়ন হবে। এখন এই কেন্দ্রে ৫৬২ জন বিদেশি ও ৭৬২ জন স্থানীয় এবং অন্যান্য এলাকার ২৭৭৭ জন অর্থাৎ মোট ৩১০১ জন লোক কর্মরত আছে। নগরায়নের নিমিত্ত ভূমি উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি প্রায় ২৭.০৫ শতাংশ হয়েছে।
মাতারবাড়ি প্রকল্পটি একটি ফ্লাগশীপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র। জাপানের জাইকার মাধ্যমে এলাকাটি যাচাই করার পূর্বে প্রায় ২ বছর ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়েছে। এলাকার বাস্তুসংস্থাপনের উপর যাতে কোনো প্রভাব না পড়ে সেদিকে বিশদভাবে নজর দেওয়া হয়েছে। নগরায়নটি যেন বিশ্বের যে কোনো উন্নত শহরের মতোই হয় সে বিষয়েও প্রকল্পে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে। মাতারবাড়ি পাওয়ার প্রকল্পসহ ও অন্যান্য প্রকল্পসমূহের বাস্তবায়নের ফলে স্থানীয় লোকজনদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন হবে এবং সামগ্রিক জাতীয় সমাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন বেগবান হবে। শুধু তাই নয় অত্র এলাকার সমৃদ্ধি ও সৌন্দর্য্যবর্ধনে তাৎপর্যময় অবদান রাখবে।


