মাদরাসার দ্বীনচর্চার গল্প পৌঁছুক বাড়িতেও
আবদুর রহমান রাশেদ : মাদ্রাসা ছুটির কয়েক দিন আগে থেকেই ছাত্রদের মধ্যে একটা উত্তেজনা কাজ করে।কিভাবে ছুটিটা কাটাবো? কোন কোন জায়গায় ঘুরতে যাবো? কি কি কাজ করবো? ইত্যাদি ইত্যাদি।
কওমি মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার পাশাপাশি তাদের নৈতিক শিক্ষার দিকটাও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে।বরং কখনো কখনো পড়ালেখার চেয়েও নৈতিক শিক্ষাই মূখ্য হয়ে যায়।কওমী মাদ্রাসা ছাড়া পৃথিবীর দ্বিতীয় কোন প্রতিষ্ঠানে যার কোন দৃষ্টান্ত নেই। সুতরাং বলাই যায় একমাত্র কওমী মাদ্রাসাই সমাজের শান্তিপ্রিয় মানুষ তৈরির কারখানা।
সেই আকাবিরে আসলাফের পথ ধরে এখনো মাদ্রাসাগুলোতে বছরের প্রায় সময় তরবিয়তি জলসার আয়োজন করা হয়।বলা যায়, এই তরবিয়তি জলসাগুলোই কওমী মাদ্রাসার প্রাণ।সেই ধারাবাহিকতায় প্রত্যেকটা ছুটির আগে মঙ্গলকামী আসাতিযায়ে কেরাম ছাত্রদেরকে দিক-নির্দেশনা দিয়ে থাকেন, কিভাবে একজন ছাত্র তার ছুটির দিনগুলো অতিবাহিত করবেন।
আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ তা’আলা আমাকে এই রকম অনেক ইসলাহী ও তরবিয়তি মজলিসে বসার তাওফিক দিয়েছেন।অনেক বড় বড় বুজুর্গদের মুখ থেকে তাদের নুরানী কথা শোনার তাওফিক দিয়েছেন।
আমার এই লেখায় আমি নিজের পক্ষ থেকে কিছুই লিখবো না।বড় বড় বুজুর্গদের পবিত্র জবান থেকে যা শুনেছি তাই আপনাদের সামনে পেশ করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
১. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে আদায় করা
ইসলামে নামাজের গুরুত্ব অপিরিসিম।নামজ ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ।এই নামাজ মুমিনের অদম্য শক্তির মাধ্যম।সাধারণ মুমিন আর খাঁটি মুমিনের মাঝে পার্থক্য করে দেয় এই নামাজই।
সুতরাং ছুটির দিনগুলিতে একজন ছাত্রের প্রধান দায়িত্ব হলো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে জামাতের সাথে আদায় করা।এই জন্য অনেক মাদ্রাসা ছাত্রদেরকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের লিস্টি সম্বলিত একটি কার্ড দিয়ে দেয়।ছাত্ররা যে যেখানে যেই ওয়াক্ত নামাজ পড়বে সেইখানে ঐ মসজিদের ইমাম সাহেবের স্বাক্ষর নিয়ে নিবে।আমার মতে এটা একটা ভাল সিদ্ধান্ত।
২. বাবা-মায়ের খেদমত করা
কথায় আছে খেদমতে খোদা মিলে, ইবাদতে জান্নাত।হাদীসে আছে ‘আল জান্নাতু তাহতা আক্বদামীল উম্মাহাত’।মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত।
সুতরাং একজন ছাত্রের জন্য ছুটিতে তার বাবা -মায়ের খেদমত করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের জন্য প্রত্যেক বাবা-মায়ের দোয়াই আল্লাহ তা’আলা সরাসরি কবুল করে থাকেন।হাদীসে এমনিই এসেছে। বাবা-মা যদি অমুসলিমও হয় তাহলেও তাদের দোয়া আল্লাহ তা’আলা কোন রকম পর্দা ছাড়াই কবুল করেন।পৃথিবীতে যদি আপনি সফল হতে চান তাহলে আপনার জন্য আপনার মায়ের দোয়াই যথেষ্ট হবে।
৩. বড়দের সম্মান করা ছোটদের স্নেহ
বড়দের সম্মান করা এবং ছোটদের স্নেহ করা রাসুলের সুন্নাত।রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে বড়দের সম্মান করে না আর ছোটদের স্নেহ করে না সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।
ভাবা যায় কত বড় একটা ধমক। সুতরাং ছুটিতে আমরা রাসূলের এই সুন্নাতটি খুব বেশি করে আমল করার চেষ্টা করবো।
কীভাবে সম্মান করা যায়? সম্মান করার একটা সহজ পদ্বতি হলো মুরব্বীদের দেখলেই হাসিমুখে সালাম দেয়া। তাদের কাছে গিয়ে তাদের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলা। তাদের হালচাল জিজ্ঞেস করা। এতে দেখবেন আপনার প্রতি নয় কেবল বরং মাদ্রাসার ছাত্রদের প্রতিই তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পালটে যাবে।যে মাদরাসায় পড়বেন ওই মাদরাসার প্রতিও তাদের ধারণা বদলাবে। আর বিপরীতে আপনি যদি অসম্মানি করেন তাহলেও মাদ্রাসার ছাত্রদের প্রতি খারাপ ধারণাই জন্মাবে।
আজকাল সমাজের চিত্র এমন হয়ে গেছে, একজন মুরব্বী পাশ দিয়ে হেঁটে যায় আমরা ভ্রুক্ষেপও করি না।সালাম দেওয়া তো দূরের কথা।
৪. বিষয়-ভিত্তিক পড়ালেখা চালু রাখা
আমরা অনেকেই মনে করি ছুটি হলো ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয়ার জন্য। ছুটি হলো ঘুরে বেড়ানোর জন্য। আর যাই হোক, কমপক্ষে ছুটিতে বই ছুঁয়েও দেখা যাবে না।এমনই ধ্যান ধারণা বর্তমানে আমাদের।
না, ছুটিতে আপনি যে কোন নির্দিষ্ট বিষয়ে পড়ালেখা চালু রাখবেন। হতে পারে সেটা কোন সফরনামা, হতে পারে সেটা কোন আকাবিরের জীবনী, হতে সেটা কোন তাফসির বিষয়ক গ্রন্থ, হতে পারে সেটা গল্প-উপন্যাস, ছড়ার বই। মোটকথা আমাদের একটা টার্গেট থাকা চাই যে, এই ছুটিতে আমি এতো হাজার পৃষ্ঠা পরবো।
আমার আসাতিযায়ে কেরাম বলেন, ছুটি মানে পড়ালেখা বন্ধ হওয়া নয়। বরং ছুটি মানে পড়ালেখার আকৃতি পরিবর্তন হওয়া।আগে আমরা মাদ্রাসায় পড়ালেখা করতাম। এখন আমরা বাড়িতে গিয়ে পড়া-লেখা করবো।
৫. আসাতিযায়ে কেরামের সাথে যোগাযোগ রাখা
এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছাত্রদের জন্য।ছুটিতে এমন হয় যে, একটা পুর্ণ ছুটি কাটিয়ে ফেলি অথচ এই লম্বা সময়ে প্রিয়-শিক্ষকের সাথে একটি বারো যোগাযোগ হয়নি।এটা খুবই দুঃখজনক ব্যাপার।
আমার প্রান-প্রিয় উস্তায, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের প্রফেসর ডঃ হুসাইনুল বান্না প্রত্যেক ছুটির আগে ছাত্রদেরকে যেসব বিষয়ে নসিহত করেন তার মধ্যে এটিও একটি।ফোনে কথা বলতে কত টাকাই বা লাগে।আপনার ফোন পেয়ে উস্তায আপনার জন্য কত দোয়াই না করবেন।উস্তায আপনাকে তাঁর কত কাছের ভাববেন তা কি আপনি কল্পনা করতে পারেন? তাই আমরা ছুটিতে উস্তাদদের সাথে অল্পক্ষণ হলেও কথা বলবো। নিজের হালচাল জানাবো।
লেখক : উচ্চতর আরবি সাহিত্যে অধ্যয়নরত


