কওমী মাদরাসায় মুহতামিম ও শায়খুল হাদিস নিয়োগে উসূল প্রণয়ন জরুরি
আমিনুল ইসলাম কাসেমী :: দেওবন্দী সিলসিলার মাদ্রাসাগুলোতে মুহতামিম- শায়খুল হাদিস পদ লাভের জন্য কোন ফর্মুলা বা রূপ রেখা প্রণয়ন করা যেতে পারে। যেহেতু মাদ্রাসাগুলো দেওবন্দকে অনুসরণ করে চলে, সে হিসেবে সব বিষয়গুলোতে দেওবন্দই হবে আমাদের পথ-প্রদর্শক। দেওবন্দের নীতি- সিষ্টেমকে আমরা অনুসরণ করতে পারি। কারো নিজের মত করে নয়, প্রভাব- প্রতিপত্তি হিসেবে নয়, একদম যে উসূল থাকবে, সেটাকে আমরা মেনে চলব। তাহলে কোথাও সমস্যা থাকার কথা নয়।
কোন নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা কোন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে আমি লিখছি না। আমার এই লেখাটা আম। সাধারণ- মোদ্দাকথা উল্লেখ করতে চাই। কাউকে কটাক্ষ করা বা ছোট করা আমার উদ্দেশ্য নয়। আজকাল একটা মিনিয়া হয়েছে আমাদের। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান এবং পীরের খানকাগুলোতে চলছে যেন রাজতন্ত্র একনায়কতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র। রাজার ছেলে রাজা। পীরের ছেলে পীর। মুহতামিম এর ছেলে মুহতামিম। শায়েখের ছেলে শায়েখ। আমীরের ছেলে আমীর।
বিশ্বে যে সব দেশে রাজতন্ত্র একনায়কতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র চলে আসছে, সেখানে দেখবেন, রাজার মৃত্যুর পর তার পরিবারের লোকেরা রাজ্য চালায়। যোগ্যতা থাকুক আর না থাকুক। অথর্ব হলেও সে হয় রাজ্যের কর্ণধার। রাজ্যের চাবিকাঠি তখন রাজার ছেলের হাতে। এমনিভাবে পীর মারা গেলে তার গদ্দিনশীন হচ্ছেন তারই ছেলে। ছেলের যোগ্যতা থাকুক চাই না থাকুক। তাকে পীর মানা হচ্ছে। ছেলের মুখে দাঁড়ি নেই, শরীয়াতের উপরে চলে না,বরং অবৈধ অশ্লীল কাজে জড়িত, তারপরেও সে পীর হয়ে যাচ্ছে। বাবার হাল ধরে পীর মুরিদী কার্যক্রম চালাচ্ছে। এরকম অগণিত খানকা আছে এদেশে। আসল পীর, তিনি প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ওয়ালা ছিলেন। শরীয়তের উপরে চলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ছেলে যে পীর হয় পরে দেখা যায় তার কোন যোগ্যতা নেই। বরং সে ফাসেক। তারপরেও তাকে পীর বানানো হচ্ছে। হাজারো মানুষের রাহবার হচ্ছে সে।
এমনি সিষ্টেম চালু হয়েছে আমাদের কিছু কিছু দেওবন্দী মাদ্রাসাতে। মুহতামিম সাহেবের ইন্তেকাল হয়ে গেলে সাথে সাথে তাঁর ছেলেকে মুহতামিম পদে বসানো হয়। অনেক যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও থোড়াই কেয়ার। কাউকে তখন প্রাধান্য দেওয়া হয় না। ছেলে না থাকলে পারিবারিক কাউকে বসানো হয়। আর সে সব মুহতামিম সাহেবও তার জীবদ্দশায় এমন কিছু কাজ করে যান, পরে মুহতামিম এর ছেলে ছাড়া উপায়ন্তর থাকে না কারো। অর্থাৎ ওফাত প্রাপ্ত মুহতামিম সাহেব, বেঁচে থাকাকালীন নিজের ছেলেকে প্রাধান্য দিতেন সব কাজে। অন্য প্রতিভাধর ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও তাদের কোণঠাসা করে রাখতেন। আর নিজের ছেলেকে হাইলাইট করতেন। যার দরুণ মুহতামিমের মৃত্যুর পর ছেলেকে তার জায়গায় বসাতে চায় সকলে।
তবে এর দ্বারা অনেক যোগ্য ব্যক্তি ছোট হয়ে যায় তখন। হেয় করা হয়। অপমান-অপদস্ত হতে হয় সে সব সিনিয়র আলেমদের। তারপরেও কিন্তু চলে আসছে সেই আজগুবি সিষ্টেম। মুহতামিমের ছেলে মুহতামিম। যোগ্যতার দিকে না তাকিয়ে, মুহতামিমের ছেলে হিসেবে বসানো হচ্ছে। মাদ্রাসা চালাতে না পারলেও সে মুহতামিম হিসেবে রয়েই যায়। একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে। স্বেচ্ছারিতা, নিয়মনীতি বহির্ভূত কাজ হয় তখন। মুরুব্বী উস্তাদগণকে পিছনে ঠেলে নিজের খেয়াল খুশিমত চলতে থাকে সে।
এমনিভাবে আরো কিছু বিষয় আছে, যেগুলো দেওবন্দী মাদ্রাসাগুলোতে চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। কিন্তু সে বিষয়ে কেউ কোন আওয়াজ তোলেন না। আবার বলতেও কেউ সাহস রাখে না। মনের কষ্ট মনেই থেকে যায় চিরদিন।
জুনিয়র আর সিনিয়রিটির মেইন্টেন হচ্ছে না। হঠাৎ একজন এসে বুখারী শরিফ পড়াচ্ছেন। অথবা নতুন এসে দাওরায়ে হাদীসের বড় কিতাব দেওয়া হচ্ছে। মানে শায়েখের ছেলে শায়েখ। বাবা যদি শায়খুল হাদীস হয় বা মুহতামিম বা বড় মুহাদ্দিস, তাহলে তো আর কথাই নেই। ফারেগ হয়ে কোথাও গেলে আগেই বুখারী শরীফ। অথচ কত সিনিয়র মুহাদ্দিস রয়েছে, ঐ ছেলের বাবার বয়সী উস্তাদ রয়েছে, তাদেরকে অভারটেক করে একজন নবীনকে বানানো হচ্ছে শায়খুল হাদীস।
হ্যাঁ, আমি মানলাম, নবীণ যিনি অনেক মেধাবী, বেফাকে অনেক ভাল রেজাল্ট। তাই বলে তাকে প্রথম ধাক্কায় বড় মুহাদ্দিস পদে বসাতে হবে? অন্য যারা হাদীস পড়াচ্ছেন তাদের ছোট করে দিতে হবে? খোঁজ নিলে দেখা যাবে, এক ঝাঁক যোগ্যতা সম্পন্ন আলেম আছেন সেখানে, তারপরেও তারা মূল্যহীন। তারা অবহেলিত, অবজ্ঞার শিকার।
বহু প্রতিষ্ঠানে কিন্তু এরকম কারসাজি হচ্ছে।কেউ কিছু বলতে পারে না।বললে চাকুরী চলে যাবে। বুড়ো বয়সে চাকুরী হারিয়ে আবার কোথায় যাবেন তিনি। এজন্য নীরবে সয়ে যেতে হয় সব কিছু। ইচ্ছের বিরুদ্ধে গেলেও মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।
কথা হল, যদি কোন রুপ রেখা থাকত। যেটাকে আমরা ফলো করতাম। কে হবে মুহতামিম? কে হবেন শায়খুল হাদীস? কে পাবেন হাদীসের কিতাব? এরকম কোন নিয়মনীতি অবশ্যই প্রনয়ণ করা জরুরি। তা যদি না করা হয়, তাহলে দিনে দিনে সমস্যা বাড়তে থাকবে। নিজেদের ভিতরে রেষারেষি হবে। ইখতেলাফের কারণে দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের অপূরণীয় ক্ষতি হবে।
পীরের ছেলে পীর হোক তাতে সমস্যা নেই। মুহতামিমের ছেলে মোহতামিম হোক আমার তাতে দুঃখ নেই। দেখতে হবে, সে যোগ্য কিনা। যোগ্যতা ছাড়া শুধু ক্ষমতা বলে বড় পদে বসানো ঠিক নয়। এরপর জুনিয়র -সিনিয়রিটির মাসয়ালা তো রয়েছে। মুহতামিম সাহেবের ইন্তেকালের পরে যদি তার ছেলে সেরকম যোগ্যতা সম্পন্ন হয়, এবং সেখানে সিনিয়র কেউ না থাকে, তাহলে তো মোহতামিমের ছেলে হলে দোষের কিছু নয়। সমস্যটা হল, ছেলের যোগ্যতা নেই, আবার সেখানে সিনিয়র উস্তাদগণ মজুদ,তারপরেও মুহতামিমের ছেলেকে বসানো বড্ড বেমানান।
আবার মুহতামিম নির্বাচনের ক্ষেত্রে এটাও দেখা যেতে পারে, যিনি চলতে – ফিরতে পারেন। অন্যের সাহায্য ছাড়াই নিজে সকল জায়গায় যেতে পারেন। এরকম ব্যক্তিদের বানানো হলে সবচেয়ে ভাল হয়। প্রায় জায়গাতে দেখা যাচ্ছে, আমাদের মুরুব্বীগণকে আমরা হুইল চেয়ারে ঠেলেই নিয়ে চলেছি। হুজুর নিজে সব কিছু করতে পারেন না। পরনির্ভরশীল। তারপরেও তাঁকে মুহতামিম পদ দেওয়া হয়েছে।
এখানে একটা কথা আছে, যিনি প্রবীণ, যিনি আমাদের মুরুব্বী। তাঁকে অবজ্ঞা নয়। তাঁকে মাদ্রাসা থেকে বিদায় নয়। তিনি মৃত্যু পর্যন্ত মাদ্রাসাতে থাকবেন। তবে তাঁকে মোহতামিম পদে নয়। ছদরুল মুদাররিসিন বা অন্য কোন সন্মাজনক পদে রাখা হবে তাঁকে। বাকি যিনি মোহতামিম হবে, তিনি যেন কর্মদ্দোমী, চৌকষ, এবং নিজের মত করে সব জায়গায় সফর করতে পারেন। এরকম হলে মনেহয় ভাল হয়।
সর্বপরি মাদ্রাসাগুলোর গঠনতন্ত্র, রুপ রেখা প্রনয়ণ সময়ের দাবী। যেটাকে অনুসরণ করে আমরা চলব। দারুল উলুম দেওবন্দের উসুলে হাশ্ততেগানাকে সামনে রাখা যেতে পারে। অষ্টম মূলনীতি, দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর যে মূলনীতি গুলো প্রনয়ণ করা হয়েছিল। সেটা সব সময় অনুসরণীয়। আমাদের মুরুব্বীগণ সেই মূলনীতিকে সন্মান জানাতেন। আমাদেরও তার বিপরীত হবেনা আশা রাখি।
প্রতিটি মাদ্রাসায় শুরা কমিটি আছে নিশ্চয়। কোন প্রতিষ্ঠান শুরার বাইরে নয়। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত সকল মাদ্রাসাতে রয়েছে মজবুত পরিচালনা কমিটি। এসব পরিচালনা কমিটিকে ভেবে- চিন্তে এগুতে হবে। কাউকে মুহাতামিম এবং শায়খুল হাদীসের পদ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক ভাবা জরুরি।
দেখুন! আমাদের অনেক মুরুব্বী, একাই অগণিত মাদ্রাসার শায়খুল হাদীসের পদে আছেন। সেটাও চিন্তার বিষয়। অথচ উক্ত প্রতিষ্ঠানে যোগ্য ব্যক্তির কিন্তু অভাব নেই। তাদেরও তরক্কি দিয়ে সমাজের মাঝে পরিচিতি ঘটানো চাই। আমরা সেটা করছিনা। শায়খুল হাদীস বানাচ্ছি না। শুধু মশহুর ব্যক্তিদের তালাশ করি। কে বেশী প্রসিদ্ধ। কাকে মানুষ বেশী চিনে। তাঁকে আমরা শায়েখ বানায়ে নিচ্ছি। উক্ত প্রতিষ্ঠানের যোগ্য ব্যক্তিগণ চিরদিন অপরিচিত রয়েই গেল।
এভাবে আরো অনেক বিষয় রয়েছে, যে সব নীতিমালা এখন সময়ের দাবি। নীতিগুলো মানা চাই। যদি মানতে পারি, অনেকাংশ কমে যাবে আমাদের ফেৎনা- ফাসাদ। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে সহি বুঝ দান করুন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক
মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়


