মোল্লার দৌড় কি মসজিদ পর্যন্ত | মোহাম্মদ ইয়াহইয়া শহিদ

মোল্লার দৌড় কি মসজিদ পর্যন্ত | মোহাম্মদ ইয়াহইয়া শহিদ

মোল্লার দৌড় কি মসজিদ পর্যন্ত | মোহাম্মদ ইয়াহইয়া শহিদ

কতো হাজার পেশার মানুষ পৃথিবীতে আছে, আমার জানা নেই। আমি কেবল জানি যে যে পেশারই হোক, প্রত্যেকই মানুষ এবং প্রত্যেক মানুষেরই ব্যক্তিজীবন বলে আলাদা একটা জীবন আছে এবং প্রত্যেক মানুষই তার ভেতরে খুব সুক্ষ্মভাবে ব্যক্তিস্বাধীনতার ইচ্ছে লালন করে।একটা মানুষ তখনই খুব কষ্ট পায়, যখন তার ব্যক্তিস্বাধীনতায় কেউ হস্তক্ষেপ করে বা ব্যক্তিজীবনের কোন বিষয় নিয়ে নাক গলায়।

আমরা যারা মাদরাসায় লেখাপড়া করে বড় হই, আমাদের ব্যক্তিজীবন বা ব্যক্তিস্বাধীনতা বলতে কিছু থাকে না। না ছাত্রজীবনে, না এর পরে। আমরা উদ্ভট একটা উটপাখির মতো বড় হই। মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার পর থেকেই বিভিন্নভাবে আমাদের ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হয়। আমাদের আটদশটা মানুষের মতো বড় হতে দেওয়া হয় না। আমরা বড় হই সম্পূর্ণ অন্যের ইচ্ছায়। আমাদের আলাদা কোনো ইচ্ছা-অনিচ্ছা, আবেগ-অনুভূতি, চিন্তা-চেতনা বলতে কিছুই থাকে না। আমাদের তাই করতে হয়, যা আমাদেরকে বলে দেওয়া হয়।

একটা মানুষ যখন শিশু থাকে, তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই ইচ্ছে করে সে অন্যান্য শিশুর মতো জীবনযাপন করতে; কিন্তু আমাদের তা করতে দেওয়া হয় না। আমাদেরকে পৃথিবীর সবকিছু থেকে দূরে রাখা হয়। এই সমাজ নিজের জন্য কিছু না করতে পারলেও আমাদেরকে অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত রাখার কাজটা করতে পারে। মানুষ বড় হওয়ার সাথে সাথে তার ইচ্ছা-অনিচ্ছা, আবেগ-অনুভূতি, চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন আসে; কিন্তু আমাদের আসে না। আমাদেরকে বুঝানো হয় মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত। আমরা যেনো এর থেকে বেশি কিছু না করি। আমরা যদি বাজারে যাই, তাহলে মানুষ আমাদেরকে আড়চোখে দেখে; মনে হয় যেন ভিনগ্রহের কেউ বাজারে এসেছে। মাদরাসায় পড়বে আবার বাজারে যাবে, এইটা যেন কেউ নিতে পারে না। কেন ভাই? সে কি মানুষ না! তার কী খাওয়া দাওয়ার প্রয়োজন নেই? তার গোসলের সাবান কিনতে হয় না? যদি কোন রেস্টুরেন্টে বসে চা খায়, তাহলেও চোখ দেড় ইঞ্চি সাইজের করে আমাদের দেখে সবাই, যেন বুঝাতে চায় মাদরাসায় পড়লে চা খাওয়া হারাম।

মাদরাসায় যারা লেখাপড়া করবে, একশ্রেণির মতে সে বাইসাইকেল পর্যন্ত চালাতে পারবে না। কেউ যদি চালায়, তখন সেই শ্রেণি সেটা মেনে নিতে পারে না। পেছনে পেছনে ঘুরঘুর করে। অন্যান্য গাড়ি চালানো শেখা তো শিরকের পর্যায়ে পড়ে তাদের কাছে। মাদরাসায় যারা পড়ে, তারা ল্যাপটপ, কম্পিউটার এগুলোর ধারেকাছেও যেতে পারবে না। ল্যাপটপের সামনে যদি কোন মাদরাসার ছাত্র বসে থাকতে দেখে, তাহলে এমনভাবে তাকায়, যেন মনে হয় এই দৃশ্য পৃথিবীতে দেখার মতো দৃশ্য না। এভাবে প্রত্যেকটা বিষয় থেকে আমাদের দূরে রাখা হয়। আমরা এভাবেই বড় হই। মানুষের বয়সের সাথে সাথে কিছু কাজ করতে হয়, যেগুলো সময় চলে গেলে করা যায় না। আমরা সেই কাজগুলোও করতে পারি না। একটা সময় কেবল আক্ষেপ আর তীব্র ঘৃণা নিয়ে সেই শ্রেণির মানুষকে স্মরণ করি, যারা আমাদের কাজগুলো করতে দেয়নি।

আমাদের কোন আফসোস থাকত না, যদি পরে আমাদেরকে আমাদের মতো থাকতে দেওয়া হত। কিন্তু পরে আর আমাদেরকে আমাদের মতো থাকতে দেওয়া হয় না। আমাদেরকে বিভিন্নভাবে হেয় করা হয়। মোল্লারা সমাজের বোঝা, তারা কিচ্ছু পারে না, মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত, এগুলো বলে আমাদের মাথা সবসময় নুয়ে রাখতে চায়। একটা সমাজ কখনো চায় না আমরা সবার মতো বড় হই। তার পরেও আমরা বড় হই। আমরা এগিয়ে যাই।
আমরা যখন ছাত্রজীবনটা এভাবে পার করে পরবর্তী জীবনে পা দিই, তখন শুরু হয় আমাদের আসল যুদ্ধ।

যেই সমাজ আমাদেরকে পৃথিবীর সবকিছু থেকে দূরে রেখে বড় করলো, যেই সমাজ আমাদেরকে আমাদের প্রয়োজনীয় বিষয়াদি শিক্ষা করা থেকে দূরে রাখলো, তারাই আবার আমরা কিচ্ছু পারি না বলে আমাদেরকে নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে শুরু করে। যে সমাজ আমাদের প্রযুক্তি হাতে দেখতে পারেনি, সে সমাজই আবার আমরা প্রযুক্তির ব্যবহার জানি না বলে আমাদেরকে হেয় করতে চায়। যে সমাজ আমাদেরকে বাইসাইকেলের প্যাডেল ঘুরাতে দেয়নি, সে সমাজ আজ আমরা মোটরবাইক চালাতে পারি না বলে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। যে সমাজ আমাদের বাজারে যেতে দেয়নি, সে সমাজ আজ আমাদেরকে বলে আমরা নাকি ঘরমুখী। যে সমাজ আমাদেরকে সামাজিক নিয়মে বেড়ে ওঠতে দেয়নি, সে সমাজ আজ আমাদের বলে আমরা নাকি অসামাজিক। কেন ভাই? আপনার নীতি দ্বিমুখী কেন? আপনার সবকিছুতে চুলকায় কেন?

আপনাদের মাসিক পকেটখরচ যেখানে ১০ হাজার টাকা, সেখানে একজন ইমাম সাহেবকে মাসিক বেতনভাতাই দেন ৫ হাজার টাকা। তাও অনেক শর্তসাপেক্ষ। পাঁচ হাজার দিয়ে তো আপনারা ইমাম সাহেবকে আপনাদের গোলাম বানিয়ে নেন। যেখানে আপনাদের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মত পড়ালেই ইমাম সাহেবের দায়িত্ব আদায় হওয়ার কথা, সেখানে ২৪ ঘন্টা মসজিদে থাকার শর্ত দেন। দেবেন না কেন! হুজুরদের তো বউ বাচ্চা নেই। হুজুররা তো বিয়ে করে না। হুজুরদের তো মা বাবা নেই।

তাদের মা বাবাকে দেখতে ইচ্ছে হয় না। তাদের মা বাবা অসুস্থ হোন না। তাদের কোথাও ঘুরতে ইচ্ছে হয় না। তাদের আত্মীয়স্বজনও তো নেই। তারা তো উটপাখি। তাদের তো পৃথিবী দেখার অনুমতি নেই। এজন্য ২৪ ঘন্টাই মসজিদে থাকতে হয়। বউয়ের সাথে যে ঝগড়ায় পারে না, সেও শুক্রবারে ইমাম সাহেব কেন ২৪ ঘন্টা মসজিদে থাকেন না বলে তার বউয়ের সাথে পরাজয়ের বদলা নেয়, পাঁচহাজার টাকা দিয়ে রাখা ইমাম সাহেবের সাথে।

ইমাম সাহেব মসজিদে ইমামতি ছাড়া অন্যকোন ব্যবসা করতে পারবেন না। সেদিন শুনলাম ব্যবসায় জড়ানোর কারণে এক ইমাম সাহেবের চাকুরি চলে গেছে। যাবে না কেন! ইমাম সাহেবের কি ব্যবসা করার অধিকার আছে? তারা ব্যবসা কেন করবে! তারা তো ভিনগ্রহের প্রাণী! তাদের জৈবিক চাহিদা বলে কিছু নেই। আপনাদের এতোকিছুর পরও আমরা আমাদের কাজ করি আমাদের দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে। আপনার মতো প্রান্তিক চিন্তাধারার মানুষ সমাজে একজন, কিন্তু উন্নত চিন্তার মানুষ অনেক বেশি। আমরা তাদের কথাই ভাবি।

আমাদের এলাকার কোন এক শিক্ষিত নাকি বলেছে, আমাদের মাদরাসায় ই-মেইল একাউন্ট তৈরি করতে পারবে, এরকম কোন শিক্ষক নেই। ও শিক্ষিত ভাই! কেন থাকবে! আমাদের হাতে একটু সাইজে বড় মোবাইল দেখলেই তো আপনার চুলকানি শুরু হয়। হারবালের মলম দিয়েও আপনার চুলকানি মেটে না। ল্যাপটপ দেখলে তো আপনার সারা গায়ে রীতিমত চিকুনগুনিয়ার ব্যথা শুরু হয় যেন আপনার ডেঙ্গু হইসে। তাহলে আমরা ই-মেইল বানানো শিখব কী করে? আমাদেরকে তো আপনার চুলকানি আর মাথাব্যথা প্রযুক্তি ব্যবহার করতে দেয়নি। তাহলে কীভাবে আমরা ই-মেইল তৈরি করব?

তারপরেও আপনাকে বলি, আপনি জেনে হয়ত হার্ট এ্যাটাক করতে পারেন। আপনাদের চুলকানির থেরাপি হিসেবে আমরা আপনাদের মাথাব্যথা উপেক্ষা করেও অনেক কিছু শিখে ফেলছি। আপনারা আমাদেরকে বাইসাইকেলের প্যাডেল ঘুরাতে দেননি, কিন্তু আজ আমরা মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে ট্রাক্টর (যেটাকে আপনারা কুত্তাগাড়ি বলেন) চালাতে পারি। কেবল পারি না আপনাদের সাথে প্রতিযোগিতা হলে নিঃসন্দেহে আমরা প্রথম হবো। আপনারা আমাদেরকে বাজারে চা খেতে দেননি, কিন্তু আমরা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে ইংলিশ মেনু থেকে অর্ডার করে দেশি বিদেশি এমন খাবার খাই, যেগুলোর নামও হয়ত আপনারা শুনেন নি।

আপনারা আমাদেরকে ল্যাপটপ কম্পিউটারে হাত দিতে দেননি, ভাবছিলেন আমরা এগুলো করলে আপনারা কী করবেন! কিন্তু এখন আমাদের কাছে পান্তাভাত, আপনাদের যখন কো্ন বিষয়ে খটকা লাগে, আমরা তা সমাধান করে দিই। যে সময় আপনি ভাবছেন আমরা ই-মেইল একাউন্ট তৈরি করতে পারি না, ঠিক সে সময়ে আমরা ই-মেইল, ফেইসবুক, টুইটার, ইউটিব, ব্লগ, অয়েব সাইট কেবল তৈরি করতে পারি না; হ্যাকও করতে পারি। এগুলোও আমাদের কাছে পান্তাভাত; যেটা আপনি স্বপ্নেও ভাবেননি। আমরা এখন অনলাইনে ব্যবসা করি। আপনার অবগতির জন্য বলি যেটাকে ফ্রিল্যাংসিং বলা হয়। আমরা আরো অনেক কিছু পারতাম, যদি সেটা আপনাদের চুলকানির কারণ না হতো। এগুলো বলে পটরপটর করে সময় নষ্ট করা আমাদের কাজ না, তারপরেও পটরপটর করছি, কারণ বিড়ালের সামনে দুধভাত না দেওয়া পর্যন্ত বিড়াল মিয়াও মিয়াও করতেই থাকে।

আমি একদিন বাইক চালিয়ে কোথাও যাচ্ছিলাম, আপনারা আমাকে দেখে থ হয়ে গেছিলেন। ভাবছিলেন যাকে আমরা বাইসাইকেলের প্যাডেল ঘুরাতে দিইনি, সে কিভাবে আজ মোটরসাইকেলের ড্রাইভিং করে! মাদরাসার কাজে গত বছর কয়েকদিন কম্পিউটারে বসেছিলাম, আপনারা দেখে তো কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গিয়েছিলেন। একি দেখলাম! যাদেরকে আমরা বড় মোবাইল চালাতে দিইনি, তারা আজ কম্পিউটার চালাচ্ছে নির্লিপ্তভাবে! হুম আপনাদের কাছে অবাক লাগলেও এগুলো এখন আমাদের কাছে স্বাভাবিক। এগুলো এখন আমাদের গৌরবের কারণ না, বরং আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার অংশ। আপনারা যেখানে নিজের কাফনের কাপড় কাটতে ব্যর্থ, আমারা এখন নিজের সব কাজ নিজেরাই করতে পারি।

লিখতে ভুলে গিয়েছিলাম, একসময় আপনারা কেবল গল্প, উপন্যাস, কবিতা লিখেছেন। আমাদের হাতে গল্প, উপন্যাস, কবিতার বই দেখলে বলেছেন হুজুররা এগুলো কেন পড়বে! এখন আবার বলেন হুজুররা বাংলা জানে না। আপনার অবগতির জন্য বলছি, আমরা কেবল বাংলা জানি এরকম না, আমরা নিয়মিত গল্প, উপন্যাস, কবিতার বইও লেখি। হুম আমরা প্রেমের কবিতা, গল্প, উপন্যাসও লেখি। মানুষ পড়েও সেগুলো।

আপনারা বারাবার চেয়েছেন আমাদের ব্যক্তিজীবনের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে, পেরেছেনও। কিন্তু যুগের সাথে আমরাও পিছিয়ে নেই। আমরা আমাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা নিশ্চিত করব। এতে যদি কারো চুলকায়, তাহলে আমরা থেমে থাকব না। আমরা এগিয়ে যাবই। একদিন দেখবেন যাকে ঘরমুখি করতে চেয়েছিলেন, যাকে মসজিদের ভেতরে রাখতে চেয়েছিলেন, সে বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে আপনার সব চুলকানি মিটিয়ে দেবে।

আমারাই সমাজ আবার সমাজকে নিয়েই আমরা। আমি যে সমাজের কথা বলছি, তারা আসলে কোনো সমাজের না। এরাই মূলত অসামাজিক। যারা সামাজিক, যাদেরকে নিয়ে সমাজ, তারা আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়। প্রান্তিক চিন্তাভাবনাকারী লোকগুলো যখন আমাদেরকে পিছেয়ে দিতে চায়, তখন সেই সমাজই আমাদেরকে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দেয়। তাদের অনুপ্রেরণা আর সহযোগিতায়ই আজ আমরা এতদূর। আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। আপনার আমার এই লেখা পড়লে মন খারাপ করবেন না, আমি আপনাদের জন্য লিখিনি, লিখেছি ঐ প্রান্তিক শ্রেণির লোকদেরকে উদ্দেশ্য করে, যারা আপনার, আমার সবারই পথের কাঁটা। আপনারা আমাদের পাশে থাকেন। আমাদের এগিয়ে যেতে সাহায্য করেন।

আপনাদের অনুপ্রেরণায় আমরা এগিয়ে চলছি। একদিন আলো আসবেই।

লেখক : তরুণ আলেম

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *