পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : দখলদার ইসরাইলের সাথে যুদ্ধ অবসানের পর গাজা এবং পশ্চিমতীরে নতুন একটি স্বাধীন নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চায় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস ও অন্য প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো। যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনায় অংশ নেয়া পশ্চিমতীরের ফিলিস্তিনি ইসলামী আন্দোলনের নেতা হোসাম বাদরাম গত শুক্রবার এ তথ্য জানিয়েছেন। যুদ্ধের শুরুতে ইসরাইল জানিয়েছিল হামাসকে তারা গাজা থেকে নির্মূল করবে। তবে এখনো এই লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি তারা।
হোসাম বাদরাম কাতার, মিসর ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে যে আলোচনা হচ্ছেÑ তাতে পশ্চিমতীরের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তিনি বলেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আমরা নির্দলীয় জাতীয় দক্ষ সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছি। যারা গাজা ও পশ্চিমতীরের দেখভাল করবে। সেই সাথে যুদ্ধ-পরবর্তী গাজায় প্রশাসন প্রতিষ্ঠা ফিলিস্তিনের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার এবং তা নিয়ে হামাস বিদেশী কোনো শক্তি বা গোষ্ঠীর সাথে আলোচনা করবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন এ হামাস নেতা।
হামাসের এই কর্মকর্তা এএফপিকে বলেছেন, মধ্যস্থতাকারীদের কাছে একটি নির্দলীয় সরকারের প্রস্তাব করা হয়েছিল। হোসাম বাদরামের মতে, যুদ্ধোত্তর সরকার গাজা উপত্যকা এবং অধিকৃত পশ্চিমতীরে একটি সাধারণ নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করবে। এর আগে ইসরাইল দাবি করে যে, তারা মিসরের সাথে গাজার সীমান্তে ফিলাডেলফি করিডোরের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে। এরপরই বাদরাম এসব কথা বলেন।
গাজায় যুদ্ধাবসানের পর ইসরাইলি সেনাদের উপত্যকাটির সমস্ত এলাকা থেকে প্রত্যাহার করতে হবে বলে বারবারই আহ্বান জানিয়ে আসছে হামাস। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট দাবি করেছে, হামাস অস্ত্র ও লোকবলের দিক দিয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ কারণে তারা এখন যুদ্ধবিরতি চাইছে। তবে হামাসের লেবানন রাজনৈতিক অফিসের প্রধান নেতা আহমাদ আব্দুল-হাদি বার্তাসংস্থা এপিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, যুদ্ধের শুরুর সময়ের চেয়ে এখন ভালো অবস্থানে আছে ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা। তিনি বলেছেন, প্রতিরোধ যোদ্ধাদের জন্য সামরিক সক্ষমতা স্থিতিশীল রয়েছে এবং তাদের অবস্থান যুদ্ধের শুরুর সময়ের চেয়ে ভালো আছে। ইসরাইলের হামলার তীব্রতা বাড়ায় গাজায় অবস্থানরত হামাসের নেতারা যুদ্ধবিরতিতে রাজি হতে চাপ দিচ্ছে এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন লেবাননভিত্তিক এই নেতা। হামাসের ওই নেতা বলেছেন, পরবর্তী ধাপে আমরা একা গাজাকে শাসন করতে চাই না। আমরা অংশীদারিত্ব এবং জাতীয় ঐকমত্যের সরকার চাই। জুলাইয়ের শেষ দিকে চীনে নিজেদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ফাতাহর প্রতিনিধির সাথে হামাসের প্রতিনিধিরা বৈঠক করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। গত মাসে বৈঠকটির সময় নির্ধারণ করা হলেও এটি স্থগিত করা হয়।
নিরাপদ জোনে হামলা : এ দিকে গাজার দক্ষিণাঞ্চলে গতকাল শনিবার হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। এতে নিহত হয়েছে অন্তত ৭১ জন। সেই সাথে আহত হয়েছে ২৮৯ জনের বেশি। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে বার্তাসংস্থা এপি। হামাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, খান ইউনিসের কাছে আল-মাওয়াসিতে হামলা হয়েছে। এই অঞ্চলটিকে ইসরাইলি বাহিনী পূর্বে মানবিক অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করেছিল।
তবে ইসরাইলের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হামাসের মিলিটারি উইংয়ের প্রধান মোহাম্মেদ দেইফকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে। একজন প্রত্যক্ষদর্শী বিবিসিকে বলেছেন, যেখানে হামলা চালানো হয়েছে তা দেখে মনে হচ্ছে যেন ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে।
গত বছরের অক্টোবর থেকে গাজায় হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ চলছে। এতে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৩৮ হাজার ছাড়িয়েছে। আহত হয়েছে ৯০ হাজারের বেশি। সেই সাথে ২০ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ রয়েছে।
হেপাটাইটিসে আক্রান্ত ৭০ হাজার : অন্য দিকে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়েছে ৭০ হাজারের বেশি মানুষ। গাজার হাজারো মানুষ বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়ায়, এত বেশি মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা এ খবর জানিয়েছে। গাজার সরকারি সংবাদমাধ্যমের কার্যালয় জানিয়েছে, গত ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে গাজা উপত্যকার বিভিন্ন অংশে বাস্তুচ্যুত হওয়ার কারণে কমপক্ষে ৭১ হাজার ৩৩৮ জন হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, বাস্তুচ্যুত পরিস্থিতির কারণে এখন পর্যন্ত ১৭ লাখের বেশি মানুষ বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরাইলি সেনাবাহিনী প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহে বাধা দেয়ায় গাজায় দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এ দিকে আল-মাওয়াসি শরণার্থীশিবির থেকে খান ইউনিসের নাসের মেডিক্যাল কমপ্লেক্সে মৃত ও আহতদের তালিকা অন্তর্ভুক্তির কাজ চলছে। আলজাজিরার ফ্যাক্ট-চেকিং এজেন্সি সানাদ দ্বারা যাচাইকৃত ভিডিও ফুটেজে এ সময় হাসপাতালে হতাহতের ছড়াছড়ি দেখা গেছে।
যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে বাধা নেতানিয়াহু : ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস ও দখলদার ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধবিরতির চুক্তি করতে চেষ্টা চালাচ্ছে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো। যুদ্ধবিরতি যেন হয় সেজন্য হামাস তাদের কঠিন শর্ত থেকেও সরে এসেছে। তবে দখলদার ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এখন এই চুক্তিতে বাধা সৃষ্টি করছেন। ইসরাইলি এক কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যম চ্যানেল-১২কে জানিয়েছেন, আলোচনা এখন যে অবস্থায় রয়েছে সেটি অব্যাহত থাকলে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে চুক্তি করা সম্ভব। কিন্তু নেতানিয়াহু নতুন করে যেসব শর্ত দিয়েছেন সেগুলো এই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত এমনকি থামিয়ে পর্যন্ত দিতে পারে।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমগুলোতে গত শুক্রবার খবর প্রকাশিত হয়, নেতানিয়াহু আলোচনার ক্ষেত্রে নতুন করে শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। যার মধ্যে অন্যতম হলো গাজা ও মিসর সীমান্তবর্তী স্থানে ইসরাইলি সেনাদের অবস্থান অব্যাহত রাখা হবে এবং গাজার উত্তরাঞ্চলে হামাসের কোনো যোদ্ধাকে ফিরতে দেয়া হবে না। কিন্তু নেতানিয়াহুর এসব শর্ত যুদ্ধবিরতির আলোচনা ভণ্ডুল করে দিতে পারে।
কুকুর লেলিয়ে হত্যা : গাজা উপত্যকার সুজাইয়াতে ইসরাইলি সেনাদের কুকুরের হামলায় এক প্রতিবন্ধী যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। প্রতিবন্ধী এই যুবক কথা বলা থেকে শুরু করে কিছুই করতে পারত না। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডেল ইস্ট আই শুক্রবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২৪ বছর বয়সী ওই যুবকের নাম মুহাম্মদ। সে তার পরিবারের সদস্যদের সাথে থাকত। যুবকটি ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত ছিল।
মুহাম্মদের মা নাবিলা আহমেদ সংবাদমাধ্যমটিকে বলেছেন, গত ২৭ জুন থেকে সুজাইয়াতে দখলদার ইসরাইলের সেনারা ব্যাপক হামলা চালায়। ওই দিন থেকে নিজেদের বাড়িতে লুকিয়ে ছিলেন তারা। কিন্তু একদিন তাদের বাড়িতে এসে উপস্থিত হয় ইসরাইলিরা। এসেই প্রথমে একটি কুকুরকে বাড়ির ভেতর ছেড়ে দেয়। ওই কুকুরটি এসে অবুঝ মুহাম্মদকে কামড়ে ধরে ছিন্নভিন্ন করে দেয়।
দখলদার ইসরাইলিরা সুজাইয়া থেকে চলে যাওয়ার পর গত বুধবার মুহাম্মদের পরিবার দ্রুত তাদের বাড়িতে যান। সেখানে গিয়ে দেখতে পান বাড়িতে পড়ে আছে তার গলিত লাশ। এ ছাড়া তারা প্রত্যক্ষ করেন মুহাম্মদের মুখমণ্ডল খাচ্ছিল পোকামাকড়। মুহাম্মদের মা নাবিলা আহমেদ বলেছেন, তার চিৎকার এবং কুকুর থেকে ছাড়া পাওয়ার চেষ্টার যে চিত্র আমি দেখেছি তা ভুলতে পারছি না।
সূত্র: আলজাজিরা, আরব নিউজ, রয়টার্স ও মিডল ইস্ট আই


