আরও ৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের শঙ্কা
নিজস্ব প্রতিবেদক : কতজন রাশিদা, হাসিনার দুর্দশার কথা বলব? বাস্তুচ্যূত রোহিঙ্গাদের দিনলিপি লিখতে গিয়ে এখন আর হাত তেমন কাঁপে না। তবে, হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে ৭১’র বাংলাদেশের মানুষের দেশান্তরিত হবার চিত্র। পাক সেনাদের নির্যতন নিপীড়নের শিকার হয়ে মানুষ ঢল নেমেছি ভারতের প্রান্তিক রাজ্য ত্রিপুরায়। আর এবারে পাশ্ববর্তি মিয়ানমার সেনাবাহিনী তা-ব আর বর্বরতার শিকার হয়ে লাখে লাখে রোহিঙ্গারা পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। তৎকালীন দেশ ছাড়া বাংলাদেশের বাসিন্দাদের সামনে আশার বাতি ছিল।
যা বিতাড়িত হয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বেলায় নেই। মিয়ানমার আদৌ তাদের গ্রহণ করবেন কিনা সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ উঁকি দিচ্ছে। মিয়ানমার সরকার নতুন করে যে বিষয়টি আচমকা সামনে মেলে ধরেছে, তাতে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের গ্রহণ না করার পক্ষেই জোরালো সমর্থন দাবি করে। রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রহীন করেছে যে আইন। বার্মা সিটিজেনশিপ ল’, অক্টোবর ১৯৮২ সালের ৪ নম্বর আইন। এদিকে মিয়ামারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু মুসলমান রোহিঙ্গাদের বসবাস। রাজ্যের জনসংখ্রার ৪০ শতাংশের বেশি রোহিঙ্গা হলেও তাদের নাগরিক মানতে নারাজ মিয়ানমান সরকার। এই অস্বীকৃতির মূলে রয়েছে, ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন। যে আইনে ৩ ধরনের নাগরিকের কথা বলা হয়েছে। সিটিজেন (পূর্ণ নাগরিক), অ্যাসোসিয়েটস সিটিজেন, ন্যাচারাইজড সিটিজেন। কারা মিয়ানমারের পূর্ণ নাগরিক? ১৮২৪ সালে ইংরেজরা আসার আগে যারা স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। এমন ৮ জাতিগোষ্ঠীর ১৩৫টি নৃতাত্তিক গোষ্ঠীকে পূর্ণ নাগরিকের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। সরকারের দাবি রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিয়ে যায় ইংরেজরা। সুতরাং তারা পূর্ণ নাগরিক হতে পারে না। তাদের অ্যাসোসিয়েট সিটিজেন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর যারা ১৯৪৮ সালের নাগরিকত্ব আইনে নাগরিকত্ব পেয়েছেন-তারা ন্যাচারালাইজড সিটিজেন।
অন্যদিকে ১৯৪৮ সালের আগে এলও ১৯৮২ সালের পরে যারা আবেদন করেছেন, তারা এ আইনের কারণে বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। নিরাপত্তাবাহিনীর নিপীড়নে লাখ লাখ রোহিঙ্গা ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। এক্ষত্রে কেবল রোহিঙ্গা নয়, ভারতীয় বংশদ্ভূত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীও একারণে নাগরিকত্ব বঞ্চিত। তবে, ঐতিহাসিকদের মতে, রোহিঙ্গারা ১৮২৪ সালের বহু আগে থেকেই মিয়ানমারে বাস করে আসছে। আন্তর্জাতিকভাবেও রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃত। অন্যদিকে দমন-পীড়নের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের এখন থেকে ‘বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিক’ বলবে বাংলাদেশ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহ কামাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনেএ তথ্য জানান। তিনি বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আমাদের চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের নাগরিকদের বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিক বলতে হবে। এর আগে ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের হাই কমিশনার ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডির সঙ্গে সরকারের এক বৈঠকের পর ত্রাণ সচিব জানিয়েছিলেন মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলেও এখনই তাদের শরণার্থী মর্যাদা দিচ্ছে না বাংলাদেশ। শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে কোনো দেশকে উদ্বাস্তুদের বেশ কিছু অধিকার দিতে হয়। সরকারিভাবে রোহিঙ্গাদের এতদিন অনুপ্রবেশকারী বলা হাচ্ছিল। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনী নতুন করে দমন অভিযান শুরুর পর ২৫ অগাস্ট থেকে পাঁচ লাখের বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।
এদিকে মিয়ানমার সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার ঘোষণা দিলেও এখন উল্টাপাল্টা কথা বলছে। অথচ ঢাকায় বৈঠককালে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবার কথা জানালেও দেশে ফিরে যাবার পর পররাষ্ট্র দফতর থেকে উল্টো শর্ত জুড়ে দিয়ে বার্তা দেয় মিয়ানমার। একারণে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা শরণার্থীরা বলছেন, পশ্চিম রাখাইনে থেকে যাওয়া অবশিষ্ট রোহিঙ্গাকে দেশছাড়া করতে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী ফের তা-ব শুরু করেছে। তাদের তাড়িয়ে দিতে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান দ্বিগুণ জোরদার করেছে। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বলছেন, প্রতিদিন বাংলাদেশের সীমান্তে ছুটছে হাজার হাজার মানুষ। বহু গ্রাম এখন একেবারেই জনমানবশূন্য। বাংলাদেশে প্রথম ধাক্কায় (প্রায় একমাসে) ৫ লাখের কাছাকাছি রোহিঙ্গা আশ্রয়। এরপর আন্তর্জাতিক চাপ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনার মুখে কিছুটা থেকে গিয়েছিল সেনাবাহিনীর বর্ববরতা। কিন্তু গত ক’দিন যাবত ফের সেনাতা-বে তা রোহিঙ্গ ঢল নামে বাংলাদেশে। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বলছেন, রাখাইনে অবশিষ্ট রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষকে তাড়িয়ে দিতে দ্বিগুণ শক্তিতে অভিযান শুরু করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে থাকা রোহিঙ্গা ¯্রােত আরও জোরালো হয়েছে। রাখাইন থেকে বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর সেই বিপন্ন মানুষদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জেনেছে দেশি-বিদেশি সংবাদ মাধ্যম। জাতিসংঘের আশঙ্কা, এখনও রাখাইনে থেকে যাওয়া রোহিঙ্গারাও বাংলাদেশে চলে আসবে। বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই থাকা ৯ লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে সেখানকার অবশিষ্ট ৩ লাখ রোহিঙ্গা যুক্ত হয়ে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ১২ লাখে দাঁড়াবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে তারা। জাতিসংঘের মঙ্গলবারের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ৫ লাখ ৯ হাজার রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে। সংস্থাটির আবাসিক সমন্বয়কারী রবার্ট ওয়াকিনস বলেন, কক্সবাজারে থাকা রোহিঙ্গারা খুবই নাজুক অবস্থায় আছে। তাদের অনেকেই এখন সেই বিভীষিকা কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
তাদের বসবাসও করতে হচ্ছে অনেক মানবেতর পরিস্থিতিতে। আমাদের লক্ষ্য ১২ লাখ রোহিঙ্গার মানবিক সহায়তা নিশ্চিতের জন্য প্রস্তুত থাকা। কারণ ইতোমধ্যে ৮ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে বাংলাদেশে। আর আগামী ৬ মাসে আরও ৩ লাখ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে। ০বাংলাদেশে ও ত্রাণ সংস্থাগুলো এই বিশাল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। সহায়তায় এগিয়ে এসেছে জাতিসংঘ, ইউনিসেফসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। রোহিঙ্গাদের উপর এই নির্যাতনকে জাতিগত নিধনযজ্ঞের পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে জাতিসংঘ। তবে মিয়ানমার বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তাদের দাবি বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছে তারা। গত বছর অক্টোবরেও পুলিশের উপর হামলা চালিয়েছিলো রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়ের সশস্ত্র এই বিদ্রোহী সংগঠনটি। সেই সময়েও ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।
পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন মংডুর বাসিন্দা রাশিদা বেগম। তিনি এএফপিকে বলেন, স্থানীয়রা আমাদের কয়েক সপ্তাহে ধরে বলছিল যে আমরা সেখানে থাকলে তারা নিরাপত্তা দেবে। কিন্তু এরপর সেনারা এসে ঘরে ঘরে তল্লাশি শুরু করে। তারা আমাদের চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। তিনি বলেন, স্থানীয়রা আশ্বাস দিয়েছিল, তারা আমাদের কোনো ক্ষতি করবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদের ঘর থেকে বের করে দিয়ে বাড়িতে আগুন দেয়। হাসিনা খাতুন নামের আরেক পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা নারী বলেন, স্থানীয়রা আমাদের বলেছিল, বাংলাদেশে যেও না। সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। আমরা তাদের বিশ্বাস করেছিলাম। আমি গ্রামেই থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পরিস্থিতির কোনও উন্নতি হয়নি। শেষ পর্যন্ত আমাদের চলে আসতে হল।


