রোগ প্রতিরোধে টিকা দিন

রোগ প্রতিরোধে টিকা দিন

 মোহাম্মদ হাসান জাফরী : ছোটো ফুটফুটে শিশুটিকে আর বাঁচানো গেল না। মায়ের কোল জুড়ে আলো ছড়িয়ে পৃথিবীতে এসেছিল। কষ্ট সহ্য করে দিনের পর দিন যার মুখটি দেখার জন্য অপেক্ষা, একটু একটু করে আশা নিয়ে লালন-পালন করে যাচ্ছিলেন মা-বাবা; আজ সে নেই।

জন্ম-মৃত্যু থাকবেই এটাই সত্য। কিন্তু তাই বলে অজ্ঞতা, অবহেলায় ফুটফুটে শিশুটিকে আর বাঁচানো গেল না, এটা মেনে নেওয়া কষ্টের। বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে চিকিৎসাক্ষেত্রে যে আমূল পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত তার সুফল থেকে তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে হাত গুটিয়ে আমরা বসে থাকবো না। সময় এসেছে বাস্তবের মুখোমুখি হওয়ার। সচেতনতা বৃদ্ধির পাশপাশি অন্যকেও সচেতন করার। শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ সবল হয়ে সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গড়তে সকলে এগিয়ে আসবো।

ইপিআই একটি বিশ্বব্যাপী কর্মসূচি যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে সংক্রামক রোগ থেকে শিশুদের অকাল মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব রোধ করা। ১৯৭৯ সালের ৭ এপ্রিল সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির ঘোষণা ও বাস্তবায়নের পর থেকে দেশে এক বছরের কমবয়সি সকল শিশুদের মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব থেকে রক্ষা করতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) সফলতা আজ বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত এবং সমাদৃত। সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থাসমূহের সকলের মাঠ পর্যয়ে অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই বাংলাদেশে আজ শতকরা ৯০ ভাগের উপরে শিশুকে নিয়মিত টিকা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। ফলে শিশুমৃত্যুর হার আজ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

টিকাদান কর্মসূচির ফলে শিশুদের প্রতিরোধযোগ্য রোগসমূহ- যক্ষা, পোলিও, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, মা ও নবজাতকের ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস-বি, হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা-সম্পর্কিত রোগসমূহ, হাম, রুবেলা, নিউমোকক্কাল নিউমোনিয়া ইত্যাদি এখন অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। বর্তমান বিশ্বে রোগ প্রতিরোধের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কারণ রোগ প্রতিকারের চেয়ে রোগ প্রতিরোধই উত্তম। শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। ফলে শিশুরা সহজে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। টিকা একটি নির্দিষ্ট রোগের বিরুদ্ধে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে। রোগের ভিন্নতায় টিকাও ভিন্ন। যেসব রোগের টিকা এ পর্যন্ত আবিষ্কার হয়েছে তার অধিকাংশই শিশুদের জন্য। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি শুরু করার আগে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় আড়াই লাখ শিশু ৬টি রোগে মারা যেত। এর মধ্যে এক বছরের কম বয়সি শিশু মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। দেখা গেছে, পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের রোগ ও মৃত্যুর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এদের তিন ভাগের একভাগ মারা যায় ডায়রিয়া রোগে, এক ভাগ ছয়টি প্রতিরোধযোগ্য রোগে এবং বাকী এক ভাগ অন্যান্য রোগে। তাই সময়মতো টিকা প্রদান করে শিশুদের মৃত্যু হার অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এজন্য সঠিক সময়সূচি অনুসরণ করে এবং ন্যূনতম বিরতি মেনে টিকা প্রদান করলে অনেক রোগ থেকে শিশুদের বাঁচানো সম্ভব হয়। অবশ্য টিকা কখন দেওয়া যাবে আর কখন দেওয়া যাবে না এ সম্পর্কে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি এবং এ বিষয়টি সম্পর্কে জনসচেতনতার বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) কাh©ক্রমসমূহ সঠিকভাবে সম্পন্ন করার বিষয়ে মাঠ-কর্মীদের অনেক দায়িত্ব। সঠিক বয়সে, সঠিক বিরতিতে ও সঠিক টিকাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে মা-বাবা, অভিভাবকদের পরামর্শ প্রদান এর পাশাপাশি কর্মসূচির সঠিক বাস্তবায়ন, অগ্রগতি পর্যালোচনা, পর্যালোচনাশেষে সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। যা অভিভাবকদের আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমে ইপিআই কর্মসূচির লক্ষ্য অর্জিত হতে পারে।

সরকারই সব করে দিবে, বিষয়টি এমন নয়, আমরা সাধারণ জনগণ সচেতন থাকলে বিষয়গুলো আরো সহজে সমাধান করতে পারি। মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য এ নীতিকে বুকে ধারণ করে করে আমরা এগিয়ে যাব, একে অপরের সুখ-দুঃখের অংশীদার হবো, সকলে মিলে মিশে কাজ করবো, সুস্থ সবল উন্নত জাতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াবো এটাই আমাদের কাম্য।

যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষ তার জ্ঞান, বুদ্ধি, বিবেক, অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাবে। অভ্যাস বা আচরণ পরিবর্তনের মাধ্যমে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নতুন নতুন চিকিৎসা ব্যবস্থার আলোকে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনছে যা মানুষকে উন্নত জীবনযাপনে উপকৃত করছে। স্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনে মানুষের মনোভাব ও আচরণে পরিবর্তন যেমন জরুরি তেমনি সেবা প্রদানকারী সংস্থাদের নিরলস পরিশ্রমের পাশাপাশি সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব তার নিজ এলাকার নিরক্ষর, অল্পশিক্ষিত, সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা যা সমগ্র জাতির উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।

প্রচার অভিযানের মাধ্যম ও উপকরণ হিসেবে ফ্লিপ চার্ট, মাইকিং, গান ও কবিতার স্লাইড প্রদর্শনী, আলোচনা এবং মিটিং জোরদার করতে হবে ও হাট-বাজারে বা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পোস্টার লাগালে অনেকের চোখে পড়বে। আর এসব প্রচারাভিযানে স্থানীয় বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ যেমন-শিক্ষক, ইমাম, চেয়ারম্যান, শিল্পী সাহিত্যিক, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্মীবৃন্দ, মহিলা সংস্থা বা ক্লাবের কর্মীদের অংশগ্রহণ বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বতঃù‚র্ত অংশগ্রহণ, ইপিআই কর্মসূচিতে সামাজিক সমর্থন, ইপিআই কাজে সহায়তা, তত্ত্বাবধান ও মনিটরিং এবং টিকাদান কর্মীর দায়িত্ব ও করণীয় বিষয়সমূহের সফল বাস্তবায়নই পারে কাঙ্ক্ষিত সুস্থ সবল সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে আমাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে।

২১.১০.২০১৮

লেখক : কলামিস্ট

 

 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *