সমালোচকরাই মুজিববর্ষ নিয়ে ভাবছে

সমালোচকরাই মুজিববর্ষ নিয়ে ভাবছে

সমালোচকরাই মুজিববর্ষ নিয়ে ভাবছে

আমিনুল ইসলাম :: এই মতামতটা আমার ব্যক্তিগত। কারো পরামর্শ বা কারো কোন কথায় প্রভাবিত হয়ে এটা লিখছি না। এই তো কদিন আগে আমি মুজিব বর্ষ নিয়ে, বঙ্গবন্ধুর কীর্তি নিয়ে কয়েকটি কলাম লিখেছিলাম। সে কলামগুলো দু একটা অনলাইন নিউজ পোর্টালে ছাপা হলো। কিন্তু আমার কিছু বন্ধু আমাকে চরমভাবে আক্রমণ করে বসলেন। কেউ তো দালাল, কেউ সেক্যুলার আলেম, কেউ আওয়ামী লীগার, এরকম বিভিন্ন ভাষায় আমাকে গালমন্দ করলেন।

অনেকে কানাঘুষা করলেন, আমি নাকি সরাসরি আওয়ামী লীগে যোগদান করেছি। আমার এলাকার মধ্যে আমার কলামগুলো নিয়ে কম কথা হয়নি। একদম আলোচনা -পর্যালোচনা হয়েছে বেশ কয়েকদিন যাবত।

বিশেষ করে যারা বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামীলীগকে সহ্য করতে পারে না, তাদের কাছে তো মুখরোচক আলোচনা ছিল আমার লেখা গুলো। কেননা, যারা কোনদিন বঙ্গবন্ধুকে মনেপ্রাণে ভালবাসেনি। দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে মন খুলে স্বীকার করেনি, তারা কীভাবে মুজিববর্ষ মেনে নিবে? তবে যে যাই বলুক, আমি কিন্তু কারো কথার জবাব দিইনি। একেবারে মুখে কুলুপ এঁটে ছিলাম। এমনকি অনেকে সরসরি জিজ্ঞেসও করেছেন, আমি কেন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখালেখি করি? তাদের কথায়ও ছিলাম লা জওয়াব।

বড় অবাক হলাম, হঠাৎ করে যেন দৃশ্যপট পাল্টে গেল। যারা এতদিন মুজিববর্ষ নিয়ে সমালোচনা করেছে, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নানা কথা বলেছে, ওনারা এখন যেন, একদম বঙ্গবন্ধুর খাস অনুরাগী বনে গেলেন। বঙ্গবন্ধুর জন্য বড্ড মায়া কান্না এখন।

যারা মুজিববর্ষ উদযাপনকে অনর্থক ভাবছিলেন, তারা এখন পুরোপুরি ফজীলত মনে করছেন। আবার মুজিব বর্ষ এবং বঙ্গবন্ধুর গুণকীর্তন শুরু করে এখন তাদের টার্গেট হয়েছে, ঠেকাও নরেন্দ্র মোদি। ওনারা এখন মুজিববর্ষকে পবিত্র মনে করে, নরেন্দ্র মোদিকে অপবিত্র ভাবছেন। নরেন্দ্র মোদি এলে মুজিববর্ষ অপবিত্র হয়ে যাবে।

আচ্ছা মুজিব বর্ষ এখন এতদিন পরে পবিত্র হল কিভাবে? নরেন্দ্র মোদি এলে নাকি এয়্যারপোর্ট থেকে নিয়ে বঙ্গভবন পর্যন্ত লাশ পড়ে যাবে। আবার কেউ বলছেন, কেয়ামত হয়ে যাবে। নরেন্দ্র মোদিকে আমি কোনদিন সাপোর্ট করিনি।যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিল, তখন থেকেই তার অপকর্ম জাতির সামনে প্রকাশ পেয়েছিল। আর বর্তমান তো তার সেই আসল চেহারা পুরোপুরি প্রকাশ পেয়েছে।

দিল্লিতে মুসলমানদের ওপর যে গণহত্যা নির্যাতন হচ্ছে, এটার জন্য আমি তীব্র নিন্দা জানাই। এবং মোদি সাহেবের এহেন কর্মকাণ্ড ঘৃণা করি।

কিন্তু কথা হল, মোদি সাহেবের ঢাকায় আগমনকে কেন্দ্র করে লাশ পড়ে যাবে, কেয়ামত হয়ে যাবে, মুজিববর্ষ অপবিত্র হবে, এগুলো কতটুকু যুক্তিযুক্ত। দেশের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করা, কতটুকু শোভনীয়।

মোদি সাহেব কিন্তু স্বেচ্ছায় আসছেন না। বা তিনি নিজে দাওয়াত নেননি। তিনি আমাদের রাষ্ট্রের মেহনমান। একজন মেহমানকে দাওয়াত দিয়ে, তাকে আবার আসতে নিষেধ করা এটা কেমন ভদ্রতা? কাউকে দাওয়াত দেওয়ার পরে আবার কি আসতে বারণ করা যায়?

বিগত চারদলীয় জোট সরকারের সময় দেখেছিলাম, সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদ সাহেবকে জামায়াতে ইসলামী দলের নেতারা তাদের ইফতার মাহফিলে দাওয়াত দিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট এরশাদ সাহেব, সেই ইফতার মাহফিলের উদ্দেশ্যে নিজ বাসা থেকে রওয়ানা হলেন, কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয়, মাঝ পথে থাকা অবস্থায়, জামায়াত নেতারা এরশাদ সাহেবকে আসতে নিষেধ করলেন, অত্যন্ত মনক্ষুন্ন হয়ে বাসায় ফিরতে হয়েছিল তাঁকে।

এরকম অভদ্রতা সবার দ্বারা সম্ভব নয়। এটা জামায়াতের ভাই- ব্রাদারগণ ভাল পারবেন। কিন্তু একজন রাষ্ট্রের মেহমান, একজন বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর দাওয়াত ফেরত দেওয়া কোন সভ্য মানুষের আখলাক হতে পারে না। একটা কথা বুঝা দরকার, এখানে মোদি আসল নন মূল হলো- ভারতের প্রধানমন্ত্রী। অন্য কেউ দায়িত্বে থাকলে, তাকেই সেই দাওয়াত দেয়া হতো।

আমার কথা হলো, নরেন্দ্র মোদি তিনি রাষ্ট্রীয় মেহমান। তাঁকে আসতে বাধা না দিয়ে, বরং তাকে আসতে দেয়া উচিত। তবে আমাদের পক্ষ থেকে একটা প্রতিনিধি দল, তাঁর কাছে যাওয়ার ব্যবস্থা হতে পারে।আমাদের দেশের ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিক নেতাগণের পক্ষ থেকে একটা দল, তার সাথে বৈঠকের ব্যবস্থা হলে ভালো হয়। তাই বলে মোদির আসাকে কেন্দ্র করে দেশের মধ্যে লাশ পড়ে যাওয়ার হুমকি, কেয়ামত ঘটে যাওয়ার ভয় প্রদর্শন কতটুকু ভাল কাজ হবে?

অনেকে বলবেন, ভারতে মুসলমান হত্যা করা হচ্ছে, তার জন্য কি আমরা প্রতিবাদ করব না? অবশ্যই করতে হবে। কিন্তু মোদি সাহেব একজন রাষ্ট্রের দাওয়াতী মেহমান, তাকে ঠেকাতে পারলে কি দেশের সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে? বুঝা যায়, মুজিববর্ষ এর জন্য যারা এখন উপরে উপরে দরদ দেখাচ্ছেন, তারা আসলে এই মুজিববর্ষ অনুষ্ঠানের পক্ষে নেই। কেননা, ঐ দিন মোদি সাহেবের আগমনকে কেন্দ্র করে যদি আমরা রাজপথ দখল করি, তাহলে তো কোন মেহমানই আসতে পারবেন না। তাহলে মুজিববর্ষ কিভাবে উদযাপন হবে?

আমি সবসময় একটা জিনিস দেখে আসছি, কে বা কাহারা যেন একটা সুর তুলে দেয়, আর আমরা সব হুজুর সেই হুজুগে তাল দেই। কে যেন অনলাইনে একবার সুর উঠাল, মোদিকে মুজিব বর্ষে আসতে দেওয়া হবে না। ব্যাস, এতটুকু। সারা অনলাইন- অফলাইনে সাথে সাথে ছড়ায়ে গেল সেটা। আমরা সবাই সেই নিউজ হাইলাইট শুরু করে দিলাম।

আমরা কেউ ভেবে দেখলাম না, বিষয়টা কি? কে প্রথম এই প্রস্তাব দিল। আর এই কর্মসূচি কতটা যুক্তিপূর্ণ। মোদি সাহেবকে ঠেকালে কি পুরো মুসলমান নিরাপদ হয়ে যাবে? কেউ কোন পরামর্শ করলাম না। শুধু জোয়ারে আমরা গা ভাসায়ে দিলাম।

আরেকটা বিষয় খেয়াল রাখা দরকার, আমরা অনেক সময় প্রতিবাদের ক্ষেত্রে নিয়ম নীতি হারিয়ে ফেলি। এমনভাবে প্রতিবাদ করি, যার দ্বারা সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়ায়।

এর আগে ভারতের এক মুসলিম নেতা আমাদের বাংলাদেশের ইসলামী দলের নেতাদের সতর্ক করেছিলেন। ভারতে মুসলিমগণ আক্রান্ত হলে, আমরা একচেটিয়া হিন্দুদের দায়ী করে থাকি।অথচ সকল হিন্দু কিন্তু খারাপ নয়। সকল হিন্দু সন্ত্রাসী নয়। সন্ত্রাসী যারা, তাদের দল বা ধর্ম নেই।

আমরা দেখেছি, হিন্দু ভায়েরা মানব প্রাচীরের মাধ্যমে মুসলিমদের ইবাদতে নিরাপত্তা দিতে। তাহলে বলুন তো, আমরা এক নাগাড়ে কিভাবে হিন্দুদের দায়ী করি। কিভাবে সকল হিন্দুদের সন্ত্রাসী বলি।

আমাদের প্রতিবাদ হওয়া দরকার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। সকল অপকর্মের বিরুদ্ধে। আমাদের প্রতিবাদ বা আন্দোলনের দ্বারা যদি মুসলমান আর হিন্দুদের মাঝে সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি হয়, সেটা বড় দুঃখজনক।

আমাদের জোশের সাথে হুঁশ থাকা দরকার। রাজপথে আন্দোলন সংগ্রামের জন্য পরামর্শ করে আগানো দরকার। অন্য কারো পরামর্শে নয়। নিজ সংগঠনের লোকদের সাথে পরামর্শ করে সামনে বাড়ানো উচিত।

খেয়াল করুন! কাদিয়ানীবিরোধী আন্দোলন কিন্তু চাঙ্গা হয়ে উঠেছিল। প্রায় সবমহল থেকে আওয়াজ উঠা শুরু হয়েছিল। হঠাৎ মোদি সাহেবকে ঠেকাতে গিয়ে, আমাদের আন্দোলন ভিন্ন দিকে মোড় নিচ্ছে। এটা চলতে থাকলে, কাদিয়ানীদের ঠেকানো আন্দোলন কোথায় যাবে আল্লাহ ভাল জানেন। তাই আসুন! হিসাবের অঙ্ক ঠিক করে সামনে বাড়াই। কোন হুজুগে কান দেওয়া নয়। আল্লাহ আমাদের সঠিক পথে পরিচালিত করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *