সাম্য, মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের মুজিববর্ষ
মুফতী তামীমুল ইসলাম ফরিদী :: মুজিব কারো একার নন। তিনি সবার আত্মজ জন। বাঙালির হাজার বছরের আরাধ্য ধন। বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা। বাঙালির প্রাণ পুরুষ। মুজিব মানে একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। মুজিব মানে বিশাল রক্ত সাগর সাঁতরে পাড়ি দেয়া এক উপমাহীন নাবিক। মুজিব মানে লাল সবুজের প্রিয় পতাকা। মুজিববর্ষ তাই আলাদা এক অনন্য মহিমায় সমোজ্জ্বল একটি বছর।
যে ঘাতকেরা শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করেছিল, তারা উপলব্ধি করতে পারেনি একজন জীবিত মুজিবের চেয়ে একজন মৃত মুজিব কতটা জনপ্রিয় হতে পারেন? জাতির জন্য কতটা প্রেরণার আঁধার হতে পারেন।
অথচ সেই ঘাতকেরা আজ কোথায়? খন্দকার মোশতাকের নাম আজ কয়জন মানুষে জানে? কয়জনে চেনে তাকে? তারা আজ ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। এ কমিনাদের নাম আজ মুছে যেতে বসেছে। এসবই নিয়তির নির্মম পরিহাস। তারা আজ গেল কোথায়? এদের অস্তিত্ব পর্যন্ত আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। মাওলা পাকের লীলা বুঝা মুশকিল। একমাত্র রাব্বে কারীম ব্যতীত কারো পক্ষে কোনো কিছু সৃষ্টি কিংবা ধ্বংস করা সম্ভব নয়।
আজ শেখ মুজিবের নাম কেবল বাংলাদেশের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি আজ বিশ্ব ইতিহাসের এক অপরিহার্য অধ্যায়। আব্রাহাম লিংকন, নেপোলিয়ন, মাও সেতুং, গান্ধী, ফিদেল ক্যাস্ট্রো, নেলসন ম্যাণ্ডেলা প্রমুখ বিশ্ব নেতার নামের সাথে সমান শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় আজ বাঙাল জাতির একনিষ্ঠ-নির্লোভ-নিঃস্বার্থ কর্ণধার শেখ মুজিবের নাম দুনিয়ার সর্বত্র উচ্চারিত হয়। বঙ্গবন্ধু এখন কেবল বঙ্গবন্ধুই নন, তিনি বিশ্ববন্ধু। জাতিসংঘ তাঁকে নিয়ে এমন ভাবনাই ভাবছে বলে জানা যায়।
অন্যদিকে ইউনেস্কো ও এ বছর আমাদের সাথে মুজিববর্ষ উদযাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে কেবল শেখ মুজিবকে সম্মানিত করেনি, বিশ্ব দরবারে জাতি হিসেবে আমাদের মর্যাদা ও বৃদ্ধি করেছে। শেখ মুজিবকে বিশ্ব নেতার আসনে সমাসীন করেছে। মুজিববর্ষ উদযাপনের যথার্থতার স্বীকৃতি দিয়েছে। এ আমাদের এক অনাবিল গৌরব ও সম্মানের বিষয়। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আমাদের একটি যুগান্তকারী ম্যাসেজ দিতে চেয়েছে, সেটি আজ ভেবে দেখা একান্ত অপরিহার্য বিষয় বলে আমি মনে করি।
জাতিসংঘ বঙ্গবন্ধুকে বিশ্ববন্ধু আখ্যা দিয়েছে। ইউনেস্কো মুজিববর্ষ উদযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমাদের এখন উপলব্ধির সময় হয়েছে যে, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আর কোনো বিতর্ক নয়। জাতির নেতা ইস্যুতে কোনো দ্বিমত নয়। এ বিষয়ে আর কোনো বিতর্কের অবকাশ থাকা কাম্য নয়।
মুজিববর্ষ কারো একার নয়, নয় কারো উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কোন অধিকার।বঙ্গবন্ধু আওয়ামীলীগের ও দলীয় সম্পদ নয়। তিনি সবার। বাংলাদেশের সর্ব শ্রেণীর মানুষের। সব বাঙালি আপামর জনতার। আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতা কর্মীদের এই ঐতিহাসিক সত্যটি উপলব্ধি করার এখনই উপযুক্ত সময়। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের কাঁটাতারের সীমানা পেরিয়ে পৃথিবীর মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। আওয়ামী লীগ যদি কেবল নিজেদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে আটকিয়ে রাখতে চায়, তবে মুজিববর্ষ উদযাপনের কোনো মানেই থাকে না।
কেবল ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি, সাথে ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানও মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করেছে। ‘তোমার নেতা, আমার নেতা-বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ বলে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে হাত ধরাধরি করে সবাই মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। আজ বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের রূপকার মানতে যাদের কষ্ট হয়, তাদের এ দেশে বসবাসের কী দরকার? মুজিববর্ষেই তাদের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়াই যুতসই ও সমীচীন। মুজিববর্ষ নিয়ে সারা বছর লেখালেখি হবে। আজ একটি বিষয়ে সামান্য আলোকপাত করে লেখাটির ইতি টানলাম।
আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন সকলকে সব রকমের ভেদাভেদ হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে নেক ও এক হওয়ার তৌফিক দান করুন, আমীন।
লেখক : শিক্ষক


