নিজস্ব প্রতিবেদক : বোরো ও আমন আবাদে সেচের জন্য ডিজেল ও বিদ্যুৎ চালিত পাম্পের ওপরই নির্ভর করতে হয় কৃষককে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে অনেক সময়ই সেচের জন্য ভোগান্তিতে পড়তে হয় তাদের। ডিজেলচালিত পাম্পের জন্য জ্বালানি তেল আমদানিতে চাপ তৈরি হয় বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও। এ সমস্যা সমাধানে বিদ্যুৎ ও ডিজেলচালিত সেচ পাম্পকে সোলারে পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি)। এ উদ্যোগের আওতায় ২ দশমিক ২ থেকে ১১ কিলোওয়াটের পাঁচ ধরনের পাম্প স্থাপনের পর নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে এর মালিকানা কৃষককে দেয়া হবে। সংস্থাটির ৮০টির মধ্যে প্রাথমিকভাবে ১০টিতে সমিতির এ কার্যক্রম শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে তা সব সমিতিতে বাস্তবায়ন করা হবে। এতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়বে ৫ টাকা ৪৬ পয়সা।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, সার্বিকভাবে বিদ্যুৎ সাশ্রয়, পরিবেশ দূষণ রোধ, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলা ছাড়াও কৃষকের বিকল্প আয়ের উৎস সৃষ্টিতে ৪০৭ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করবে বিআরইবি। এতে ৩৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকার জোগান দেয়া হবে সরকারি কোষাগার থেকে। বাকি ৩৬৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা আসবে প্রকল্প সাহায্য হিসেবে। সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। প্রকল্প ঋণ দেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।
এ প্রসঙ্গে বিআরইবি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মঈন উদ্দিন বলেন, বিদ্যুৎ চালিত পাম্প ব্যবহারের মাধ্যমে সেচ মৌসুমে গ্রিডে বিদ্যুতের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। এছাড়া পরিবেশ দূষণকারী পদার্থের নির্গমনও বেড়ে যায়। তাই অর্ধেকের বেশি ভর্তুকি ছাড়াও স্বল্পমূল্যে দীর্ঘমেয়াদি কিস্তির মাধ্যমে কৃষককে মালিকানা দিয়ে সোলার সেচ পাম্প স্থাপন করা হবে। এ পাম্পের মাধ্যমে সেচকাজ পরিচালনা করে বছরে প্রায় ৬৬ হাজার টাকা বাড়তি আয় করতে পারবেন তারা। এছাড়া অফ সিজনে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিকল্প কাজে ব্যবহার করতে পারবেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিরবচ্ছিন্ন সেচের প্রয়োজনে এরই মধ্যে বিভিন্ন স্থানে সোলারের মাধ্যমে সেচকাজ পরিচালনা করছেন অনেকে। এতে খরচও অনেক কম পড়ছে তাদের। এদেরই একজন রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার কৃষক আতিয়ার রহমান। চার বছর আগে বোরো মৌসুমে ডিজেলচালিত শ্যালো মেশিনে সেচকাজ চালাতেন। এতে প্রতি একর বোরো ফসল তুলতে সেচের পেছনেই তার খরচ হতো ১৪ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা। ডিজেলের পরিবর্তে এখন সোলার প্যানেল বসিয়ে সেচের কাজ চালাচ্ছেন আতিয়ার রহমান। একই পরিমাণ জমির বোরো ফসল ঘরে তুলতে সেচ বাবদ এখন তার খরচ হচ্ছে মাত্র ৭ হাজার টাকা। সেইসঙ্গে প্রয়োজনের মুহূর্তে সেচও দিতে পারছেন নির্বিঘেœ।
সোলার প্যানেলের মাধ্যমে সেচকাজ পরিচালনা করছেন একই ইউনিয়নের কৃষক ওয়াজেদ মিয়াও। তিনি বলেন, সোলার প্যানেলের মাধ্যমে সেচ পাওয়ায় খরচ অনেক কমে গেছে। এখন সারা বছরেই নিরবচ্ছিন্ন সেচ পাওয়া যাচ্ছে। রবি মৌসুমে প্রতি একরে খরচ হচ্ছে মাত্র ৭ হাজার টাকা।
আরো বেশিসংখ্যক কৃষককে স্বস্তি দিতেই ডিজেল ও বিদ্যুৎ চালিত সেচ পাম্পকে সোলারের আওতায় আনছে আরইবি। এর অংশ হিসেবে ১০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অধীন পাঁচ শ্রেণীতে দুই হাজার সেচ পাম্প স্থাপন করা হবে। সমিতিগুলো হলোÑ ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর-১, রংপুর-২, বগুড়া-১, নওগাঁ-২, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, কুমিল্লা-২ ও ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। পল্লী এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ চালিত সেচ পাম্প টার্ন-কি ভিত্তিতে স্থাপন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে ২ দশমিক ২ কিলোওয়াটের ৫৫০টি, ৪ কিলোওয়াটের ৫৩০টি, ৫ দশমিক ৫ কিলোওয়াটের ৫০০টি, ৭ দশমিক ৫ কিলোওয়াটের ৩২০টি ও ১১ কিলোওয়াটের ১০০টি সেচ পাম্প। সব পাম্পই হবে ২০ বছর মেয়াদি। এককালীন ডাউন পেমেন্টের মাধ্যমে ১৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট ৮৫ শতাংশ অর্থ ১০ বছর মেয়াদে কিস্তির মাধ্যমে পরিশোধ করে সম্পূর্ণ মালিকানা পাবেন কৃষক।
বিআরইবি সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত বিআরইবির অধীন ৮০টি সমিতিতে গ্রাহক রয়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ। এর মধ্যে ৩ লাখ ২৫ হাজার সেচের গ্রাহক। সমিতির সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা থাকে ৬ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। এর বড় অংশই সেচ মৌসুমে। তাই সেচ পাম্পে সোলার স্থাপনের মাধ্যমে কৃষি সেচের জন্য সোলার ফটোভোল্টিক পাম্পিং সিস্টেমের বিস্তার ঘটানো হচ্ছে।
সংস্থাটির তথ্য বলছে, ২ দশমিক ২ কিলোওয়াটের ২০ বছর মেয়াদি একটি সোলার পাম্প স্থাপনে খরচ হবে ৯ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। এর মধ্যে সরকারের অনুদান থাকবে অর্ধেকের কিছু বেশি। অর্থাৎ কৃষককে পরিশোধ করতে হবে ৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। এর ১৫ শতাংশ বা ৭১ হাজার টাকা এককালীন জমা দিয়ে মালিকানা নিতে পারবেন কৃষক। বাকি ৪ লাখ ৫ হাজার টাকা ১০ বছরের কিস্তিতে পরিশোধ করতে পারবেন। কিস্তি পরিশোধের পর সেচ পাম্পের মালিকানা কৃষকের কাছে হস্তান্তর করা হবে। ২ দশমিক ২ কিলোওয়াটের একটি পাম্পের মাধ্যমে প্রতি বিঘায় বছরে কৃষকের নিট আয় হবে ৩ হাজার টাকা। বছরে ২২ বিঘা জমিতে সেচ দিতে পারলে তার আয় হবে প্রায় ৬৬ হাজার টাকা।
বিআরইবির প্রধান প্রকৌশলী (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) এসএম জাফর সাদেক বলেন, সোলার পাম্প সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তিন বছরের ওয়ারেন্টি গ্রহণ করা হবে। ফলে এ তিন বছর নির্বিঘেœ কৃষকরা সেবা পাবেন। পরবর্তীতেও যাতে কৃষকরা সেবা পান, সেজন্য তিন বছরের মধ্যে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যোগ্য টেকনিশিয়ান গড়ে তোলা হবে, যার মাধ্যমে কৃষক আজীবন কারিগরি সহায়তা পাবেন। আর ১০ বছরের মধ্যে দুবার পাম্প এবং একবার ইনভার্টার পরিবর্তন করে দেয়া হবে। সার্বিকভাবে এ কার্যক্রমের ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।
patheo/105


