হযরত মাদানীর অতুলনীয় দর্শন

হযরত মাদানীর অতুলনীয় দর্শন

হযরত মাদানীর অতুলনীয় দর্শন

মাওলানা আমিনুল ইসলাম : দেওবন্দে যখন পড়তাম, দাওয়াত ও তবলীগের মেহনতের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলাম। দেওবন্দের ছাত্তা মসজিদ হলো তবলীগের মারকাজ। ছাত্তা মসজিদ থেকে বিভিন্ন এলাকাতে তবলীগের কাজে সময় ব্যয় করেছি।

ছাত্তা মসজিদে সব সময় দেশ/ বিদেশের জামাত আসা যাওয়া করত।আবার ছাত্তা মসজিদ থেকে তবলীগের জামাত দেশ বিদেশে ছড়ায়ে পড়ত। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জামাতের সাথে সাক্ষাত হয়েছে। অনেক কথা শুনেছি তাদের। বহু কারগুজারী শোনা যেত ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সফরকারী জামাত থেকে।

একেক দেশের মানুষ একেক ধরনের কারগুজারী শোনাতেন। তাদের সফরের বাস্তব অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতেন। সফরে কোথায় কি হয়েছে, কোন এলাকায় কি ধরনের কাজ চলছে, কোন এলাকায় মানুষের বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়েছে, কোথায় কোথায় মানুষ নুসরত করেছে, সব কিছুর বিস্তারিত বর্ণনা শোনা যেত সে সব জামাতের সাথীদের মুখ থেকে।
কোন কারগুজারী শোনে অন্তর ভরে যেত। মনটা খুশিতে নেচে উঠত। আবার কোন কোন বর্ণনা ছিল বেদনাদায়ক।এ রকম বহু বেদনা দায়ক কারগুজারী শুনেছি জামাতের সাথীদের থেকে। যে গুলো শোনে আফসোস ছাড়া আর কিছু করার থাকত না।

তবলীগ জামাতের সাথীদের বর্ণনা, ভারতের বহু শহর আছে, যেখানে শত শত মসজিদ বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। এ সকল মসজিদগুলো এক সময় আবাদ ছিল, হাজার হাজার মানুষ নামাজ আদায় করত। এখন সেগুলো বিরাণভূমি। এখন আর কেউ আবাদ করার মত লোক নেই।

১৯৪৭ সালে যখন দেশ ভাগ হয়, তখন বহু মুসলিম দেশ ছেড়ে পাকিস্তানে পাড়ি জমিয়ে ছিলেন। তারা চলে গিয়ে ছিল, কিন্তু মসজিদ তো আর যেতে পারেনি। মসজিদ গুলো ঐ ভাবে আজো পড়ে রয়েছে।

এরকম বহু মসজিদ অনাবাদী। মুসলমানগণ দেশ ছেড়ে গিয়েছেন। কিন্তু মসজিদ সে ভাবে পড়ে রয়েছে। ঐ মসজিদে আজান – ইকামতের লোকের অভাব। সেই সাতচল্লিশ সাল থেকে অদ্যাবধি পড়ে আছে।কেউ নেই সংরক্ষণ করার মত। কেউ নেই এক ওয়াক্ত নামাজ পড়ার মত মানুষ।

বাবরী মসজিদ নিয়ে কত কথা, কত সমালোচনা। কত আন্দোলন সংগ্রাম হচ্ছে। কিন্তু বাবরি মসজিদ ও কিছুটা সেই কোয়ালিটি। যুগ যুগ ধরে পড়ে আছে। একদম অনাবাদি। এক সময় জৌলুস ছিল। কিন্তু মুসলিমগণ পাকিস্তানে পাড়ি জমানোর পর থেকে বিরাণভূমি হয়ে পড়েছে। কেউ যেন দেখার নেই।

আর এটাকে সুযোগ পেয়েছে উগ্রবাদী হিন্দুগ্রুপ।তারা এটাকে নিজেদের কব্জায় নেওয়ার জন্য নয়া ফন্দি-ফিকির এটেছে। এক পর্যায়ে তারা মসজিদটিকে শহীদ করে দিল।

আমি তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এই জঘন্যতম কাজের। কেননা, মসজিদ এটা মুসলিমদের শেয়ার। ইসলামের এক মানদন্ড। এটার উপর আক্রমন দুঃখজনক। যতই বিরান ভুমি হয়ে যাক, তবে সেটাকে ভেঙে ফেলা মুসলিমদের হৃদয়ে আঘাত করা হয়।

তবে যে কথা বলছিলাম, যুগ যুগ ধরে ভারতের বিভিন্ন জায়গাতে অনাবাদি হয়ে আছে শত শত মসজিদ। বাবরি মসজিদের মত বহু মসজিদ পড়ে রয়েছে। কেউ সে গুলো দেখার নেই। মসজিদ আবাদ করার মত কোন মানুষ নেই।
আসলে খুবই দুঃখ লাগে। আল্লাহর ঘর অযত্নে-অবহেলার শিকার। কেউ যত্ন করছেনা সেটাকে।

অথচ ঐ মসজিদগুলো আবাদ করার দায়িত্ব কাদের উপর? কোন হিন্দুর জিম্মাদারী নয়, অন্যান্য ধর্মালম্বীদের দায়িত্বে সেটা বর্তায় না।

মসজিদ আবাদ করার দায়িত্ব মুসলিমের।মুসলমানগণই মসজিদকে আবাদ রাখবেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, মুসলিমগণ এসকল ধর্মীয় স্থানগুলোকে ছেড়ে চলে গেল। সেখানে আর কেউ অবশিষ্ট থাকল না।

এজন্য মনে পড়ে হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ.- এর চিন্তা- চেতনা। তিনি ভারত ছেড়ে পাকিস্তান যেতে রাজি হননি। ভারতের মুসলমানদের বিপদে ফেলে তিনি পাকিস্তানে চলে যাবেন, সেটা কল্পনাও করেননি। বরং তিনি একমাত্র ব্যক্তি, ভারত কে নিজের আবাস ভূমি হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

ভারত থেকে হাজার হাজার মানুষ পাকিস্তানে চলে গেছেন। কিন্তু এর দ্বারা কোন ফায়দা তো হয়নি আজো।আর ভবিষ্যতে হওয়ার সম্ভবনা নেই। বরং ক্ষতির সস্মুখীন হয়েছে ইসলাম আর মুসলমান।

মুসলমান দুর্বল হয়েছে এই বিভক্তির মাধ্যমে। ইত্তেহাদ আর ইত্তেফাক ভুলে গেছে। বরং পারস্পারিক হিংসা- প্রতিহিংসায় জর্জরিত।

একটু চিন্তা করে দেখুন! হযরত মাদানী রহ. এবং তাঁর চিন্তা ধারার আলেমগণ তারাও যদি পাকিস্তানে পাড়ি জমাতেন, তাহলে আমাদের মাদারে ইলমী দারুল উলূম দেওবন্দের কি অবস্থা হত। যে দারুল উলুম আজ বিশ্ব মুসলিমের রাহবার। গোটা বিশ্বের আনাচে- কানাচে ছড়িয়ে আছে দারুল উলূমের সন্তানেরা। আজো মানুষ যে কোন সমস্যায় দারুল উলুমের স্মরণাপন্ন হয়।উনারাও যদি এই দারুল উলুমকে ছেড়ে চলে যেতেন, আল্লাহ না করুন, আল্লাহ না করুন, দারুল উলুমের দশাটা আজ বাবরি মসজিদের মত হত।

যাইহোক, জাতির এই ক্রান্তি কালে বড্ড স্মরণ হয় সেই মর্দে মুজাহিদ, কুতুবুল আলম, খাতামুল মুহাদ্দিসীন সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ. কে। তাঁর চিন্তা- চেতনার প্রতি শ্রদ্ধা আসে। আসলেই তিনি ছিলেন এক বে -মেছাল। তাঁর দর্শনও ছিল তুলনাহীন।

আল্লাহ তায়ালা সেই মহামনিষীকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *