৩ জেলায় বন্যার অবনতি : নতুন ৫০ গ্রাম প্লাবিত

৩ জেলায় বন্যার অবনতি : নতুন ৫০ গ্রাম প্লাবিত

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : ভারত থেকে নেমে আসা প্রবল ঢলে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে করে নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এ তিন জেলায় নতুন করে ৫০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার পানিবন্দী মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অভাবে বিপাকে পড়েছেন। গবাদিপশুর খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য শুকনো খাবার, চাল ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পাঠাচ্ছে ত্রাণ অফিস।

নীলফামারী প্রতিনিধি জানান, ভারী বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল বিকেল ৩টা থেকে তিস্তা নদীর পানি নীলফামারীর ডালিয়া তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে করে তিস্তানদীঘেঁষা গ্রামগুলোর প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের পানি পরিমাপক নূরুল ইসলাম জানান, তিস্তা নদীর পানি ডালিয়া তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা ৫২ দশমিক ২৬ সেন্টিমিটার এবং বিকেল ৩টা থেকে ৫২ দশমিক ৩০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছে। এই পয়েন্টে বিপদসীমা ৫২ দশমিক ১৫ সেন্টিমিটার। এদিকে পানির গতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে।

তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পূর্বছাতনাই, টেপাখড়িবাড়ী, খগাখড়িবাড়ী, খালিশা চাপানি, ঝুনাগাছ চাপানি, জলঢাকা উপজেলার শৌলমারী ও ডাউয়াবাড়ী ইউনিয়নের ১৫টি চরগ্রামসহ নি¤œাঞ্চলের প্রায় ২০ হাজার মানুষের ঘরবাড়িতে পানি উঠেছে। বানের পানিতে এসব এলাকায় তলিয়ে গেছে রোপা আমনসহ উঠতি ফসরের ক্ষেত।

জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো: মনোয়ারুল ইসলাম জানান, যাবৎ ডিমলা উপজেলায় পাঁচ হাজার দুই শ’ জন পরিবার পানিবন্দী হয়ে রয়েছে। তারা উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। পানিবন্দীদের জন্য ২০ টন চাল, শুকনো খাবার, বস্ত্র, প্রয়োজনীয় ঔষধ উপজেলা ত্রাণ অফিসে পাঠানো হয়েছে।

লালমনিরহাটে ২০ হাজার পরিবার পানিবন্দী

লালমনিরহাট প্রতিনিধি জানান, তিস্তা নদীর পানি বেড়ে ডালিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে লালমনিরহাটে বন্যার পরিস্থিতি অবনতিতে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে প্রায় ২০ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।

গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার সেচপ্রকল্প তিস্তা ব্যারেজ ডালিয়া পয়েন্টে পানিপ্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ২৩ মিটার। যা বিপদসীমার (স্বাভাবিক ৫২ দশমিক ১৫ মিটার) ৮ সেন্টিমিটার উপরে।

একদিনে সকাল ৯টায় তিস্তা নদীর ডালিয়া পয়েন্টে পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছে ৫২ দশমিক ৩০ সেন্টিমিটার (স্বাভাবিক ৫২ দশমিক ১৫ মিটার), যা বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এর আগে সকাল ৬টায় পানি বিপদসীমার ১১ সেন্টিমিটার উপরে ছিল।

বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর পানি প্রবাহ সোমবার ও মঙ্গলবার রাত দিন থেকে বাড়তে থাকে।

গত বুধবার দিনভর ডালিয়া পয়েন্টের বিপদসীমার ৭ থেকে ৪ সেন্টিমিটার উপরে প্রবাহিত হয়েছিল। ফলে তিস্তা নদীর উভয় পাড়ের নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ায় জেলার প্রায় ২০ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়ে।

জানা গেছে, তিস্তার পানি বাড়ার ফলে লালমনিরহাট সদর, পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী উপজেলার বেশ কিছু নতুন নতুন এলাকা বন্যায় ডুবেছে। এর মধ্যে পাটগ্রামের দহগ্রাম, হাতীবান্ধার গড্ডিমারী, দোয়ানী, ছয়আনী, সানিয়াজান, সিঙ্গামারী, সিন্দুর্না, হলদিবাড়ী, ডাউয়াবাড়ী, কালীগঞ্জের ভোটমারী, শৈলমারী, নোহালী, আদিতমারীর মহিষখোচা, গোবর্ধন, বাহাদুরপাড়া, পলাশী এবং সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ, কুলাঘাট, মোগলহাট, রাজপুর, বড়বাড়ী ও গোকুন্ডা ইউনিয়নের নিচু অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

টানা তিন দিনের বন্যায় পানিবন্দী পরিবারগুলো চরম দুর্ভোগে পড়েছে। গবাদি পশুপাখি, বৃদ্ধ শিশু ও প্রতিবন্ধীদের নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তিস্তাপাড়ের মানুষ। চার দিকে শুধু পানি আর পানি। ঘরের ভেতর বিছানায় মাচাং বানিয়ে সারা দিনের রান্না একবারে করছেন গৃহকর্মীরা। কেউ কেউ পাশের উঁচু রাস্তা বাঁধে চুলা বসিয়ে রান্না করে নিচ্ছেন। বাঁধ আর রাস্তার ধারে পলিথিনের তাঁবু সাঁটিয়ে রাখা হচ্ছে সন্তানতুল্য গবাদি পশুগুলোকে। সবচেয়ে বড় বিপাকে পড়েছেন পানিবন্দী পরিবারের নারীরা। পায়খানা ডুবে যাওয়ায় শৌচকাজ সারতে বেশ বিড়ম্বনায় পড়ছেন নারীরা। প্রায় সব বাড়ির টিউবওয়েল ডুবে যাওয়ায় বিশুদ্ধ খাবার পানিরও চরম সঙ্কট দেখা দিয়েছে।

তিস্তাপাড়ের গোবর্ধন গ্রামের আজিজার রহমান বলেন, দুই দিন ধরে চরাঞ্চলের প্রায় বাড়ি পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পানির কারণে সাপ, পোকামাকড়ের উপদ্রব বেড়েছে। গরু ছাগলের খাদ্য ও রাখার মতো শুকনো জায়গা মিলছে না। পানিতে রাখলে গরু ছাগল তো অসুস্থ হয়ে পড়বে। বাইরে রাস্তায় রাখলে চুরি হওয়ার ভয় থাকে।

উত্তর ডাউয়ামারী গ্রামের জুয়েল জানান, রাস্তাঘাট ডুবে গেছে। গ্রামের সব বাড়িতে হাঁটু বা কোমর পানি। রান্না করা খাওয়া, থাকা, প্রস্রাব পায়খানা করা বেশ কষ্টকর হয়ে পড়েছে। রাতে ঘুমাতে পারিনি। কখন যে পানিতে কে পড়ে যায়? আতঙ্কে থাকি বাচ্চাদের নিয়ে। নিদারুণ কষ্ট আমাদের ভাই।

ডাউয়াবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মশিউর রহমান বলেন, প্রায় ৫ হাজারের বেশি পরিবার টানা দুই দিন ধরে পানিবন্দী রয়েছে। তাদের তালিকার পাশাপাশি খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে।

সিন্দুর্না ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আরিফুল ইসলাম বলেন, আমার ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে ৩ হাজার পরিবার দুই দিন ধরে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। তাদের তালিকা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী শুনীল কুমার জানান, বৃষ্টি ও উজানের ঢলে তিস্তা নদীর পানি বাড়ছে। দুই দিন ধরে বিপদসীমার উপরে প্রবাহিত হওয়ায় তিস্তাপাড়ের নি¤œাঞ্চলে বন্যা দেখা দিয়েছে। উজানেও প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে। যার দরুন পানির চাপ কিছুটা বেশি। বন্যার উন্নতি হতে কিছুটা সময় লাগবে। তাই এসব অঞ্চলের জনগণকে সতর্ক থাকতে বলা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক এইচ এম রকিব হায়দার বলেন, পানিবন্দী পরিবারগুলোর মাঝে কিছু প্যাকেটজাত শুকনো খাবার ও জিআর চাল বিতরণ করা হয়েছে। আরো কিছু শুকনো খাবারের জন্য বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করা হয়েছে।

ভুরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারীর দুধকুমার নদের পানি বিপদসীমার ছয় সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া উপজেলার সব কটি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে নদীতীরবর্তী এলাকাসহ নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। উপজেলার প্রায় ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসব গ্রামের প্রায় ৫৫০টি পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। রোপা আমনসহ অন্যান্য ফসলের জমি তলিয়ে গেছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কুড়িগ্রামের তথ্য মতে, দুধকুমার নদের পানি গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ভুরুঙ্গামারীর পাটেশ^রী পয়েন্টে ২৯ দশমিক ৬৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। যা বিপদসীমার ছয় সেন্টিমিটার বেশি।

তিলাই ইউনিয়নে বাসিন্দা আতোয়ার রহমান বলেন, দুধকুমার নদের পানি বেড়ে নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

পাইকেরছড়া ইউনিয়নের রবিউল ইসলাম বলেন, পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ধান, পাট ও অন্যান্য ফসলের জমি তলিয়ে গেছে।

চরভুরুঙ্গামারী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মানিক উদ্দিন বলেন, আমার ইউনিয়নের চারটি গ্রাম প্লাবিত হয়ে মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল জব্বার বলেন, উপজেলার ১৭০ হেক্টর জমির ধান ও ১৫ হেক্টর জমির সবজি পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। বৃষ্টি না হলে এসব জমির পানি নেমে যাবে। এতে ফসলের তেমন ক্ষতি হবে না।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সবুজ কুমার ঘোষ বলেন, ইউপি চেয়ারম্যানদের তথ্যানুযায়ী উপজেলার ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সেই সাথে ৫৪০টি পরিবার পানিবন্দী হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার দীপ জন মিত্র বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা হয়েছে। ইউপি চেয়ারম্যানদের সার্বক্ষণিক কন্ট্রেল রুমের সাথে যোগাযোগ রাখতে বলা হয়েছে। শুকনো খাবার মজুদ করা হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য সবরকম প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।

Related Articles