৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ৯ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি

আত্মশুদ্ধির মিলনমেলা জমে ছিল জামিআ ইকরাতে

  • আমিনুল ইসলাম কাসেমী

যার কথাগুলো মন্ত্রমুগ্ধেরমত শুনি। যার বয়ানগুলো হৃদয় জুড়ানো। কোনো সুরেলা কণ্ঠ নয়। কোনো লৌকিকতা নেই। নেই কোনো রঙঢঙ। এযেন তাঁর হৃদয়মন্দির থেকে উৎসারিত। ভাবনার জগতে নিয়ে যায় স্রোতাকে। বিবেককে জাগিয়ে তোলে। হতাশাকে মুলোৎপাটন করে আশার আলো জাগ্রত করে। তিনি শাইখুল ইসলাম আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দামাত বারাকাতুহুম।

সত্যি কদিন ধরে অপেক্ষায় ছিলাম। কবে শোনা যাবে তাঁর কথা। মুছে ফেলব যত গ্লানি। তাই তো সেই মাহিদ্রক্ষণ এসে গেল। ১৯ ও ২০ নভেম্বর। রাজধানীর জামিআ ইকরাতে আত্মশুদ্ধির মেলা জমে ছিল। শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমাদ মাদানী ( রহ.) এর পৌত্র, ফেদায়ে মিল্লাত সায়্যিদ আসআদ মাদানী (রহ.) এর জানশীন, বর্তমান ইসলামী বিশ্বের অগ্রদূত সায়্যিদ মাহমুদ আসআদ মাদানী দামাত বারকাতুহুম তিনিও তাশরীফ এনে ছিলেন। এক মনমুগ্ধকর পরিবেশ।

আমলী-ইসলাহী মাকামের অবতারণা ঘটেছিল সেখানে। আল্লামা মাসঊদ সাহেব সবসময় বলে থাকেন, ইসলাহী ইজতেমা কোনো ওয়াজের জায়গা নয় এটা আমলের জায়গা। ঠিক সেটা যেন কথায় ও কাজে। তিনি যেমন কোনোদিন বেঁফাস কথা বলেন না। যার কথায় কোনো ছলচাতুরি নেই। তেমনি তাঁর ইসলাহী ইজতেমা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী। মানুষের মনকে জয় করে, অন্তরে যেন শন্তির পরশ বুলিয়ে দেয়।

অনেক মজলিসে যাওয়ার সুযোগ হয় আমার। ভক্তবৃন্দের বাড়াবাড়ি থাকে সব জায়গাতে। আত্মশুদ্ধির মজলিস কোথাও আত্মকেন্দ্রিক হয়ে দাঁড়ায়। কোথাও খোলাফাগণ স্বীয় শায়েখ-মুরশিদকে প্রশংসার দরিয়ায় ভাসিয়ে দেয়। পীর সাহেব বা শায়েখ খলিফাদের বাড়াবাড়িকে ইনকার করার শক্তি সাহস রাখেন না। শেষমেষ আত্মার সংশোধন এর পরিবর্তে বড় বিমার নিয়ে ঘরে ফেরে সবাই। কিবির বা অহংকার-অহমিকার প্রবাহে হারায়ে ফেলে ঈমানী তাকাত। এরকম বহু জায়গাতে বেউসুলি কাজ হরহামেশা ঘটছে।

বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার উদ্যোগে আল্লামা মাসঊদের ইসলাহী মজলিসে দুটো জিনিস স্বচক্ষে দর্শন করলাম, যেটা বুক ফুলিয়ে বলতে পারি, আমার প্রিয় শায়েখ সত্যি বেমেছাল।

এক. ২০ নভেম্বর বাদ আছর বয়ান করছিলেন আল্লামা মাসঊদের দীর্ঘ ৩৫ বছরের সাহচার্যপ্রাপ্ত শাগরেদ এবং জামিয়া ইকরার সিনিয়র মুহাদ্দিস মুফতী আব্দুর রহিম কাসেমী দামাত বারাকাতুহুম। তিনি বক্তৃতার এক পর্যায়ে আল্লামা মাসঊদ সাহেবকে মুজাদ্দিদে মিল্লাত বলে আখ্যা দিলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে আব্দুর রহিম সাহেবকে পাকড়াও করলেন তিনি। বললেন, আপনার ওই কথা থেকে ফিরে আসুন! মুজাদ্দিদে মিল্লাত কোনো সাধারণ বিষয় নয়। এভাবে আর কখনো বলবেন না। তাকে সতর্ক করলেন।

অথচ আমরা সকলেই ভালো করে জানি। আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেবের কওমী অঙ্গনে যে ভুমিকা, বিশেষ করে কওমী মাদ্রাসার তালিম, এ শিক্ষাব্যবস্হাকে আধুনিকরণ ও সনদের স্বীকৃতির ক্ষেত্রে অতুল্য ভুমিকা রেখেছেন। কওমী মাদ্রাসাগুলোতে একসময় উর্দুর দাপট ছিল। উর্দুভার্সনে ছাত্রদের তালিম দেওয়া হতো। বাংলাভাষায় লেখাপড়া করা যেন অপরাধ মনে হত। কোথাও কেউ বাংলা বই পড়লে বা পরীক্ষার উত্তরপত্রে বাংলাভাষা ব্যবহার করলে তাকে বহু গ্লানি সহ্য করতে হত।

অনেক প্রতিষ্ঠানে তো এগুলো কানুনি ভাবে নিষেধ ছিল। তেমনি এক সঙ্গিন মুহুর্তে আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেব এবং তাঁরই প্রাণপ্রিয় উস্তাদ আল্লামা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ (রহ.) কওমী মাদ্রাসাতে বাংলা ভার্সনে লেখাপড়া চালু করেন। শুধু তাই নয়, বাংলা বক্তৃতা, বাংলাভাষা চর্চা, লেখালেখির অভ্যাস গড়ে তোলা। এরকম নানা বিষয়ে তিনি ছাত্রদের তালিম দেন। আর সে মোতাবেক হাজারো লেখক, কবি- সাহিত্যিক ছাত্র গড়ে ওঠে। বর্তমানে সেসব আলেমগণ লেখালেখির ময়দান কাঁপিয়ে দিচ্ছেন। বহু পত্র-পত্রিকায় সংবাদ মাধ্যমেও আল্লামা মাসঊদ সাহেবের ছাত্র-শিষ্য একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আছে।

বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া সবখানে এখন মাতৃভাষা চর্চার আন্দোলন চলছে। এগুলো তাঁরই বড় অবদান। অবশ্য প্রাথমিক পর্যায়ে বহু ঝাকুনি সামলাতে হয়েছে। অনেক ফতোয়ার শিকার তিনি হয়ে ছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই তাহরিক ছিল সফল। যে তাহরিকের কারণে দেশের সকল প্রতিষ্টানে এরপর মাতৃভাষা চর্চা শুরু হয়। এখনতো সারাদেশের সকল প্রতিষ্ঠানে মাতৃভাষা ব্যাপকভাবে চর্চা হচ্ছে। বরং বলা যায় মাতৃভাষা চর্চায় আলেমগণ অনেকখানি এগিয়ে।

আল্লামা মাসঊদ সাহেবের এমন তাজদীদী তথা সংস্কারমুলক কাজ সত্যি প্রশংসার দাবী রাখে। সেই সাথে তাঁকে মুজাদ্দিদ বললে ভুল হবে না। কিন্তু আল্লামা মাসঊদ সাহেব প্রতিটি কর্ম নিষ্ঠার সাথে করে থাকেন। নিজের বড়ত্ব এবং কর্তৃত্ব জাহির করেন না। তাঁর সবকিছু আল্লাহর জন্য।

দুই. ইসলাহী ইজতেমাতে সঞ্চালনে ছিলেন বিশিষ্ট আলেমেদ্বীন মাওলানা হুসাইনুল বান্না সাহেব। তাঁর সঞ্চালনের এক পর্যায়ে তিনি আল্লামা মাসঊদ সাহেবকে ‘আমাদের বড়হুজুর’ বলে আখ্যা দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে আল্লামে মাসঊদ সাহেব তাকেও পাকড়াও করলেন। এব্যাপারে সতর্ক করলেন।

এই যে সাধারণ দুটো বিষয়। অনেক জায়গাতে শায়েখ নিজেই রোগাক্রান্ত। তার মাঝে অহংকারে ভরা। নিজের বড়ত্ব জাহির করতে চান। আর শায়েখ নিজেই কামনা করেন সকলে তাঁর প্রশংসা করুক। যেটা খুবই দুঃখজনক। শায়েখ নিজেই যদি বিমারগ্রস্থ হন তাহলে তার থেকে শিষ্যগণ কোন ফায়দা হাসিল করতে পারে না।

ফেদায়ে মিল্লাতের অত্যন্ত স্নেহধন্য খলিফা, দারুল উলুম দেওবন্দের সূর্যসন্তান আল্লামা মাসঊদ সাহেব একজন মুহাক্কিক আলিম এবং মুখলিস ব্যক্তিত্ব। লিল্লাহিয়্যাত তথা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই সব কাজ করছেন। লোক দেখানো বা কাউকে আকৃষ্ট করে দল ভারি করা নয়, বরং মহান রবের সান্নিধ্য পাওয়াই যেন মূল উদ্দেশ্য। বিভিন্ন কর্মে তাঁর ইখলাসপূর্ণ আচারণ অতুলনীয়। দেশ ও জাতির ক্রান্তিকালে এরকম নিষ্ঠাবান দায়ী পাওয়া বড় কষ্টকর। যিনি জীবনের শেষপ্রান্তে পৌঁছে গেছেন। কিন্তু এদেশের আলেম-উলামা এবং আমজনতাকে ভুলে যাননি। অুসুস্থ অবস্থায়ও তিনি মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত।

মহান আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করি, তিনি আল্লামা মাসউদকে নেক হায়াত দান করুন, তাঁর এসব দ্বীনি খেদমত কবুল করুন। আমিন।

  • লেখক: শিক্ষক ও কলামিস্ট

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com