১৬ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ২রা আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ৫ই জিলকদ, ১৪৪২ হিজরি

আমি গর্বিত আমি দেওবন্দী

আমিনুল ইসলাম কাসেমী

১৮৬৬ সালের ৩০ মে দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অত্যন্ত নাজুক পরিবেশ-পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল দারুল উলূমের অগ্রযাত্রা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে আমাদের আকাবির-আসলাফগণ দ্বীন ইসলামকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে যে কর্মকৌশল হাতে নিয়েছিলেন, তা আজ দেড়শত বছরধরে ইস্পাতের ন্যায় সুদৃঢ় রয়েছে। যে চিন্তা-চেতনা নিয়ে তাঁরা তাঁদের কর্মপন্থা শুরু করেছিলেন, সেটা যেন আকাশেরর তারকার মত জ্বল জ্বল করছে।

আজ বিংশ শতাব্দীর সংকট কালে এখন আমাদের মাঝে প্রশ্ন জাগে আমরা কি দেওবন্দী? সত্যি কি আমরা আকাবির-আসলাফের অনুসারী? পুর্বসুরীগণ যে চিন্তা-চেতনা নিয়ে চলেছেন, তাঁরা যে মননশীলতায় নিজেকে গড়ে তুলেছেন, আমরা কি সেই পথে কদম রাখতে পেরেছি?
বড় পরিতাপের বিষয়, আজ আমরা নামে দেওবন্দী, নামে আকাবির-আসলাফের অনুসারী, কিন্তু আমাদের চিন্তাধারার মাঝে চিড় ধরেছে। আকাবিরদের বাতলানো পথ বাদ দিয়ে ফেরাকে বাতেলার সঙ্গে গা ভাসিয়ে মুলধারা থেকে ছিটকে যাচ্ছি।

দেওবন্দ কোন চার দেয়ালের নাম নয়। দেওবন্দ কোন নির্দিষ্ট বিল্ডিং এর নামে পরিচিতি নয়। দেওবন্দ একটি চিন্তাধারার নাম। অর্থাৎ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাত তথা মা আনা আলাইহি ওয়া আসহাবি এর পদাঙ্ক অনুসারী এক জামাত। কোন ব্যক্তি ইজম নয়, কোন ব্যক্তি বিশেষকে পুঁজা করা নয়। সম্পুর্ণ আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের চিন্তা-চেতনা ধারণ করা।

দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পর থেকে তার ফুজুলা এবং তার শাখা মাদ্রাসার ফারেগীন এবং ঐ চিন্তা-চেতনা লালনকারীদের সাধারণত দেওবন্দী বলা হয়ে থাকে। কেউ দেওবন্দ মাদ্রাসায় পড়েনি, এমনকি তার শাখা মাদ্রাসা অর্থাৎ কওমী বা দেওবন্দী কোন শাখা প্রতিষ্ঠানেও কোন দিন পড়েনি। তবে সে দেওবন্দ এর চিন্তাধারা লালন করে চলে থাকে। তাঁকে অবশ্যই দেওবন্দী বলা যায়। পক্ষান্তরে একজন ব্যক্তি দেওবন্দ মাদ্রাসায় পড়েছে বা তার কোন শাখা প্রতিষ্ঠানে পড়েছে কিন্তু সে দেওবন্দী চিন্তা তথা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের চিন্তা-চেতনা লালন করে না, সে কিন্তু কখনো দেওবন্দী হতে পারে না।

আজ সব কিছু জগা-খিচুড়ীতে পরিণত হয়েছে। দেওবন্দ ইদারায় পড়ে, দেওবন্দী মাদ্রাসায় তালিম নেওয়ার পরেও কিছু মানুষ মুল স্রোত থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। দেওবন্দী হালকার মাঝে বড় হওয়ার পরেও তারা এখন গড্ডলিকা প্রবাহে ছুটে চলেছে। ওরা আর আকাবির-আসলাফের চেতনা তথা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের চিন্তাধারাকে লালন করে না।

দেওবন্দী মাদ্রাসা এবং সেই চিন্তাধারার মানুষের মাঝে বিশৃংখলা ঘটানোর জন্য বারবার কোশেশ করে যাচ্ছেন কিছু মানুষ।

আবার আরেক প্রজাতি জন্ম নিয়েছে এদেশে, ওরা অবশ্য চাতুরতার সাথে সব কিছু করে যাচ্ছে। নামে দেওবন্দী, দেওবন্দ এর বড় সাইনবোর্ড লাগানো, কিন্তু ওরা ভিতরে ভিতরে বাতিল ফেরকার চিন্তা-চেতনা লালন করে থাকে। আবার কিছু আছে, যারা দেওবন্দী লেবাস লাগিয়ে উলামায়ে দেওবন্দের মাঝে প্রবেশ করে ফিতনা ছড়ায়।

এমনও ঘটনার অবতারনা হয়েছে, ফেরাকে বাতেলার সংগঠনের দায়িত্বশীল। কিন্তু তিনি সংগোপনে কওমী মাদ্রাসার সর্বোচ্চ বোর্ড হাইয়াতুল উলইয়াতে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে নতুন ফেতনা ছড়ানোর ফন্দি এটেছিলেন। এভাবে দেওবন্দী মাদ্রাসা এবং সেই চিন্তাধারার মানুষের মাঝে বিশৃংখলা ঘটানোর জন্য বারবার কোশেশ করে যাচ্ছেন কিছু মানুষ। বিশেষ করে বাতিলপন্থী মানুষদের মাঝে বেশী দেখা যায় এধরনের দুরভিসন্ধি।

তবে কেনই বা এমন হচ্ছে বা এমন করছে কিছু মানুষ? এর কারণ হলো, দারুল উলূম দেওবন্দ এবং তাঁর অনুসারী উলামায়ে কেরাম এই ভারত উপমহাদেশসহ বিশ্বব্যাপি যে অবদান রেখেছেন তাতে ভিন্ন কোন মতবাদের মানুষের ঠায় পাওয়া মুশকিল। এই দেশের মাটি মানুষের সাথে মিশে গেছেন দেওবন্দী আলেমগণ। এমন কোন জায়গা বাকী নেই যেখানে দেওবন্দী হালকার আলেমদের পদচারণা ঘটেনি। বিশ্ব মুসলিমের দোর গোড়ায় পৌঁছে গেছে দেওবন্দীদের খেদমত। পুরো বিশ্ব জুড়ে যেন উলামায়ে দেওবন্দ আধিপত্য বিস্তার করে আছে।

একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, স্পেন, তুরস্ক, রাশিয়ার বুখারা, সমরকন্দ, উজবেকিস্তান, কাজাখাস্তান, যেসব জায়গাতে শত শত বছর ধরে মুসলিমগণ শাসন করেছেন। ইলমে হাদীসের চর্চা হয়েছে। হাজার হাজার আলেম তৈরীর মারকাজ চালু ছিল। যেখানে মসনদে বসে মুহাদ্দিসগণ হাদীসের দরস দিয়েছেন। সেসব জায়গাতে এখন ‘কলান্নাবি’ আর ‘কলার্রাসুল’ এর ধ্বনি বেজে ওঠে না। মুসলিমগণ রাজত্ব হারিয়েছে ইলমে হাদীসের দরস ও বন্ধ হয়েছে।

দারুল উলূম দেওবন্দ যেন এক চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় গোড়পত্তন হয়েছিল বলা যায়। ইলমেদ্বীন এর নিভুপ্রায় বাতিকে প্রজ্জলিত করেছিলেন আমাদের পুর্বসুরীগণ। এবং অত্যন্ত ত্যাগ-কোরবানীর বিনিময়ে এই ইদারার জন্ম লাভ করেছিল। সবচেয়ে স্পর্শ কাতর বিষয় হলো, এই ইলমেদ্বীন টিকিয়ে রাখার জন্য কোরবানী আর মোজাহাদা করতে হয়েছে সবচেয়ে বেশী।

এই ভারত উপমহাদেশের মাটির সাথে মিশে আছে আলেমদের রক্ত। উলামায়ে কেরামের সেই ত্যাগের বিনিময়ে মুলত এই উপমহাদেশে সহীহ ইলমে দ্বীনের প্রচার-প্রসার লাভ করেছে। এজন্য আলেম-উলামার পূণ্যভুমিতে বাতিল ফেরকা প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে বারবার। ওরা এগিয়ে আবার পিছিয়ে যাচ্ছে। কেননা আলেমদের পদচারণায় যে জায়গা মুখরিত, সেখানে অন্য তরিকার মানুষের পরাজয় হবে নিশ্চিত।

একারণে আজ বারবার দেওবন্দী আলেমদের কাঁধে সওয়ার হতে চায় বাতিল ফেরকার লোকেরা। দেওবন্দী সেজে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্তিতে ফেলতে চায়। দেওবন্দী না হয়েও ওরা দেওবন্দী মাদ্রাসায় পরীক্ষা দিয়ে জাতিকে বোকা বানানোর প্রচেষ্টা করে থাকে। কখনো দেওবন্দী আলেমদের টার্গেট করে তারা। নানান ভাবে তাদেরকে কাবু করার চেষ্টা করে। বিভিন্ন ধরনের ফন্দি এঁটে, কখনো কখনো সামান্য সময়ের জন্য সাকসেস হতে দেখা যায়।

এখন এমন অবস্থা, কোন বেদআতী বা গোমরাহ ফেরকার মানুষও যদি হয়, সে নিজের মত প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে দেওবন্দী সাজে।

আমরা কিন্তু গর্ব করতে পারি দেওবন্দ নিয়ে। গর্ব করতে পারি আমি একজন দেওবন্দী। যে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দেওবন্দী আলেমদের খেদমত প্রবেশ করেছে। যে প্রতিষ্ঠান মকবুলিয়্যাত এর মর্যাদা লাভ করেছে, যে প্রতিষ্ঠানকে মানুষ মিয়ারে হক মনে করে, সেটাতো গর্বেরই বিষয়। ‘ইখলাস কা তাজ মহল’। ইখলাসের তাজমহল সাদৃশ্য এ প্রতিষ্ঠান। যেমন ত্যাগ-তিতিক্ষা তেমন পাহাড়সম ইখলাস এর মাধ্যমে গড়ে ওঠেছিল এই ইদারা।

আজ যে তরিকারই হোক এদেশে, সে কিন্তু দেওবন্দী আলেমদের দিকে তাকিয়ে থাকে। ধর্মীয় দিক বলেন আর রাজনৈতিক দিক বলেন, সে কিন্তু দেওবন্দী আলেমদের অপেক্ষায়। তিনি যে সিদ্ধান্ত দেন, সেটাই মাথা পেতে মেনে নেয়। এখন এমন অবস্থা, কোন বেদআতী বা গোমরাহ ফেরকার মানুষও যদি হয়, সে নিজের মত প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে দেওবন্দী সাজে। সে জানে, যদি দেওবন্দ এর কথা বলি, তাহলে মানুষ তাড়াতাড়ি গ্রহণ করবে। মানে একজন ভ্রান্ত চিন্তার মানুষও বুঝতে পারে দেওবন্দ মকবুল এক ইদারার নাম।

আরও পড়ুন: রাজনীতিতে উলামায়ে দেওবন্দ

সত্যি গর্বে বুকটা ভরে যায়। এই ভারতবর্ষসহ আজ বিশ্বব্যাপি উলামায়ে দেওবন্দের পদচারণা।তাদের খেদমত যেভাবে মাকবুলিয়্যাত লাভ করেছে, যে গ্রহণ যোগ্যতা পেয়েছে, এটা এক মহীরুহে অবতীর্ণ হয়েছে।

পুরো ভারতবর্ষের পরতে পরতে দেওবন্দী মাদ্রাসা গড়ে ওঠেছে। মহান আল্লাহর খাস অনুগ্রহ প্রাপ্ত এই ইদারাগুলো। আমরা আশাবাদি কেয়ামত পর্যন্ত চালু থাকুক এই দ্বীনি প্রতিষ্ঠান। আল্লাহ তায়ালা কবুল আর মঞ্জু করুন। আমিন।

লেখক: শিক্ষক ও কলামিষ্ট

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com