১৩ই আগস্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ২৯শে শ্রাবণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ১৪ই মহর্‌রম, ১৪৪৪ হিজরি

আল্লামা আবদুল্লাহ মারুফীর ঢাকা সফর

  • মুফতী ফয়জুল্লাহ আমান কাসেমী

২০২২ সালের মার্চের চার তারিখ সকাল দশটা বেজে তিরিশ মিনিট। আগরতলা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশ আসেন দারুল উলুম দেওবন্দের হাদীস বিভাগের প্রধান মাওলানা আব্দুল্লাহ মারুফী সাহেব। জামিআ ইকরার পক্ষ থেকে মাওলানা শফিক সাহেব বিবাড়িয়ার স্থানীয় উলামায়ে কেরামের একটি কাফেলা সহ ইস্তিকবাল করেন। হযরত মাওলানা সিবগাতুল্লাহ নূর সাহেবের অনুরোধে জুমা পড়ান জেলা জামে মসজিদে। ডিসি সাহেব সহ বিবাড়িয়ার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ হযরতের ইমামতিতে জুমা আদায় করেন। জুমার পরপর তাড়াইলের বেলংকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।

এদিকে আমি ঢাকা থেকে জুমার পর বের হই একটি হায়েস গাড়ি নিয়ে। সঙ্গে ঢাকার বেশ কজন বড় আলেম ছিলেন। দুঃখজনক হলো আমাদের আগেই হযরত বেলংকায় পৌঁছে যান। ইন্ডিয়া থেকে তিনি আমাদের আগে ইসলাহী ইজতেমায় পৌঁছে গেলেন, আমরা ঢাকা থেকে পৌঁছতে পারলাম না। এটি সত্যি বিস্ময়কর।

শুক্রবার সকাল থেকেই খুব দুশ্চিন্তায় ছিলাম। হযরত আগরতলা সীমান্ত দিয়ে ঢুকতে পারেন কি না। গত মাসে যখন ভিসা হয় তখনই তথ্য নিয়ে দেখলাম, বাই রোডে টুরিস্টদের প্রবেশে বিধি নিষেধ জারি রয়েছে। কিছুদিন আগেই মাওলানা আযহার মাদানি সীমান্ত থেকে ফিরে গেছেন। এবছর দেওবন্দের কোনো উস্তাদই বাংলাদেশ আসতে পারেননি। এজন্য আমরা চাচ্ছিলাম অন্তত হযরত মারুফীর সফরটা সফল হোক। কোনোভাবে যেন বাধাগ্রস্ত না হয়।

আমাদের দুশ্চিন্তা দেখে হযরত আমাকে বারবার বলেছেন, ‘মুফতী সাব, আপ বিলকুল মুতমাইন রাহিয়ে..’। আমি মোটেও মুতমাইন হতে পারছিলাম না। দেওবন্দ থেকে বাংলাদেশের কাছে এসে যদি এভাবে ফিরে যেতে হয় তাহলে আমার মত হযরতের ভক্ত অনুরক্তরা কত কষ্ট পাবে সেই চিন্তা করছি না, হযরতের কষ্টের দিকটিই আমার চিন্তায় ঘুরছিল। বর্ডারে কিছুটা সমস্যা হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের ইমিগ্রিশনের অফিসারদের আন্তরিকতায় এবং স্থানীয় কিছু লোকের প্রচেষ্টায় আল্লাহর রহমতে হযরত খুব সহজেই বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারলেন। আলহামদুলিল্লাহ।

বেলংকার ইসলাহী ইজতেমার কাছাকাছি পৌঁছেই মাইকে হযরতের কণ্ঠ শুনতে পেলাম। সফরের ক্লান্তি ভুলে গেলাম মুহূর্তে। হাত মুখ ধুয়েই স্টেইজে উপস্থিত হলাম। মাওলানা শফীক সাহেব অনুবাদ করছেন। আমি হযরতের সাথে মুসাফাহা করলাম। জিজ্ঞেস করলেন, আভি পোহঞ্চে? এখনই পৌঁছেছ? সামান্য দুএক কথা বলে বসে গেলাম বয়ান শোনার জন্য।

রাতে হযরতের সাথে আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ (দা.বা.)-এর বাড়িতে খাবার খেলাম। সকালে সফরসঙ্গী হিসেবে আমি আর শফীক ভাই রঞ্জু ভাইয়ের গাড়িতে উঠে গেলাম। প্রায় একমাস আগেই সফরসূচি লিখে রেখেছিলাম। আমাদের ধারণা ছিল, আমরা ঢাকায় বেলা নয়টায় পৌঁছে যাব, কিন্তু দেখা গেল বারোটা বেজে গেছে। ঢাকার প্রথম প্রোগ্রাম ছিল বারিধারা জামিয়া আশরাফিয়া মাদ্রাসায়। মাওলানা আব্দুল আলীম ফরীদী সকাল থেকে বারবার ফোন দিচ্ছেন। আমরা পৌঁছার কয়েক ঘণ্টা আগ থেকেই আশপাশের আলেম উলামা ভিড় করতে শুরু করে সেখানে। আমরা মাদ্রাসায় পৌঁছে দেখি লোকে লোকারণ্য।

নুরের চালার পরে মিরপুর ১৩ দারুল উলুম মাদ্রাসায় প্রোগ্রাম ছিল। দারুল উলুম মিরপুরের মুহতামিম মাওলানা রেজাউল হক আব্দুল্লাহ গাড়ি এনে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু তার প্রোগ্রাম ক্যান্সেল করতে হলো। অবশ্য ঢাকার শেষ দিন তার মাদ্রাসায় হযরতকে নেওয়ার সুযোগ পেয়ে যান। নুরের চালায় খুব সংক্ষিপ্ত বয়ান হয়। দাওরা ও মিশকাতের ছাত্ররা বুখারী ও মিশকাত থেকে হাদীস পড়ে। হযরত উপস্থিত সবাইকে হাদীসের ইজাযত দেন। তবে চারটি শর্তের কথা উল্লেখ করেন।

এক. সুন্নাতের পাবন্দ থাকতে হবে।
দুই. বিদআত থেকে বেঁচে থাকতে হবে।
তিন. তাকওয়া তাহারাতের সাথে চলতে হবে।
চতুর্থ. ইলমে হাদীসের সাথে সব সময় সম্পৃক্ত থাকার চেষ্টা করতে হবে। ইশতিগাল বি ইলমিল হাদীস।

আমি মাওলানা রেজাউল হক আব্দুল্লাহ সাহেবের গাড়িতে হযরতকে উঠিয়ে দিয়ে বাসায় চলে আসি। হযরত শনিবার সারা দিন মিরপুর ও মোহাম্মাদপুরের বিভিন্ন মাদ্রাসায় প্রোগ্রাম করেন। জামিউল উলুম মাদ্রাসার মুহতামিম মাওলানা আবুল বাশার সাহেব খুব আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু সেখানের প্রোগ্রামও বাতিল করতে হয়েছে। শনিবার সারা দিনের সফর নির্ধারণের দায়িত্ব ছিল মাওলানা মামুন আব্দুল্লাহ কাসেমীর হাতে। মাওলানার মাদ্রাসায়ও সুন্দর মুহাজারা হয়েছে। সম্ভবত এতদিনে তা ইউটিউবে এসেও গেছে। বিকালে লালমাটিয়া এবং সন্ধায় বসিলা জামিআ রাহমানিয়া আজিজিয়ায় ছাত্রদের উদ্দেশ্যে আম বয়ান করেন।

মাওলানা মাহফুজুল হক সাহেবের বিশেষ আগ্রহে রাহমানিয়ায় প্রোগ্রাম হয়। আমি সেখানে ছিলাম না। কিন্তু যারা ছিলেন তারা আমাকে শুনিয়েছেন, হযরতের একটি সুন্দর রহমদিলির কথা। মাওলানা মাহফুজুল হক বয়ান শেষে বিদায় দেওয়ার সময় হযরতকে মুসাফায় হাদিয়া দিতে চান। হযরত তাকে ফিরিয়ে দেন। তারপরও মাহফুজ সাহেব আন্তরিকভাবে জোর করেন। হযরত বলেন, ‘মাওলানা, আমাকে হাদিয়া নিতে জোর করলে আমার খুব কষ্ট হবে। আপনি এই টাকা আপনার মাদ্রাসার জন্য খরচ করুন।’

মূলত মাদ্রাসাটির আবাসন ব্যবস্থার দূরবস্থা দেখে তিনি কোনো ভাবেই হাদিয়া নিতে রাজি হতে পারেননি। আমাদের উলামায়ে দেওবন্দের এই রহমদিলি আমাদের হৃদয়কে মোহিত করে। বাংলাদেশ ভারত পাকিস্তানের দেওবন্দী মাশায়েখদের অনেকের ভেতরই এই গুণ আছে। তাদের এই নির্মোহ মনমানস সত্যি অনন্য।

সেদিন রাতে জিগাতলা কোথাও আম বয়ান ছিল। কোনো মাদ্রাসার প্রোগ্রাম। রাত্রি যাপন করেন হযরতের খলীফা মাওলানা যোবায়ের ভাইয়ের মাদ্রাসায়। প্রোগ্রাম সেরে ধানমণ্ডি হয়ে সেখানে পৌঁছতে রাত প্রায় দুইটা। মাত্র দেড় ঘণ্টা বিশ্রাম করে সাড়ে তিনটায় উঠে গেছেন। তাহাজ্জুদ পড়ে বসেছেন যিকিরে। বাংলাদেশ ছিলেন পাঁচ দিন। প্রতিদিন একই রুটিন।

হযরতের ছাত্রদের মুখে শুনেছি, সবসময় তিনি এমন আমলের ভেতর থাকেন। তাই তো বলি, তার ইলমের রং কিছুটা ভিন্ন। এই রং আমল ছাড়া হতে পারে না। আমরা তো ভাবি, আমি ইলম নিয়ে আছি, খুব বেশি আমলের দরকার নেই। অথচ যত বেশি ইলম হবে তত বেশি আমলও করতে হয়। ইলম অনেক সময় শয়তানের ধোকার উপকরণ হয়ে যায়। আমলহীন ইলমের কোনো মূল্য নেই। একজন চোর ইলম রাখে যে চুরি করা অবৈধ, তা সত্ত্বেও চুরি করে, তার এই ইলম তাকে মুক্তি দিতে পারবে না। আলআমালু রুহুল ইলম। আমল হচ্ছে ইলমের আত্মা। আত্মাহীন দেহের মতই আমল হীন ইলম কোনো কাজের নয়।

বেআমল লোকের ইলম নির্জীব লাশের মতো দুর্গন্ধ ছড়ায়, পরিবেশ নষ্ট করে। ইলমের অপব্যবহার হয়। মূলত না মানলে কেবল জানা কোনো ইলম নয়। ইলম মাকসাদ নয়, ওসিলা বা মাধ্যম। আমল বাদ দিয়ে যারা ইলমকে মাকসাদ বানিয়ে নেয় তাদের সেই ইলমের দ্বারা উম্মতের ক্ষতি ছাড়া উপকার হয় না। আমলি মন মানসিকতা ইলমের ভেতর নূর পয়দা করে। অন্য রকম রং ধরে ইলমের গায়ে। আকাবিরে দেওবন্দের ইলমে সেই আমলি রং ছিল। মাওলানা আব্দুল্লাহ মারুফীকে দেখে আমরা আমাদের আকাবিরদের সেই রং অনুভব করি। আলহামদুলিল্লাহ।

রবিবার ভোরে উঠেই প্রস্তুত হলাম হযরতের কাছে যাওয়ার জন্য। ফজরের পরপর গাড়ি এসে গেল। আজকেও একটা হায়েস নিলাম। হযরতের ঘনিষ্ঠ শিষ্য মাওলানা হাবীবুল্লাহ মাহমুদ কাসেমী বললো, বড় গাড়ি নিলেই ভালো। কারণ হযরতের সফরসঙ্গী হতে ইচ্ছুক অনেক উলামায়ে কেরাম আছেন, তাদের জন্য সুবিধা হবে। প্রথমে আমি নোহা গাড়ি নিতে চাচ্ছিলাম, কিন্তু মাওলানা হাবীবুল্লাহর কথায় হায়েস নিতে হলো। সত্যি, বাংলাদেশের আলেম উলামা হযরতকে যে এত বেশি ভক্তি করে তা আমার জানা ছিল না। সব জায়গায় অসংখ্য উলামায়ে কেরামের ভিড় হয়ে যায়। অনেক মুরুব্বি আলেম হযরতের সাথে সফরসঙ্গি হওয়ার সৌভাগ্য খোঁজেন। বড় গাড়ি হওয়ায় সারা দিন আমরা দশ বারো জন হযরতের সাথে থাকার সৌভাগ্য লাভ করি। আলহামদুলিল্লাহ।

বসিলায় হালকা নাস্তা করে মাওলানা ফারুক এলাহির মাদ্রাসার জায়গা দেখতে চলে গেলাম কেরানিগঞ্জ। ফারুক এলাহী ভাইয়ের বাসায় রাতে গিয়েছিলাম। ধানমন্ডি এই বিহারী পরিবারকে হযরত খুব পছন্দ করেন। তারাও হযরতকে খুব মহব্বত করে। প্রত্যেক সফরেই তারা একবেলা আপ্যায়ন করতে আগ্রহ প্রকাশ করে। আমি রাতে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলাম। কেরানিগঞ্জ থেকে আরেকটু দূরেও ফারুক এলাহি ভাই কোথাও নিতে চাচ্ছিলেন। আমি একটু কঠোর হলাম। তা না হলে পরবর্তী সিডিউল নষ্ট হবে।

ফারুক এলাহি ভাইও খুব শরীফ মানুষ। তিনি আমার কঠোর আচরণ হাসি মুখে মেনে নিলেন। তিন কোটি টাকার একটা জমি কিনেছেন ফারুক এলাহী ভাই, সেখানে হযরত দুআ করলেন। আমরা দুআয় শরীক হলাম। হৃদয় গলানো একেটি দুআ। যারা হযরতের দুআয় শরীক হয়েছেন তারা এর স্বাদ অনুভব করবেন।

হাতিরঝিল হয়ে চলে আসলাম রামপুরা কারিমিয়া মাদ্রাসায়। মাওলানা আবুল ফাতাহ কাসেমী মূলত এক প্রকার জোর করেই এখানে প্রোগ্রাম নিয়েছেন। মাওলানা আবুল ফাতাহ হযরতের গাইরে মুকাল্লিদিয়াত বইটি অনুবাদ করেছেন। আমি তার অনুবাদ সম্পাদনা করেছি। এটিই বাংলা ভাষায় হযরতের প্রথম বই। হযরত এজন্য মাওলানা আবুল ফাতাহকে খুব মহব্বত করেন। মাওলানা ফাতাহও হযরতের জন্য ফিদা। মাশাআল্লাহ। কারিমিয়াতেও বুখারীর দরস হলো। ছাত্ররা শেষ হাদীস পড়লো। হযরত সবাইকে ইযাজত দিলেন। আশিক ইলাহি বুলন্দশহরির আলআনাকিদুল গালিয়ার সব সনদের ইজাযতও দিলেন। এটা এর আগে আমরাও হযরতের কাছ থেকে পাইনি। আলহামদুলিল্লাহ, এই সফরে এটি আমাদের এক বড় অর্জন।

কারিমিয়া থেকে আমরা যাচ্ছি মহাখালী টি এন্ড টি কলোনি মাদ্রাসায়। আমাদের উস্তাদ মাওলানা জাফর আহমদ সাহেবের মাদ্রাসা। সেখানে প্রথম দিকে কোনো প্রোগ্রাম দেওয়া হয়নি। কিন্তু জাফর সাহেব খুব করে ধরলেন। অন্য কয়েকটি মাদ্রাসার সফরের শিডিউল চেঞ্জ করে আমরা মহাখালীর প্রোগ্রাম ঠিক রাখলাম। কারণ মাওলানা জাফর সাহেব দারুল উলুম দেওবন্দের প্রতি অন্য রকম ভালোবাসা লালন করেন।

সংক্ষিপ্ত বয়ান শেষে আমরা গাড়িতে উঠে বসলাম। এসময় অবাক হয়ে গেলাম। মাওলানা জাফর সাহেব আমাদের বললেন, আমি হযরতের সাথে সারাদিন সফরে থাকতে চাই। চুয়াডাঙ্গার মাওলানা মুস্তফা ভাই নেমে জায়গা করে দিলেন। আরও কয়েকজন সফরসঙ্গী হওয়ার বাসনা প্রকাশ করলেন। তাদেরকে বললাম, সি এনজি নিয়ে চলে আসতে। আফতাব নগর খুব ইলমী আলোচনা হবে। মহাখালী মাদ্রাসার তিরমিযির শায়েখ মাওলানা আবুল কালাম ভাইসহ অনেকেই আফতাবনগরের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।

আফতাবনগর হযরতের ছাত্র আমার বন্ধু মাওলানা বশীরুল্লাহ ভাই আমাকে বলেছিলেন, যে কোনো এক বেলা আপ্যায়নের সুযোগ দিতে হবে আমাদেরকে। তার কথা রেখে এভাবেই প্রোগ্রাম সাজানো হয়েছে। ঠিক বারোটায় উপস্থিত হলাম আফতাবনগর। নামাজের আগে হযরত আমাদেরকে হাফেজ ইবনু হাজারের তাকরীবুত্তাহযিব নিয়ে আলোচনা করলেন। বললেন, আগে আমি উপস্থাপন করব, তারপর আপনাদের যার যা প্রশ্ন থাকবে, উত্থাপন করবেন। নামাজের সময় হয়ে যাওয়ায় প্রশ্ন করার সুযোগ হলো না। নামাজের পর আফতাবনগর মসজিদে ছাত্রদের উদ্দেশে বয়ান হলো। বয়ানগুলো রেকর্ড হয়েছে। বয়ানের বিষয়বস্তু উল্লেখ না করে বরং সফরের কারগুযারি তুলে ধরাই ভালো হবে।

অল্প সময়েই অসংখ্য উলামায়ে কেরাম আশপাশ থেকে হাজির হয়ে গিয়েছিল। মুফতী মোহম্মাদ আলী সাহেব সব উলামায়ে কেরামকে খুব আপ্যায়ন করলেন। রাতে ধানমণ্ডি থেকে বাসায় ফিরতে আমার অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল, এজন্য চোখে খুব ঘুম ছিল। মাওলানা শহীদ ও মুফতী মুযযাম্মিল আমাকে একটু বিশ্রাম নিতে বললেন। এই দুজন আফতাব নগরের গুরুত্বপূর্ণ উস্তাদ। তাদের কথায় কিছুটা ঘুমিয়ে নিলাম। কিন্তু হযরত মারুফী (দা.বা) মাওলানা বশীরুল্লাহ ভাই ও অন্যদের সময় দিলেন। সারা দিনে এক দণ্ড বিশ্রাম নেই। তবু হযরতের দিকে তাকালে বোঝা যাবে না, ক্লান্ত আছেন। ক্লান্তিহীন এক মুসাফির তিনি।

কিছুক্ষণ বাদে আবারও ইলমী মজলিস শুরু হলো। যার যা প্রশ্ন আছে সব উত্থাপন করা হলো। সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেলেন প্রশান্তভাবে। রক্তে মাংসে যেন ইলমে হাদীস ঢুকে আছে। একের পর এক উদ্ধৃতি কিভাবে মুখস্থ বলে যান, দেখলে অবাক হতে হয়। আমরা আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরি বা বিননুরি রহ.কে দেখিনি কিন্তু আল্লামা মারুফীকে দেখেছি। আলহামদুলিল্লাহ।

এবার আমাদের যেতে হবে যাত্রাবাড়ির কাজলায়। সেখানে হযরতের ঘনিষ্ট শিষ্য মাওলানা হাবীবুল্লাহ মাহমুদ কাসেমীর মসজিদ। করোনার পুরো সময়টা মাওলানা হাবীব দেওবন্দ ছিলেন। হযরতের বাসাতেই থাকতেন। হযরত তাকে দিয়ে তিরমিযির শরাহ আলআরফুযযাকির কাজ করাতেন। এই সুযোগ বাংলাদেশের আর কোনো তরুণ পায়নি।

মাওলানা হাবীব সাত খণ্ডের কাজ করেছেন। আমি মনে করি এটা মাওলানা হাবীবুল্লাহ মাহমুদ কাসেমীর জন্য অনন্য সৌভাগ্য। এবার যেহেতু হযরত সামান্য সময় নিয়ে বাংলাদেশ আসছেন এজন্য আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল আওয়ামের বয়ানের প্রোগ্রাম না রাখা। সব ইলমী মজলিস করতে হবে। কিন্তু মাওলানা মাহমুদের পীড়াপীড়িতে সেখানে প্রোগ্রাম রাখতে হলো। গাড়িতে উঠেই জানতে পারলাম ফরীদাবাদের প্রধান মুফতী মাওলানা আব্দুস সালাম সাহেব আফতাবনগর আসার জন্য সি এন জিতে উঠে পড়েছেন। আমরা তাকে কাজলার ঠিকানা দিয়ে দিলাম। আসরের নামাজের সময় কাজলায় পৌঁছলাম আমরা। মুফতী সালমানদের বাসায় উঠলাম।

মুফতী সালমানের বাবা মাওলানা ইয়াহয়া সাহেব খুবই সজ্জন মানুষ। তাসাউফ ও তরীকতের সাথে তার সম্পর্ক। ঢালকানগর মাওলানা জাফর সাহেবের খলীফা তিনি। মূলত কেরানিগঞ্জে অবস্থান করলেও কাজলায় দুটি ফ্লাট রয়েছে তার। তার বাসায় উঠলাম আমরা। আসর নামাজ বাসাতেই পড়লাম। আসর বাদ মাওলানা জাফর আহমাদ সাহেব আম মজমায় বয়ান করলেন। কিছুক্ষণ মাওলানা খালেদ ইয়াহইয়া সাহেবও বয়ান করলেন। পুরো যাত্রাবাড়ি এলাকার আলেম উলামা এখানে এসে গেছেন। আমরা মুফতী সালমানদের বাসা থেকে নেমে মাগরিব নামাজ আদায় করলাম কাজলার এই চারতলা মসজিদে।

নামাজ শেষে ভূমিকা স্বরূপ অন্য একজন মাওলানা কথা বললেন, আমরা দোতলায় উঠে গেলাম। হযরত কিছু সময় বিশ্রাম নিলেন। মুসল্লিরা হযরতের বয়ানের জন্য তাগাদা দিতে লাগল। মাওলানা হাবীবুল্লাহ মাহমুদ কাসেমী আমাকে তরজমা করতে বললেন। এক ঘণ্টা বয়ান করলেন হযরত। ইলমী মানুষ যে উমুমি বয়ানও এত ভালো করতে পারেন তা আল্লামা মারুফীকে না দেখলে বোঝা যাবে না। মাওলানা জাফর সাহেব বলে ফেললেন, ‘আজকে আমি কুরআনের একটি আয়াতের তাফসীর শিখে গেলাম।’ হযরত এখানে বয়ান করেছেন, আল্লাহর ইবাদত বন্দেগি নিয়ে। আমি জিন ও ইনসানকে আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি। এ আয়াতের তাফসীর করেছেন রাসূল (সা.)-এর একটি হাদীসের আলোকে।

বয়ান শেষে আমাদের জামিআ ইকরায় ফেরার কথা। ইকরায় কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে যেতে হবে মাকতাবাতুল আযহারে। আমি এবং মাওলানা শফীক ভাই এ সিদ্ধান্তে খুব অনড়। কাজলায় আমরা ইশা আদায় করব না। জামিআ ইকরায় ইশা আদায় করতে হবে। মাওলানা জাফর সাহেবও তাই বলছেন। হযরতের হাত ধরে মাওলানা জাফর সাহেব নিচে নেমে আসছেন। এসময় মাওলানা হাবীবুল্লাহ মাহমুদ আমাকে খুব অনুনয় করে বললেন, হুজুর, এলাকার মানুষ এটা কোনো ভাবেই মানতে পারবে না। তারা সব আলেম উলামার জন্য খাবার দাবারের বিরাট আয়োজন করেছে।

মসজিদ কমিটির এক সদস্য আমাকে কান্নার সুরে বললো, হযরত এখানে না খেলে সেই খাবার কেউ মুখে দিবে না। আমি এদের অবস্থা দেখে দৌড়ে গেলাম। মাওলানা জাফর সাহেবকে বললাম, হুজুর, মেহেরবানি করে একটু বসুন। এলাকাবাসী কোনো ভাবেই মানতে পারছে না। উলামায়ে দেওবন্দের প্রতি তাদের এ ভালোবাসা আমরা কিভাবে রদ করব? আমার বলার ভঙ্গিমা দেখে মাওলানা জাফর সাহেব হযরতকে নিয়ে মসজিদের দোতলায় উঠে এলেন। খাবারের আয়োজন করা হচ্ছে তৃতীয় তলায়। ইশার নামাজের ইকামত হয়ে গেল সাথে সাথে। এলাকাবাসীও হাফ ছেড়ে বাঁচল যেন। আমাদের অন্য সফরসঙ্গীরা আমাকে ভর্ৎসনা করতে লাগলেন।

বিশেষত মাওলানা মামুন আব্দুল্লাহ কাসেমী বলতে লাগলেন, ‘এই যে আপনি উসুল ভাঙলেন।’ শফীক ভাই বললেন, ‘এই যে হযরতদের প্রোগ্রাম করতে হলে একটু কঠোর হতে হবে। উসুলের পাবন্দ হতে হবে।’ আমি বললাম, উসুল হচ্ছে অন্ধের লাঠি। আজকে আফতাবনগরে হযরতই একথা বলেছিলেন। সব সময় উসুল অনুযায়ী চলা যায় না। কখনও কখনও উসুল ভাঙতে হয়। হযরতের কথা দিয়েই হযরতের ভক্তদেরকে থামালাম। সাধারণ মানুষের আবেগকে মূল্যায়ন করতে হয়। খেয়ে দেয়ে ধীরে সুস্থেই বের হতে হলো। রাস্তায় কিছুটা জ্যামও ছিল।

ফেরার পথে সম্ভবত মাওলানা জোবায়ের ভাই বা অন্য কেউ মাওলানা জাফর সাহেবকে মার্কাজুদ্দাওয়া থেকে প্রকাশিত আব্দুল্লাহ মারুফী সাহেবের বিরুদ্ধে লিখিত কিতাবের বিবরণ হাজির করলো। জাফর সাহেব (দা.বা) সব শুনে বললেন, ‘আমি আজই জানতে পারলাম যে, বাংলাদেশের একজন কাওমি আলেম দেওবন্দের কোনো দৃষ্টিভঙ্গির বিপক্ষে বা দেওবন্দের কোনো উস্তাযের বিরুদ্ধে শুধু মৌখিক সমালোনাই নয়, বরং একেবারে পাঁচশত পৃষ্ঠার কিতাব লিখে ফেলেছে। এরচেয়ে লজ্জার আর আফসোসের কি হতে পারে? আমি তো দেওবন্দের কুকুরকেও আমার থেকে উত্তম মনে করি।’

উস্তাদজির এই আবেগে আমরা সবাই অভিভূত হয়ে গেলাম। পরে আমরা পারস্পরিক আলোচনায় খুঁজে দেখতে চাইলাম আসলেই এর আগে এমন কোনো ঘটনা ইতিহাসে ঘটেছে কি না। এমন কিছু খুঁজে পেলাম না। বিদআতি বা জামাতিরা দেওবন্দের বিরুদ্ধে কিতাব লিখেছে। কিন্তু কওমি মাদ্রাসার ইতিহাসে সম্ভবত এটাই প্রথম। এই দুঃসাহসের জন্য মারকাযুদ্দাওয়াকে অবশ্যই সাধুবাদ জানানো যায়। তবে মানতে হবে, এটা দুঃসাহস। খুব তাড়াহুড়া করেই তারা এই দুঃসাহস প্রদর্শন করেছেন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে আকাবির আসলাফের আজমত ধরে রাখার সুমতি দিন এবং সিরাতে মুস্তাকিমে অনড় থাকার তাওফিক দান করুন। আমীন।

কথা ছিল জামিআ ইকরায় হযরত কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিবেন। কিন্তু রাত নয়টার উপর বেজে গেছে। মাকতাবাতুল আজহার থেকে মাওলানা উবায়দুল্লাহ আজহারী বারবার ফোন দিচ্ছেন। সেখানে অনেক আলেম উলামা অপেক্ষা করছে। জামিআ ইকরায় পৌঁছে যাত্রিদের মাঝে কিছু পরিবর্তন হলো। জুনিয়ররা সিনিয়র আলেমদের জন্য জায়গা ছেড়ে দিলেন। মাওলানা আরীফ উদ্দীন মারূফ, মাওলানা ইমদাদুল্লাহ কাসেমী সহ আরও কয়েকজন আলেম এখান থেকে গাড়িতে চড়লেন। চরম যানজটের ভেতরে আমরা দশটারও পরে বাড্ডা পৌঁছলাম। বাড্ডা মাকতাবাতুল আযহারে প্রিন্সিপলস অব হাদীস বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করবেন হযরত। বইটি প্রকাশ পেয়েছে পাঁচ ছয় মাস হয়ে গেল। এত দিনে প্রথম এডিশন প্রায় শেষ হয়ে গেছে। তবু এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো, হযরতের বরকত লাভের আশায়।

প্রকাশক মাওলানা উবায়দুল্লাহ আজহারী খুবই সজ্জন মানুষ। আমার সাথে সম্পর্ক আমার কর্মজীবনের শুরু থেকেই। ইকরার আগে আমি বাড্ডা মিফতাহুল উলুম মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেছি তিন বছর। তখন থেকেই ঘনিষ্ঠতা। বিরূপ পরিস্থিতিতে তিনি আমার অনূদিত এ বই ছেপে আমার প্রতি তার দারুণ পক্ষপাত প্রকাশ করেছেন। আল্লাহ তার এই মহব্বতের উত্তম প্রতিদান দান করুন। আযহারের পাঠকদের একটা অংশ না বুঝেই এ বইয়ের প্রকাশের বিরোধিতা করছিল। এজন্যও হযরতের উপস্থিতির প্রয়োজন ছিল।

মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে মার্কাজুদ্দাওয়ার অনেক ফুজালাও অংশগ্রহণ করেন। দুই বুযুর্গের উপস্থিতির কারণে কেউ অনুষ্ঠানটির ভিডিও ধারণ করতে পারেনি। একজন একটা ছবি তুলতে যাচ্ছিল, মাওলানা জাফর সাহেব তাকে ধমক দিয়ে বসিয়ে দিলেন। মুফতী আব্দুস সালাম সাহেবও ছবি তোলা পছন্দ করেন না। দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়ার উপর তারা অটল। অনেক সময় বিপরীত ফতোয়ার সুযোগ গ্রহণ করি আমরা, কিন্তু কেউ দেওবন্দের ফতোয়া অনুসরণ করলে তার প্রতি শ্রদ্ধা রাখা উচিত। পূর্ণ আলোচনার রেকর্ড সংরক্ষিত হয়েছে, আশা করছি দ্রুত ই তা প্রকাশ করা হবে।

মাওলানা উবায়দুল্লাহ ভাইকে অনুরোধ করেছিলাম যেন বন্ধুবর আব্দুল্লাহ ফারুক অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। সেখানে উপস্থিত হয়ে দেখলাম আব্দুল্লাহ ফারুক ভাই মাইক হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। খুশি হলাম, কিন্তু তিনি উল্টো আমাকে সঞ্চালনার জন্য অনুরোধ করলেন। বললেন, এখানে আগত অতিথিদের সবাইকে আপনি চেনেন, আপনি উপস্থাপন করলেই ভালো হয়। অনেক অনেক আলেম ছিলেন, তাদের সবাইকে কথা বলতে দিলে ভালো হতো। কিন্তু অনেক রাত হয়ে গেছে। তাই মাওলানা বশীরুল্লাহ ও মাওলানা মামুন আব্দুল্লাহ কাসেমী কথা বললেন।

মাওলানা জাফর সাহেব ও মুফতী আব্দুস সালাম সাহেব হযরতের কথা শুনতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। কিন্তু আমি আল্লামা আরীফ উদ্দীন মারূফ সাহেবকে খুব করে অনুরোধ করলাম কিছু কথা বলার জন্য। কারণ জামিআ ইকরার রইস এই আরবি আদীবের সাথে হযরতের দারুণ সম্পর্ক রয়েছে। একটা অনুষ্ঠানে একবার হযরত বললেন, ইনি হলেন মারুফ, আর আমি উনার দিকে মানসুব মারুফী..।

মাওলানা মারুফ সাহেব আরব শায়েখের কথা শোনালেন, মদীনা মুনাওয়ারার এক শায়েখ তাকে বলেছিলেন, আরবদের বিনয় দেখে ধোকা খেয়ো না, সত্যিকার বিনয় আর আখলাক পাবে উলামায়ে দেওবন্দের কাছে। আমরা সত্যি আল্লামা মারুফী দা বা -এর আখলাক দেখে বিমোহিত না হয়ে পারিনি। প্রতিদিন কতবার কত যে মাধূর্য আর সূক্ষ্মতা দেখতে পেয়েছি। আমাদের দেশের মাত্রাহীন স্থূলতার ভেতরে এর বোদ্ধা খুঁজে পাওয়াও মুশকিল।

এই মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে মাওলানা মামুন আব্দুল্লাহ কাসেমী প্রশ্ন উত্থাপন করলেন, তাকরিব সম্পর্কে আপনার যে মত সেটিকে একটি শায মত বলা হচ্ছে। মাশায়েখে দেওবন্দের কারো এর সাথে কোনো সম্পর্ক নেই বলে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, এর বাস্তবতা কী? আল্লামা মারুফী সেখানে খুব বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর দিলেন। আট দশ মিনিটে এত সুন্দরভাবে কথা বললেন- সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনলো তার কথা। আমি শুধু শুযুযের উত্তর উল্লেখ করছি।

হযরত বললেন-

‘আমি তাকরিব সম্পর্কে যে মতামত দিয়েছি তা প্রথম প্রকাশ করেছেন ডক্টর ওয়ালিদ আনি। ওয়ালিদ আনির এই বই গুজরাট থেকে মাওলানা নিআমাতুল্লাহ আজমি দেওবন্দ আনেন। তারপর থেকে পনের বছর যাবৎ দেওবন্দের নেসাবে এই কিতাব রয়েছে। দেওবন্দের কাওয়ায়েদে দাখেলা গ্রন্থে এ কিতাবের উল্লেখ রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে এভাবে চলছে। দেওবন্দের কোনো মাশায়েখ তো এ বিষয়ে কখনও কোনো আপত্তি করেননি। কাজেই এটা খুব হাস্যকর, যে, কেবল আমার চিন্তা অনুসারেই দেওবন্দে এই মানহাজ অনুসরণ করা হচ্ছে।

এটা আমার ব্যক্তিগত মানহাজ নয়, দারুল উলুম দেওবন্দের মানহাজ। এটাকে আমার ব্যক্তিগত মত হিসেবে উপস্থাপন করা এবং তার খণ্ডন করা মোটেও যৌক্তিক নয়। কেউ এই মত গ্রহণ না করতে পারেন, কিন্তু এটিকে শায মত বলার অবকাশ নেই। এটি দেওবন্দের মাওকিফ। দারুল উলুম দেওবন্দের কাওয়ায়েদে দাখেলা আপনাদের হাতে আছে, সেটির পাতা উল্টে দেখলেই বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারবেন। তবে আমি সৌভাগ্যবান, আমার ভুল ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমার কথা খণ্ডনের উপযোগী মনে করেছেন কিছু আহলে ফন। এটা আমার জন্য বড়ই সৌভাগ্যের। আমাকে যে খণ্ডনের উপযোগী মনে করেছেন তাতে আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। তাদের এই রদের দ্বারা অন্তত আহলে ইলম এখন আমার লেখা কিতাব খুলে দেখার প্রয়োজন অনুভব করছেন। এসব কিছুর জন্য আমি তাদের ধন্যবাদ জানাই।’

সংক্ষিপ্ত দুআর মাধ্যমে শেষ হলো মোড়ক উন্মোচন। উপস্থিত সব অতিথিকে হাদিয়া দেওয়া হলো কিতাব। উপরে প্রকাশকের বাসায় রাজকীয় আপ্যায়ন হলো এবং অনেকের সাথেই প্রিন্সিপলস অব হাদীস নিয়ে কথা হলো। মাওলানা আব্দুস সালাম সাহেব ইংরেজি নাম নিয়ে আপত্তি তুললেন। হযরত আমার পক্ষ হয়ে উত্তর দিলেন- অনেক সাধারণ মানুষ কেবল এই ইংরেজি নাম দেখে সংগ্রহ করতে উৎসাহিত হবে।’ আব্দুস সালাম সাহেবের কথাটিও আমি ফেলে দিতে পারছি না। এজন্য ভাবছি প্রকাশককে পরামর্শ দিব, সামনে থেকে দুটি প্রচ্ছদ করবেন। একটিতে হাদীস ফাহমে হাদীস, অপরটিতে প্রিন্সিপলস অব হাদীস নাম লেখা হবে। আল্লাহ আসান করুন। আমীন।

পরদিন সকালে বাদ ফজর জামিআ ইকরার দাওরার ছাত্রদের সামনে উলুমুল হাদীসের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে ইলমী মুহাজারা অনুষ্ঠিত হলো। রাত দুই টা পর্যন্ত ঘনিষ্ঠ অনেক আলেম উলামাকে দাওয়াত দিলাম। অনেককে ম্যাসেজ দিয়ে রাখলাম, সকালে ইলমী মুহাজারা হবে। দাওরার দরসের পর মুহাজারার অপেক্ষা করতে লাগলাম। এর মাঝে মাওলানা আহমাদ মায়মুন সাহেব এলেন। চৌধুরিপাড়া মাদ্রাসার অনেক মুহাদ্দিস এসে উপস্থিত হলেন। আমরা সবাই একসাথে নাস্তায় শরিক হলাম।

হযরত অপেক্ষা করছিলেন বসুন্ধরার মাওলানা আব্দুস সালাম সাহেবের। আব্দুস সালাম সাহেবের সাথে আমাদের বন্ধু মাওলানা ইমতিয়াজ ভাইও এলেন। কিছুক্ষণ বাদে মাওলানা আবু সাদেক ভাইও এসেছিলেন। আফতাবনগরের চেয়েও দীর্ঘ সময় নিয়ে হযরত এখানে তাকরিব সম্পর্কে আলোচনা করলেন। কথার মাঝে মাঝে বসুন্ধরার মুফতী আব্দুস সালাম সাহেব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করতে থাকলেন আর হযরত প্রতিটি প্রশ্নের তাশাফফীবখশ উত্তর দিতে থাকেন। আলহামদুলিল্লাহ।

বাদ জোহর ছিল চৌধুরিপাড়া মাদ্রাসায় ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বয়ান। দুপুরের আপ্যায়ন করেন আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ (দা.বা)-এর জানেশিন মাওলানা সদরে আলা মাকনুন ভাই। এবার হযরত মারুফী (দা.বা.)-কে দাওয়াত করা থেকে নিয়ে বাংলাদেশ সফরের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন তরুণ উলামায়ে কেরামের অহংকার এই সদরুল মাকারিম সদরে আলা মাওলানা মাকনুন হাফিজাহুল্লাহ। হযরত মারুফী এ বছর কোনো ভাবেই বাংলাদেশ আসতে চাচ্ছিলেন না, মাওলানা মাকনুন ভাই বারবার দাওয়াত দেন।

হযরত সম্মতি প্রকাশ করলে মাকনুন সাহেব হযরতের পাসপোর্ট সংগ্রহ করে ভিসার ব্যবস্থা করেন এবং সব কিছুর ইন্তিজাম করেন। আমাকে বলেন- প্রোগ্রাম সেট করতে। এভাবেই সুসম্পন্ন হলো হযরতের এবারের বরকতময় সফর। আল্লাহ তায়ালা মাওলানা মাকনুন ভাইকে বাংলাদেশের আলেম সমাজের পক্ষ থেকে জাযায়ে খায়ের দান করুন। এবছর হযরত মারুফী না আসলে আমরা দেওবন্দের ঘ্রাণ থেকে মাহরুম থাকতাম।

আসরের আগেই আল্লামা মারুফী বেরিয়ে গেলেন আমিন বাজার মসজিদের উদ্দেশ্যে। সেখানে হযরতের ছাত্র তরুণ আলেম মাওলানা যাকারিয়া ভাইয়ের মসজিদে উলামায়ে কেরাম উপস্থিত হবেন। আমার আজ তাদাব্বুরে কুরআনের দরস আছে বাদ মাগরিব। এজন্য সঙ্গে থাকতে পারলাম না। যুক্ত হবো ভাষানটেক খতমে বুখারী অনুষ্ঠানে। ভাষানটেক মাদ্রাসার মুহতামিম মাওলানা শাহাদাত ভাই হযরত কবে সময় দিতে পারবেন তা জেনেই খতমে বুখারীর তারিখ ঠিক করেছেন। আমি বাদ মাগরিব সেখানে পৌঁছার কিছুক্ষণ পরই আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ উপস্থিত হলেন।

মাওলানা জাফর আহমদ সাহেব আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন। তিন শায়েখের মধুর কথোপকথনের কিছু চিত্র পাঠকের সামনে তুলে ধরব। জাফর সাহেব ফরীদ সাহেবকে উর্দুতে বললেন, আমি সারাদিন হযরতের সাথে ছিলাম। হযরতের ইলম থেকে ইস্তিফাদা করলাম। হযরত রদ করে বললেন, না উনি আমার কাছ থেকে কি ইসতিফাদা করবেন, উনি নিজেই তো একজন বড় মুহাদ্দিস। ফরীদ সাহেব বললেন, মেই বিমার থা..আমি অসুস্থ, তা না হলে আমিও হযরতের সঙ্গে থাকতাম, ইস্তিফাদা করতাম..।

পাঠক, এই কথোপথনের আরেকটু অংশও আপনাদের সাথে শেয়ার করি, বড়দের বিনয় দেখুন, সূক্ষ্মতা দেখুন। আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ (দা.বা.) হযরতকে লক্ষ্য করে বললেন, এই মাওলানার এক বড় দুর্ভাগ্য হচ্ছে, সে আমার কাছে কিছু দিন পড়েছে, তাই এখন আমার ছাত্র পরিচয় দিতে হয়..। জাফর সাহেব আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ে বললেন, না না.. আমার বড় সৌভাগ্য.. আমি হুজুরের ছাত্র হতে পেরেছি। .. আমরা যারা উপস্থিত ছিলাম আমরা কেবল উপভোগ করলাম।

রাত্রি যাপন করলাম মিরপুর ডি,ও,এইচ,এস হযরতের এক মুরিদের বাসায়। বাসায় পৌঁছতে একটা বেজে গিয়েছিল। খাওয়া দাওয়া করে ঘুমুতে ঘুমুতে রাত দুইটা। আবার সাড়ে তিনটায় উঠে গেলেন হযরত। আমরাও উঠলাম। তাহাজ্জুদ পড়লাম। কথা ছিল আমরা হযরতের সাথে বসে জিকির করব। কিন্তু বাড়ির মালিক আমাদের কাছে অনুরোধ করলেন, একান্তভাবে তিনি হযরতের সাথে বসে জিকির করতে চান। একজন সাধারণ মানুষের চেহারায় তাসাওফের রং দেখে সত্যি অভিভূত হয়ে গেলাম। এরকম আরও কয়েকটি ফ্লাট রয়েছে এই ডি,ও,এইচ,এস এরিয়ায়।

এছাড়া কাজিপাড়া ও অন্যান্য অঞ্চলে আরও বাড়ি আছে উনার। তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে এবং স্ত্রী সবাই লন্ডনে। এই বাসাটায় কেউ থাকে না। খালি পড়ে আছে মাসের পর মাস। এত ভি আইপি বাড়ি, অথচ শুন্য পড়ে থাকে। আমার মনে হলো হযরতের সাথে সম্পর্ক এই ভদ্রলোককে দুনিয়া আখেরাতে বাঁচিয়ে দিয়েছে। তা না হলে বিলাস ব্যসনে মত্ত হয়ে থাকায় কোনো বাধা ছিল না। এত বিত্ত বৈভবের মালিক হয়েও তিনি আত্মার প্রশান্তির জন্য শাইখে কামিলের হাতে তরিকতের বাইআত হয়েছেন। ইমানি রঙে রাঙিয়েছেন নিজেকে। আহলুল্লাহর সোহবতে থেকে নিজেও একজন আহলুল্লাহ হয়ে গিয়েছেন। তার কথাবার্তা ও আচরণ দেখলে যে কেউ বুঝবেন তার আধ্যাত্মিকতার উৎকর্ষতা।

হযরত ইসলাহি দিক দিয়ে অনেক উচ্চ মাকামের। একই সাথে ইলম ও তাসাউফ- দুটির এত সুন্দর সমন্বয় এ যুগে খুব কম মনীষীর ভেতর পাওয়া যায়। আগামীকাল সকাল ফাস্ট ফ্লাইটে আমি হযরতের সাথে সিলেট যাচ্ছি। এখান থেকে ইতোমধ্যেই বিদায় নিয়েছেন মাওলানা আবু বকর আমীন। বি বাড়িয়া থেকে তিনি হযরতের সাথে ছিলেন। পুরো সফরে হযরতের সবচেয়ে বেশি খেদমত করেছেন তিনি। হযরতের তরুণ খলীফা মাওলানা আব্দুর রহমান নাইমও ছিলেন সাথে। অবশ্য সিলেট যাবেন না তিনি। সফরে কিছু সময়ের জন্য ছিলেন হযরতের একান্ত ছাত্র মাওলানা আইনুল হক কাসেমী। আরও অনেকেই ছিলেন হযরতের সাথে।

রাতে একে একে সবাই বিদায় নিয়ে গেছেন। মাওলানা শফীক ভাই কাল যাবেন বি বাড়িয়া। হযরত আসা যাওয়ার পথে শফীক ভাইদের বাড়িতে অবস্থান করেন। আখাউড়া বর্ডারের কাছেই শফীক ভাইয়ের বাড়ি। মাওলানা মাহমুদ মাদানী সহ অনেক আকাবির হযরত সেখানে যাত্রা বিরতিতে অবস্থান করেন। মাওলানা আবু বকর আমীন চলে গেছেন সিলেটে। সিলেট বিমানবন্দরে হযরতকে ইস্তিকবাল করবেন। সিলেট এয়ারপোর্টে আরও থাকবেন সিলেটের তরুণ উলামায়ে কেরামের আইডল বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়্যার নায়েবে সদর মাওলানা মুসলেহুদ্দিন গওহরপুরি।

সারাদিন সিলেটের প্রোগ্রাম শেষে রাতে আমাকে ঢাকায় ফিরতে হবে। পরদিন ঢাকা একটি মাহফিলে অংশগ্রহণ করতে হবে আমাকে। এজন্য সফরের শেষ সময়ে আমি সঙ্গে থাকতে পারব না। খুব আফসোস হচ্ছে, কিন্তু কিছু করার নেই, পূর্ব নির্ধারিত মাহফিল। তবু সিলেটে সারা দিন হযরতের সাথে থাকা হবে, এটাই কম কিসে? আকাবির হযরতদের সংস্পর্শে যতটা সময় থাকা যায় তাই গনিমত। শফীক ভাইদের বাড়ি পর্যন্ত সঙ্গে থাকবেন মাওলানা আবু বকর আমীন। সিলেট শহর থেকে রাত সাড়ে বারোটার গ্রিন লাইনে হযরতের সাথে উঠে যাবেন আবু বকর ভাই।

আমি মাওলানা মোসলেহুদ্দিন গওহরপুরির সাথে তার গাড়িতে উঠব। হযরতের সাথে চান্দুরায় দেখা করব। গ্রিনলাইনের সাথে সাথে চলবে আমাদের প্রাইভেট কার। সেখানে সম্ভব হলে কিছু সময়ের জন্য হযরতের সাথে আমরা দুজন শফীক ভাইয়ের বাড়িতে উঠব। চা খেয়ে আমরা হযরতের কাছ থেকে আবার বিদায় নিয়ে ঢাকার পথে যাত্রা করব। আমরা গ্রিনলাইনে উঠিয়ে দেওয়ার সময় হযরতকে বলব না, সামনে বিবাড়িয়ায় আবারও যে ইস্তিকবাল করব। হযরত চরম ক্লান্তিতেও আমাদের আবার দেখতে পেয়ে খুশি হবেন। পরদিন থেকে বেফাকের পরীক্ষা শুরু হবে, মাওলানা মোসলেহুদ্দিন ভাইকে অবশ্যই বেফাকের অফিসে থাকতে হবে।

লামার গ্রাম মাদ্রাসার মুহাদ্দিস মুফতী আবুল হাসান সাহেবও হয়ত থাকবেন। হযরতের এক ছাত্র মাওলানা জহীরুদ্দিন ভাই শুরু থেকেই আমার সাথে ফোনে যোগাযোগ রেখে চলেছেন। তিনিও ইস্তিকবাল করতে আসবেন বলেছেন। সিলেট জকিগঞ্চ লামার গ্রাম মাদ্রাসায় হযরত সেই ২০০৮ সাল থেকে আসতেন। সেখানে এবারও যাবেন। আমার সাথে মুফতী আবুল হাসান সাহেব বারবার যোগাযোগ করেছেন। আমি সিলেটের নেতৃস্থানীয় আলেম মাওলানা মোসলেহুদ্দিন রাজু ভাইয়ের কথা বলে দিয়েছি। তারা সরাসরি হযরতের সাথে কথা বলেছে।

হযরত আমার সাথে যোগাযোগ করতে বলে দিয়েছেন। ফুলতলি দরবারের কাছাকাছি রাইপুরি পীরসাহেবের এই মাদ্রাসা। রাইপুরি বর্তমান গদ্দিনশীন পীর সাহেবের বাবা আমাদের উস্তায মুফতী সাইদ আহমাদ পালনপুরি রহ.-এর সহপাঠী। মুফতী পালনপুরি এই প্রতিষ্ঠানে এসেছেন। ভারতের আসাম সীমান্তের একদম কাছাকাছি এক খানকা। হযরত মারুফী প্রত্যেক বছর কাছাড় বাসকান্দি আসতেন। শিলচর একটি মাদ্রাসায় কিছুদিন দরস দিতেন। সেখান থেকেই লামার গ্রাম মাদ্রাসার দায়িত্বশীলগণ হযরতকে দাওয়াত করেন। হযরতের মাধ্যমে তারা পরবর্তীতে দেওবন্দের প্রায় সব বড় আলেমকেই এখানে আনতে সমর্থ হন। এটা তাদের জন্য নিঃসন্দেহে অনেক সৌভাগ্যের।

ফুরফুরা সিলসিলার এক বিরাট প্রতিষ্ঠান এখানে এই অজপাড়া গাঁয়ের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে। ফুরফুরা তরিকার হলেও তারা উলামায়ে দেওবন্দকে মহব্বত করেন। খুবই ভারসাম্যপূর্ণ মনন তাদের। তালিম ও তাযকিয়ার সুসমন্বয় করে চলার মানসিকতা লালন করেন। সিলেটের সফরনামা আরেক লেখায় হাজির করতে হবে। আজ এখানেই শেষ করা যাক।

লেখক : শিক্ষক, খতিব, প্রাবন্ধিক ও গবেষক

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com