১৯শে জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ৫ই মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৫ই জমাদিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

ইরান-তালেবান সম্পর্ক : বৈঠক শেষে যা জানা যাচ্ছে

ফাইল ছবি: ২০২০ সালে তেহরানে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও তালেবান নেতা আব্দুল গনী বারদার

  • ইরান-তালেবান সম্পর্ক
  • সীমান্তে সংঘাত ‘ভুল বুঝাবুঝির’ কারণে
  • ইরান-তালেবান-ভারত ত্রিভুজ সম্পর্ক
  • বৈঠকের ফলাফল

য. সামনূন :  তালেবান সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দলের সাথে আজ সোমবার (১০ জানুয়ারি) বৈঠকের পর ইরান জানাচ্ছে, তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়ার মতো আস্থা ইরানের এখনও তৈরি হয়নি।

স্বীকৃতি প্রদানের সম্ভাবনা নাকচ করে দিলেও ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাইদ খতিবজাদেহ দ্বিপাক্ষিক এই বৈঠক ‘ইতিবাচক’ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। এতে আয়োজক দেশ ইরানের পক্ষ থেকে যোগ দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুসাইন আমির-আব্দুল্লাহিয়ান।

খতিবজাদেহ বলেন, আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের’ জন্য উদ্বেগজনক। আর এই উদ্বেগ থেকেই তালেবান প্রতিনিধি দলের এই সফরের আয়োজন।

তালেবানের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির মুত্তাকি খানের নেতৃত্বধীন ২৬ সদস্যের প্রতিনিধি দলে আরও রয়েছেন ভারপ্রাপ্ত তালেবান অর্থমন্ত্রী দীন মোহাম্মদ হানীফ এবং ভারপ্রাপ্ত শিল্প ও বানিজ্যমন্ত্রী নুরুদ্দীন আজীজী। আফগানিস্তানে ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর মন্ত্রী পর্যায়ে ইরানের মাটিতে এটাই তাদের প্রথম বৈঠক।

ইরান-তালেবান সম্পর্ক

গত কয়েক বছর ধরেই সুন্নি-প্রধান তালেবান নেতৃত্ব শিয়া-সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরানের সাথে মজবুত সম্পর্ক গড়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। কাবুলের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা অর্জনে যাত্রা শুরুর আগেই ২০১৯ সালে তালেবানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তি মোল্লা আব্দুল গনী বারদার ইরান সফর করে আসেন।

এরপর কোভিড-১৯ এর প্রথমদফার প্রকোপ কিছুটা কমে আসতেই ২০২০ সালের জুনে ইরান-তালেবান আরও একটি বৈঠক হয়, সেখানেও মোল্লা বারদার অংশ নেন।

গত আগস্টে তালেবান কাবুল দখলের পর থেকেই ইরান বলে আসছে, তারা তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেবে যদি তালেবান সবাইকে সাথে নিয়ে একটি ‘ঐক্যমতের সরকার’ গঠন করতে সক্ষম হয়।

তবে, সেপ্টেম্বরে তালেবান সরকার গঠনের পর স্বীকৃতি না দিলেও; ইরান তালেবানের সাথে তাদের পূর্ব সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চলেছে। গত কয়েক মাসে ইরানের বিশেষ দূত হাসান কাযেমি-কোমি আফগানিস্তানে একাধিক সফর করেছেন।

সীমান্তে সংঘাত ‘ভুল বুঝাবুঝির’ কারণে

আফগানিস্তানের সাথে ইরানের ৯০০ কিলোমিটারেরও বেশি সীমান্ত রয়েছে। চোরাচালান ঠেকাতে এর একটা অংশ দেয়াল তুলে রুদ্ধ করে দিয়েছে ইরান।

গত ডিসেম্বরে ইরানের হিরমান্দ প্রদেশে তালেবান প্রহরীদের সাথে ইরানি সীমান্ত রক্ষীদের গুলিবিনিময় হয়। ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাইদ খতিবজাদেহ জানান, একদল ইরানি কৃষক দেয়াল পেরিয়ে ওপারে গেলে তালেবান প্রহরীরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে। তারা ধারণা করেছিলো ইরানি কৃষকরা অবৈধভাবে আফগানভূমিতে প্রবেশ করেছেন, যদিও বাস্তবে তারা ইরানি ভূমিতেই অবস্থান করছিলেন।

উভয় দেশ পরবর্তীতে এটাকে ভুল বুঝাবুঝি হিসেবে স্বীকার করে নেয়।

ইরান-তালেবান-ভারত ত্রিভুজ সম্পর্ক

তালেবান প্রতিনিধি দলের সাথে এই বৈঠকের কয়েক ঘন্টা পূর্বে আফগানিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকরের সাথে ফোনালাপ করেন ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুসাইন আমির-আব্দুল্লাহিয়ান।

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই ফোনলাপে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফগানিস্তানে সবাইকে সাথে নিয়ে একটি ‘ঐক্যমতের সরকার’ গঠনের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন।

ফোনালাপে তিনি আফগানিস্তানকে দেয়া ভারত সরকারের জরুরি সহায়তার প্রশংসা করেন। পাকিস্তানের অসহযোগিতার কারণে এই ত্রাণ আফগানিস্তানে পৌছুতে ভারতের বেগ পেতে হচ্ছে দেখে ইরানি মন্ত্রী প্রস্তাব রাখেব, ইরান ভারতকে সহায়তা করবে এই ত্রাণ আফগানিস্তানে পৌঁছে দিতে।

আফগানিস্তানকে দেয়া ভারতের জরুরি সহায়তার তালিকায় আটা, ওষুধ, করোনা ভাইরাসের টিকা ইত্যাদি রয়েছে।

গত ডিসেম্বরে ভারতের দুই টন পরিমাণ চিকিৎসা সহায়তা পাওয়ার পর তালেবানের উপ-মুখপাত্র ওয়াসিক আহমাদুল্লাহ এক টুইটে ভারতকে ‘আঞ্চলিক নেতা’ বলে উল্লেখ করেন এবং ভারতের সাথে সুসম্পর্ক তালেবানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন।

বৈঠকের ফলাফল

২৬ সদস্যের তালেবান প্রতিনিধি দলের এই সফরে মুখ্য উদ্দেশ্য ছিলো কমমূল্যে ইরান থেকে তেল ক্রয় করা।

এক প্রেস রিলিজে কাবুল জানিয়েছে, ইরান তাদের কাছে বাজার মূল্যের চেয়ে কমদামে তেল বিক্রি করতে রাজি হয়েছে।

প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে অন্যান্য অনেক প্রতিকূলতার সাথে সাথে আফগানিস্তানে বর্তমানে ভয়াবহ বিদ্যুত সংকট চলছে।

ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুসাইন আমির-আব্দুল্লাহিয়ান বৈঠকে ১৯৯৮ সালে মাজার-ই শরীফ কনস্যুলেট অবরোধ করে ইরানের কূটনৈতিকে হত্যার কথা তুলে ধরেন। তিনি তালেবানকে স্বরণ করিয়ে দেন, ক্ষমতায় বসার পর তালেবানের এখন কূটনীতিক দপ্তরগুলো রক্ষা করার দায়বদ্ধতা তৈরি হয়েছে।

তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির মুত্তাকি খান অঙ্গীকার করেছেন, নতুন তালেবান সরকার প্রতিবেশী কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে না।

আফগানিস্তানে ‘ভুল নীতি’র জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে বৈঠকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী  মানবাধিকার বিবেচনায় আফগানদের সহায়তা করতে যুক্তরাষ্ট্রকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

এছাড়াও বৈঠকে ইরানি মাটিতে অবস্থানরত ১০ লাখ আফগান শরণার্থী সংকট নিরসন এবং ইরান-আফগান ব্যবসা সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে আলোচনা হয়েছে।

এদিকে এক প্রেস রিলিজে কাবুল জানিয়েছে, তালেবান সরকার ইরানসহ প্রতিবেশি দেশগুলোয় তাদের দূতাবাসে কূটনীতিক নিযুক্ত করতে যাচ্ছে। যেসব দেশ বর্তমানে কাবুলে তাদের দূতাবাস চালু রেখেছে, আপাতত এই তালিকায় সেসব দেশের নাম রয়েছে। দেশ ছয়টি হচ্ছে: ইরান, চীন, পাকিস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও কাজাখস্তান।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com