২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১১ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৭ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

এখনো বাড়েনি আইসিইউ সক্ষমতা

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : চিকিৎসা সেবায় আইসিইউ যে একটি অতীব জরুরি বিভাগ, করোনা মহামারি সেটি আমাদের সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউর সংকট প্রকট। দেশের ৪২টি জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ নেই। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আইসিইউ তো দূরের কথা, হাইফ্লো অক্সিজেন সরবরাহেরও কোনো ব্যবস্থা নেই।

আইসিইউর অভাবে সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে অনেক রোগী মারা যাচ্ছে। উপজেলা পর্যায়ে একজন রোগীর আইসিইউর প্রয়োজন হলে তাকে পাঠানো হচ্ছে বিভাগীয় হাসপাতাল কিংবা রাজধানীতে। এতে রোগী সঙ্গে সঙ্গে আইসিইউ সাপোর্ট পাচ্ছে না। আর আইসিইউ রোগীকে আইসিইউ ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসাসেবা দিতেই হবে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের অনেক রোগী আইসিইউ সাপোর্ট পাওয়ার জন্য বিভাগীয় হাসপাতাল কিংবা রাজধানীর হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।

করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর অনেক দেশ আইসিইউ সক্ষমতা বাড়াতে পারলেও এক বছরেরও বেশি সময় পেলেও দেশে বাড়েনি আইসিইউ সক্ষমতা। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা কার্যকর করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী গত বছরের জুনে একনেকের বৈঠকে সারা দেশে সব জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ চালুর নির্দেশ দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হাইফ্লো অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। কিন্তু এক বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও ৪২ জেলা সদর হাসপাতালে কেন আইসিইউ স্থাপন করা হয়নি, উপজেলা সদর হাসপাতালে কেন অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়নি, তার কোনো সদুত্তর দিতে পারছেন না স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী কিংবা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হাসপাতালে আগত রোগীদের মধ্যে ৫ থেকে ১০ ভাগের আইসিইউর প্রয়োজন হয়। এ কারণে ১০০ বেডের হাসপাতালের জন্য ৫ থেকে ১০ বেডের আইসিইউ থাকা অত্যাবশ্যকীয়। আর ৫০ বেডের হাসপাতাল হলে ৩ থেকে ৫ শয্যার আইসিইউ থাকতেই হবে। অর্থাৎ হাপসাতালে আইসিইউ থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু দেশের অনেক সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ নেই। দু-একটি নামিদামি বেসরকারি হাসপাতাল ছাড়া অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতালেও আইসিইউ নেই। আবার কিছু হাসপাতালে থাকলেও কাজ করে না। রোগীকে জিম্মি করে অর্থ আদায় করে অনেক বেসরকারি হাপসাতাল।

সারা বিশ্বে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ ভাগ সুস্থ হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের দেশে আইসিইউতে চিকিৎসাধীনরোগীদের মৃত্যুর হার বেশি। এর একটাই কারণ, আইসিইউতে আসার আগেই রোগীর অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে যায়। জেলা-উপজেলা পর্যায় থেকে রোগীকে রাজধানীতে আসতে তো সময় লাগবেই। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলা করতে গিয়ে আইসিইউর জন্য রীতিমতো হাহাকার চলছে। সামনে যদি করোনার তৃতীয় ঢেউ আসে, তাহলে পরিস্থিতি হবে ভয়াবহ। আইসিইউর অভাবে যেখানে-সেখানে রোগীর লাশ পড়ে থাকবে। তাই সময় থাকতে ব্যবস্থা নিতে হবে।

সারা দেশে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে যে জনবল আছে তাদের স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ দিয়ে সব জেলা সদর হাসপাতাল ও সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দ্রুত আইসিইউ চালু করতে হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিসিন কনসালট্যান্ট, এনেসথেসিওলজিস্ট, গাইনি কনসালট্যান্টসহ সব বিভাগের ডাক্তারের পদ রয়েছে। সেখানে ৮/৯ জন সিনিয়র স্টাফ নার্সও নিয়োজিত থাকেন। শূন্য পদ দ্রুত পূরণ করে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দ্রুত আইসিইউ স্থাপন করা যায়।

দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ সরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সরকারি হাসপাতালের কোথাও আইসিইউ মিলছে না। আইসিইউয়ের জন্য লম্বা লাইন। কিন্তু আইসিইউয়ের রোগীকে সময়মতো আইসিইউতে না রাখতে পারলে মৃত্যু অবধারিত। এই বিষয়টি যাদের দেখার দায়িত্ব, তারা যেন কিছুই দেখেন না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের এক শ্রেণির কর্মকর্তা এক্ষেত্রে ফাইল আটকে রাখেন। এনেসথেসিওলজিস্টদের পক্ষ থেকে আইসিইউ বাড়ানো ও জনবল নিয়োগের জন্য কয়েক দফা প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি।

কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের এক শ্রেণির কর্মকর্তা আইসিইউ বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেন না। এটা ইচ্ছা করে কি না জানি না। তবে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে যোগ্য লোকের অভাব রয়েছে। অনেক কর্মকর্তা তদবিরে কিংবা অর্থের বিনিময়ে সেখানে গেছেন।

অনভিজ্ঞ লোক গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন। আর নন-মেডিক্যাল পার্সনরা বিষয়টি বোঝেন না বলে গুরুত্ব দেন না। অথচ আইসিইউ সক্ষমতা বৃদ্ধি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে চিকিত্সাসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সবার আগে স্বাবলম্বী হওয়া উচিত বলে তারা পরামর্শ দেন। এনেসথেসিওলজিস্টদের পাশাপাশি মেডিসিনের ডাক্তারদের প্রশিক্ষণ দিয়েও উপজেলা পর্যায়ে আইসিইউ পরিচালনা করা যায়। শুধু ইচ্ছা থাকার প্রয়োজন। বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশনা আসতে হবে।

সারা দেশের কোথায় আইসিইউ ঘাটতি রয়েছে, দ্রুত আইসিইউ সম্প্রসারণ কীভাবে করা যায় এসব বিষয় নিয়ে শনিবার করোনা মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদ উল্লাহর নেতৃত্বে একটি অনলাইন মিটিং হয়েছে। মিটিংয়ে অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদ উল্লাহ সারা দেশে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে দ্রুত আইসিইউ সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সরকারকে তাগিদ দিয়েছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হাইফ্লো অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করারও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

ঐ অনলাইন মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশ সোসাইটি অব এনেসথেসিওলজিস্টের সভাপতি অধ্যাপক ডা. দেবব্রত বণিক। তিনি বলেন, আইসিইউ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব মূলত পালন করে থাকেন এনেসথেসিওলজির ডাক্তার। ৫০০ এনেসথেসিওলজি ডাক্তার নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছি। কিন্তু সেই প্রস্তাব বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে আইসিইউ স্থাপন জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইসিইউয়ের চিকিত্সা আইসিইউ ছাড়া সম্ভব না। আইসিইউয়ের সাপোর্ট প্রয়োজন হলে সঙ্গে সঙ্গেই আইসিইউতে নিতে হবে।

সোসাইটি অব মেডিসিনের সাধারণ সম্পাদক ও মুগদা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর বলেন, সময়মতো আইসিইউ সাপোর্ট না পেয়ে অনেক রোগী মারা যাচ্ছে। হাসপাতাল মানেই আইসিইউ থাকতে হবে। জেলা-উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত দ্রুত আইসিইউ চালু করতে হবে।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com