২৪শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৯ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৩ই জিলহজ, ১৪৪২ হিজরি

এ ‘মিথ্যে’ আর নয়

এ ‘মিথ্যে’ আর নয়

নাসরীন মুস্তাফা : ভাংতি হবে? রিক্সাভাড়া দিতে পারছিলেন না তিনি। রিক্সাওয়ালাও বাকি টাকাটা ভাংতি করে ফেরত দিতে পারছেন না। অফিসের সামনে এই সময় প্রচুর ভিড় থাকে, দাঁড়ানোর ফুরসত নেই কারোর। অগত্যা রিক্সা থেকে নেমে পড়লেন তিনি। দু’ কদম হেঁটে দেখলেন পাশের ফুটপাতের ওপর ঘুমন্ত সন্তান কোলে নিয়ে ভিক্ষা করছে এক নারী। ভাংতি চাইলে কোনো কথা না বলে টাকাটা ভাংতি করে দিল। রিক্সাওয়ালার ভাড়া পরিশোধ করা হলো। ভিক্ষুক মহিলাকে কিছু টাকা দিয়ে খুব খুশি তিনি। ইহকালের জন্য দারুণ একটা কাজ করে ফেলেন দিনের শুরুতেই।

ব্যক্তিগত পর্যায়ে পুণ্য অর্জনের ইচ্ছেকে পুঁজি করে ভিক্ষাকে ব্যবসা হিসেবে দাঁড় করিয়ে ফেলেছে শক্তিশালী একটি চক্র। এদের বিস্তৃত ফাঁদে পা দিয়ে ভিক্ষুক হতে বাধ্য হচ্ছে দুর্বল চিত্তের নারী-পুরুষ। হারাচ্ছে সম্মান, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পর্যন্ত। শিশুদের কথা বলি বিশেষভাবে। মানুষের সহানুভূতি বেশি বেশি পাওয়ার আশায় নারী ভিক্ষুকের কোলে শিশু রাখাটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। এই শিশুদের বেশির ভাগই কোলে উঠে কোল থেকে নেমে যেতে চায়। আশ্চর্যজনকভাবে এরা অতি শান্তভাবে কোলেই থাকে, বলা যায় ঘুমিয়েই থাকে। শিশু কেন চাঞ্চল্য হারিয়ে কেবল ঘুমিয়ে থাকে ভিক্ষুক নারীর কোলে? এ নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। ভিক্ষাচক্রে জড়িয়ে পড়া সন্ত্রাসী আর নিষ্ঠুর মানুষগুলো শিশুদেরকে মাদকের নেশায় ঘুম পাড়িয়ে দেয়, এ কথা আমরা জানি। গরিব মা-বাবা সামান্য কিছু টাকার লোভে সন্তানকে ভিক্ষুক নারীর কাছে ভাড়া দেন দিন হিসেবে। সন্তানটি যে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, এ নিয়ে মাথাব্যথা নেই? সামাজিক এই বাস্তবতার জবাবে কেউ হয়তো বলবেন, ওরা আর কী করবে? পেটে খিদে থাকলে মানুষ কী না করে!

কথাটা ঠিক। পেটে খিদে থাকলে মানুষ অনেক কিছুই করে। দুই পা নেই, তবুও ফুটপাতে পত্রিকা সাজিয়ে বসে থাকা তরুণ রহমত কিন্তু পেটের জ্বালাতেই কাজ করছে। দুই হাত নেই, দুই পা নেই, মুখে কলম নিয়ে পরীক্ষায় ব্যস্ত ছোট্ট শিশুর ছবি দেখেছিলাম কয়েক দিন আগে। লেখাপড়া শেখার অদম্য আগ্রহ ওর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে মায়ের কোলে চড়ে গিয়েছিল অচল পায়ের হৃদয়। মানুষ হওয়ার স্বপ্নে বিভোর এই মুখগুলোতে হাত-পা না থাকলেও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছা পবিত্র আলোয় ঝলমল করে ওঠে। বড়ো হতে চায়, পরিবারের দুঃখ ঘোচাতে চায় শারীরিকভাবে অচল মানুষরাও। এই চাওয়াটাই স্বাভাবিক। দারিদ্র্য প্রথমে বাসা বাঁধে মনে। কারোর মনের ভেতর যদি হাত পাতার অভ্যাস গেঁথে যায়, সে মিথ্যে দারিদ্র্য থেকে বের হতে পারবে না।

একজন মন্ত্রী একবার বলেছিলেন, ‘দেশে কোনো ভিক্ষুক নেই। শহরের রাস্তাঘাটে কিছু ভিক্ষুক দেখতে পাবেন। এরা স্বভাবগতভাবে ভিক্ষুক। এদের রাজবাড়ি বানিয়ে দিলেও ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়বে না। তাদের পেশাই হলো ভিক্ষাবৃত্তি।’ কথাটা কী পুরোপুরি মিথ্যা। ছয় তলা ভবনের মালিকও ভিক্ষা করে বলে মাঝে মাঝে গণমাধ্যমে খবর এসেছে।

ব্যক্তিগতভাবে এই সমাজের একজন সচেতন সদস্য হিসেবে স্বভাবগত ভিক্ষুকদেরকে নিরুৎসাহিত করা আমার আপনার আমাদের কাজ। ভিক্ষার হাতকে কাজের হাতে পরিণত করার উপায় কী? হাত পাতার পরও যদি আমি আপনি আমরা কখনোই ভিক্ষার সামান্য কড়ি না দিতাম, তবে কী হতো? ভিক্ষাবৃত্তি নিরুৎসাহিত হতো। ভিক্ষুকের আশপাশে পাহারায় থাকা সন্ত্রাসীচক্র নিরুৎসাহিত হতো। ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ হলে বেঁচে যেত অসহায় নারী ও পুরুষ। চোখ হারাতে হতো না। হাত-পা ভেঙে পথে পড়ে থাকতে হতো না। আর শিশুদেরকেও ঘুমিয়ে থাকতে হতো না মিথ্যে মায়ের কোলে।

রাষ্ট্রীয়ভাবে কী কিছুই হচ্ছে না ভিক্ষাবৃত্তিকে বন্ধ করার জন্য? ‘ভিক্ষার থালা পেতে নয়, মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাই’- বর্তমান সরকারের এই স্পষ্ট ঘোষণা বার বার উচ্চারিত হচ্ছে, যা আশার আলো দেখায়। ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছিলেন, ভিক্ষুক ও ছিন্নমূল মানুষদের সরকারের তরফ থেকে বিনা খরচে পুনর্বাসন করা হবে। যদিও ২০১০ সাল থেকেই সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে ‘ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান’ শীর্ষক কর্মসূচি পরিচালনা করছিল। কেননা, ঐ বছরে ‘শিশুর অঙ্গহানি করে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করা’ শিরোনামে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর উচ্চ আদালতে ভিক্ষাবৃত্তির বিরুদ্ধে রিট করা হয়। এর প্রেক্ষিতে রাজধানীসহ দেশের সব স্থানে শিশু ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

‘ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান’ কর্মসূচির আওতায় ঢাকা শহরে ১০টি বেসরকারি সংগঠনের সহায়তায় ভিক্ষুক জরিপে ১০ হাজার ভিক্ষুকের ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করে ডাটাবেজ তৈরি করা হয়। এদের মধ্যে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু ভিক্ষুকের সংখ্যা ছিল ১০ শতাংশ। ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীকে পুনর্বাসন ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদেরকে আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরপরই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পসহ অন্যরাও কর্মসূচি হাতে নিতে থাকে। আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের ‘যার জমি আছে ঘর নাই তার নিজ জমিতে ঘর নির্মাণ’ উপখাতের আওতায় ভিক্ষুকরা ঘর পাচ্ছে, পুনর্বাসিত হচ্ছে। তবে কথা আছে, চরিত্রগত ভিক্ষুকদের অনেকের ক্ষেত্রেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েও সফল হওয়া যায়নি। কোনো কোনো জেলার পুনর্বাসিত ভিক্ষুকদের বেশির ভাগই রিকশা, ভ্যান বিক্রি করে পুনরায় ঢাকায় চলে এসেছে। আবার কোনো কোনো জেলায় পুনর্বাসনকৃত স্থানীয় ভিক্ষুকগণ রিকশা, ভ্যান ও সরবরাহকৃত পুজিঁ ব্যবহারের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছে। সিটি কর্পোরেশনের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ঢাকা শহরের কিছু এলাকাকে ভিক্ষুকমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে ভিক্ষুকমুক্ত এলাকার আওতা আরও বৃদ্ধি করা হবে বলে চেষ্টা অব্যাহত আছে। ভিক্ষুকমুক্ত হিসেবে ঘোষিত এলাকাসমূহে ভিক্ষাবৃত্তি না করার জন্য ২/১ দিন পর পর নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে, নির্দিষ্ট সময় অন্তর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা, এর মাধ্যমে প্রাপ্ত ভিক্ষুকদেরকে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানোর চেষ্টাও কিন্তু আছে। প্রতিষ্ঠানে থাকাকালীন তাদেরকে বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ এবং পুনর্বাসন করা হয়।

ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধে ভিক্ষুককে পুনর্বাসিত করার উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করা নিষ্ঠুর চক্রটিকে আইনের আওতায় আনার পদক্ষেপও দরকার। নইলে ভিক্ষকমুক্ত সমাজ গঠনের মধ্য দিয়ে রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। চক্রটিকে হতোদ্যম করার জন্য ব্যক্তি পর্যায়ে আমার আপনার আমাদের ভিক্ষা প্রদানে নিরুৎসাহিত হওয়াটাও কিন্তু খুব জরুরি। সাহায্য এমন হতে হবে, যাতে সাহায্যপ্রার্থীকে আর সাহায্য চাইতে না হয়- এই নিয়ম যাকাতের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। পুণ্য অর্জনের জন্য সেভাবেই সাহায্য দিতে হবে, যাতে সাহায্য যাকে দেওয়া হলো, তিনি নিজেই পরবর্তীতে অন্যকে সাহায্য করার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেন। খুচরা পাঁচ-দশ টাকা বা ভাংতি করা টাকা থেকে কিছু অংশ দিয়ে তো আর সেই নিয়ম প্রতিষ্ঠিত হয় না। ‘মিথ্যে’ দানসদকা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসাটা জরুরি।

লেখক : কলামিস্ট
১২.০৩.২০১৯

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com