২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১১ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৭ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

কওমী অঙ্গনে অস্থিরতা কেন?

ফাইল ছবি

  • আমিনুল ইসলাম কাসেমী

কয়েকবছর ধরে কওমী অঙ্গনে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। এরকম প্রতিকুল পরিবেশ আর কোনদিন হয়নি। বিশেষ করে আল্লামা আহমাদ শফী (রহ.) এর জীবনের শেষ বছর এবং তাঁর মৃত্যু পরবর্তি সময়ে কওমী অঙ্গনের উপর দিয়ে যেন টর্নেডো বয়ে যাচ্ছে, এখনো পর্যন্ত তার রেশ কাটেনি। ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে এখনো সেই বিশৃংখলা সৃষ্টিকারীদের দোসরেরা ওঁৎ পেতে থাকে। সুযোগ বুঝে তারা কওমী অঙ্গনে জঞ্জাল তৈরীর পাঁয়তারা করে বেড়ায়। ওরা সহজেই যেন ক্ষ্যান্ত হয় না।

কওমীতে ঘাপটি মেরে বসে থাকা একটি চক্র বারবার তারা নানান ফন্দি এঁটে যাচ্ছে। একেক সময় একেক ধরনের আওয়াজ তুলে পরিবেশ ঘোলাটে করে ফেলে। ভিত্তিহীন কথা আবিস্কার করে প্রচার করতে থাকে। যে সমস্ত কথার কোন আগা-মাথা নেই, সেসমস্ত বোল দিয়ে মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়ায় এবং সেটাকে ভিন্ন লাইনে নিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা করতে থাকে।

এরকম ভাবে নানান সমস্যা সৃষ্টি করে কওমী অঙ্গনে অস্থিরতা তৈরী করছে। যে বিষয় নিয়ে কোনদিন কল্পনা আসে নি, সে বিষয় নিয়েও আজ অস্থিরতা। নিম্নে অস্থিরতার ধরণগুলো উল্লেখ করা হচ্ছে-

এক. প্রথমে ষড়যন্ত্রকারীরা কওমী অঙ্গনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান ‘বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া’কে নিয়ে ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। বেফাকের মুরুব্বীদের শানে সত্য-মিথ্যার মিশ্রণ ঘটায়ে তাঁদের বিতর্কিত করে ফেলে। বেফাক একটি গুরুত্বপুর্ণ প্রতিষ্ঠান। দেশের  আশিভাগ কওমী মাদ্রাসা বেফাকের অধীনে। সেই বেফাক নিয়ে ওরা যেন ছিনিমিনি খেলতে লাগল। দুস্কৃতিকারীদের সাথে যুক্ত হল কওমীর কিছু অবুঝ সন্তান। আবার কিছু লোকের ইন্ধন তো থাকেই। অনলাইনে-অফলাইনে নানান অভিযোগ তুলে সেসব আলেমদের ধরাশায়ী করতে সক্ষম হয়েছিল। সে যেন এক হুলুস্থুল অবস্থা।

দুই. বেফাকের পরে শুরু হলো হাটহাজারী ইস্যু। আল্লামা আহমাদ শফী (রহ.) তখন জীবিত। তাঁর জীবদ্দশাতেই হাটহাজারীতে এমন বিশৃংখলা তৈরী হলো, যেটা কেউ আশা করেনি। ছাত্রদের উস্কে দিল ষড়যন্ত্রকারীরা। পুরো মাদ্রাসা উস্তাদদের নিয়ন্ত্রণের  বাইরে চলে গেল। যেসব ছাত্ররা উস্তাদদের দেখলে মাথা নিচু করে থাকে, তারাই যেন বেপরোয়া হয়ে গেল। কোন উস্তাদকে আর ইজ্জত দিল না তারা। এমনকি  আল্লামা আহমাদ শফী (রহ.) যিনি পুরো বাংলাদেশের আলেম এবং দ্বীনদার মানুষের সেরেতাঁজ ছিলেন, তাঁর উপরেও হামলে পড়ে। অর্থাৎ বেপরোয়া ছাত্ররা হুজুরের কামরা ভাঙচুর করে। মাদ্রাসার জানালা-দরজা এবং বিভিন্ন আসবাব পত্রসহ ভবনের ক্ষতি সাধন করে। একটা ঘৃণ্যতম ইতিহাস সেটা। কওমী মাদ্রাসার ইতিহাসে এরকম জঘন্যতম কাজ মনেহয় আর হয়নি। আজ পর্যন্ত কোন শিক্ষার্থী এমনটি করার সুযোগ পায়নি। কিন্তু ঐ সকল ষড়যন্ত্রকারীদের দ্বারা এরকম অস্বস্তিমুলক কার্যকলাপ সম্ভব হয়েছে।

তিন. হাটহাজারীর পরে শুরু হয়েছে  হেফাজতের অস্থিরতা। হেফাজতের সাথে বাংলাদেশের কওমী অঙ্গনের অধিকাংশ আলেম কমবেশী জড়িত।  আবার অবস্থাটা এমন সৃষ্টি করা হয়েছিল, কওমীর কেউ যেন হেফাজত থেকে খালি নয়। কিছু লোক তো কায়দা কৌশল করে প্রায় অধিকাংশ আলেমকে হেফাজতে ঢুকিয়ে ফেলেছিল। বড় আফসোসের বিষয় ছিল, এই হেফাজতের ষ্টিয়ারিং চলে গেল কিছু অপরিণামদর্শি লোকের হাতে। যারা অন্য কারো দ্বারা প্রভাবিত। এরকম কিছু মানুষ হেফাজতে ভিন্ন রঙ লাগিয়ে, রাজনৈতিক ইস্যু সৃষ্টি করে হেফাজতকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলল তারা। আল্লামা আহমাদ শফী (রহ.) যে মেজাজ নিয়ে হেফাজত গঠন করেছিলেন, তার কোন কিছু বাকি রইল না। মনে হতে লাগল, এরা যেন ভিন্ন কোন রাজনৈতিক দলের বি টিম।

আবার  কিছু হেফাজতী নেতা কওমী মাদ্রাসার বিভিন্ন প্রোগ্রামে তারা মানুষকে হুমকি-ধমকি দেওয়া শুরু করে দিল। এমনকি কোন বুজুর্গের ইন্তেকালের পরে তাঁর শোক সভায় গিয়ে ভারাক্রান্ত দিল না দেখিয়ে সেখানে মানুষের সামনে উস্কানীমুলক বক্তৃতা দিতে দ্বিধা করেনি। পুরো বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলোকে  হাটহাজারী মাদ্রাসার মত অস্থির পরিবেশ বানানোর হুমকিও তারা দিয়েছে।

চার. ওয়াজ মাহফিলকে কেন্দ্র করে আরেক অস্থিরতা তৈরী হয়েছিল। কিছু লোক ওয়াজ মাহফিলে ওয়াজ না করে সেখানে তাদের বিপক্ষের লোকদের  ধোলাই দেওয়া যেন তাদের মাকসাদ ছিল। কেউ যদি ওসব বক্তার মতের খেলাফ হয়েছে, তাকে ওয়াজের ষ্টেজে বসে সাইজ করা হয়েছে। আবার এমন ভাষা,  এমন শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে, যেটা বর্ণনা করা যায় না।

পাঁচ. হেফাজতের হরতাল আরেক বড় অস্থিরতা। কওমী মাদ্রাসার পরীক্ষা সামনে, কিন্তু কোন তোয়াক্কা নেই। প্রথমে মোদি বিরোধী আন্দোলন। ছাত্রদের মাঠে নামিয়ে মিছিল-মিটিং। এরপর আবার হরতাল। সহিংস ঘটনা ঘটল হরতালে। বহু ছাত্র হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। গ্রেফতার হয়েছে বেশুমার আলেম এবং মাদ্রাসার নিরীহ ছাত্র।

ছয়. হরতাল শেষ হয়ে গেলে ঘটল রিসোর্ট কাণ্ড। যদিও এটা ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু এর আছর গিয়ে পড়েছে কওমীতে। কেননা, যিনি এই ঘটনার নায়ক, তিনিতো কওমীর হাইব্রীড নেতা। খুব তাড়াতাড়ি বড় নেতা হয়ে গিয়ে ছিলেন। সেই ব্যক্তির নিজস্ব ব্যাপার হলেও জবাবদিহী করতে হয়েছে পুরো বাংলাদেশের আলেম সমাজকে।

সাত. গ্রেফতার আতঙ্ক। ঐ হেফাজতের নেতাদের খামখেয়ালীপনা এবং নির্বৃদ্ধিতার কারণে এমন কিছু  কর্মসুচি দিয়েছে তারা, যেটার দ্বারা সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং রাষ্ট্রের সম্পদ বিনষ্টের কারণ হয়েছে। এজন্য সরকার  অপরাধী এবং সহিংসতায় জড়িত কিছু লোককে গ্রেফতার শুরু করে, যে লিষ্টে বহু আলেম এর নাম যুক্ত হয়েছে। অনেক আলেম-উলামা গ্রেফতার হয়েছেন। কিন্তু সমস্যটা হলো, পুরো বাংলাদেশের আলেমগণ যেন আতঙ্কে রয়েছেন। ইচ্ছাতে হোক আর অনিচ্ছায় হোক, সকলের মধ্যে অস্থিরতা কাজ করছে।

আট. আবার ষড়যন্ত্রকারীরা বেফাকের দিকে কুদৃষ্টি দিয়েছে।বেফাকের নতুন কমিটি। অত্যন্ত সুন্দর ভাবে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু ওরা আবার ফাসাদ তৈরী করে যাচ্ছে। এখন আমাদের বেফাকের চেয়্যারম্যান সাহেবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। অনলাইনে মিথ্যা রটনা করে আবার অস্থির পরিবেশ কায়েম করতে চাচ্ছে।

এভাবে বহু পয়েন্ট আছে। যেসব কারণে আজ কওমী অঙ্গনের  বহু আলেম- উলামা আতঙ্কে। মাদ্রাসাগুলো বন্ধ। কোন শান্তি যেন পাচ্ছেন না। অনেক উলামায়ে কেরামের অর্থ সংকট যাচ্ছে। যেহেতু প্রতিষ্ঠান বন্ধ, বেতন-ভাতা যথা নিয়মে কেউ পাচ্ছেন না।

কি কারণে এসব অস্থিরতা:

ক. ছাত্রদের আদব-আখলাকে ঘাটতি। বহু শিক্ষার্থী এখন উস্তাদকে ইজ্জত-সন্মান করতে চান না। যার কারণে ছাত্ররা এখন আর মুরুব্বীদের নেক নজরে নেই।

খ. ছাত্ররা মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে। ইন্টারনেট, ইউটিউব, ফেসবুকে পড়ে থাকছে সারাক্ষণ। ফেসবুকের দ্বারা বাতিল মতাদর্শের লোকদের সাথে উঠাবসায়  মুরুব্বীদের প্রতি মহব্বত ভালবাসা হারাচ্ছে। বহু শিক্ষার্থীর মোবাইল ব্যবহার করে নৈতিক চরিত্রে অধঃপতন নেমে এসেছে।

গ. বাতিল সংগঠনের প্রভাব পড়েছে কওমী মাদ্রাসায়। যেসব সংগঠন আহলুস ওয়াল জামাতের দৃষ্টি ভঙ্গি লালন করে না, বরং নবী ও সাহাবাদের সমালোচনা করে, ঐ সব সংগঠনের কর্মিদের সাথে মিশে এরাও ঐরকম হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ফেরাকে বাতেলার সাথে নির্বাচনী ঐক্য হওয়ার পর থেকে তাদের সাথে  আমাদের সন্তান এবং নবীন আলেমদের মেলামেশায় ওদের সিফাতগুলো এদের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে।

ঘ. ছাত্রদের আত্মশুদ্ধির মেহনত নেই। আগে প্রতিটি মাদ্রাসা যেন পীরের খানকা। যেখানে তালিমের পাশাপশি ইসলাহে নফসের ট্রেনিং দেওয়া হত। আর এখন পীরের কথা বললে ঠাট্রা করে থাকে।

ঙ. ছাত্রদের পাশাপাশি বহু মাদ্রাসার উস্তাদদের ইসলাহী প্রশিক্ষণ নেই। যার কারণে সমস্যাটা আরো প্রকট হচ্ছে।

উত্তরণের উপায়:

অস্থিরতা থেকে উত্তরণের উপায়, যে কারণগুলো বলা হলো, ঐ বিষয় থেকে ফিরে আসতে হবে। ছাত্ররা যেন বেয়াদব না হয় সে সব বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। অধিকাংশ ছাত্র বেয়াদব হয় কিছু উস্তাদদের কারণে। তাঁদের খামখেয়ালীপনা এবং গাফলতে ছাত্র বেয়াদব হয়ে পড়ে। মাঠে, ময়দানে যাকে তাকে হুমকি ধমকি দেওয়া এটা কিন্তু ছাত্রদের উপর আছর পড়ে। ঐসব চরিত্র থেকে উস্তাদ এবং মুরুব্বীদের ফিরে আসতে হবে।

আরও পড়ুন: যথা নিয়মেই এগিয়ে চলছে বেফাক ও হাইয়াতুল উলইয়া

বাতিল সংগঠনের সঙ্গ ত্যাগ করা জরুরী। এক সময় কওমীর ছাত্ররা মওদুদীবাদের উপর বিস্তর লেখাপড়া করত। উস্তাদগণ সে ব্যাপারে তথ্য দিয়ে ছাত্রদের সহযোগিতা করতেন। প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে মওদুদীবাদের বিরুদ্ধে বিতর্কানুষ্ঠান হতে দেখা গেছে। কিন্তু আমাদের মুরুব্বীগণ যখন রাজনৈতিক ঐক্য করলেন ঐ মওদুদীবাদী সংগঠনের সাথে, তখন থেকে যেন কওমীতে আর মওদুদীবাদের বিরুদ্ধে তেমন আর গবেষণা হয় না। এজন্য ওদের সঙ্গ ত্যাগ করে হক হক্কানিয়্যাতের উপরে চলতে হবে।

হক কে হক হিসাবে আমাদের জানতে হবে এবং বাতিলকে বাতিল বলে চিনতে হবে। প্রতিটি মাদ্রাসায় এখন খানকার রুপ কায়েম করুন। তথা আমল-আখলাকে উন্নতি ঘটানো জরুরী।

আপাতত অন্য কোন সব ফিকির বাদ দিয়ে তালিমের দিকে ঝুকে পড়া উচিত। বিশেষ করে ছাত্র এবং উস্তাদদের কথা বলছি। আগে মানুষ বানান। পরিবেশ শান্ত করুন। আল্লাহ আমাদের উপর রহম করুন। আমিন।

লেখক: শিক্ষক ও কলামিষ্ট

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com