আমিনুল ইসলাম কাসেমী : যে যাই বলুক, আল-হাইআতুল উলইয়া লিল-জামিআতিল কওমীয়া বাংলাদেশ ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ যথা নিয়মেই এগিয়ে চলেছে। আমাদের কওমী বোর্ড নিয়ে যারা বিরুপ মন্তব্য করছেন, নানান সমালোচনায় জর্জরিত করছেন, তারা কেউ কওমী অঙ্গনের কল্যাণকামী নয়। সত্যি, তারা যদি কওমীর বন্ধু হতেন, তাহলে তারা এধরনের অনাকাঙ্খিত মন্তব্য করতেন না।
বর্তমানে যারা বেফাক এবং হাইয়াতুল উলইয়ার দায়িত্বশীল, তাঁরা অনেকটা চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় দায়িত্বগ্রহণ করেছেন। তাঁদের দায়িত্বগ্রহণ করার আগে বেফাক-হাইয়াতুল উলইয়ার কি অবস্থ ছিল সেটা কারো অজানা নয়। এক শ্রেণীর লোকেরা অনলাইন-অফলাইনে আমাদের শিক্ষাবোর্ড এবং তাঁর কর্মকর্তাদের বিতর্কিত করে ফেলেছিল। পুরো দেশ জুড়ে চলছিল সমালোচনা। এমনই নাজুক পরিস্থিতিতে আমাদের সর্বোচ্চ ওলামায়ে কেরামের পরামর্শে এবং তাদের সমর্থনে বর্তমান কমিটি গঠন হয়। এমন নয় তাঁরা নিজ ইচ্ছায় দায়িত্ব নিয়েছেন বা কোন লবিং করে বেফাক-হাইয়ার দায়িত্বগ্রহণ করেছেন। সম্পুর্ণ নিঃস্বার্থ ভাবে, দ্বীনি মাদ্রাসাগুলোর কল্যাণের উদ্দেশ্যে তারা দায়িত্বগ্রহণ করেন।
তাঁরা এপদে এসেই খ্যাতি লাভ করেননি বা এপদ পেয়ে দেশ সেরা হয়ে ওঠেননি, বরং তাঁরা অনেক আগে থেকেই খ্যতিমান এবং সন্মানি ব্যক্তিত্ব। একথা বলা যেতে পারে, তাঁরা এপদে এসে এই জায়গাটার আরো রওনক বৃদ্ধি পেয়েছে। কওমী শিক্ষাবোর্ড আরো সামনে অগ্রসর হচ্ছে।
অনেকে প্রশ্ন তুলছেন হাইয়াতুল উলইয়া এবং বেফাকে রাজনৈতিক কিছু নেতা এবং নিজস্ব লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে স্বজনপ্রীতি চলছে। এসব অভিযোগ তুলে হাইয়াতুল উলইয়ার মহান মুরুব্বীকে হেনেস্থা করা হচ্ছে। নানান সমালোচনার ঝড় তোলা হচ্ছে। কিন্তু বিষয়টা কতটা সঠিক সেটা যাচাই-বাছাই করা দরকার। রাজনৈতিক কোন নেতা বেফাক-হাইয়াতুল উলইয়াতে এই প্রথম নাকি এর আগে কখনো রাজনৈতিক নেতা ছিল। বর্তমান চেয়্যারম্যান সাহেব তিনি নিজে এই প্রথম কোন রাজনৈতিক নেতা নিয়ে আসলেন নাকি আগে ছিল।
আসলে বিষয়টা যাচাই করলে দেখা যায়, এই প্রথম নয়, এটা নতুন নয়, এর আগেও বেফাক-হাইয়াতুল উলইয়ার পদে ডজন ডজন রাজনৈতিক নেতা আমরা দেখেছি। আর বর্তমানেও বহাল তবিয়তে রয়েছেন। বেফাক এবং হাইয়্যার যে নিয়মনীতি রয়েছে, তাতে সভাপতি এবং সেক্রেটারী ছাড়া বাকী পদগুলোতে রাজনৈতিক কোন ব্যক্তি আসাতে বাঁধা নেই। এখানে যাদেরকে নতুন ভাবে পাঁচটি বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সেটাতো কোন সভাপতি এবং সেক্রেটারীর দায়িত্ব নয়। আর অন্য ব্যক্তিগণ যদি রাজনৈতিক নেতা হওয়ার পরেও দায়িত্ব থাকতে পারে, তাহলে মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ সাহেব এবং মাওলানা নেয়ামাতুল্লাহ আল ফরিদী সাহেবের সমস্যাটা কোথায়?
বলা হচ্ছে, ওনারা চরমোনাই করেন, এটাই নাকি বড় সমস্যা। আচ্ছা, চরমোনাই ওয়ালারা কি মানুষ নয়? তাদেরকে কোন পদে থাকার অধিকার নেই? অন্যান্য দলের নেতারা যদি বেফাক-হাইয়াতুল উলইয়ার পদে থাকতে পারে, তাহলে চরমোনাই সমর্থিত কোন আলেম থাকতে পারাটা দোষের কিছু নয়। স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তোলা হচ্ছে বর্তমান চেয়্যারম্যান সাহেবের প্রতি। তিনি নাকি স্বজন প্রীতি করেছেন এসব আলেমদের নিয়োগের ক্ষেত্রে।
প্রথমে বোঝা দরকার স্বজনপ্রীতি কাকে বলে? আসলেই তিনি স্বজনপ্রীতি করেছেন নাকি যোগ্য কোন লোককে যথা স্থানে বসিয়েছেন। বিজ্ঞজনদের বক্তব্য হলো, অযোগ্য,অথর্ব কোন লোককে এমন পদে বসানো যেটার যোগ্য তিনি নন। এমন লোককে যদি পদে দেওয়া হয়, তাহলে তাঁকে স্বজনপ্রীতি বলা যেতে পারে। আরবীতে একটা প্রবাদ বাক্য আছে, ‘ওয়াজ উশ শাইয়্যে ফি গাইরে মাহাল্লিহি জুলমুন’ অর্থাৎ যিনি যে পদের যোগ্য নন, তাকে যদি সেখানে বসানো হয়, তাহলে সেটা বড় অন্যায়।
আমরা একটু ভাল করে লক্ষ্য করলে দেখতে পারব, বর্তমান চেয়্যারম্যান সাহেব যে লোকগুলো ঢুকিয়েছেন, তাঁরা কেউ অযোগ্য নয়, বরং তাদেরকে দেশ সেরা আলেম বলা যেতে পারে। মিজানুর রহমান সাঈদ একজন দেশের শীর্ষস্থানীয় মুফতী। এক নামে তাঁকে সকলেই চেনে। মুফতী মুনসুরুল হক সাহেব একজন প্রতিভাবান আলেম এবং বুজুর্গ, এটা সর্বজন বিদিত। মাওলানা জাফর আহমাদ সাহেব একজন খ্যাতিমান বুজুর্গ ও জাঁদরেল আলেম। এমনি ভাবে নেয়ামাতুল্লাহ আল ফরিদী সাহেব একজন তুখোড় মেধাবী আলেম। তাঁর মাদ্রাসা জামিয়াতুস সুন্নাহ, শিবচর, বেফাকের সবচেয়ে সেরা প্রতিষ্ঠান। এক নাগাড়ে বহুবছর ধরে তাঁর মাদ্রাসাটি সবার সেরা মুকুট ধরে রেখেছে। আর মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজু সাহেব তো আগে থেকে বেফাকেই ছিলেন। সুতরাং উক্ত লোকগুলো অযোগ্য নন। আবার তাঁদের প্রতিষ্ঠান যেন-তেন নয়। সুতরাং যে পাঁচজন লোককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সকলেই প্রসিদ্ধ আলেম এবং বুজুর্গ ব্যক্তিত্ব। এখানে অযোগ্য কেউ নেই।
একথা বলা যেতে পারে, এই সকল লোকগুলোকে এতদিন তাঁদের যথাস্থানে রাখা হয়নি। এখন তাদেরকে মুল্যায়ন করা হয়েছে। এটা তাদের প্রাপ্য ছিল। এখানে স্বজনপ্রীতি করা হয়েছে বলাটা সম্পুর্ণ বেমানান, অহেতুক অভিযোগ।
স্বজনপ্রীতি যদি তিনি করবেন তাহলে মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজুকে কেন দায়িত্ব দিলেন? রাজু সাহেব তো বহু বছর ধরে বেফাকে। তিনি তো চেয়্যারম্যান সাহেবের নিয়োগপ্রাপ্ত নন। যদি তাঁর মতলব খারাপ হত, তাহলে মাওলানা রাজুকে রাখতেন না, তাকে বাদ করে দিতেন।
আচ্ছা, চেয়্যারম্যান সাহেব কি এই লোকগুলো ঢুকিয়ে অন্য কাউকে ছাটাই করেছেন? অথবা অন্যকে মাহরুম করেছেন। তাহলে বোঝা যেত অন্যের হক নষ্ট করে নিজের লোক ঢুকিয়ে স্বজনপ্রীতি করা হচ্ছে। এখানে সেসব কিছু করা হয়নি, বরং দেশের কিছু যোগ্য আলেমকে তিনি সম্পৃক্ত করেছেন, যাতে বেফাক-হাইয়্যাতুল উলইয়া সুন্দর মত পরিচালনা করা যায়।
আরেকটা বিষয় মনে রাখা দরকার, এই লোকগুলো উড়ে এসে জুড়ে বসেনি। তাঁরা আগে থেকে বেফাকের সদস্য বা অন্য পদে ছিলেন। বর্তমানে তাঁদেরকে বাড়তি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাও আবার বিনা পারিশ্রমিকে। কোন বেতন-ভাতা নেই।
আরও পড়ুন: খতরনক মুজাহিদ | আমিনুল ইসলাম কাসেমী
দেখুন! তারপরেও এক শ্রেণীর লোক ট্রল করে যাচ্ছেন। বেফাকের মহান মুরুব্বীদের হেনেস্থা করে আমাদের শিক্ষাবোর্ডের মান ক্ষুন্ন করে যাচ্ছে। যেটা খুবই দুঃখজনক। এক শ্রেণীর কওমী মাদ্রাসা বিদ্বেষী মানুষ বিগত বছরে তারা যেমন আমাদের আহলে হক আলেমদেরকে বিতর্কিত করে বেফাক-হাইয়াতুল উলইয়ার চরম ক্ষতির সম্মুখিন করেছিল। বর্তমানে মনে হয় ঐ ধরনের কিছু লোক আবার আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছেন। বিশেষ করে ফেসবুকে আর গণমাধ্যমে তারা বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে।
ওনারা আল্লামা আহমাদ শফী (রহ.) সহ বহু ওলামায়ে কেরামের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছিলেন। আল্লামা আহমাদ শফী (রহ.) এর ইন্তেকালের পরে বর্তমান বেফাক-হাইয়াতুল উলইয়ার নতুন কমিটি গঠনের পর কওমী অঙ্গনে কিন্তু শান্তির সুবাতাস বইছে। আলেমদের ঐক্যবদ্ধ ফ্লাটফরমে দাঁড় করানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, ওরা আবার সেই শান্তির পরিবেশ নষ্ট করতে চায়। তাঁরা আমাদের মুরুব্বীদের বিতর্কিত করে আমাদের কওমী মাদ্রাসার বোর্ডগুলো নষ্ট করার পাঁয়তারা করে যাচ্ছে। এজন্য সাবধান হোন। আমাদের বেফাক ও হাইয়াতুল উলইয়া যথা নিয়মে চলছে। কোন প্রোপাগান্ডায় কান দেওয়া যাবে না। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। আমিন।
লেখক: শিক্ষক ও কলামিষ্ট


