৭ই ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ২২শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ২রা জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

কফি: মুসলিমদের আবিষ্কার | পর্ব- ২

এই প্রবন্ধে সময়কাল অনুযায়ী বিভিন্ন ইসলামি ব্যক্তিদের আবিষ্কারের তালিকা সহজপাঠ্য করে তুলে ধরা হবে। মূলত এটি ‌’১০০১ ইনভেনশনস: মুসলিম হেরিটেজ ইন দ্য ওয়ার্ল্ড‌’ নামক জনপ্রিয় গ্রন্থের ভাবানুবাদ।

মুবাশশির হাসান সাকফি

কফি

পৃথিবীতে একদিনে ১.৬ বিলিয়ন কাপ কফি খাওয়া হয়। এত কফি দিয়ে একটা অলিম্পিকের সমান তিনশ সুইমিং পুল প্রতিদিন ডুবিয়ে দেওয়া সম্ভব। আপনার রান্নাঘরে যদি কফি সত্যিই না থাকে, তাহলে আপনি সংখ্যালঘুদের একজন। কফির মত আন্তর্জাতিক একটি ইন্ডাস্ট্রি এবং যাকে পণ্যমানের দিক থেকে তেল ছাড়া আর কোনো কিছুই পেছনেই ফেলতে পারেনি।

আজ থেকে বারো শত বছর আগে দিনমজুর মানুষদের কফি না থাকায় জেগে থাকার জন্য রীতিমত যুদ্ধ করতে হত। খালেদ নামের এক আরব আবিষ্কার করলেন জীবন পাল্টে দেওয়া এই সাধারণ জিনিসটা। তিনি খেয়াল করলেন তার মেশগুলো যখন ইথিওপিয়ান ঢালগুলোতে ওঠে তখন তারা খুব চাঙ্গা হয়ে ওঠে। এক ধরনের বীজের মত জিনিস খেয়ে খুবই উত্তেজিত হয়ে যায়। এই বীজগুলোকে কাঁচা না খেয়ে নিয়ে যাওয়া হলো, সেদ্ধ করে তৈরি হয়ে গেলা আল কাহওয়াহ (কফি)।

ইয়েমেন সুফিগণ এই আল কাহওয়াহ খেতেন ঠিক আমাদের মতই জেগে থাকার জন্য। যাতে তারা বিনিদ্র রজনী আল্লাহর জিকিরে মনোনিবেশ করতে পারেন। এই কাহওয়াহ পথযাত্রী, হজযাত্রী এবং বণিকদের হাত ধরে পুরো মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে গেল। ১৫শ শতকে মক্কা, তুরস্কে এবং ১৬শ শতকে কায়রো এটি জনপ্রিয় পানীয়রূপে পরিগণিত হল।

(অন্যদিকে রোমানরা শক্তিবর্ধক হিসেবে প্রচুর মদ খেত। সীসার পাত্রে করে মদ খাওয়ায় অনেকেই আস্তে আস্তে বিকলাঙ্গ জন্ম নিতে শুরু করে। আরেকটা শক্তিবর্ধক আবার নিরাময়ক পানীয়ও ছিল। ছাগলের লাদি সংগ্রহ করে রোদে শুকিয়ে ভিনেগার দিয়ে সেদ্ধ করে পান করা হত। – অনুবাদক)

পাসকা রোজি (Pasqua Rosee) নামের এক তুর্কি বণিক প্রথম ১৬৫০ খৃস্টাব্দে যুক্তরাজ্যে কফি নিয়ে আসেন। তিনি লন্ডনের ল্যাম্বর্ড স্ট্রিটের জর্জ ইয়ার্ড এলাকায় একটা কফি হাউজে কফি বিক্রি করতেন। আট বছর পর কর্নহিলে আরেকটা দোকান সুলতানেস হেড নামে চালু করলেন। এখনকার দিনের লয়ডস অব লন্ডন (Lloyds of London), জনপ্রিয় ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, আদতে ছিল একটা কফির দোকান; তার নাম ছিল, ‘এডওয়ার্ড লয়েডের কফি ঘর’।

১৭০০ এর দিকে লন্ডনে প্রায় ৫০০ টি কফির দোকান হয়ে গেল। পুরো ইংল্যান্ডে প্রায় ৩ হাজারটি। এই দোকানগুলোকে মানুষ ‘পেনি ইউনিভার্সিট’ বা এক কড়ির বিশ্ববিদ্যাল বলত, কারণ আপনি এইসব দোকানে আপনি একটা কফির দাম এক পেনি (এক পাউন্ডের ২৪০ ভাগের এক ভাগ দাম) দিয়ে তৎকালীন বড় বড় চিন্তাবিদদের সাথে আলাপচারিতায় যোগ দিতে পারতেন।

ইউরোপে কফি খাওয়া হত মুসলিমদের প্রণালী অনুযায়ী। তখন গরম পানিতে কফির গুঁড়া, চিনি, পানি একসাথে মেশানো হত। ফলে কাপের তলায় কফির তলানি থেকে যেত। তখন তো কফি ছাঁকা হত না। পরে অবশ্য ১৬৮৩ তে নতুন প্রণালী আবিষ্কার হয়ে কফি হাউজগুলোর মনযোগ কাড়ে।

আরও পড়ুন: মুসলিমদের ১০০১ আবিষ্কার | পর্ব- ১

ক্যাপুচিনো (বিশেষ ধরনের কফি) ডি আভিআনো, একজন ক্যাপুচিন সন্নাসী ধারার পাদ্রীর হাত ধরে প্রচলিত হয়। ডি আভিআনো তখন তুর্কিদের সাথে যুদ্ধ করছিলেন ভিয়েনা অঞ্চল ঘেরাও করে। তুর্কিদের প্রস্থানের পর ভিয়েনাবাসীরা তুর্কিদের পরিত্যাক্ত কফির বাক্স থেকে কফি বানিয়ে দেখল, সেগুলো খুব বেশি উত্তেজক। তাই তারা ওতে কিছুটা ক্রিম আর মধু মিশিয়ে হালকা করল। এতে কফির রং বাদামি দেখাল যা ক্যাপুচিনদের ধর্মীয় শালের রংকে প্রতীকায়িত করে। ভিয়েনাবাসীরা মার্কো ডি আভিআনোর সম্মানে এর নাম দিয়ে দিল ক্যাপুচিনো। তারপর থেকে বিশ্বব্যাপী স্বাদের কারণে এর কদর বেড়ে গেল।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com