করোনাকালে সর্দি-কাশি জ্বরের চিকিৎসা

করোনাকালে সর্দি-কাশি জ্বরের চিকিৎসা

স্বাস্থ্য। ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

করোনাকালে সর্দি-কাশি জ্বরের চিকিৎসা

সারাদেশ এখন এখন করোনা ভাইরাস আতঙ্ক বিরাজ করছে। এর বাইরে আরেক উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সামনে এসেছে। তার নাম ডেঙ্গু ঘরেও হাসপাতালে ছড়িয়ে থাকা জ্বরে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৩০-৩৫ শতাংশ রোগীর শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাস পাওয়া গেলেও বাকীদের বেশির ভাগই আক্রান্ত হচ্ছেন অন্য কয়েকটি ভাইরাস ও জীবাণুতে।এই সময়ে সর্দি-জ্বর বৃষ্টির সময়কার একটি সাধারণ রোগ। সর্দি-জ্বর দেহের শ্বাসনালীর ভাইরাসজনিত এক ধরনের সংক্রমণ।

ঋতু পরিবর্তনের সময় এ রোগ বেশি দেখা যায়। কম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন লোকদের এ রোগ বেশি হয়। হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এ রোগ একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে ছড়ায়। সর্দি-জ্বর হলে প্রথমে নাকে ও গলায় অস্বস্তি লাগে, হাঁচি হয়, নাক দিয়ে অনবরত পানি পড়তে থাকে। নাক বন্ধও থাকতে পারে। মাথাব্যথা, মাথা ভারী বোধ হওয়া, শরীরে ব্যথা, হালকা জ্বর, গলাব্যথা প্রভৃতি উপসর্গও দেখা যায়।

কখনো কখনো চোখ লাল হতে পারে এবং চোখ দিয়ে পানি ঝরতে পারে। এমন হলে প্রথমেই নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে নিন। সর্দি-জ্বরের সময় বিশ্রামে থাকতে হবে, বাইরে যাওয়া যাবে না। ঘরে থাকলেও কারো সঙ্গে কথা বলা বা কেউ আপনার রুমে কিছু দিতে এলে মাস্ক ব্যবহার করুন ও অন্তত এক মিটার দূরে থাকুন।

সাধারণ খাবারের পাশাপাশি প্রচুর পানি, লেবুর রস, আনারস, পেয়ারা বা আমলকী জাতীয় খাবার খাওয়া যেতে পারে। ঠান্ডা জাতীয় খাবার (আইসক্রিম, ঠান্ডা পানি, কোমল পানীয় খাওয়া যাবে না। বারবার গরম চা বা কফি খাওয়া যেতে পারে। তবে সংক্রমণের লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত চিকিৎসা নিতে হবে।সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত হলে অন্যদের সঙ্গে মেলামেশা করবেন না। হাঁচি দেওয়ার সময় বা নাকের পানি মুছতে রুমাল বা টিস্যু পেপার ব্যবহার করুন। রোগীর ব্যবহৃত রুমাল বা গামছা অন্যদের ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। যেখানে সেখানে কফ, থুথু বা নাকের শ্লেষ্মা ফেলা যাবে না। স্বাস্থ্যকর, খোলামেলা, শুষ্ক পরিবেশে বসবাস করতে হবে এবং বিরূপ পরিবেশে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।এসময় অ্যালার্জিক রাইনাইটিস, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও হাঁপানি থেকে দূরে থাকতে হলে অতিরিক্ত গরম, এসির ঠান্ডা ও ধুলাবালি যতটুকু সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। সাবান দিয়ে ভালো করে বারবার হাত ধুয়ে নিন। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকুন।

হোমিওসমাধান : করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রধান লক্ষণ হলো শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া। এর সঙ্গে সঙ্গে থাকে অতিরিক্ত জ্বর, রক্ত বমি, রক্ত কাশি, নিদারুণ শারীরিক দুর্বলতা এবং অনবরত কফযুক্ত কাশি। অরগ্যান ফেইলিওর বা দেহের বিভিন্ন প্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়া। হতে পারে নিউমোনিয়া। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভাইরাসটি শরীরে ঢোকার পর সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিতে প্রায় পাঁচ দিন লাগে। প্রথম লক্ষণ হচ্ছে জ্বর। তার পর দেখা দেয় শুকনো কাশি। এক সপ্তাহের মধ্যে দেখা দেয় শ্বাসকষ্ট।করোনাকালে সর্দি-কাশি জ্বর নিয়ে, নিম্নে বর্ণিত ওষুধগুলো ব্যক্তিদের আরোগ্যের জন্য কাজ করতে পারে।* অ্যাকোনাইট নেপ রোগের কারণ : অতিরিক্ত ঠান্ডা বা অতিরিক্ত গরম থেকে আবহাওয়ার পরিবর্তনে, ধুলাবালি এবং অন্যান্য যে কোনো কারণে রোগাক্রমণ।

লক্ষণগুলো : করোনার আক্রমণ প্রবল ঝড়ের মতো আসে এবং অল্পক্ষণ থেকে রোগীকে একেবারে শেষ করে দেয়। অতিরিক্ত মৃত্যু ভয়, অস্থিরতা, শারীরিক জ্বালা-পোড়া, দ্রুতগতিতে তাপমাত্রা অনেক বেশি উঠে যাবে। অতিরিক্ত কফ, কাশি, শ্বাসকষ্ট দেখা দেবে। মাথা ও বুকে ভার বোধ মনে হবে। সব শরীরে কম্পন দেখা দেবে। একটু পর পর প্রচুর পরিমাণ পানি একসঙ্গে পান করবে।

ব্রায়োনিয়া অ্যালবাম রোগের কারণ : একই। লক্ষণগুলো : রোগের কষ্টগুলো দুই-তিনদিনের মধ্যে আস্তে আস্তে দেখা দেবে। কয়েক দিনের মধ্যে রোগটি দেহের মধ্যে বিস্তার লাভ করবে। নাকের মধ্যে ঘন সর্দি, অনবরত শুষ্ক কাশি, নাক দিয়ে রক্ত পড়া, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট এবং শ্বাসযন্ত্রের প্রদাহ রোগাক্রমণের তিন-চারদিনের মধ্যে দেখা দেবে। রোগের সময় রোগী সারাক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকবে। কারও সঙ্গে কোনো কথা বলবে না। সর্ব শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা ও জ্বর থাকবে। রোগী অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকবে। অতিরিক্ত হাঁচি ও শুষ্ক কাশি থাকবে। নাক দিয়ে রক্ত যাবে, রক্ত মিশ্রিত কফ, গলার স্বর বসে যাবে। ব্রঙ্কাইটিস, নিউমোনিয়া, হুপিংকাশি ও ফুসফুসে পানি দেখা দিতে পারে। কষ্টদায়ক কাশি হবে। সর্ব অবস্থায় রোগী চুপচাপ থাকতে চাইবে। শরীরের সব ছিদ্র পথ শুষ্ক হয়ে যাবে। রোগী অলস প্রকৃতির হয়ে যাবে, এবং অনেকক্ষণ পরপর প্রচুর পরিমাণ পানি একসঙ্গে পান করবে।* জেলসিমিয়াম রোগের কারণ : একই। লক্ষণগুলো : রোগাক্রমণের ৩-৪ দিন পর অতিরিক্ত ঠা-া, জ্বর, মাথাব্যথা দেখা দেবে। সব অবস্থায় রোগী মৃত ব্যক্তির মতো চুপচাপ অচেতন, তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় পড়ে থাকবে। সর্বশরীর ভারবোধ, অবশভাব, নিস্তেজভাব, থরথর করে শরীর কাঁপতে থাকবে। নিজে তার শরীর নাড়াতে পারবে না। হাত ও পা বরফের মতো ঠা-া কিন্তু মাথা অত্যন্ত গরম থাকবে। পানির পিপাসা একেবারে থাকে না। শুষ্ক কাশি ও শ্বাসকষ্ট দেখা দেবে।* আর্সেনিক অ্যালবাম রোগের কারণ : একই।

লক্ষণগুলো : রোগাক্রমণের প্রথম দিনেই অতিরিক্ত দুর্বলতা দেখা দেবে। সর্দি, কফ, কাশি, জ্বর এবং অতিরিক্ত শ্বাসকষ্ট দেখা দেবে। কাশির সঙ্গে দুর্গন্ধ যুক্ত ময়লা কফ বের হবে। রোগীর মধ্যে মৃত্যুভয়, মানসিক ও শারীরিক অস্থিরতা, শারীরিক জ্বালা-পোড়া, উৎকণ্ঠা দেখা দেবে। শ্বাসকষ্টে রোগীর বুক ভারী ভারী মনে হবে। রোগী সামনের দিকে ঝুঁকে বসে বা সামনের দিকে বাঁকা হয়ে ঝুঁকে থাকবে একটু বাতাস পাওয়ার জন্য। তেষ্টা নিবারণের জন্য কাতর হয়ে থাকবে। মুখ দিয়ে হালকা কফ, কাশি বের হবে। অল্প পরিমাণ পানি বারবার পান করিবে। রোগীর শরীরে জ্বর, মাথাব্যথা এবং বমি বমি ভাব থাকবে।* ড্রসেরা রোগের কারণ : একই।লক্ষণগুলো : সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্ট থাকবে। *কার্ভো ভেজ;রোগের কারণ : একই। লক্ষণগুলো : গলার মধ্যে চুলকানি যুক্ত কফ, আপেক্ষিক কাশি, গড়গড় আওয়াজ করে কাশি আসবে।

কাশির সঙ্গে অতিরিক্ত বমি হবে। গলার স্বর বসে যাবে, গলার মধ্যে জ্বালা-পোড়া থাকবে, বমির কারণে রক্ত ও পানি শূন্যতা দেখা দেবে। নাড়ির গতি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম থাকবে। শরীরের উপরিভাগ হিমশীতল হয়ে যাবে, শ্বাসকষ্ট দেখা দেবে। রোগী বারবার বাতাস চাইবে। রোগী মরার মতো পড়ে থাকবে। ঠান্ডা ঘাম দেখা দেবে, সঙ্গে ঠান্ডা শ্বাস-প্রশ্বাস দেখা দেবে, জিহ্বা ঠান্ডা হয়ে যাবে এবং কথা বন্ধ হয়ে যাবে।* এন্টিমোনিয়াম টার্টরিক্যম,রোগের কারণ : একই। লক্ষণগুলো : মুখ বিবর্ণ ও রুগ্ন দেখাবে, নাকটি আকৃষ্ট ও কুঞ্চিত থাকবে, চক্ষু বসে যাবে, চোখের চারদিকে কৃষ্ণমন্ডল দেখাবে, কণ্ঠস্বর বিবর্ণ ও কুঞ্চিত হয়ে যাবে। মুখমন্ডল ঠান্ডা ঘামে আবৃত, ঠান্ডা এবং বিবর্ণ দেখাবে, শরীরের মধ্যে মৃত ব্যক্তির গন্ধ অনুভব হবে। সর্দি সংযুক্ত রোগী, শ্বাসনালি ও বায়ুনালিগুলোর মধ্যে সর্দির অবস্থা থাকবে। বক্ষে, কাশির ঘড়ঘড় এবং ভড়ভড় শব্দ শোনা যাবে, মনে হয় মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত। বক্ষদেশে ক্রমাগত শ্লেষ্মায় ভর্তি হয়ে থাকবে। কিন্তু রোগী কফ তুলতে অক্ষম এবং শ্বাসকষ্ট দেখা দেবে। ঘড়ঘড় শব্দ বের হতে শোনা যাবে। রোগটি দ্রুতগতিতে অগ্রসর হতে থাবে সঙ্গে জ্বর থাবে। ২-৩ দিনের মধ্যে রোগী দুর্বল, অবসন্ন এবং শীতলতা দেখা দেবে। * বেলাডোনা রোগের কারণ : একই। লক্ষণগুলো : রোগের আক্রমণ হঠাৎ এবং তীব্র আকার ধারণ করবে।

রোগীর নাক, কান, গলা, ফুসফুসসহ শরীরের সর্ব অঙ্গ আক্রমণ করবে। এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রক্তাভ হয়ে যাবে। সর্ব শরীরে জ্বালা-পোড়া, আপেক্ষিক কাশি, প্রচুর মাথাব্যথা, উৎকণ্ঠা এবং সর্ব শরীরে কম্পন দেখা দেবে। হাতের তালু, পায়ের তালু অত্যন্ত শীতল অনুভব হবে কিন্তু মাথা ও মুখম-ল অতিরিক্ত গরম অনুভব হবে। রোগীর শরীরে তীব্র ব্যথা ও জ্বর অনুভব হবে। জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা, কাশি ও শ্বাসকষ্ট একবার অতিরিক্ত হবে আবার রোগের তীব্রতা কম অনুভব হবে। এভাবে রোগগুলো সারাদিন বাড়া-কমার মধ্যে থাকবে। রোগে লক্ষণগুলো অতি তাড়াতাড়ি দেখা দেবে এবং অতি তাড়াতাড়ি রোগী আরোগ্য লাভ করবে।

করোনার এই সময়ে ছোট শারীরিক সমস্যাও অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শমতো ওষুধ সেবন করতে হবে। রোগ লক্ষণের সঙ্গে মিলিয়ে গেলে অন্যান্য ওষুধ নির্বাচন করতে পারেন। তারপরে ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে মেডিসিন সেবন করতে পারে।

লেখক : স্বাস্থ্য বিষয়ক উপদেষ্টা, হিউম্যান রাইটস রিভিউ সোসাইটি কেন্দ্রীয় কমিটি

drmazed96@gmail.com

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *