আলেমদের ইখতেলাফে ছাত্র ও ভক্তদের করণীয়
আমিনুল ইসলাম কাসেমী :: আলেম- উলামাদের ইখতেলাফ- মতানৈক্য নতুন কিছু নয়। অনেক পুরনো। মুরুব্বীদের মাঝে বিভিন্ন সময়ে মতানৈক্য দেখা দেয়। মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে বলেন আর রাজনীতির ময়দান বলেন, সব জায়গাতে কিছু না কিছু মত পার্থক্য হয়। আলেমগণ দুই শিবিরে বিভক্ত হন।কখনো আরো বেশী বিভক্ত হতে দেখা যায়।
দেশ- বিদেশের বিভিন্ন দ্বীনি প্রতিষ্ঠানেও এসকল মত- পার্থক্য রয়েছে। অনেক খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান, যাদের আমরা অনুসরণ করি, সেখানেও অনেক জটিল মত-পার্থক্য। বিজ্ঞ আলেমগণ বিভক্ত। সকলের কাছেই মজবুত দলীল রয়েছে। কেউ কারো থেকে কম নয়।
বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানে – রাজনৈতিক অঙ্গনে মত- পার্থক্য ছড়িয়ে পড়ে। বিগত সময় গুলোতে দেখা গেছে, আমাদের খ্যাতনামা মুরুব্বী, ছারে তাজ ওলামায়ে কেরামের ইখতেলাফ। তুমুল আকারে ধারণ করেছিল তখন। অথচ সকল ওলামায়ে কেরামই আমাদের অনুসরণীয়। সকলেই হক- হক্কানিয়্যাতের উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু তারপরেও তাঁদের মাঝে ইখতেলাফ চরম আকারে ধারণ করে।
আচ্ছা, এরকম পরিস্থিতিতে আমরা কি করব? কোন পক্ষে যাব? যদি কোন এক পক্ষ নেই, তাহলে তো বিপরীত গ্রুপটি হবে আমাদের প্রতিপক্ষ। অথচ সেই প্রতিপক্ষ গ্রুপটিও কিন্তু না হক নয়। তারাও হকের পতাকাবাহী। আমরা যেমন হক প্রতিষ্ঠাতা করতে চাই। তারাও সেই হকের কান্ডারী।
আমাদের যতটুকু জানা। এক সময় শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ; এবং চরমোনাই এর মরহুম শায়েখে কামেল সৈয়দ ফজলুল করীম রহ; এর মাঝে রাজনীতির ময়দানে ইখতেলাফ চরম আকারে ধারণ করেছিল। সেসময়ের অনেকেই হয়ত এখন ফেসবুকে থাকতে পারেন। সব কিছু জানা আছে সকলের।
দুইজনই উঁচু স্তরের বুজুর্গ। শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ; হাজার হাজার আলেম- মুহাদ্দিস- মুফতিদের উস্তাদ তিনি, আবার ওদিকে চরমোনাই এর মরহুম পীর সৈয়দ ফজলুল করীম রহ: তিনিও জবরদস্ত আল্লাহর ওলী। হাজার হাজার মুরীদান নিয়ে চলেন তিনি।
বলেন তো আপনি কোন পক্ষে যাবেন? উভয় কিন্তু সহী পথে ছিল। সকলের কাছে মজবুত দলীল। আমি যদি চরমোনাই এর পক্ষ নেই, তাহলে শায়খুল হাদীস রহ; এর মত ব্যক্তির বিরুদ্ধাচারণ হয়ে যায়। আবার শায়খুল হাদীস সাহেবের পক্ষ নিলে চরমোনাই এর মহান বুজুর্গ সম্পর্কে কুধারণা জন্মে যায়। বড় খতরনাক কাজ।
অথচ দুই বুজুর্গের মধ্যে ফুয়ুজ বারাকাত বিদ্যমান ছিল। কোথাও কোন কমতি ছিল না। কেউ যদি এক পক্ষে গিয়ে অন্য পক্ষের গীবত- শেকায়েতে লিপ্ত হয়, সেটা হবে বড় দুঃখজনক। কেননা, সে তখন উভয়ের ফয়েজ- বরকত থেকে বঞ্চিত হবে।
এখানে একটা কথা বলে রাখি, আমাদের ছাত্র ও নবীন আলেমগণ শায়েখ জাকারিয়া রহ; এর কিতাব মুতায়ালা করতে পারেন। তার দ্বারা অনেক ভ্রান্ত- চিন্তা- চেতনার সমাধান হবে। আগে মুতায়ালা করে থাকলে পুনরায় আবার পড়ুন।বারবার পড়ুন। অনেক কিছু নিরসন হবে।
শায়েখ জাকারিয়া রহ; এর লিখিত ” আল ইতিদাল ফি মানাকিবির রিজাল”, ও মুফতী মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী রহ; এর লিখিত “হুদুদে ইখতেলাফ ” বেশী বেশী পড়া দরকার। বিশেষ করে উদ্ভুত পরিস্হিতিতে এগুলো পড়লে হৃদয়ে প্রশস্ততা বাড়বে।
বই পড়ার সুযোগ না হলে কোন কামেল শায়েখের সোহবতে আসা- যাওয়া করা প্রয়োজন। সবচেয়ে বেশী ফায়দা হয়, কোন আল্লাহ ওয়ালা ব্যক্তির সংস্রব। দীর্ঘদিন যদি কোন কামেল শায়েখের সোহবতে সময় কাটানো যায়, তাহলে আলেম এবং ছাত্র ভাইদের যথেষ্ট উপকার হবে। আলেমদের মাঝে ইখতেলাফ হলে তখন নিজেই একটা সমাধান বের করতে পারবেন।
আমরা তো জানি, হযরত সাহাবায়ে কেরামের মাঝে ইখতেলাফ হয়েছে। “জঙ্গে জামাল, জঙ্গে সিফফীন”।
জঙ্গে জামালে হযরত আলী রাঃ এর সাথে হযরত আয়েশা রাঃ এর যুদ্ধ হয়েছে। আচ্ছা, আপনি কোন পক্ষ নিবেন? হযরত আয়েশা রাঃ এর পক্ষ? নাকি হযরত আলী রাঃ এর পক্ষ?
যদি হযরত আয়েশা রাঃ এর পক্ষ নেন, তাহলে হযরত আলী রাঃ যিনি ইসলামের চতুর্থ খলিফা, আশারায়ে মুবাশশারা। জান্নাতের সার্টিফিকেট প্রাপ্ত একজন সাহাবী, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধাচারণ হয়ে যায়। আবার শুধু হযরত আলী রাঃ এর পক্ষ নেন, তাহলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পত্নী, তাঁর প্রিয়তমার বিরুদ্ধে চলে যেতে হয়।
জঙ্গে সিফফীনে তো একই অবস্হা। উভয় গ্রুপে সাহাবায়ে কেরাম। সকলেই আজাল্লে দরজার সাহাবী। কোথাও কিন্তু ফয়েজের কমতি নেই। কিন্তু এক পক্ষ নিলেই সমস্যা। এক পক্ষ নিলে আরেক পক্ষের বিরুদ্ধে হয়ে যাবে আমাদের অবস্হান।
হযরত সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে বলা হয়েছে, আল্লাহর পেয়ারা হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ, আল্লাহ ফি আসহাবী।
খবরদার! তোমরা আমার সাহাবীদের দোষ ত্রুটি তালাশ করোনা। যে তাদের ভালবাসবে আমিও তাদের ভালবাসব, যে তাঁদের প্রতি দুশমুনি রাখবে, আমিও তাদের প্রতি দুশমুনি রাখব”। (হাদীস শরীফ)
তাহলে কোন এক পক্ষ নেওয়ার সুযোগ নেই। এক পক্ষ নিলে আরেক পক্ষের দোষ ত্রুটি তালাশ করতে মনে চাইবে। নিজেদের গ্রুপকে শক্তিশালী ভাবে দাঁড় করানোর জন্য প্রতিপক্ষের দোষ – ত্রুটি খুঁজে বের করা লাগবে। যেটা ঈমান ধ্বংসের এক বড় ফাঁদ। এভাবে কিন্তু বহু ইসলামী চিন্তাবিদ গোমরাহীর জালে আবদ্ধ হয়েছেন। এখনো পর্যন্ত তাঁদের অনুসারীরা পর্যন্ত সেই গোমরাহীর উপরে। আজো ফিরে আসতে পারেন নি তারা।
এজন্য কি করণীয় আমাদের? আমাদের আকাবির – আছলাফ, বিজ্ঞ ওলামায়ে কি করেছেন এই পরিস্হিতিতে। সেদিকে নজর করতে হবে। তারা কি কোন পক্ষ নিয়েছেন? না, তারা কোন পক্ষ নেন নি। বরং সকল সাহাবায়ে কেরাম সত্যের মাপকাঠি। সকলেই অনুসরণীয়।
বি আইয়্যিহিম ইকতিদাইতুম, ইহতিদাইতুম” যে কোন একজনকে অনুসরণ করলে সঠিক পথের সন্ধান লাভ করা যাবে।
সাহাবীদের ব্যাপারে কোন সমালোচনা করা যাবেনা। কোন পক্ষ নেওয়া যাবেনা। বরং চুপ থাকাই শ্রেয়। এটা আমাদের ঈমানী পরীক্ষা। সাহাবাদের ব্যাপারে কোন ইশকাল না করে মুখকে বন্ধ রাখাটা বুদ্ধিমানের পরিচয়।
ঠিক, আমাদের ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মতানৈক্য হলে, সেখানেও বুজুর্গ আকাবির – আছলাফদের পরামর্শ হল, যাকে আপনার ভাল লাগে, যার প্রতি আস্হা হয় তাঁকে অনুসরণ করুন। তাঁর কাছে যান। তাই বলে প্রতিপক্ষের কোন সমালোচনা করা যাবেনা। প্রতিপক্ষকে অপমান- অপদস্হ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এমন কোন কাজ করা যাবেনা, যাতে আমাদের হযরত ওলামায়ে কেরামের উপর তোহমত চলে আসে, বা তাঁদের গীবত -শেকায়েতের দ্বার উম্মোচিত হয়।
যারা কাউকে অনুসরণ করতে পারবেন না, বা নিজের কাছে যদি উক্ত দুই গ্রুপের কাউকে নিজের আস্হাভাজন না মনে হয়, সে ক্ষেত্রে চুপ থাকা চাই। কারো দোষ ত্রুটি বের করে অন্যের সামনে অপমান করা বাঞ্চনীয় নয়।
দেখুন! আমাদের উত্তরসুরী ওলামায়ে কেরামের মাঝে তুমুল মতানৈক্য ছিল। হযরত মাদানী রহ; যিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অগ্রসেনানী। আবার তিনি ছিলেন বিশ্ব কুতুব। ওলীকুল শিরোমণী। তাঁর সাথে ইখতেলাফ হয়েছিল তৎকালিন জামানার খ্যাতনামা বুজুূর্গ আশরাফ আলী থানবী এর সাথে। ইখতেলাফ ছিল পাকিস্তান আন্দোলন নিয়ে।
উভয় বুজুূর্গ তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী হকের উপর ছিলেন। কেউ কিন্তু না হক নয়। সেসময়ে অনেক আলেম এবং সাধারণ মানুষ বিভ্রান্তিতে পড়লেন, কোনদিকে যাবেন। সবাই তো আমাদের অনুসরণ যোগ্য। কাকে ছেড়ে কাকে ধরবেন?
শায়েখ জাকারিয়া রহ. তাঁর লিখিত কিতাব আল ইতিদাল ফী মারাকিবির রিজাল- এর মধ্যে তিনি তার জওয়াব দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, উভয়ই আলেমই অনুসরণ যোগ্য। যার দৃষ্টি ভঙ্গি ভাল লাগে তাঁরটা গ্রহণ করুন। তাই বলে কারো সমালোচনা করা যাবেনা।
তিনি আরো বলতেন, ফয়ুজ ও বারাকাত উভয়ের মধ্যে আছে , যারটা ভাললাগে সেটা গ্রহন করুন। দেওবন্দে মাদানীর খানকাতে ফয়েজ- বরকত আছে আবার থানভবনে হযরত থাবনীর খানকাতে ফয়েজ রয়েছে।
আমাদের উক্ত দুই বুজুর্গের অতুলনীয় সিফাত ছিল। কোন মুরীদ যদি হযরত মাদানীর খানকাতে বসে থানবী রহ; এর সম্পর্কে গীবত -শেকায়েত করলে তাঁকে খানকা থেকে বের করে দিতেন এবং থানবীর কাছে মাফ চাওয়ার জন্য পাঠাতেন। ঠিক হযরত আশরাফ আলী থানবী রহ; এর খানকাতে কেউ মাদানী এর বদনাম করলে তিনিও তাকে বের করে দিতেন।
এসব আখলাক ছিল আমাদের বড়দের। আমরা কোথায় আছি? আমরা কি করছি? বর্তমানে এমন সমস্যা, মাদ্রাসার মধ্যে উস্তাদদের মাঝে মতানৈক্য পরিলক্ষিত হলে,দুই গ্রপ হয়ে যায়। কিছু ছাত্র এক উস্তাদের দিকে আর কিছু অন্য উস্তাদের সাথে। এরপরে কথা চালাচালি। গীবত- শেকায়েতে ভরে যায়। পাল্টাপাল্টি চলে গীবত।
এখন তো আরো বড় সমস্যা। মাদ্রাসার ইখতেলাফ উঠে আসে অনলাইনে। আর একে- অপরকে নাঙা করে। বড় দুঃখজনক। কে কত বদনাম করতে পারে, গালি দিতে পারে, সবই হচ্ছে। (আছতাগফিরুল্লাহ)।
আমার হুজুর বলেছিলেন, ফেসবুকটা হয়েছে এখন মুনাফিকিনদের কিতাব। আসলে তাই। এত বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছি আমরা ভাষায় প্রকাশ করা যাবেনা।
মাদ্রাসাতে ইখতেলাফ হলে ছাত্রদের উচিত হবে, কোন পক্ষেই না যাওয়া। কেননা উভয়েই তাদের উস্তাদ। নিজের জবান বন্ধ রেখে মুতালায় লেগে যাবে।
এ প্রসঙ্গে আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেবের ছাত্র জীবনের এক ঘটনা মনে পড়ে গেল। যেটা আমি উস্তাদদের মুখে শুনেছি। ফরীদ মাসঊদ সাহেব যখন জামেয়া ইমদাদীয়া কিশোরগঞ্জে পড়েন,তখন একবার সেখানে উস্তাদদের মাঝে মতানৈক্য শুরু হয়েছিল, কিছু ছাত্র ফরীদ সাহেবকে নিয়ে টানাটানি করছিল, কেননা, তিনি তখন মাদ্রাসার সবচেয়ে মেধাবী ছাত্র। তাদের সাথে মিলে কোন একটা কিছু করার জন্য। কিন্তু ফরীদ সাহেব সাফ জানিয়ে দিলেন, আমার অনেক মুতালায়া বাকি, এই সুযোগে বেশী করে মুতালায়া করে নেই। ছাত্রদের তো এমন হওয়া চাই। কোন ইখতেলাফে ছাত্ররা নেই। ছাত্ররা শুধু লেখাপড়া নিয়ে থাকবে।
একবার দেওবন্দ,এরপর সাহারাণপুর, নদওয়াতে কিছু ছাত্র ধর্মঘট ডেকে ছিল। শায়েখ জাকারিয়া রহ: কড়া ভাবে বলেছিলেন, যারা ধর্মঘটের সাথে জড়িত, তারা আমার কোন দরসে যেন না বসে। এমনকি তাদের হাদীসে মুসালসালাতের সনদ দিতে অস্বীকৃতি জানান।
এজন্য কোন প্রতিষ্ঠানে ইখতেলাফ হলে ছাত্ররা জড়াবেনা। চুপ থাকবে। মুতালায়া বাড়িয়ে দিবে। দুআর ইহতেমাম করা চাই। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে জ্ঞানীর পরিচয় দিতে হবে আমাদের। খামোশ হোন। দুআ চালু রাখুন। আল্লাহ আমাদের সহী বুঝ দিন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক


