৩০শে নভেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ৪ঠা জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি

কুরআনের পাখিগুলো যেন অঙ্কুরেই বিনষ্ট না হয়

  • আমিনুল ইসলাম কাসেমী

দেশজুড়ে এখন বিশ্বজয়ী কুরআনের হাফেজ সালেহ আহমাদ তাকরিমের বন্দনা চলছে। অনলাইন-অফলাইন এখন তাকরিমের দখলে। দেশের আলেম-উলামা এবং সর্বস্তরের জনতা তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। সৌদিআরব থেকে ফেরার দিনে ঢাকা বিমানবন্দরে হাজার হাজার জনতা তাকে অভ্যর্থনা জানাতে ভুল করেনি। মধ্যরাতেও সেদিন এয়ারপোর্টে ছিল মানুষের উপচেপড়া ভিড়। কুরআনপ্রেমী মানুষ তাকে ফুলেল শুভেচ্ছায় বরণ করে নেয়। দেশের প্রখ্যাত ব্যক্তিবর্গ-সেলিব্রিটিগণও বিভিন্নভাবে তাকে অভিনন্দন জানিয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং সামাজিক সংগঠনও তাকে অভিনন্দন জানাতে কার্পণ্য করেনি। মোটকথা, বিজয়ের দিন থেকে নিয়ে এখন পর্যন্ত মানুষ তাকরিমকে অভিনন্দন জানাচ্ছে এবং আলহামদুলিল্লাহ এধারা অব্যহত রয়েছে।

আমিও তাকরিমকে অভিনন্দন জানিয়েছি। তার মঙ্গল কামনা করি। উজ্জ্বল ভবিষ্যত আশাকরি। হিফজ প্রতিযোগিতায় যেমন বিশ্ব জয় করেছে, তেমনি একজন যোগ্য আলেম হয়ে; গোটা পৃথিবী জুড়ে তার আলো ছড়িয়ে পড়ুক সেই কামনা করি। আমিন।

তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, যেরকম হাঁক-ডাকের সাথে আমাদের সন্তানেরা বিশ্ব জয় করে আনছে, কিন্তু কিছুদিন পরে সব যেন স্তিমিত হয়ে পড়ছে। সেই সুখ্যাতি আর থাকছে না। সে যেন ইলমী লাইনে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। প্রখর মেধা কোন কাজে লাগছে না। ভোঁতা করে ফেলা হচ্ছে।

তাকরিমের বয়স কতই বা হয়েছে? সবেমাত্র কিশোর। বলা যায় ইলমী লাইনের প্রাথমিক ধাপ শেষ করল। সামনে তার বিশাল জগৎ। জ্ঞান- ভান্ডারের পর্বতশৃঙ্গে উঠতে হবে। হিমালয়ের মতো কঠিন অসমতল রাস্তা পাড়ি দিতে হবে। কিন্তু অপ্রিয় সত্য কথা হলো, আন্তর্জাতিক হাফেজগণ  প্রাইমারি সেকশনের পড়া শেষ করে ইতি টানেন। আর তিনি সামনে অগ্রসর হতে চান না।  দিনে দিনে কেমন যেন স্লথ হয়ে যায় সবকিছু।

একজন আন্তর্জাতিক মানের হাফেজ মানে, সে সেরকমই আন্তর্জাতিক মেধাসম্পন্ন কিশোর। অত্যন্ত প্রখর প্রখর মেধা ছাড়া বিশ্বের শত শত  প্রতিযোগিকে পিছনে ফেলা যায় না। কিন্তু এরকম তুখোড় মেধাসম্পন্ন হওয়ার পরেও তারা শুধু হিফজের গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে। সামনে অগ্রসর হতে পারছেনা।

কী কারণে তারা সামনে অগ্রসর হতে পারে না, বিশ্বমানের আলেম হয়ে উঠতে পারে না, সেটা বলা মুশকিল। নিশ্চয়ই তাদের আশে-পাশে যারা থাকেন তারা বলতে পারবেন কোন সমস্যার কারণে তারা ইলমী লাইনে এগুতে পারেনা। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার।

তবে আমরা এতকাল যা দেখে আসছি, সেটা তো বড় খতরনাক বিষয়। যেমন, কেউ আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে পুরস্কার নিয়ে আসলে আমরা তার পিছনে লেগে যাই। বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিল কর্তৃপক্ষ তাকে দাওয়াত করতে থাকে। সেখানে তার হাজিরি দিতে হয় পড়ালেখা ফাঁকি দিয়েই। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন হাফেজের নাম-লকব পোষ্টারে দিয়ে মানুষ জড়ো করা হয়।  সামান্য একটা ক্বেরাত পড়েই সে ক্ষান্ত থাকে। বিনিময়ে নগদ কাঁচা টাকা। হয়ত হাজার হাজার বা বেশুমার হাদিয়া দিয়ে পকেট ভারি করা হয়।

তাকরিম-সাকিব-তরিকুল এরা তো অবুঝ বালক। এই বয়সেই যদি এত হাদিয়ার হাতছানি থাকে, তাহলে কি কোন প্রোগ্রাম মিস করবে কখনো? তখনই শুরু হয় কোমলমতি কিশোরদের ওয়াজ মাহফিল বা বিভিন্ন প্রোগ্রাম। লেখাপড়া তখন শিকেয় উঠে যায়।

আরো দুঃখজনক হলো, কোনো ইলমী লেখাপড়া না করে, কেবল কোরআনের হাফেজ হয়ে আর আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন হওয়ার সনদ পেয়ে ওয়াজের ময়দানে মানুষকে ধর্মীয় জ্ঞান দিতে নেমে যাচ্ছে অনেকে। গলায় সুর ভাল, সেই সাথে কিছু ইসলামী সঙ্গীত মুখস্ত করে ওয়াজের ষ্টেজে উঠে যাচ্ছে। সেখানে কিছু মুখস্ত ওয়াজ আর কোরআন তিলাওয়াত-ইসলামী সঙ্গীত গেয়ে স্রোতাদের বাহবা কুড়াচ্ছে। ফেরার পথে মোটা অংকের হাদিয়া। তাহলে এবার বলুন তো, সে পড়ালেখা করবে কখন?

যে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে লেখাপড়া করেনি, তার দ্বারা তো কোরআন-হাদীসের সঠিক সমাধান দেওয়া সম্ভব নয়

তাছাড়া যে শুধু কুরআনের হাফেজ, আর কোন লেখাপড়া করেনি, সে কী ওয়াজ করবে? সে কী কোরআন হাদীসের সঠিক নির্দেশনা দিতে পারবে কখনো? কোন সমস্যার সমাধান কী তার দ্বারা হবে? আসলে যে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে লেখাপড়া করেনি, তার দ্বারা তো কোরআন-হাদীসের সঠিক সমাধান দেওয়া সম্ভব নয়। বরং এসকল অজানা মানুষদের দ্বারা জাতি গোমরাহির দিকে ধাবিত হবে। কারণ, সে নিজে জাহেল এবং মানুষকেও জাহেল বানাবে।

আবার কিছু আন্তর্জাতিক হাফেজদের দেখছি, তারা পড়ালেখা বাদ দিয়ে বিভিন্ন এলাকায় প্রাইভেট হিফজখানা খুলেছে। এর ডিমান্ডও অনেক বেশি। অবশ্যই প্রাইভেট হেফজখানা খোলা নিষেধ নয়, কেননা এর দ্বারা ফায়দা হচ্ছে। কিন্তু এরা পড়ালেখা বাদ দিয়ে যখন শুধু কমার্শিয়াল চিন্তায় ময়দানে নেমে যায়, সেটা আফসোসের বিষয়। আর ওসব হিফজখানাগুলো মুরুব্বী আলেমদের সুপরামর্শ মানছেনা, আবার কোনো বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে যেতেও আগ্রহী নয়। কিছুটা ‘একলা চল’ নীতি। কিন্তু তাদের এমন একলা চল নীতির কারণে হেফজ বিভাগের ছাত্ররা সঠিক তরবিয়ত, আদর্শিক শিক্ষা পাচ্ছেনা। যার কারণে দিকবিদিক হয়ে যাচ্ছে অনেকে, হিফজও আর শেষ করতে পারছে না।

মোটকথা, আমরা দেখতে পাচ্ছি, বিশ্বজয়ী নবীন হাফেজগণ কচিবয়সেই ইলম থেকে লাইনচ্যুত হয়ে যাচ্ছে। এর বড় কারণ, অল্প বয়সেই টাকার হাতছানি। আর যোগ্য গাইডের অভাব। আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে বাড়ি ফেরার পর সঠিক রাহনুমায়ী করা হয়না। দেখা যায়, যে শিক্ষকের মাধ্যমে তার সুগন্ধ ছড়িয়েছে, সেই হিফজখানাতেই, তার নিয়ন্ত্রণেই জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে। তার অভিভাবকও কিছু বলেনা, যার হাত ধরে সুনাম অর্জন করেছে, তার কাছেই সোপর্দ করে রাখেন।  কিন্তু যিনি তাকে পথ দেখাচ্ছেন, তার তো এই অবুঝ কিশোরের ভবিষ্যত চিন্তা করা উচিত।

এক্ষেত্রে আমাদের আকবিরদের একটা ঘটনা বর্ননা করছি। শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ. ছিলেন শাইখুল হিন্দ রহ. এর হাতেগড়া শিষ্য। হযরত মাদানী রহ. যে বিশ্ববিখ্যাত ব্যক্তি হয়েছিলেন, এর সবই ছিল শাইখুল হিন্দের অবদান। তিনি নিজ হাতে মাদানীকে গড়ে ছিলেন। হযরত মাদানী দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে ফারেগ হওয়ার পর তাঁর পিতার সাথে মক্কা-মদীনায় হিজরত করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তখন শাইখুল হিন্দ রহ. হযরত মাদানীকে বললেন, যাওয়ার আগে ফকীহুন নফস রশিদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ. এর কাছে বায়আত গ্রহণ করে নিতে। অথচ শাইখুল হিন্দ রহ. তো নিজেই পীর। আবার হযরত মাদানীও তাঁর কাছে বায়আত গ্রহণ করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু শাইখুল হিন্দ রহ. নিজে বায়আত না করে রশিদ আহমদ গাঙ্গুহী রহ. এর কাছে পাঠালেন।

এটা ছিল আকাবিরদের উদারতা। তাঁরা ছাত্রের উজ্জ্বল ভবিষ্যত চেয়েছেন। নিজের কাছে আবদ্ধ করে রেখে দিতে চাননি।

তদ্রূপ আমাদেরও উদার হওয়া দরকার। সারাজীবন ছাত্রকে নিজের নিয়ন্ত্রণে না রেখে, বড় আলেম বানানোর জন্য অন্যত্র পাঠানোর মানসিকতা তৈরী করুন। দেখবেন, এতে সকলেরই মঙ্গল হবে।

আল্লাহ আমাদের কবুল করুন। আমিন।

লেখকঃ শিক্ষক ও কলামিষ্ট

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com