খতমে নবুওয়াত প্রসংঙ্গ: ও.আই.সি এর সিদ্ধান্ত মানবে না কেন বাংলাদেশ?

খতমে নবুওয়াত প্রসংঙ্গ: ও.আই.সি এর সিদ্ধান্ত মানবে না কেন বাংলাদেশ?

  • আল্লামা রুহুল আমীন খান উজানী

মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি, যিনি আমাদেরকে সর্বশ্রেষ্ঠ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঈমানদার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ‘খতমে নবুওয়াত’ ইসলামের এমন একটি নাজুক অঙ্গন যা তাওহীদ, রেসালাতের মতোই অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এ খতমে নবুওয়াত মানেই হলো নবীজি মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বশেষ নবী হওয়ার বিষয়টিকে অস্বীকার অথবা সন্দেহ করলে একজন মুসলমান কোনোক্রমেই পবিত্র কোরআন হাদিসের দৃষ্টিতে আর মুসলমান থাকতে পারে না। যদ্দরুন বিষয়টি অধিক প্রচার ও প্রসারের দাবী রাখে।

আমাদের প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবীকুলের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠত্বের বাহন এ খতমে নবুওয়াত। একটি দিক একটি দিকের ওপর পরস্পরে নির্ভরশীল। কথাটির মর্মার্থ এ দাঁড়ালো, আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মর্যাদা সর্বশ্রেষ্ঠ কেন?
-তিনি যেহেতু সর্বশেষ নবী।
তিনি সর্বশেষ নবী কিভাবে?
-তিনি যেহেতু সর্বশ্রেষ্ঠ নবী তাই।

সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠত্বই হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এক বিস্ময়কর মহিমান্বিত আসনে আসীন করে রেখেছে। তাই যতসব ঈর্ষা ও প্রতিহিংসা। বিষয়টির সুস্পষ্ট ও পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা এ সামান্য পরিসরে অসম্ভব। এজন্য মুসলিম উম্মাহর ধীবান প্রথিতযশা ইসলামী চিন্তানায়ক আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী (রাহ.) এর ‘আল-কাদিয়ানীয়াহ’ গ্রন্থখানা পাঠকবৃন্দকে পাঠের আহ্বান জানাব।

আল্লামা নদভী (রাহ.) সবিস্তারে এ তত্ত্বটি তুলে ধরেছেন। সর্বশেষ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ খতমে নবুওয়াতের এমন মর্যাদা কেন এবং কিভাবে? এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটই বা কি? মুসলিম উম্মাহর সর্বোত্তম পাওনা যে এ খতমে নবুওয়াতের অনুপম ভূষণ তা তিনি যথার্থই উপস্থাপন করতে প্রয়াস পেয়েছেন সফলভাবে। একান্তই সুনিপুণভাবে। আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদানে বিভূষিত করুন।

তন্মধ্যে একটি মাত্র তথ্য উল্লেখ না করে পারছি না। ইমাম বুখারী (রাহ.) একাধিকবার স্বীয় কিতাব সহিহ বুখারিতে হাদিস খানা চয়ন করেছেন। জনৈক ইয়াহুদী খলিফাতুল মুসলিমিন হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন কুরআনে কারীমে একটি আয়াত আছে যেটি আপনারা রীতিমতো তেলাওয়াত করেন। যদি আমাদের ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের কল্যাণে এ গৌরব অর্জিত হতো আমরা আয়াতটি নাযিল হওয়ার দিনটিকে ঈদ (সোনালী ঐতিহাসিক দিন) হিসেবে নির্ণীত ও চিহ্নিত করে রাখতাম। জবাবে হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহ বললেন সেটি কোনো আয়াত?

ইয়াহুদি বলল আয়াতটি হচ্ছে:

‎الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسْلاَمَ دِينًا‏

অর্থাৎ “আজ আমি তোমাদের দীনকে তোমাদের জন্য পরিপূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দীন হিসেবে মনোনীত করলাম”— (সূরা আল মায়িদাহ ৫ঃ ৩) এ কথা শুনে উমর (রাযি.) বললেন, কোন দিন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে, কোন সময়ে অবতীর্ণ হয়েছে এবং এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার প্রাক্কালে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোথায় ছিলেন, তাও আমি সম্যক অবগত আছি। এ আয়াতটি মুযদালিফার রাতে জিলহজ্জ এর ০৯ তারিখ, জুমাবার অবতীর্ণ হয়েছে। তখন আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে আরাফার মাঠে ছিলাম।

আল্লামা নদভী (রাহ.) উপরোক্ত আয়াত নাযিলের প্রেক্ষাপট আলোচনা করতে গিয়ে যে চমৎকার তথ্য পরিবেশনের স্বাক্ষর রাখলেন পাঠ করলে বিস্মিত হতে হবে নিঃসন্দেহে। আমরা জানতাম খতমে নবুওয়াতকে কেন্দ্র করে যত ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলিহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবের পর থেকেই কেবল। জি-না বিষয়টি এমন নয়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবের হাজার হাজার বছর পূর্ব থেকেই খতমে নবুওয়াতের মহা আকর্ষণীয় কুরসিটিকে দখল করার জন্য নবুওয়াতের অসংখ্য মিথ্যা দাবিদারের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে।

সারকথা হচ্ছে হযরত আদম আলাইহিস সালামা হতেই এ খতমে নবুওয়াত আকর্ষণীয় বরং ঈর্ষণীয় প্রতীক্ষিত খোদায়ী ভূষণ হিসেবে যুগে যুগে আলোচ্য বিষয় হিসেবে আসছিল। জানিনা মালাটি শোভা পাবে কার গলে? প্রবাদের মতোই ছিল। ইয়াহুদীর ভাবগম্ভীর জিজ্ঞাসায় ছিল সেই ঐতিহাসিক ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গা প্রতীক্ষার সমাপনীর মহা ইঙ্গিত।

আল্লামা নদভী (রাহ.) খুবই অনুতাপ করে লিখেন আমরা সেই ইয়াহুদীর জিজ্ঞাসার মর্মার্থ যথাযথ মূল্যায়ন ও অনুধাবন করতে পারিনি। উল্লেখিত কুরআনের আয়াতাংশে রয়েছে মূলত খতমে নবুওয়াতের সুস্পষ্ট ছোঁয়া। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে খতমে নবুওয়াতের সঠিক মর্যাদা ও মর্মার্থ উপলব্ধি করার তাওফিক দিন।

বিগত শতাব্দীতে অবিভক্ত ভারতবর্ষে এ খতমে নবুওয়াতের বিরুদ্ধে দাঁড়ালো মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী। তার বহুমুখী দাবি-দাওয়ার মধ্যে অন্যতম নিকৃষ্ট একটি দাবি ছিল তিনিও নাকি নবী! নাউজুবিল্লাহ! প্রশ্ন: তিনি কে? কি কি তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য? কোথা থেকে তার সূচনা? কোথায় তার সমাপনী? এসব প্রশ্নের জবাব বস্তুনিষ্ঠভাবে যদি কেউ কালেকশন করতে চায় ফলাফল দাঁড়াবে সুদুরপ্রসারী একটি আন্তর্জাতিক চক্রান্ত মহান ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে। এই চক্রান্তের মূলে রয়েছে ওরিয়েন্টালিস্ট ও ক্রুসেডারগণ। যারা ইয়াহুদী খ্রিস্টানদের লালিত-পালিত প্রশিক্ষিত টিম। যাদের বাহ্যতঃ মায়াবী আচরণে স্থুলদর্শীরা তৎক্ষণাৎ আকৃষ্ট হয়ে যায় অনায়াসে। সুহৃদবেশী ওসব বেনিয়াদেরকে চেনা কিন্তু সুকঠিন। মৎস্য শিকারিদের নেয় ওরা সামান্য আধার দেখিয়ে লাখো মুসলমানকে ঈমানহারা করার চক্রান্তে বিভোর থাকে অহরহ।

জেনারেল লাইনের সরল শিক্ষিতরাই ওদের প্রধান টার্গেট। শিক্ষা সংস্কৃতির নামে ঈমাননাশা বিষ যত্রতত্র ওদের মধ্যে ছড়াচ্ছে অতি সাবলীলভাবে। মির্জা গোলাম আহমদকে কেন নির্বাচন করল তারা এই অবিভক্ত ভারতবর্ষে? ডাবলু ডাবলু হান্টার ‘দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস’ গ্রন্থে পরিষ্কার করে লিখে গেছেন, আমাদের ব্রিটিশ রাজত্ব ভারতবর্ষে দীর্ঘস্থায়ী করার উদ্দেশ্যে ”DIVIDE AND RULE” ভাগ করো শাসন করো” পলিসিটা ছিল খুবই কার্যকর।

দ্বিতীয়তঃ মুসলমানদের ধারাবাহিক জিহাদ ইংরেজ শাসনকে তছনছ করে চলছিল তখন, এ জন্যে চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নবীর জিহাদকে আরেকজন নবী (তথাকথিত) ব্যতীত রহিত করতে পারবে না। এজন্য মির্যাকে প্যারালাল নবী মঞ্চস্থ করা হয়। ঠিকই মির্যা নবুওয়তের দাবি করে এ ঘোষণা দিল জিহাদ আর নয় তা রহিত। নাউযুবিল্লাহ! মূলত মির্যার সমস্ত ডাটা সংগ্রহ করলে এ দুটি কথা-ই ফুটবে—
১. জিহাদ হারাম
২. মুসলিম উম্মাহর ঐক্যে ফাটল ধরানো।

এক কথায় অবিভক্ত ভারতের তদানিন্তন স্বাধীনতাকামী সংগ্রামী যোদ্ধা দেরকে প্রতিহত করার জন্যই এ কাদিয়ানী ফিৎনা। এই জন্যই কাদিয়ানীরা সর্ব সময় স্বাধীনতা ও মুক্তির দুশমন। সেজন্যই বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর ভাবগুরু মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকা কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে এতো সোচ্চার ছিল। বরেণ্য আলিমেদ্বীন মুজাহিদে মিল্লাত আল্লামা শামসুদ্দিন কাসেমী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ‘কাদিয়ানী ধর্মমত’ গ্রন্থে কৃতজ্ঞতার সাথে এ তথ্যটি উল্লেখ করেছেন।

খতমে নবুওয়তের পক্ষে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ নিজ নিজ অবস্থানে থেকে বহু স্মরণীয় ভূমিকা রেখে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছেন। বাংলাদেশ ও.আই.সি এর অন্তর্ভুক্ত হয় বঙ্গবন্ধুর মাধ্যমে। ও.আই.সি এর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত কাদিয়ানীরা অমুসলিম। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের হুমকি এসব কাদিয়ানীরা দেশের জন্য মারাত্মক চ্যালেঞ্জ। সঙ্গত কারণেই রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদেরকে অমুসলিম ঘোষণার দাবি উত্থিত হচ্ছে। ও.আই.সি. এর অন্যতম সদস্য বাংলাদেশ। ও.আই.সি. এর গৃহীত সিদ্ধান্ত মানবে না কেন বাংলাদেশ? এ প্রশ্নতো এসেই যায়।

উল্লেখ্য, মুসলিম বিশ্বের সর্বজনমান্য প্রজ্ঞাবান বুযুর্গ ব্যক্তিত্ব আল্লামা আহমদ শফি রহমাতুল্লাহি আলাইহি সরকার প্রধান এবং সরকারের কল্যাণে সবসময় তিনি দুআ করতেন। তিনি উলামা তথা মুসলিম ঐক্যের বিশ্বপ্রতীক। আখিরি নবীজি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শাফায়াত লাভের অদম্য প্রত্যাশায় তাঁর জীবনের সর্বশেষ আকাঙ্খা কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা করার জন্য বিশেষভাবে পরীক্ষিত ধর্মানুরাগী, সত্য সন্ধানী সরকার প্রধানের খিদমতে আকুল আবেদন জানাচ্ছি।

মহান আল্লাহ যার, সবই তার। আকাশে বাতাসে চির অম্লান থাকবে খ্যাতি ও কৃতিত্ব তার ইনশাআল্লাহ। সরকার প্রধানের দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য তারই কল্যাণে কোটি কোটি জনতার পক্ষ থেকে এ যৌক্তিক আবেদন।

  • লেখক: সহ-সভাপতি, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ। মহাসচিব, আঞ্জুমানে দাওয়াতে ইসলাহ বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল ও শায়খুল হাদীস, জামিয়াতুস সাহাবাহ উত্তরা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *