৩০শে নভেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ২৪শে রবিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

খাল পুনরুদ্ধার করে দখল-দূষণমুক্ত নদী উপহার দিন

খাল পুনরুদ্ধার করে দখল-দূষণমুক্ত নদী উপহার দিন

রাজধানীর খাল উদ্ধার নিয়ে ঢাকা সিটি করপোরেশন নড়েচড়ে বসেছে। নিঃসন্দেহে এটি ভালো উদ্যোগ। আদতে খাল কি সুরক্ষা পাবে? এমন প্রশ্ন থেকেই যায়। স্বাধীনতার পর থেকে কেবলই গ্রাস করা হয়েছে এসব খাল। বরাবরই রক্ষক বক্ষকে রূপ নিয়েছে। দুই সিটিতে নতুন মেয়র দায়িত্বে আসার পর থেকে একের পর এক চমক দেখা যাচ্ছে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারা উদ্ধার করে চলেছেন খাল, জলাশয় ও দখল করা রাষ্ট্রের জমিন। বিস্ময়কর হলেও সত্য, এসব জায়গা বেশির ভাগই সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বে থাকা মানুষজন দখল করে রেখেছিলো। এমন জাতীয় সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদভী ধারণ করা ব্যক্তিত্বের নামও উঠে আসছে এ তালিকায়।

রক্ষক বক্ষণ শুরু করলে রাষ্ট্রের ক্ষতি ছাড়া আর কোনো কিছু আশা করা যায় না। জনগণ ধরে নিয়েছে, যা-ই হোক, রাজধানীর খাল পুনরুদ্ধারে মানুষ কিছুটা স্বস্তি পাবে। আবার কেউ না কেউ যে দখলবাণিজ্যে অবদান রাখবে না এমন কথা আমরা হলফ করে বলতে পারি না। অনেক নদি ভাঙার মতো। সকাল বেলার ধনীরে তুই ফকির সন্ধেবেলা। যাতে অন্য কোনো রাগব বোয়ালের চোয়ালের থাবায় দেশের সম্পদ বিনষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত বলেই আমরা মনে করি।

কষ্টকর হলেও সত্য, যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) প্রতিবছর বিশ্বের প্রধান প্রধান শহরের যে তালিকা করে, তাতে ঢাকার অবস্থান বরাবরই তলানিতে থাকে। এই তালিকা তৈরিতে পরিবেশদূষণ, যানজট, জলাবদ্ধতাসহ যে ৪০টি সূচক ব্যবহার করা হয়, তার প্রায় সব কটিতেই ঢাকার অবস্থান থাকে নিচের দিকে। এর কারণগুলোও আমাদের অজানা নয়। এ জন্য দায়ী দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন। আমরা আশাবাদি হয়েছি তখনই বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঢাকার উন্নয়নে বেশ কিছু পরিকল্পিত উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে যানজটের মহাপ্রকোপ কিছুটা হলেও কমেছে।
মেট্রো রেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে চালু হলে ঢাকার যানজটের একটা সুরাহা হবে বলেই আশা রাখতে পারি। এবার ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে উদ্যোগকে অবশ্যই প্রশংসনীয় বলবো। বায়ুদূষণ কমানোর লক্ষ্যেও কাজকে ত্বরান্বিত করা অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। সত্যিকার অর্থেই দেশকে এগিয়ে নিতে চাইলে কোনো দিকেই দুর্বলতা রাখা যাবে না।

আমরা মনে করি, ঢাকার জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ এখানকার খালগুলো দখল ও দূষণে ভরাট হয়ে যাওয়া। একসময় ঢাকায় ৪৬টি খাল ছিল। এখন ২৬টি খাল কোনো রকমে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। এসব খাল ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ঢাকা ওয়াসা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। তারা সেগুলো দখলমুক্ত ও নাব্য করার ক্ষেত্রে তেমন কিছুই করতে পারেনি। তাই খালগুলোর দায়িত্ব আবার ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ব্যাপারে গত বৃহস্পতিবার সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। শনিবার থেকেই ডিএসসিসি খাল পুনরুদ্ধার কর্মসূচি শুরু করেছে। গতকালও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত ছিলো। প্রথম দিনে বাংলামোটরের পান্থকুঞ্জ পার্ক থেকে ধানম-ির রাসেল স্কয়ার পর্যন্ত দীর্ঘ বক্স কালভার্টের পাঁচটি পয়েন্ট পরিষ্কার করা হয়েছে। পাঁচটি ড্রেনেজ পিট (মুখ) থেকে ৭৪ টন বর্জ্য অপসারণ করা হয়। কালভার্টটিতে এমন পয়েন্ট আছে ২৪টি। ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, তাঁদের এই কাজ চলমান থাকবে। পান্থপথ কালভার্ট থেকে বর্জ্য অপসারণের পর সেগুনবাগিচা কালভার্টের বর্জ্য অপসারণ করা হবে। পাশাপাশি জিরানী, মা-া ও শ্যামপুর খালেও পরিচ্ছন্নতাকাজ চালানো হচ্ছে। রাজধানীর বুড়িগঙ্গা তীরে শিক্ষা, সাহিত্য ও সামাজিক সংগঠন শীলন বাংলাদেশ-এর ব্যানারে মানববন্ধন ও নৌ-ভ্রমণ করে আলেম লেখকরাও নদীদূষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন সম্প্রতি।

শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, বালু ও বুড়িগঙ্গা-এই চারটি নদী রক্ষায় ২০০৯ সালে হাইকোর্ট থেকে ১২ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। নদীকে জীবন্ত সত্তাও ঘোষণা করা হয়েছিল। উচ্চ আদালতের সেসব নির্দেশনা ভুলে গেলে চলবে না। ঢাকার চারপাশের নদী ও অভ্যন্তরের খালগুলো দখল ও দূষণমুক্ত করে বসবাস উপযোগী পরিবেশ উপহার দেবেন বলেই আমরা মনে করি।

-মাসউদুল কাদির

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com