নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিস্ময়কর দৃঢ়তা
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আশ্চর্য তেজে দৃঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছিলেন। লোকেরা ঊর্ধ্বশ্বাসে পাহাড়ের দিকে দৌড়াচ্ছিল। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চিৎকার করে ডাকছিলেন, আমি আল্লাহর রাসূল, আমি এখানে, তোমরা আমার দিকে ফিরে আসো।
মাঝে মাঝে তীর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে লক্ষ্য করে ছোঁড়া হচ্ছিল, এর মাঝে তিনি স্থির হয়ে ছিলেন। তাঁর চতুষ্পার্শে তখন খুব কমসংখ্যক সাহাবী ছিলেন। পনেরজন সাহাবী, কোনো কোনো বর্ণনায় ত্রিশজন সাহাবীর একটা ক্ষুদ্র দল তাঁকে চতুর্দিক বেষ্টন করে ছিলেন। প্রত্যেকেই বলছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনার চেহারা মোবারকের আগে আমার চেহারা, আপনার প্রাণের আগে আমার প্রাণ যাবে। সালাম আপনার উপর, এখনই বিদায়ী সালাম নয়।
নাফি‘ ইবন জুবায়র জনৈক মুহাজির সাহাবীর বরাতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমি উহুদে ছিলাম। চতুর্দিক থেকে বৃষ্টির ন্যায় তীর বর্ষিত হচ্ছিল। এর মাঝে ছিলেন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। প্রতিটি তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে এদিক-ওদিক দিয়ে চলে যাচ্ছিল। দুশমন আবদুল্লাহ ইবন শিহাব যুহরী চিৎকার করে বলছিল, মুহাম্মদ কোথায়? আজ সে বেঁচে গেলে আমার বেঁচে থাকার কোনো অর্থ নেই।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাশেই একাকী ছিলেন। কোনো সঙ্গী তখন কেউ ছিল না। কিন্তু আবদুল্লাহ যুহরী তাঁকে দেখতে পেল না। সফওয়ান ইবন উমাইয়া তাকে দেখে বলল, মুহাম্মদ তো তোমার পাশেই ছিলেন। সে বলল, কসম! আমি তাঁকে দেখিনি! আমরা চারজন আজ কসম করে চুক্তিবদ্ধ হয়ে এসেছিলাম, মুহাম্মদকে আজ হত্যা করেই ছাড়ব। কিন্তু কেউই আমরা তাঁর কাছে ভিড়তে পারিনি।
আরবুন-নামির আল কিনানী পরে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি বলেন, আমি দেখলাম মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাহাবীগণ চাঁদের বলয়ের মতো বেষ্টন করে আছেন। আমি নিজে তাঁকে লক্ষ্য করে পাঁচটি ছুঁড়াল পাথর ছুড়ে মারি, সবগুলো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। চতুর্দিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে তাঁর উপর তীর বর্ষণ করা হচ্ছিল। কিন্তু সবগুলো লক্ষ্যচ্যুত হয়ে ডানে-বামে, সামনে-পেছনে যেয়ে পড়ছিল। একটিও তাঁকে আঘাত করতে পারেনি।
কোনো কোনো সাহাবী হেরান হয়ে সারা ময়দানে তাঁকে খুঁজছিলেন। হযরত আলী রা. বলেন, মুসলিম বাহিনী বিশৃঙ্খল হয়ে পড়লে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখতে না পেয়ে আমি ময়দান জুড়ে তাঁকে খুঁজছিলাম। প্রথমে নিহতদের মাঝে তালাশ করলাম, সেখানেও তাঁকে পেলাম না। মনে মনে বললাম, ‘কসম আল্লাহর! নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো পলায়ন করার মতো মানুষ নন।
কিন্তু কোথায় তিনি? মনে হয় আমরা যে আচরণ করেছি, তাতে আল্লাহ পাক আমাদের উপর নারাজ হয়ে তাঁর মাহবুব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শহীদ না হওয়া পর্যন্ত আমার কোনো মঙ্গল নেই’। আমি আমার তরবারির খাপ ভেঙে ফেললাম এবং বীরবিক্রমে শত্রুদের মাঝে ঢুকে পড়লাম। এরা বিক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়ার কিছুটা ফাঁকা হল। হঠাৎ আমার দৃষ্টি আটকে গেল, এই তো নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেজস্বিক্রমে লড়াই করে যাচ্ছেন। অনন্তর হযরত আলী দ্রুত তাঁর পাশে এসে ব্যূহ রচনা করে দাঁড়ালেন।
ভেঙে গেল দানদান মুবারক
দুশমন বাহিনী নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে লক্ষ্য করে একের পর এক হামলা চালাচ্ছিল। এই ফাঁকে ‘উৎবা ইবন আবী ওয়াক্কাস নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেহারা মুবারক লক্ষ্য করে চারটি পাথর ছুড়ে মারে। একটি পাথর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখে আঘাত করে এবং তাঁর নিচের পাটির সামনের দুটো দাঁত ভেঙে যায়।
নিচের ঠোঁট মুবারক কেটে যায়। আবদুল্লাহ ইবন শিহাব যুহরীর২২ এক আঘাতে তাঁর চেহারা মুবারক জখমী হয়ে যায়। রক্তে দাড়ি মুবারক লাল হয়ে পড়ে।
দুরাচারী ইবনু কামিয়া নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাথায় এমন জোরে আঘাত হানে যে, তাঁর লৌহ শিরস্ত্রাণের দুটো আংটা কপাল মুবারকের হাড্ডি ভেদ করে আটকে যায়।
দুশমন আবু আমির আল ফাসিক ময়দানে কিছু গোপন গর্ত খুঁড়ে রেখেছিল। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি গর্তে পড়ে যান। হযরত আলী ও হযরত তালহা রা. তাঁকে ধরে উপরে তোলেন। হযরত আবু ‘উবায়দা ইবনুল জাররাহ অগ্রসর হয়ে শিরস্ত্রাণের আংটাগুলো সরাতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু সম্ভব না হওয়ায় দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে একটি আংটা বের করলেন। এতে তাঁর একটি দাঁত পড়ে যায়। হযরত আবু বকর রা. আরেকটি আংটা বের করতে অগ্রসর হলে হযরত আবু ‘উবায়দা রা. বললেন, ‘কসম দিচ্ছি আপনাকে, আমাকে সুযোগ দিন’। দাঁতে কামড়ে ধরে তিনি আরেকটি আংটা বের করে আনলেন। এতে তাঁর আরো একটি দাঁত ভেঙে পড়ে যায়।
হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জখম থেকে গলগল করে রক্ত ঝরতে লাগল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চেহারা মুবারকের রক্ত হাত দিয়ে মুছছিলেন আর বলছিলেন, কী করে এই কওমের মঙ্গল হবে যারা নিজের নবীর চেহারাকে রক্তাক্ত করে? অথচ সেই নবী আল্লাহর দিকেই তো তাদের ডাকছেন।
মাশায়খেগণ বলেন, ঐদিন জমিনে যদি এক ফোটাও তাঁর রক্ত ঝরত, তবে আল্লাহর ক্রোধ উথলে উঠত এবং সেদিনই পৃথিবীকে ধ্বংস করে দিতেন। পৃথিবীবাসীর প্রতি অপার করুণায় ‘রহমাতুল লিল আলামীন’ জমিনে যেন রক্ত না পড়ে সেই চেষ্টা করছিলেন। হযরত মালিক ইবন সিনান রা. সামনে এগিয়ে এসে মুখে চুমুক দিয়ে সেই রক্তটুকু খেয়ে ফেললেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যার রক্ত আমার রক্তের স্পর্শ এসেছে তাকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করতে পারবে না।
নবীজীকে রক্তাক্তকারীদের পরিণাম
যারা নবীজীকে রক্তাক্ত করেছিল তাদের কাউকে আল্লাহ ছাড়েননি। হযরত হাতিব ইবন আবী বলতআ রা. বলেন, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এই অবস্থায় দেখে আমি বললাম, হে রাসূল, সে কোন দুরাচারী এই অবস্থা করল? তিনি বললেন, ‘উৎবা ইবন আবী ওয়াক্কাস। আমি বললাম, সে কোনদিকে গেছে? তিনি ইশারা করলেন। আমি দ্রুত গিয়ে তাকে পেয়ে গেলাম এবং কাবু করে তলোয়ারের এক কোপে তার মাথা ছিন্ন করে দিলাম। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কদম মুবারকে তা এনে ফেলে দিলাম। তিনি দোয়া করলেন, আল্লাহ তোমার উপর সন্তুষ্ট।২৩
কোনো কোনো বর্ণনায় আছে, এক বছরের মাথায় সে শোচনীয়ভাবে মারা পড়ে। মুহাম্মদ ইবন ইউসুফ আল ফিরয়াবী বলেন, শুনেছি তার বংশের সন্তানদের দাঁত আস্ত থাকে না।
আরেক দুশমন ইবনু কামিয়াকে কিছুদিনের ভেতর একটি পাহাড়ি ছাগল শিং দিয়ে গুঁতোতে গুঁতোতে হত্যা করে।
নবীপ্রেমের অতুল নিদর্শন
উহুদের ময়দানে সাহাবীগণ নবীপ্রেমের যে অতুলনীয় দৃষ্টান্ত রেখেছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে এর কোনো উদাহরণ নেই। হযরত মূসা আলাইহিস সালামের সাথীরা তো নির্লজ্জভাবে সাফ জবাব দিয়েছিল, ‘হে মূসা, আপনি আর আপনার আল্লাহই যেয়ে যুদ্ধ করুন, আমরা তো এখানেই বসে থাকব’। হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের সাথীরা কঠিন বিপদের সময় তাঁকে ফেলে নিজ নিজ প্রাণরক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল।
কিন্তু প্রেম-বিসর্জনের জ্বলন্ত প্রতিভূ সাহাবীগণ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ডালে-বালে, সামনে-পেছনে, চতুর্দিক থেকে নিজেদের দেহকে বর্ম বানিয়ে দুর্ভেদ্য ব্যূহ রচনা করে বেষ্টন করে রইলেন। তাঁরা কাতরভাবে বলছিলেন, হে রাসূল, আপনার দেহের আগে আমার দেহ, আপনার প্রাণের আগে আমার প্রাণ।
কাফির দুশমনরা বারবার হামলা করছিল। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এমন কে আছো, যে আমার জন্য তার জান বিক্রি করে দিবে? এই দলটিকে যে হটিয়ে দিতে পারবে সে আমার সঙ্গে থাকবে জান্নাতে।
পাশেই ছিল আনসারী সাহাবীদের একটি দল। তাঁরা এগিয়ে এলেন, একে একে সাতজন তাঁরা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য নিজের জান উৎসর্গ করে দিলেন।
নবীজীর কদমের উপর মাথা রেখে দিয়ে দিলেন জান
হযরত যিয়াদ ইবনুস সাকান সেই জানবাজদের ছিলেন একজন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হেফাজতে লড়তে লড়তে মারাত্মক আহত হয়ে পড়ে গেলেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘একে নিয়ে এসো আমার কাছে।’ তাঁকে আনা হলো, তিনি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কদম মুবারকে মাথা রেখে পড়ে গেলেন। তাঁর প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেল আর তাঁর গাল ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কদম মুবারকে স্থাপিত। চৌদ্দটি মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন ছিল তাঁর গায়ে।
আমার পিঠ আপনার বর্ম হে রাসূল
হযরত আবূ দুজানা রা. নিজের পিঠকে বর্ম বানিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন। একের পর এক তীর তাঁর পিঠে এসে আছড়ে পড়ছিল। তিনি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, একটা তীরও যেন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গা স্পর্শ করতে না পারে।
মুহাজির সাহাবী তিনজন, আর আনসারী সাহাবী পাঁচজন এই আটজন মৃত্যুশপথ নিয়ে শত্রুনধনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তাঁরা ছিলেন হযরত আলী, যুবায়ের ও তালহা রা. এবং আনসারী ছিলেন হযরত আবূ দুজানা, হারিছ ইবনুস সিম্মা, হুবাব ইবনুল মুনযির, আসিম ইবন ছাবিত ও সাহল ইবন হুনায়ফ রা.। হযরত তালহা ঢাল দিয়ে নবীজিকে আড়াল করে রেখেছিলেন। তলোয়ার-তীরের আঘাতে হযরত তালহার একটা হাত অকেজো হয়ে গিয়েছিল। আল্লাহর মর্জী, পরবর্তীতে তাদের কেউ-ই এই যুদ্ধে শহীদ হননি।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের লৌহ শিরস্ত্রাণটি এমন ছিল যে, তা মাথাসহ চেহারা মুবারকও ঢেকে ফেলেছিল। কেবল উজ্জ্বল দুটো চোখ খোলা ছিল। ফলে বিশৃঙ্খল বিপর্যস্ততায় সাধারণভাবে তাঁকে চেনা মুশকিল হচ্ছিল। ফলে সাধারণ সাহাবীগণ আরো পেরেশান হচ্ছিলেন। কা‘ব ইবন মালিক বলেন, আমি তাঁর দুটো চোখ দেখে চিনে ফেলেছিলাম। তাঁকে জীবিত দেখে যারপরনাই আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়লাম। জোরে চিৎকার করে বললাম,
‘হে মুসলিমগণ, সুসংবাদ! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো এখানে।’ তিনি তাঁর মুখে আঙুল চেপে চুপ করে থাকতে ইশারা করলেন। ইতোমধ্যে আমার আওয়াজ বিদ্যুতের ন্যায় ময়দানব্যাপী ছড়িয়ে পড়ল। সাহাবীগণ পতঙ্গের মতো এসে আশেপাশে জড়ো হতে শুরু করলেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বর্মটি আমাকে পরিয়ে দিলেন এবং আমারটি নিজে পরে নিলেন। দুশমনরা আমাকে লক্ষ্য করে তীর ছুড়তে শুরু করল। বিশটির বেশি ছিল আমার শরীরে আঘাত।


