ঘুষ ছাড়া কোন কিছুই মিলে না : টিআইবি

ঘুষ ছাড়া কোন কিছুই মিলে না : টিআইবি

পাথেয় রিপোর্ট : প্রতিবছর সরকার সংশ্লিষ্টরা দেশ থেকে দুর্নীতি ও ঘুষ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও অপ্রতিরোধ্যহারে বেড়ে চলছে দুর্নীতি ও ঘুষ। ক্ষুদ্র থেকে বৃহত্তর প্রতিটি সেক্টরই যেন ছেয়ে গেছে দুর্নীতি ও ঘুষের অভিশাপে। ঘুষ ছাড়া কোন কিছুই মিলেনা।

মোংলা বন্দর দিয়ে গাড়ি আমদানিতে ঘুষ দিতে হয় ব্যবসায়ীদের। সব নথিপত্র ঠিকঠাক থাকার পরেও একেকটি গাড়ির শুল্কায়নে মোংলা কাস্টমস হাউসের ছয়টি বিভাগে ৪ হাজার টাকা এবং সেই গাড়ি ছাড় করতে বন্দরের ১০টি স্থানে ১ হাজার ৭১৫ টাকা ঘুষ দিতে হয়।

টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘দীর্ঘ অনুসন্ধান ও গবেষণায় আমরা বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি। বন্দর দুটিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং কাস্টমসের সব পর্যায়ে শতভাগ দুর্নীতি রয়েছে। এর পক্ষে আমাদের কাছে শত শত তথ্য-প্রমাণ থাকলেও তা আইনিভাবে প্রমাণের কোনও সুযোগ টিআইবির নেই।’

তিনি বলেন, ‘যোগসাজশের মাধ্যমে বন্দরে যে দুর্নীতি হয় তা কর্তৃপক্ষের অজানা নয়। কর্তৃপক্ষ যদি দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তাহলে তা সম্ভব। শুধু যেটা দরকার তা হলো সদিচ্ছার। যারা এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে বার্তা পৌঁছে দেয়া যে দুর্নীতি করলে শাস্তি পেতে হয়।’

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। রোববার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

টিআইবির গবেষণা বলছে, কেবল গাড়ি নয়, দেশের দ্বিতীয় সমুদ্র বন্দর মোংলা দিয়ে যে কোনো পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে নিয়মবহির্ভূত অর্থ দিতে হয় ব্যবসায়ী কিংবা তাঁদের প্রতিনিধিদের। আমদানি পণ্যের প্রতি চালানের (বিল অব এন্ট্রি) বিপরীতে শুল্কায়নের জন্য কাস্টমসে ৩৫ হাজার ৭০০ টাকা ঘুষ দিতে হয়। সেই পণ্য বিকেল পাঁচটার মধ্যে ছাড় করতে হলে ৬ হাজার টাকা এবং এর পরে ছাড় করতে হলে বাড়তি ১ হাজার ২০০ টাকা ঘুষ দিতে হয়। এ ছাড়া বন্দরে প্রতিটি জাহাজ আগমন ও বহির্গমনে কাস্টমস হাউসে ৮ হাজার ৩৫০ টাকা ও বন্দর কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ২১ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়।

মোংলার পাশাপাশি বুড়িমারী স্থলবন্দর ও শুল্ক স্টেশন নিয়েও গবেষণা করেছে টিআইবি। সেখানেও পণ্য আমদানি ও রপ্তানিতে নিয়মবহির্ভূত অর্থের লেনদেন বা ঘুষের প্রমাণ পেয়েছে সংস্থাটির গবেষকেরা। এখানে আমদানি পণ্যের প্রতিটি চালানের (বিল অব এন্ট্রি) বিপরীতে শুল্ক স্টেশনে ১ হাজার ৭৫০ টাকা ঘুষ দিতে হয়। রপ্তানির বেলায় এটি দেড় হাজার টাকা। আবার আমদানি করা পণ্য ছাড় করতে স্থলবন্দরের কর্মকর্তাদের ৩০০ টাকা ঘুষ দিতে হয়। রপ্তানিতে এই ঘুষ ২০০ টাকা।

‘মোংলা বন্দর ও কাস্টম হাউস এবং বুড়িমারী স্থলবন্দর ও শুল্ক স্টেশন: আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়ায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন টিআইবির কর্মকর্তা মনজুর ই খোদা ও মো. খোরশেদ আলম।

দেশে আমদানি হওয়া গাড়ির ৬০ শতাংশ মোংলা বন্দর দিয়ে আসে। এ ছাড়া ক্লিনকার, সার, কয়লা, এলপি গ্যাস আমদানি করা হয় এই বন্দর দিয়ে। রপ্তানি হয় চিংড়ি, পাট, সিরামিক ইত্যাদি পণ্য। ২০১৬-১৭ অর্থবছর মোংলা বন্দর ২২৭ কোটি টাকা ও মোংলা কাস্টমস ৩ হাজার ৯৯ কোটি টাকা আয় করে। অন্যদিকে লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে ভারত ও ভুটান থেকে বোল্ডার, সবজিবীজ, ভুট্টা, পেঁয়াজ ইত্যাদি পণ্য আমদানি হয়। তবে আমদানি পণ্যের ৯০ শতাংশের বেশি পাথর। ২০১৬-১৭ অর্থবছর বুড়িমারী স্থলবন্দর ও শুল্ক স্টেশন ৭২ কোটি ৫০ লাখ টাকা আয় করেছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘মোংলা বন্দর ও বুড়িমারী স্থলবন্দরে যোগসাজশে ও বলপূর্বক দুর্নীতি হচ্ছে। এটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে।’
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বন্দরের এই দুর্নীতি আইনের চোখে প্রমাণিত না, যে কারণে আমরা এটাকে অভিযোগ বলছি। যারা প্রত্যক্ষভাবে দুর্নীতির শিকার হয়ে, নিজেরাও দুর্নীতির অংশীদার হয়ে যাচ্ছে তাদের তথ্য এবং অন্যান্য অংশীজন থেকে পাওয়া তথ্য নিয়ে আমরা প্রতিবেদন তৈরি করেছি। আমাদের ম্যাথলজি অনুযায়ী প্রমাণিত বিধায় আমরা এটাকে (দুর্নীতি) বলছি।’

টিআইবির এ গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরি করেন খোরশেদ আলম, মাহমুদ হাসান তালুকদার ও মনজুর-ই-খোদা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *