২৪শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৮ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৬ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

জিলহজ মাসের প্রস্তুতি: করণীয় ও বর্জনীয়

  • মুফতি মাহতাব উদ্দীন নোমান

মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে অসংখ্য অগণিত শুকরিয়া যে, তাঁর মেহেরবানীতে আমরা এই মহামারিকালেও আরো একটি জিলকদ মাস অতিক্রম করতে যাচ্ছি। চন্দ্রবর্ষ হিসেবে জিলকদ মাসের পরে সর্বশেষ আরবি মাস হলো জিলহজ। এই জিলহজ মাস আমাদের সামনে আসছে। এই মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ মাস। জাহিলি যুগেও এই মাসকে সম্মানিত মনে করা হতো। বর্বরতার যুগের নিষ্ঠুর মানুষেরা বছরের চার মাস ছাড়া বাকি আট মাস যুদ্ধ-বিদ্রোহ এবং হত্যাযজ্ঞে লেগে থাকতো। ঐ চার মাসের সম্মানার্থে তারা যুদ্ধ-বিদ্রোহ থেকে বিরত থাকতো। মাসগুলো হলো জিলকদ, জিলহজ মহররম ও রজব।

এই দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন হইতেই আল্লাহর বিধানে আল্লাহর নিকট মাস গণনায় মাস বারোটি; তন্মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস, ইহাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং ইহার মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করিও না।’ (সূরা তওবা – ৩৬)

বিদায় হজের সময় মিনা প্রান্তরে প্রদত্ত খুতবায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্মানিত মাসগুলোকে চিহ্নিত করে বলেন: ‘তিনটি মাস হলো ধারাবাহিক, জিলকদ, জিলহজ ও মহররম, অপরটি হলো রজব।’ ( বুখারী – ৩১৯৭; মুসলিম – ১৬৭৯ )

জিলহজ মাসের সম্মানের কথা স্বয়ং আল্লাহ তাআলা বর্ণনা করেছেন এবং এই মাসে সকল প্রকার পাপাচার থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিচ্ছেন। এছাড়াও এই মাসটি হজের মাসগুলোর মধ্যে একটি অন্যতম মাস। আল্লাহ তাআলা এই সম্পর্কে ইরশাদ করেন, ‘হজ হয় সুনির্দিষ্ট মাসসমূহে।’ ( সূরা বাকারা – ১৯৭ )

এর ব্যাখ্যায় হযরত আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রা:) বর্ণনা করেন, ‘শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ মাসের দশ দিন।’ ( বুখারী – ৩/৪৯০, ফাতহুল বারী – ৩/৪৯০ )

হজ ইসলামের রোকনসমূহের অন্যতম রুকন। এর মর্যাদা এবং গুরুত্ব অপরিসীম। জিলহজ মাসের ৯, ১০, ১১ ও ১২ তারিখে হজ আদায় করা হয়। যে মাসে হজ আদায় করা হয়, সেই মাসের মর্যাদাও অনেক বেশি। বিশেষ করে জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের গুরুত্ব আল্লাহ তাআলার কাছে আরও বেশি।

স্বয়ং আল্লাহ তাআলা এই দশ দিনের কসম খেয়েছেন। আর আল্লাহ তাআলা তো কোন সময় গুরুত্বহীন অনর্থক বস্তুর কসম খাবেন না। কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হচ্ছে, ‘শপথ দশ রজনীর, শপথ জোড় ও বেজোড়ের।’ ( সূরা ফাজর – ২,৩ )

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), কাতাদা ও মুজাহিদ প্রমুখ তাফসীরবিদদের মতে দশ রজনী দ্বারা জিলহজ মাসের প্রথম দশ রাত্রিকে বুঝানো হয়েছে। যার দিনগুলো সর্বোত্তম দিন বলে বিভিন্ন হাদীসে স্বীকৃত। ( তাফসীরে ইবনে কাসীর )

আর এই দশ দিনের ব্যাখ্যায় হযরত জাবের (রাঃ) বৰ্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘নিশ্চয় দশ হচ্ছে কুরবানীর মাসের দশদিন, বেজোড় হচ্ছে আরফার দিন আর জোড় হচ্ছে কুরবানির দিন।’ ( মুসনাদে আহমাদ – ৩/৩২৭, মুস্তাদরাকে হাকিম – ৪/২২০, আস-সুনানুল কুবরা লিন নাসায়ী – ৪০৮৬, ১১৬০৭, ১১৬০৮ )

জিলহজ মাসের এই দশদিনের মধ্যে নবম ও দশম দিন আল্লাহ তাআলার কাছে আরো বেশি গুরুত্ব রাখে। এ জন্য তিনি আলাদা ভাবে এই দুইদিনকে ‘জোড় ও বেজোড়’ বলে উল্লেখ করেছেন। এছাড়াও নবম দিন পবিত্র আরাফার দিন। যেদিন হাজীগণ আরাফার ময়দানে অবস্থান করেন। আর জিলহজ মাসের দশম দিন তো পবিত্র ঈদুল আজহা। যেদিন হাজীগণ সহ সমস্ত বিশ্বের মুমিনগণ আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কুরবানী করেন।

সুতরাং এই বরকতময় মাসে ইবাদত করার প্রস্তুতি আমাদের এখন থেকেই নিতে হবে। কোরআন ও হাদিসের আলোকে আমরা এই ১০ দিনের করণীয় সম্পর্কে আলোচনা করবো।

জিলহজ মাসে আমাদের​ করণীয়-

এক.
এই দশ দিনের যে কোনো আমল, সেটা নফল নামায-রোযা হোক বা যিকির-তাহাজ্জুদ, তা আল্লাহর নিকট খুবই প্রিয় ও অতি পছন্দনীয়। তাই যে কোনো নফল ইবাদত যেমন, নামায-রোযা, যিকির-তাহাজুতদ, দান-খয়রাত ইত্যাদি এই দশ দিনে করা হলে তার ফযীলত ও মর্যাদা বছরের অন্য যে কোনো সময়ে করার চেয়ে অনেক বেশি পাওয়া যাবে। তাই এই কদিন সাধ্যমতো নফল ইবাদতের প্রতিও মনোযোগী হওয়া উচিত। এই দিনগুলোতে নফল রোজা ও রাতে নফল ইবাদত করার কথা হাদীসে বিশেষ ভাবে উল্লেখ আছে। কেননা এই দশদিনের একদিনের রোজা এক বছরের রোজার সমান গণ্য করা হয় এবং এক রাতের নফল ইবাদত শবে কদরের নফল ইবাদতের সমান গণ্য করা হয়।

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, জিলহজের ১০ দিনের ইবাদত আল্লাহ তাআলার কাছে অন্য যেকোনো দিনের ইবাদতের থেকে অধিকতর প্রিয়। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আল্লাহর পথে জিহাদও কি নয়?’ তিনি উত্তরে বললেন, ‘না, আল্লাহর পথে জিহাদও নয়। তবে হ্যাঁ, যে ব্যক্তি নিজের জান-মাল নিয়ে বেরিয়েছে, তারপর ওগুলোর কিছুই নিয়ে ফিরেনি (তার কথা স্বতন্ত্র)।’ ( আবু দাউদ – ২৪৩৮ )

হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দিনগুলোতে রোযা রাখতেন। ( সুনানে আবু দাউদ – ২৪৩৭; মুসনাদে আহমদ – ২৫৯২০; সুনানে নাসায়ী – ২৪১৬ )

আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘জিলহজের ১০ দিনের ইবাদত আল্লাহ তাআলার কাছে অন্য যেকোনো দিনের ইবাদতের থেকে অধিকতর প্রিয়। এই দশদিনের একদিনের রোজা এক বছরের রোজার সমান গণ্য করা হয় এবং এক রাতের নফল ইবাদত শবে কদরের নফল ইবাদতের সমান গণ্য করা হয়।’ ( তিরমিযী – ৭৫৮, ইবনে মাজাহ – ১৭২৮, তবে হাদীসটির সনদ যাঈফ )

দুই.
জিলহজ মাসের ৯ তারিখ তথা আরাফার দিন রোজা রাখা। কেননা এই দিনে রোজা রাখার অনেক ফাজায়েল হাদীসে বর্ণিত রয়েছে। স্বয়ং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দিনে গুরুত্বসহকারে রোজা রাখতেন। ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৯ জিলহজ্জ এবং আশুরার দিন রোজা রাখতেন।’ ( আবু দাউদ – ২৪৩৭ )

আবু কাতাদা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আরাফার দিনের রোজার ব্যাপারে আমি আশাকরি যে, আল্লাহ তাআলা এর দ্বারা পূর্ববর্তী এক বছরের ও পরবর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ করে দিবেন। ( মুসলিম – ১১৬২ )

আরাফার দিন আল্লাহ তাআলা অন্যান্য দিনের তুলনায় অধিক সংখ্যক বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন। নিশ্চয়ই তিনি নিকটবর্তী হন এবং ফেরেশতাদের সামনে এদেরকে নিয়ে গর্ব করেন এবং বলেন, এরা কী চায় ? ( মুসলিম – ১৩৪৮ )

তিন.
এই দশদিন ও ১১-১২-১৩ তারিখে বেশি বেশি জিকির-আজকার করা। বেশি বেশি কালিমায়ে তাইয়্যাবা, আল হামদুলিল্লাহ ও আল্লাহু আকবার পড়া। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তিনি তাহাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু হইতে যাহা রিযিক হিসাবে দান করিয়াছেন উহার উপর নিদির্ষ্ট দিনগুলিতে আল্লাহ নাম উচ্চারণ করিতে পারে।’ ( সূরা হজ – ২৮ )

এখানে নির্দিষ্ট দিনগুলি দ্বারা জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনকে ও আইয়ামে তাশরীক তথা ১১-১২-১৩ তারিখকেও বুঝানো হয়েছে। ( তাফসীরে ইবনে কাসীর )

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলার নিকট কোনো দিনের আমল এই দশ দিনগুলির আমল অপেক্ষা বড় ও প্রিয় নয়। সুতরাং তোমরা এই দশদিনে ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহ’ ‘আল্লাহু আকবার’ এবং ‘আলহামদু লিল্লাহ’ খুব বেশী বেশী পাঠ করো।’ (মুসনাদে আহমাদ – ৫৪৪৬)

চার.
প্রত্যেক মুসল্লীর জন্য জিলহজের ৯ তারিখের ফজর হতে ১৩ তারিখের আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরয নামায আদায় করে সালাম ফিরানোর সাথে সাথে উচ্চস্বরে একবার তাকবীরে তাশরীক বলা ওয়াজিব। এই ফরজ নামাজ জামাতের সাথে পড়া হোক অথবা একাকী, আদা হোক বা কাযা, পুরুষ হোক বা নারী, মুকিম হোক বা মুসাফির সকলের উপরে এই তাকবীরে তাশরীক পড়া ওয়াজিব। ( আদ্দুররুল মুখতার – ৩/১৭৭-১৭৮ )

আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ

কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা নির্দিষ্ট সংখ্যক দিনগুলিতে আল্লাহকে স্মরণ করিবে।’ ( সূরা বাকারা – ২০৩ )

তাশরীকের দিনগুলোতে বেশি বেশি মহান আল্লাহ্‌র যিকর করতে হবে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, নির্দিষ্ট দিনগুলো’ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ১১ থেকে ১৩ যিলহাজ্জ তথা ‘আইয়ামে তাশরীকের দিনগুলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘আইয়ামে তাশরীক হচ্ছে খাওয়া, পান করা ও মহান আল্লাহ্‌কে স্মরণ করার দিন।’ ( মুসনাদ আহমাদ – ৫/৭৫, সহীহ মুসলিম – ২/৮০০ )

আইয়ামে তাশরীকের তাকবীরটি হলো এই, ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।’ হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত ইবনে মাসঊদ (রাঃ) এই দিনগুলোতে প্রত্যেক নামাযের পরে এই তাকবীর পড়তেন। ( মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা – ২/১৬৮ )

পাঁচ.
জিলহজ মাসের ১০ তারিখে সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের জন্য কুরবানি করা ওয়াজিব। অর্থাৎ স্বাধীন, মুসলমান, মুকিম এবং কুরবানির দিনগুলোতে (জিলহজ মাসের ১০-১১-১২ তারিখে) মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত যাকাতের নেসাব পরিমাণ যে কোন সম্পদ, টাকা, সোনা রুপার অলংকার বা ব্যবসায়ী পণ্য ইত্যাদির মালিক থাকলে তার উপর কুরবানি করা ওয়াজিব। ( ফাতাওয়ায়ে শামী (জাকারিয়া) ৯/৪৫২ )

নেসাবঃ ৪৭ হাজার টাকা

বর্তমানে বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ হলো ৪৭ (সাতচল্লিশ) হাজার টাকা। এটি হচ্ছে রুপার প্রতি ভরি বিক্রয়মূল্য ৯০০/- টাকা হিসাবে। তবে রুপার বিক্রয় মূল্য কম-বেশি হলে উল্লিখিত ৪৭ হাজার টাকার কমবেশি হতে পারে। নেসাব নির্ধারণে মূল ভিত্তি হচ্ছে, ৫২.৫ ভরি বা ৬১২.৩৬ গ্রাম রূপা বা এর মূল্য পরিমাণ প্রয়োজনাতিরিক্ত সম্পদ থাকা।

হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কুরবানির দিন রক্ত প্রবাহিত করা (কোরবানি করা) অপেক্ষায় বনী আদমের অন্য কোন আমল আল্লাহর নিকট অধিক পছন্দনীয় নয়। কেয়ামতের দিন কুরবানির পশু তার শিং, পশম ও খুরসহ (হাশরের ময়দানে) উপস্থিত হবে। কুরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার পূর্বে আল্লাহর নিকট তা কবুল হয়ে যায়। অতএব সন্তুষ্টচিত্তে কুরবানি করো।’ ( তিরমিযী – ১৪৯৩, ইবনে মাজাহঃ ৩১২৬ )

ছয়.
কুরবানি দাতাদের জন্য বিশেষ একটি আমল হলো তারা জিলহজ্ব মাসের চাঁদ উঠার পর থেকে কুরবানি করা পর্যন্ত তাদের কোনো চুল বা নখ কাটবে না। এই আমলটি যারা কুরবানি করতে পারে নাই তাদের জন্যও প্রযোজ্য। আশা করা যায় আল্লাহ তাআলা এই আমলের মাধ্যমে তাকে পূর্ণ একটি কুরবানির সওয়াব দিবেন।

হযরত উম্মে সালামা রা. থেকে বর্ণিত, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যার কুরবানি করার পশু রয়েছে ( কুরবানি করার ইচ্ছা আছে ) সে যেন জিলহজ মাসের চাঁদ উঠার পর থেকে কুরবানি করার আগ পর্যন্ত তার কোন চুল বা নখ না কাটে।’ ( মুসলিম – ১৯৭৭ )

আবদুল্লাহ্ ইবন ‘আমর ইবন ‘আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আমার প্রতি আযহার (১০ই জিলহজ) দিন ঈদ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাকে আল্লাহ তাআলা এই উম্মতের জন্য (ঈদ হিসেবে) নির্ধারণ করেছেন। তখন এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করে, [ইয়া রাসুলাল্লাহ]! আপনি বলুন, (যদি আমার কুরবানির পশু ক্রয়ের সামর্থ না থাকে), কিন্তু আমার কাছে এমন উষ্ট্রী বা বকরী থাকে যার দুধ পানকরার জন্য বা মাল বহন করার জন্য তা প্রতিপালন করি। আমি কি তাকে কুরবানি করতে পারি? তিনি বললেন, না। বরং তুমি তোমার মাথার চুল, নখ ও গোঁফ কেটে ফেল এবং নাভির নীচের চুল পরিষ্কার কর। এই হলো আল্লাহর নিকট তোমার পূর্ণ কুরবানী।’ (আবু দাউদ – ২৭৮৯, নাসাঈ – ৪৩৭৭)

জিলহজ মাসে আমাদের​ বর্জনীয়-

এক.
জিলহজ মাস বিশেষ চারটি সম্মানিত মাসের অন্যতম। যে গুলোর সম্মানিত হওয়ার কথা স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআনে বলেছেন। পাশাপাশি সারা বছর গুনাহ থেকে তো বিরত থাকার এবং বিশেষ করে এই মাসগুলোতে সকল প্রকার গুনাহ থেকে বিরত থাকার নির্দেশও দিয়েছেন।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন হইতেই আল্লাহর বিধানে আল্লাহর নিকট মাস গণনায় মাস বারটি; তন্মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস, ইহাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং ইহার মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করিও না।’ ( সূরা তওবা – ৩৬ )

‘সুতরাং ইহার মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করিও না’- এর ব্যাখ্যায় হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এখানে বছরের সমস্ত মাসকে বুঝানো হয়েছে। সুতরাং আল্লাহ পাকের এ উক্তির মর্মার্থ হচ্ছে, তোমরা সমস্ত মাসে পাপকার্য থেকে বিরত থাকবে, বিশেষ করে এই চার মাসে। কেননা, এগুলো বড়ই মর্যাদা সম্পন্ন মাস। এ মাসগুলোতে পাপ শাস্তির দিক দিয়ে এবং পুণ্য বা সাওয়াব প্রাপ্তির দিক দিয়ে বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। ( তাফসীরে ইবনে কাসীর )

দুই.
জিলহজ মাসের ১০ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত রোজা রাখা হারাম। কেননা এই চারদিন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বান্দাকে মেহমানদারী করানো হয়। সুতরাং যে ব্যক্তি এই চারদিন রোজা রাখল কেমন যেন আল্লাহ তাআলার মেহমানদারীকে অস্বীকার করল।

হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিন রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন। ( বুখারী – ১৮৯৭, মুসলিম – ৮২৭ ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘আইয়ামে তাশরীক হচ্ছে খাওয়া, পান করা ও মহান আল্লাহ্‌কে স্মরণ করার দিন।’ ( মুসনাদ আহমাদ – ৫/৭৫, মুসলিম – ২/৮০০ ) ‘তোমরা এই দিনগুলোতে রোজা রেখো না। কেননা এই দিনগুলো খাওয়া, পান করা ও মহান আল্লাহ্‌কে স্মরণ করার দিন।’ ( মুসনাদে আহমদ – ১০২৮৬ )

সংক্ষেপে আমাদের করণীয় ও বর্জনীয় কাজসমূহ হচ্ছে,

  • জিলহজ মাসের প্রথম ৯ দিন রোযা রাখার চেষ্টা করা
  • ৯ দিন না পারলেও অন্তত জিলহজ মাসের ৯ম তারিখ রোযা রাখার চেষ্টা করা
  • এই ৯ দিন সহ ১৩ তারিখ পর্যন্ত বেশি বেশি নফল ইবাদত করা
  • ৯ তারিখের ফজর হতে ১৩ তারিখের আসর পর্যন্ত সর্বাবস্থায় সমস্ত ফরজ নামাযের শেষে তাকবীরে তাশরীক পাঠ করা
  • কুরবানির দিনসমুহে নেসাব পরিমাণ প্রয়োজনাতিরিক্ত সম্পদের (৪৭ হাজার টাকা) মালিক হলে কুরবানী আদায় করা
  • জিলহজ মাসের শুরু থেকে কুরবানির পূর্ব পর্যন্ত চুল-দাড়ি-নখ-গোঁফ ইত্যাদি না কাটা
  • যাবতীয় পাপকর্ম থেকে বেঁচে থাকা
  • ১০ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত রোজা না রাখা

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে জিলহজ মাসের করনীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো যথাযথভাবে পালন করার তৌফিক দান করুন। আমীন।

লেখক: খতীব ও শিক্ষক

আরও পড়ুন: সন্তানের জন্মে পরিবারের দায়িত্বঃ ইসলামী দিকনির্দেশনা

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com