১৬ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ২রা আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ৫ই জিলকদ, ১৪৪২ হিজরি

জীবিত হেফাজত থেকে বিলুপ্ত হেফাজতই শ্রেয়

আমিনুল ইসলাম কাসেমী

বিলুপ্ত হেফাজত আবার তাজা হচ্ছে। নতুন করে কমিটি গঠন করা হলো। বিগত ২৫ এপ্রিল হেফাজতকে বিলুপ্ত ঘোষণা করেছিলেন কমিটির সংগ্রামী আমীর আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী সাহেব। বিলুপ্তির এক ঘন্টা পরে আবার তিনি  হেফাজতের আহবায়ক কমিটি ঘোষণা করেছিলেন। দেড়মাস পরে  আবার হেফাজতের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হলো।

তবে হেফাজতের কমিটি নিয়ে এবার কোন আকর্ষণ নেই। বিশেষ করে অধিকাংশ আলেম-উলামা হেফাজতের কর্মকান্ডের উপরে অসন্তুষ্ট। হেফাজতের অপরিপক্ক কিছু নেতার অতিমাত্রায় বাড়াবাড়ি এবং খামখেয়ালীপনায় সচেতন উলামাদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ আর সাধুবাদ জানাতে পারছে না। অনেকেই এখন ক্ষুদ্ধ হেফাজতের কর্মকান্ডের উপর। কেউ প্রকাশ্যে আর কেউ অপ্রকাশ্যে ক্ষোভ ঝাড়ছেন। হেফাজতের প্রতি উলামায়ে কেরামের ক্ষোভ সৃষ্টি হওয়ার কয়েকটি কারণ-

১. হেফাজত যদিও অরাজনৈতিক সংগঠন, কিন্তু এটাকে কতিপয় রাজনৈতিক নেতা হাইজ্যাক করে ফেলেছে। তাদের পকেটস্থ কিছু লোক হেফাজতের কমিটিতে নিয়োগ করে থাকে। বিশেষ করে রাবেতাতুল ওয়ায়েজীন নামক সংগঠনের নেতারা, যারা নাকি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। যারা আসলে মেধাবী এবং ত্যাগী তাদেরকে হেফাজত থেকে মাইনাস করে উঠতি বয়সী কিছু ওয়ায়েজ এবং অপরিপক্ব নেতাদের বেশী মুল্যায়ন করা হয়। এদেশের বহু খ্যাতিমান আলেম এবং পীর মাশায়েখদের উপেক্ষা এবং অবমূল্যায়ন করা হয়। যেটা এদেশের কোন আলেম আন্তরিক ভাবে মেনে নেয়নি।

২. হেফাজতের অপরিপক্ক নেতাদের খামখেয়ালী সিদ্ধান্ত। বিশেষ করে অরাজনৈতিক সংগঠন হওয়ার পরেও তারা রাজনৈতিক কর্মসুচি দিয়েছিল। হরতাল এবং বিক্ষোভ মিছিলের নামে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা সৃষ্টি করেছিল। যেটা হেফাজতের মান ক্ষুন্ন করে দেয়, সেই সাথে আলেম-উলামার ইজ্জত ভুলন্ঠিত হয়।

৩. হেফাজতের নেতারা নিরীহ ছাত্রদের ব্যবহার করেছে। এমনকি ছাত্রদের পরীক্ষা সামনে সেটাকে মূল্যায়ন না করে ছাত্রদের দিয়ে তারা জ্বালাও পোড়াও এবং তাণ্ডব ঘটিয়ে ছিল। যে কারণে উলামায়ে কেরাম ক্ষুদ্ধ।

৪. হেফাজত নেতাদের আহবানে ছাত্ররা ময়দানে নেমে ১৭ জন নিরীহ ছাত্র শাহাদাত বরণ করে। কিন্তু এই শহীদ পরিবারের পাশে হেফাজতের নেতাদের তেমন মজবুতির সাথে দেখা যায়নি।

৫. নিরীহ ছাত্র মরে গেল। যাদের রক্তের দাগ এখনো মুছে যায়নি। হাজারো নেতা-কর্মি জেলে গেলেন, ওদিকে হেফাজতের সবচেয়ে হম্বি-তম্বিকারী লিডার  রিফ্রেশমেন্টে চলে গেলেন। আর এমন জগা খিচুড়ি কাজ তিনি করলেন, যার দ্বারা পুরো আলেম সমাজের মুখে চুনকালি মেখে গেল। এটা কোন আলেম মেনে নেয়নি।

৬. হেফাজতের নেতার অপকর্ম এবং হঠকারীতা প্রকাশ হওয়ার পরে সাধারণ আলেম-উলামা চিন্তা করেছিল, উনাকে হয়ত সংগঠন থেকে বহিস্কার করা হবে, কিন্তু বহিস্কার না করে যখন তাকে বহাল তবিয়তে রাখা হয়, সেটা কোন আলেম ভাল চোখে দেখেনি।

৭. হেফাজত নেতার জঘন্যতম অন্যায় করার পরেও তার বারাআত সাবেত করার জন্য (নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য) হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতারা প্রেস ব্রিফিং করেছিল, যেটা অন্যায়কারীকে সাপোর্ট করা,অথচ জেলে গিয়েছে বহু মানুষ, মারা গেছে বহু ছাত্র, তাদের ব্যাপারে কথা নেই। এমন আচরণ কোন আলেম বরদাশত করেনি।

৮. হেফাজত নেতাদের নির্বুদ্ধিতার কারণে কওমী মাদ্রাসাগুলো বন্ধ হয়ে গেল। লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর লেখাপড়া বন্ধ। সেই সাথে লাখো নিরীহ এবং দরিদ্র উস্তাদগণ বিপাকে পড়ে গেছেন, যার কারণে সেই সব শিক্ষার্থী এবং ছাত্ররা চরমভাবে এখন ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

৯. হেফাজতের অনেক নেতা জেলে গিয়েছেন। সেই সাথে সারা বাংলাদেশের আলেমদের আতঙ্কে রেখে গেছেন। পুরো রমজান মাস নিরীহ আলেম-উলামারা উৎকন্ঠার মধ্যে কাটিয়েছেন। হাজারো আলেমদের চোখে ঘুম ছিল না। বহু আলেম-উলামা এখনও বাড়ি ছাড়া। পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। গ্রেফতার আতঙ্ক কাজ করছে। একারণে সেসব আলেমগণ বলে বেড়াচ্ছেন, কতিপয় হেফাজত নেতার কারণে আজ আমাদের দুর্গতি।

১০. এখনো কওমী মাদ্রাসা খোলেনি। এর সব দোষ গিয়ে পড়ছে হেফাজতের নেতাদের উপরে।  সবাই কিন্তু ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

এরকম বহু কারণ রয়েছে ক্ষুদ্ধ হওয়ার। বিশেষ করে হেফাজতের কতিপয় নেতার বাড়াবাড়িতে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে হেফাজত। মুরুব্বীদের আসনে বসিয়ে রেখে তারা মনমত কর্মকান্ড চালিয়েছিল। মুরুব্বীগণ শুধু তাকিয়ে দেখেছেন। তারা তাদের নিবৃত্ত করতে পারেননি।

হেফাজত নেতাদের কৃতকর্মের কারণে আমাদের দেশের সরকার চরমভাবে অসন্তুষ্ট হন। যার কারণে  আইন শৃংখলা বাহিনী নেতাদের গ্রেফতার করতে থাকেন। সেই সময়ে অর্থাৎ ২৫ এপ্রিল রাতে হঠাৎ মহামাণ্য আমীর আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী সাহেব হেফাজতকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে দেন। আবার ঘন্টা খানেক পরে তিনি হেফাজতের পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট আহবায়ক কমিটি ঘোষণা করেন।

সেই অবস্থায় ছিল হেফাজত এতদিন। আবার নতুন কমিটি হলো ৭ এপ্রিল সোমবার। কিন্তু কি হবে? সেই সমস্যা যেন রয়েই গেল। কমিটিতে এবার সহকারী মহাসচিব হিসাবে আল্লামা শফি (রহ.) এর সাহেবজাদা ইউসুফ মাদানীকে রাখা হয়েছে। তবে তিনি  লিখিত একটি চিরকুটের মাধ্যমে এই কমিটির প্রতি অনাস্থা দিয়েছেন। তিনি এই কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

আরও পড়ুন: রাজনীতিতে উলামায়ে দেওবন্দ

আবার অনেক আলেম-উলামা এই কমিটি আর চান না। অনেকেই এই হেফাজতের কমিটির প্রতি অনাস্থা দিয়ে ফেসবুকে ষ্টাটাস দিচ্ছেন। তাদের কথা হলো, আর এই প্রশ্নবিদ্ধ হেফাজতের প্রয়োজন নেই। হেফাজত তো অরাজনৈতিক সংগঠন। ভবিষ্যতে কখনো ইসলাম বিরোধী কাজ দেখা দিলে, তৎক্ষণাৎ আলেমদের নিয়ে কোন কমিটি বা সংগঠন  দাঁড় করায়ে প্রতিবাদ করা যেতে পারে। তাই বলে এই হেফাজতের আর প্রয়োজন নেই।

সত্যি যদি বর্তমান হেফাজতের মাধ্যমে আলেম-উলামার মাঝে বিভেদ তৈরী হয়। অশান্তি সৃষ্টি হয় মাদ্রাসা তথা দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের মাঝে, তাহলে সেই হেফাজত না থাকাটাই শ্রেয়। আল্লাহ আমাদের উপর রহম করুন। আমিন।

লেখক: শিক্ষক ও কলামিষ্ট

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com