ডায়েরির পাতায় সে-দিনটি
আশরাফ উদ্দীন রায়হান :: এভাবে হুট করে সবার সামনে কাজটি করে ফেলব তা ভাবিনি। কিন্তু হয়েই গেছে। আজ আমাদের থার্ড ওরিয়েন্টশন ছিল। ডিপার্টমেন্টের মোস্ট সিনিয়র জনাব এটিএম উবায়দুল্লাহ স্যারের প্রাণবন্ত আলোচনা ভালোই লাগেনি মনে দাগও কেটেছে। বিশেষত আমার প্রতি স্যার যে আগ্রহ দেখিয়েছেন তা থেকে আমি উৎসাহিত না হয়ে পারিনি।
তিন দিনে অলমোস্ট ১০-১২ জন টিচার লেকচার দিয়েছেন, কিন্তু ফার্স্ট বেঞ্চে বসা একমাত্র সুন্নতী লেবাসে পরিবৃত-স্টুডেন্ট আমাকে দেখে কেউই কোনো প্রশ্ন-টশ্ন করেননি; আজকে এটিএম উবায়দুল্লাহ স্যারই করলেন। প্রথমে নাম জিজ্ঞাসা ও মাদরাসার ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছি কিনা, এরপর ধর্মকর্ম করি কিনা আর “ইন্নাল্লাহা মা’আসসবিরীন”-এর অর্থ; আমি চারটি প্রশ্নের উত্তরই অকপটে ও সাবলীলভাবে দিয়েছি।
তিনি তাৎক্ষণিক আমার উদ্দেশে কিছু প্রশংসাবাক্য উচ্চারণ করলেন! তাঁর সেন্স অব হিউমার অত্যন্ত প্রখর। তাঁর কথায় : “All the teachers of your department are my student. এইমাত্র একজনকে বকে এসেছি। তো ওর নামের আগে ডক্টর ও পরে পিএইচডি আছে, আমি ওকে বলেছি : তুমি এখনও কিছুই শিখতে পারনি। তুমি কোন ডক্টর?
কবিরাজী, না হোমিওপ্যাথিক, নাকি অ্যালোপ্যাথিক? ক্লাসের শেষে স্যার আমাদেরকে প্রশ্ন করার সুযোগ দিলেন। আমি জিগ্যেস করি : স্যার, আমরা যখন বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হব তখন কি আপনার চেম্বারে গিয়ে কথা বলা যাবে?
জবাবে তিনি বললেন : হ্যাঁ, তা করা যাবে বটে তবে অামি অলওয়েজ অ্যাভেইল্যাবল থাকব না। যেহেতু মাস্টার্সের আগে তোমাদের সাথে আমার কোনো ক্লাস নেই। এক্ষেত্রে তোমরা তোমাদের কোর্সের টিচারদের সাথেই আলোচনা করো। আরেকজন জিজ্ঞেস করলো : স্যার, আপনি স্টুডেন্ট লাইফে ক্যাম্পাসে অবসর সময়ে কী করতেন? তিনি উত্তর দিলেন : সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে ছয় ঘণ্টা পড়াশোনা করতাম।
এটিএম উবায়দুল্লাহ স্যারের ক্লাস শেষ হওয়ার পর গোলাম রাব্বানী স্যার ঢুকলেন। সাথে সিনিয়র ভাইয়া-আপুরা। তো তাঁরা কালচারাল ইভেন্টের মাধ্যমে আমাদের সাথে অ্যাডজাস্ট হওয়ার চেষ্টা করছেন। ডায়াসে এসে কয়েকজন বেশকিছু নিজস্ব পছন্দের বিষয় উপস্থাপন করলো। আমিও গোপনে গোপনে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম “বিদ্রোহী” কবিতা আবৃত্তি করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেব। আচমকা আমাকে ডায়াসে গিয়ে কিছু বলার জন্য শাহীন ভাইয়া আহ্বান জানালেন। আমি তড়িৎবেগে হনহনিয়ে উঠে গেলাম ডায়াসে। বলতে শুরু করলাম : “আমি আশরাফ উদ্দীন রায়হান, কিশোরগঞ্জ থেকে এসেছি। তো আমি একজন রবীন্দ্রপ্রেমিক তথা সাহিত্যানুরাগী; তাই বলে নজরুলকে অ্যাভোইড করে চলি না। নজরুলের “বিদ্রোহী” কবিতাটি আমার খুবই প্রিয়; আমি যখন ডিপ্রেশনে ভুগতাম তখন এই “বিদ্রোহী” কবিতাটি আবৃত্তি করতাম ও এর অডিও শুনতাম। সাথে সাথে চাঞ্চল্য ও উদ্যম ফিরে পেয়ে যেতাম। এখন যতটুকু পারি ঠিক ততটুকুই আবৃত্তি করছি।”
কবিতা আবৃত্তি শেষ হবার পর খোদ নিজেই অবাক! বলেছিলাম যতটুকু পারি ঠিক ততটুকুই আবৃত্তি করছি : এখন তো দেখি পুরো কবিতাই শেষ– সঙ্গে সঙ্গে সবার কাছ থেকে অযাচিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত “বাহবা” পাওয়া। এরপর সিনিয়রদের সাথে ক্যাম্পাস ট্যুর তথা ইবলিশ চত্বর, জোহা চত্বর, প্রশাসনিক ভবন, গোল্ডেন জুবিলি টাওয়ার, প্যারিস রোড, ভিসি বাসভবন, সেন্ট্রাল লাইব্রেরি ও সেন্ট্রাল মসজিদ পরিদর্শন।
উল্লেখ্য, আমাদের সেন্ট্রাল মসজিদটি তুর্কি স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এবং খুবই সুন্দর ও চমৎকার। এখানেই যুহরের নামাজ আদায় করি। এরপর কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়াতে সবার একত্রে লাঞ্চ। লাঞ্চের পর শহীদ মিনার চত্বরে গোলাকার হয়ে বসে সিনিয়রদের প্রদত্ত তিনটি প্রশ্নের উত্তর একটি চিরকুটে লিখে বন্ধু তুনানের সাথে বাসায় চলে আসি…
২৩ জানুয়ারি ২০১৯, বুধবার
লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


