২৭শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১২ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৬ই জিলহজ, ১৪৪২ হিজরি

দাওয়াত ও তাবলিগের আন্দোলনে আল্লামা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ রহ.-এর অবদান

  • ইকরামুল হক

হযরত মাওলানা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ রহ. নিঃসন্দেহে এদেশের মানুষের জন্য একজন সংস্কারক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। বাঙ্গালী জাতিসত্তা ও মুসলিম বাংলাদেশের একজন অভিভাবক। দেশের জন্য, ধর্মের জন্য ও মানুষের জন্য তাঁর ত্যাগ ও অবদান অনস্বীকার্য। তিনি ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, একজন যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, একজন দাঈ ইলাল্লাহ। এদেশের মাটিতে ইসলাম প্রচার-প্রসারে তাঁর রয়েছে অগ্রণী ভূমিকা।

আজ আমরা বাংলাদেশে দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ এবং প্রচার-প্রসারে তিনি যে অবদান রেখেছেন, তা জানার চেষ্টা করবো।

হযরতজি ইলিয়াস কান্ধলভী রহ.-এর দাওয়াতি পদ্ধতি এই ভারত উপমহাদেশসহ পৃথিবীর দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। দাওয়াতের এই পদ্ধতি বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়ে আসছে। এই মেহনতে যে কয়টি দেশ অগ্রগামী, তার মধ্যে বাংলাদেশের নাম সবার আগে থাকবে। বাংলাদেশে যে সমস্ত আলেম ও দাঈর হাত ধরে এই দাওয়াত ও তাবলিগে প্রাণ সঞ্চারিত হয়েছে, তাঁদের মধ্যে হযরত কাজী মুতাসিম বিল্লাহ রহ. অন্যতম। কাজী সাহেব হুজুর মনেপ্রাণে তাবলিগের একজন কর্মী ছিলেন। ছিলেন একজন প্রাজ্ঞ অভিভাবক। বৃহত্তর যশোরে জন্ম নেওয়ার সুবাদে তাবলিগ ছিলো তাঁর রক্তেমাংসে মিশে থাকা একটি নাম।

কাজী সাহেব হুজুরের বাবা কাজী সাখাওয়াত হুসাইন রহ. নিজে ছিলেন একজন তাবলীগের সাথী। নিজের দাওয়াতি চেতনা পুরাটাই গ্রোথিত করে দিয়ে গেছেন পুত্রের মাঝে। কাজী সাহেব হুজুর যখন হযরত মাওলানা তাজাম্মুল আলী রহ.-এর সাথে দেওবন্দ পড়াশোনার জন্য যেতে চাইলেন, তখন তাঁর বাবা তাঁকে এই শর্ত দিলেন যে, দেওবন্দ যাওয়ার আগে তাবলিগে তিন চিল্লা সময় লাগাতে হবে। নিজামুদ্দিন গিয়ে হযরতজি ইউসুফ রহ.-এর দেখা করে দুআ নিতে হবে।

বাবার নির্দেশ মোতাবেক তিনি দেওবন্দ যাওয়ার আগে নিজামুদ্দিন যান। সেখানে গিয়ে হযরতজি ইউসুফ রহ. দেখা করেন এবং নিজের বাবার পরিচয় দেন। হযরতজি ইউসুফ রহ. তাঁকে বেশ সমাদর করেন। দীর্ঘক্ষণ সময় দেন এবং যে কয়দিন তিনি নিজামুদ্দিন ছিলেন, তাঁকে নিয়ে হযরতজি ইউসুফ রহ. একই দস্তরখানে খানা খান। তাঁর ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে হজরতজীর নির্দেশে নিজামুদ্দিনের একদল সাথীর মাধ্যমে তিনি ভিসার মেয়াদ বাড়িয়ে নিতে সক্ষম হন।

আরও পড়ুনঃ বাংলাভাষা ও সাহিত্যের দিকপাল আল্লামা কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ

হযরতজির পরম সান্নিধ্যে থেকে তাবলিগের প্রতি তাঁর মমত্ববোধ পরিপূর্ণভাবে জাগ্রত হয় এবং তাবলিগ তাঁর হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। পরবর্তীতে দেওবন্দ গিয়ে প্রত্যক্ষভাবে তাবলিগের সাথে সম্পৃক্ত হন। নিয়মিত তাবলিগের কাজের সাথে নিজেকে যুক্ত রাখেন।

দেশে ফিরে তিনি হাদীসের খেদমতের পাশাপাশি তাবলিগের মেহনতে যুক্ত থাকেন। হযরত শামসুল হক ফরীদপুরী রহ.-এর সাথে তিনি তাবলিগে সময় লাগিয়েছেন। যাত্রাবাড়ি ও মালিবাগ মাদরাসায় সাপ্তাহিক ২৪ ঘন্টার জন্য ছাত্রদেরকে তাবলিগে বের হওয়া তিনি বাধ্যতামূলক করেন। কিশোরগঞ্জ জামিয়া ইমদাদিয়ায় শিক্ষকতাকালে তিনি কিশোরগঞ্জ জুড়ে দাওয়াতের আলো ছড়িয়ে দেন। তাঁর মেহনতেই কিশোরগঞ্জের হুমেদনগর ও আশপাশের এলাকায় তাবলিগের প্রচার-প্রসার ঘটে।

এছাড়া তিনি যতগুলো মাদরাসায় অধ্যাপনার দায়িত্ব পালন করেছেন, সব জায়গায় ছাত্রদের দাওয়াতের মেহনত চালু করেছেন। ২০১০ সালে যখন জামিআ ইকরা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হয়, তখনও তিনি তাবলিগের মেহনতের জন্য জোড় দেন৷ আমরণ ‘শাইখুল জামিআ’ পদে বহাল থেকে ছাত্রদের তাবলিগের মেহনতের খোঁজখবর নেন।

হযরত কাজী মুতাসিম বিল্লাহ রহ. নিজে যেমন তাবলিগের একনিষ্ঠ কর্মি ছিলেন, তেমনি নিজের ছাত্রদের মাঝেও তাবলিগের প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর ছাত্র মাওলানা আব্দুর রহমান হাফেজ্জী বৃহত্তর মোমেনশাহীতে তাবলিগের নেতৃত্ব দিয়েছেন যুগযুগ ধরে। তাঁর আরেক ছাত্র আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দা.বা. ও তাবলিগের মেহনতের সাথে সম্পৃক্ত। নিজে তাবলিগে সময় লাগিয়েছেন। তাবলিগের দুইপক্ষের দ্বন্দ নিরসনে রেখেছেন যুগান্তকারী ভূমিকা। দেওবন্দ ও নিজামুদ্দিনের মাঝে ভুল বুঝাবুঝি নিরসনে তিনি বারবার ভারত সফর করেছেন। হযরত মাওলানা আরশাদ মাদানী দা.বা., মুফতি আবুল কাসেম নোমানি দা.বা.-সহ দেওবন্দের আলেমদের সাথে এবং তাবলিগের আমির মাওলানা সাদ কান্ধলভী দা.বা.-এর সাথে সাক্ষাৎ করে দূরত্ব ঘুঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। শেষ পর্যন্ত তিনি সফলও হয়েছেন।

কাজী সাহেব হুজুরের অনেক ছাত্র আজ তাবলিগের মেহনতের সাথে সম্পৃক্ত। তাঁর জীবদ্দশায় কাকরাইলের মাওলানা জুবায়ের সাহেবসহ অনেক দায়িত্বশীলরা যে কোন সমস্যায় হযরত কাজী সাহেব হুজুরের সাথে পরামর্শ করে পদক্ষেপ নিতেন। মোটকথা, ‘কাজী মুতাসিম বিল্লাহ’ নামটিকে বাদ দিলে এদেশে তাবলিগ আন্দোলন অপূর্ণ থেকে যায়৷

কাজী সাহেব হুজুর আজ নেই, নেই তাবলিগের অনেক মুরব্বি। কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া তাবলিগ এখনো আছে। যদিও মাঝখানে কিছু লোক তাবলিগ নিয়ে নগ্ন রাজনীতিতে মেতে উঠেছিল। স্বার্থের বসে তাবলিগকে দুফালি করে ফায়দা লুটতে চেয়েছিল, তারা সাময়িক কিছু মিষ্টফল ভোগ করলেও আজীবন এর কুফল ভোগ করবে। আগেও যেমন তারা গুমনাম ছিল, এখনো তারা হারিয়ে যাচ্ছে। তাদের কলঙ্কিত আমলনামা প্রকাশ করে দিয়ে আল্লাহ তাআলা তাবলিগকে আবার নির্ঝঞ্ঝাট করে তুলছেন। ভাগ্যিস, আমাদের মুরব্বিদের এই স্বার্থান্বেষী দ্বন্দ্ব দেখে যেতে হয়নি। আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে হেফাজত করেছেন।

হযরত মাওলানা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ রহ.-সহ যেসকল মুরব্বিরা আজ আর আমাদের মাঝে নেই, আল্লাহ তাআলা তাঁদের কবরকে নূর দিয়ে পরিপূর্ণ করে দিন। আমিন।

লেখক : কাজী সাহেব হুজুর রহ. এর ছাত্র ও তাবলিগের সালের সাথী

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com