দাড়ি ব্যবসার রকমফেরঃ আড়ং থেকে বারণ

দাড়ি ব্যবসার রকমফেরঃ আড়ং থেকে বারণ

শাহ মুহাম্মদ উয়াইমির :  গত কয়েকদিন ধরে দাড়ি ইস্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাত্রাতিরিক্ত পাগলামি চোখে পড়ছে যা খুবই বিরক্তিকর। দাড়ি নবীজী  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্যতম একটা সুন্নত। সুতরাং এই দাড়ির বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললে সেটা অবশ্যই প্রতিবাদ করতে হবে, কিন্তু প্রতিবাদ করতে যেয়ে বাড়াবাড়ি মোটেও সমীচীন নয়। সেই বাড়াবাড়িটাই গত দুইদিন ধরে দেখছি।

ফেসবুকে প্রবেশ করলেই দাড়ি বিষয়ক বিজ্ঞাপন চোখে পড়ছে। যেমন, দাড়িওয়ালাদের জন্য অমুক পন্যে ছাড়, অনলাইন কেনাকাটায় ডেলিভারি চার্জ ফ্রি ইত্যাদি। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, দাড়ি তো নবীর দুশমন ইহুদি, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরাও রাখে সুতরাং এই অফার কি তাদের জন্যও প্রযোজ্য? নাকি দাড়ির সাথে যাদের সুন্নাতি লেবাস তথা জুব্বা পাগড়ী আছে তাদের জন্য প্রযোজ্য? সত্যিকার অর্থে বিজ্ঞাপনদাতারা যদি দাড়ির প্রতি মোহাব্বত  দেখাতে যেয়ে এরকম করে থাকেন, তাহলে তাদের উচিত বিষয়টা ক্লিয়ার করা। তা না হলে বিষয়টা কেমন ফাজলামো এবং ছেলেখেলার মতো দেখায়।

আজকাল অনলাইনের ছোটখাটো খেজুর, আতর, টুপি, পাঞ্জাবি জুব্বার ব্যবসায়ীরা সফলতার জন্য ব্যবসার প্রচার প্রচারণার কলাকৌশল বের করেন। যে যত অভিনব কায়দা কৌশল বের করতে পারবে তার ব্যবসা তত সফল। তারা এই সুযোগটা কাজে লাগায়  যখন বিভিন্ন স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে  আলোচনা-সমালোচনা তুঙ্গে উঠে তখন। বিশেষ করে ধর্মীয় বিষয়ে। দাড়ি ইস্যুতে এটা বেশ চোখে পড়ছে। এই সুযোগটা যে শুধুমাত্র অনলাইন ব্যবসায়ীরা কাজে লাগায় তা না, অনলাইনে একপ্রকারের ফতোয়াবাজ আছে যারা ধর্মের নাম ইউজ করে ধর্ম ব্যবসা করে এবং জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ায়।

এরকম একজন ধর্ম ব্যবসায়ীর উদাহরণ দিচ্ছি। চলমান দাড়ি ইস্যুতে জামায়াত ঘরানার ছদ্মবেশী লেখক আরিফ আজাদ তার ফেসবুক পেজে “আড়ংয়ে চাকুরি করা জায়েজ নয়” মর্মে ফতোয়াবাজী করেছেন যদিও পরবর্তীতে সেই ফতোয়াবাজী মার্কা পোস্ট ডিলিট করে দিয়েছেন। পাছে আবার মুফতি না হয়েও উল্টাপাল্টা ফতোয়াবাজী করার কারণে আলেমরা সহ সচেতন মহল যদি আসন্ন বইমেলায় তার নতুন বই বয়কট করে বসে! ছদ্মবেশীরা চালাকচতুরই হয় বটে। পরবর্তী পোস্টে অবশ্য তিনি তার দোষ স্বীকার করেছেন এবং বলেছেন, ফতোয়া দেয়ার এখতিয়ার তার নেই বরং সেটা হচ্ছে আলেমদের কাজ। এক পোস্টে নিজের বইব্যবসায় ধ্বস নামানোর ইচ্ছা তার নেই।

যাক ভালো কথা, কিন্তু ফেসবুকে এরকম উল্টাপাল্টা ফতোয়াবাজী করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা এবং নিজ মতামতের উপর স্থির থাকতে না পেরে পোস্ট ডিলিট করে দেওয়া এসবের মানেটা কি? মোটকথা, এসব হচ্ছে ভণ্ডামি এবং এখান থেকেই মূলত অপপ্রচার, গুজব ছড়িয়ে পড়ছে সমাজের সর্বত্র এবং ধরণ দেখে মনে প্রশ্ন জাগে নাটকগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে করা হচ্ছে কি না।

তবে আশ্চর্য হলেও সত্য যে, আজকাল এসব ভণ্ডামি একশ্রেণীর মানুষের কাছে বেশ ভ্যালু পাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব নিয়ে বিশাল তোলপাড় হচ্ছে। এই তোলপাড়টাই মূলত তাদের ফায়েদা। ধর্মপ্রাণ মুসলমানের দেশে ধর্মের বিকৃতি করে আজকাল সবখানে তোলপাড় করা একদম সহজ। সব কেয়ামতের আলামত।

আমাদের সমাজে ধর্মীয় মোটিভেশনাল বক্তা এবং মোটিভেশনাল লেখকের অভাব নেই তবুও এসব বক্তৃতা এবং লেখা পড়ে মানুষের মুখ থেকে চিন্তার বলিরেখা যাচ্ছেই না। বিশেষ করে তরুণ সমাজ দিকভ্রান্ত। শান্তির পথ খুঁজছে কিন্তু দিনশেষে কোথাও শান্তির লেশমাত্র নেই। চিন্তার বেড়াজালে বন্দী সবাই । সবজায়গায় বিশৃঙ্খলা। এর একমাত্র  কারণ হচ্ছে, নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ ছেড়ে, তাঁর মহান সুন্নতি লেবাস ছেড়ে আমরা ইহুদীবাদী স্টাইলের দিকে ধাবিত হচ্ছি কিন্তু আধুনিক হচ্ছি না।

আধুনিকতা আর স্টাইল এক জিনিস নয়। নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আধুনিক ছিলেন কিন্তু স্টাইল করতেন না। দুইটা সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। সেটা আমাদের অনুধাবন করতে হবে।

আড়ংয়ে চাকুরির জন্য অযোগ্য প্রমাণিত হওয়া জনাব ইমরান এবং ভারতের বিরাট কোহলি। একজন মুসলমান আরেকজন হিন্দু কিন্তু পোশাক আশাকে কারো মধ্যে কোন তফাৎ নেই,  পার্থক্য নেই। দুইজনের কারো শরীরে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নতি লেবাস নেই সুতরাং দুইজনই সমান। সুতরাং অপমানিত তো হতেই হবে।

বর্তমানে দাড়ি একটা ফ্যাশন বা স্টাইলে পরিণত হয়েছে।  প্রকৃত শান্তি এবং সুখ খুঁজতে নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শকে পরিপূর্ণরুপে আঁকড়ে ধরতে হবে। দাড়ি রাখলাম অথচ সুন্নতি লেবাস পরলাম না তাহলে আমি প্রকৃত মুসলমান হতে পারবো না।  আজকে কতশত আন্দোলন হচ্ছে কিন্তু কোথাও সফলতা নেই। অথচ সফল হওয়ার টেকনিক নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন।

আবূ নাজীহ ইরবায ইবনে সারিয়াহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে এমন মর্মস্পর্শী বক্তৃতা শুনালেন যে, তাতে অন্তর ভীত হল এবং চোখ দিয়ে অশ্রু বয়ে গেল। সুতরাং আমরা বললাম, ‘হে আল্লাহর রসূল! এ যেন বিদায়ী ভাষণ মনে হচ্ছে। তাই আপনি আমাদেরকে অন্তিম উপদেশ দিন।’ তিনি বললেন, ‘‘আমি তোমাদেরকে আল্লাহভীতি এবং (রাষ্ট্রনেতার) কথা শোনার ও তার আনুগত্য করার উপদেশ দিচ্ছি; যদিও তোমাদের উপর কোন নিগ্রো (আফ্রিকার কৃষ্ণকায় অধিবাসী) রাষ্ট্রনেতা হয়। (স্মরণ রাখ) তোমাদের মধ্যে যে আমার পর জীবিত থাকবে, সে অনেক মতভেদ বা অনৈক্য দেখবে। সুতরাং তোমরা আমার সুন্নাত ও সুপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের রীতিকে আঁকড়ে ধরবে এবং তা দাঁত দিয়ে মজবূত ক’রে ধরে থাকবে। আর তোমরা দ্বীনে নব উদ্ভাবিত কর্মসমূহ (বিদআত) থেকে বেঁচে থাকবে। কারণ, প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা। আর নাসাঈর এক বর্ণনায় আছে, আর প্রত্যেক ভ্রষ্টতা জাহান্নামে (নিয়ে যায়)। (আবু দাঊদ ৪৬০৯, তিরমিযী ২৬৭৬, ইবনে মাজাহ ৪২)।

আজকের এই বিশৃঙ্খলাময় মুহুর্তে সফলতা পেতে হলে, মানুষের সামনে অযোগ্য, অপমানিত হওয়া থেকে বাঁচতে হলে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথামতো চলা ছাড়া দুসরা কোন পথ নেই। আসুন, আমরা নবীজী কথামতো চলি, তাহলে সফলতা আমাদের পদচুম্বন করবে ইনশাআল্লাহ।

 

লেখকঃ তরুণ আলেম

 

মতামত বিভাগে প্রকাশিত লেখার দায় লেখকের

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *