দেশব্যাপী কমেছে এসিড সন্ত্রাস

দেশব্যাপী কমেছে এসিড সন্ত্রাস

ইলিয়াছ হোসেন পাভেল : বাংলাদেশে এসিড সন্ত্রাসের ভয়াবহতা কমে গেছে। কঠোর আইন, এসিড ক্রয়-বিক্রয়ের বাধ্যতামূলক লাইসেন্স থাকার বিধান, ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির কারণেই মূলত এটি কমে আসছে। তবে ভয়ঙ্কর এ সন্ত্রাস একেবারেই নির্মূল হয়নি। এতে অনেকে এখনও উদ্বিগ্ন। প্রেম প্রত্যাখ্যান, যৌতুক, পারিবারিক বিরোধ, বৈবাহিক সমস্যা ও জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের কারণেই বেশীরভাগ এসিড সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটে।

বাংলাদেশের এসিড আক্রান্ত মানুষগুলো সরকারি-বেসরকারি সহায়তায় ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন। কেউ কেউ আবার সামাজিক নানা কাজে যুক্ত হয়ে সমাজ বদলাতে ভূমিকাও রাখছেন। এনজিও কর্মী দেবাশীষ বলেন, কয়েকবছর আগেও দেশে এসিড সন্ত্রাসের ভয়াবহ মাত্রা ছিল। এখন সেটা অনেকটাই কমে এসেছে। এর অন্যতম কারণ, এসিড অপরাধ দমনে কঠোর আইন প্রণয়ন। এছাড়া সামাজিকভাবেও মানুষ অনেক সচেতন হয়েছে।

এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশন (এএসএফ) এর পরিসংখ্যানে দেখে গেছে, ২০১০ ১৬০ জন, ২০১১ সালে ১১৮ জন, ২০১২ সালে ৯৮ জন, ২০১৩ সালে ৮৬ জন, ২০১৪ এবং ২০১৫ সালে ৭৪ জন করে, ২০১৬ সালে ৫০ জন, ২০১৭ সালে ৪৭ জন এবং ২০১৮ সালে ৮ জন এসিড আক্রান্তের শিকার হন। তবে শুধু নারী ও শিশুরাই অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার নন, এ তালিকায় নানা বয়সের পুরুষ ও শিশু রয়েছেন। বিভিন্ন বয়সী নারী, শিশু ও পুরুষরা এসিড আক্রান্তের শিকার হলেও ১ থেকে ৩৫ বছর বয়সী নারী ও পুরুষরাই বেশি ভয়াবহতার শিকার হন।

এসিড সন্ত্রাস প্রতিরোধে সরকার ২০০২ সালে ‘এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন’ ও ‘এসিড অপরাধ দমন আইন’ নামে দুটি আইন প্রণয়ন করে। আইনে বলা আছে, এসিড নিক্ষেপকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু সে আইন সঠিকভাবে মানা হয় না। এসিড সন্ত্রাস নির্মূলে কাজ করে যাওয়া বেসরকারি সংগঠনগুলো জানিয়েছে, এসিড অপরাধ দমন আইন ও এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০২ সালে প্রণীত হওয়ার পর এ সংক্রান্ত মামলা হয়েছে প্রচুর। কিন্তু বিচার কাজে ধীরগতি, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবসহ নানা কারণে এসিড সন্ত্রাস পুরোপুরি নির্মূল সম্ভব হয়নি।

মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর প্রকাশিত ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা যায়, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী ছাড়াও অ্যাসিড নিক্ষেপ করা হয়েছে পুরুষ, মেয়েশিশু ও ছেলেশিশুদের ওপর। এ সময়ে ১৬৮ জন নারী অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার হন। এর বাইরে ৪৩ জন পুরুষ, ৩৬ জন মেয়েশিশু এবং ১১ জন ছেলেশিশু অ্যাসিড সন্ত্রাসে আহত হয়। চলতি বছর জানুয়ারি মাসে দু’জন অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার হন। এর মধ্যে একজন নারী ও একজন শিশু।

এসিড সন্ত্রাসের শিকার মানুষগুলোর আত্মবিশ্বাস টলেনি। শারীরিক ক্ষত নিয়েই তারা সমাজের ক্ষত সারাচ্ছেন। সরকারি বেসরকারি নানা সহযোগিতায় তারা ফিরছেন সমাজের মূল ধারায়। তাদেরই একজন ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর উপজেলার ভবানীপুর গ্রামের মোঃ রওশন আলীর মেয়ে শামিমা। শামিমার বিয়ে হয় মাত্র ১২ বছর বয়সে ৩৫ বছরের এক চাকরিজীবী ছেলের সাথে। তখন সে সবে মাত্র ৮ম শ্রেণির ছাত্রী। চাকরিজীবী ছেলে পেয়ে অনেকটা তড়িঘড়ি করেই শামিমাকে বিয়ে দেয় তার পরিবার। বিয়ের পর থেকেই স্বামী বিভিন্নভাবে নির্যাতন করে আসছিল। ১৯৯৬ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ২টার সময় ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় শামিমাকে এসিড নিক্ষেপ করা হয়।

এসিডে তার মুখমন্ডল, চোখ, কান, নাক, ঠোঁট ও হাত ঝলসে যায়। শামিমা মৃত্যুর সাথে দীর্ঘ দুই বছর সংগ্রাম করে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠে। তারপর শুরু করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। নিজে সেলাইয়ের কাজ শুরু করেন। স্থানীয় শারীরিক প্রতিবন্ধী, দরিদ্র ও অধিকার বঞ্চিত ৪৩ জন নারী নিয়ে গড়ে তোলেন ‘ঐক্য নারী কল্যাণ সংস্থা’। শুরু হয় তার অপতিরোধ্য সংগ্রামী জীবন। শামিমার নিজ হাতে গড়া সংস্থার মাধ্যমে প্রতিদিন বøক, বাটিক, নকশী কাথা, দর্জি কাজ সেলাই প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। জীবন সংগ্রামে শামিমা এখানেই থেমে না থেকে ‘অণির্বান সমাজ কল্যাণ সংস্থা’ নামের আরও একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। কাজের মধ্যে শামিমা জীবনে আলোর সন্ধান পেয়েছে। সে আলোই শামিমা পথ দেখিয়ে চলেছেন আরো কিছু অধিকার বঞ্চিত নির্যাতিত মানুষকে।

আরেকজন কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার হাসনাবাদ ইউনিয়নের দক্ষিণ নওদাপাড়া (স্কুলের হাট) গ্রামের এসিডদগ্ধ সখিনা। সেলাই কাজ শিখে এখন স্বাবলম্বী। সেলাইয়ের কাজটা তার স্বামী কাশেমও শিখে ফেলেন। দুজনের কাজে প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০ টাকা রোজগার হতে থাকে। খরচ বাদ দিয়ে লাভ থাকে ১০০ টাকা। এর মধ্যেই কাজের ফাঁকে ফাঁকে গ্রামের অন্য মেয়েদেরও সেলাইয়ের কাজ শিখিয়ে দেন সখিনা। এখন তারাও সখিনার সঙ্গে কাজ করেন। এ গ্রামে সেলাইয়ের যত কাজ, সখিনা ছাড়া আর কাউকে দিয়ে কেউ করান না। সেলাইয়ের উপার্জন দিয়ে সখিনা একটা ছাগল কেনেন। ছাগলের সংখ্যা এখন চার। আগের ভাঙা ঘরের বদলে এখন তার দুটো টিনের ঘর। দেড় বিঘা জমি বন্ধক নিয়েছিলেন। সেই জমিতে এখন ভালো ফসল হচ্ছে। ফসল বিক্রির টাকা দিয়ে কিনেছেন ধান ভাঙানোর মেশিন। এখন নিজ বাড়িতেই ধান ভাঙানো হচ্ছে।

এসিড আক্রান্তদের সমাজের বোঝা ভাবলে চলবে না। তাদেরকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে আইনগত, কাউন্সেলিং, চিকিৎসা দিতে হবে। তা একা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। এ বিষয়ে সরকার, সমাজ ও পরিবারকে এগিয়ে আসতে হবে। এছাড়া দক্ষতা ও যোগ্যতা অনুসারে এসিড আক্রান্তদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দিতে বেসরকারি সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।

এসিড নিক্ষেপের ঘটনা কমার পেছনে ব্যাপক জনসচেতনতা, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের মধ্যকার ত্রিমুখী উদ্যোগ, কঠোর শাস্তির বিধানযুক্ত আইন কাজ করেছে। তবে গত কয়েক বছর এসিড সন্ত্রাসের তীব্রতা কমলেও তা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এর কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো এসিডের সহজ লভ্যতা, এসিড ক্রয়-বিক্রয়ের উপর নজরদারির অভাব, আইনের দীর্ঘসূত্রিতা এবং নারীর প্রতি নেতিবাচক মনোভাব ইত্যাদি। সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমেই এসিড সন্ত্রাস পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞগণের মতে, এসিড সন্ত্রাসের মামলাগুলো দ্রুত সময়ে সঠিকভাবে বিচার করলে এ অপরাধ শূন্যের কোঠার নামিয়ে আনা সম্ভব। সরকার এ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কঠোর হওয়ায় এ অপরাধের পরিমাণ অনেকটা কমেছে।

মানব সভ্যতার কলঙ্কজনক অধ্যায় হচ্ছে এসিড সন্ত্রাস। এসিড সন্ত্রাস নারীর প্রতি সহিংসতার একটি চরম রূপ এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। তবে ধীরে ধীরে যে এসিড সন্ত্রাস কমে যাচ্ছে এটা আশাব্যঞ্জক দিক। এডিস সন্ত্রাস একেবারে নির্মুলে সরকারের পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, নাগরিক সমাজ, স্বেছাসেবী সংস্থা, সাধারণ মানুষের সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।

লেখক : কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *