৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ২৮শে রবিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

নিরাপদ সড়ক বিনির্মানে ইসলাম

  • মাওলানা আবু আইমান

মহান আল্লাহ আমাদের রব। তিনি সবকিছুর মানুষের কল্যাণে তৈরি করেছেন। আল্লাহ তাআলা যত প্রাণী তৈরি করেছেন এবং তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসেবে যা প্রয়োজন, তার সবগুলোই আল্লাহ তাআলা দান করেছেন। পাশাপাশি একজন আদর্শবান ও অনুকরণীয় হিসেবে প্রেরণ করেছেন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে।

একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য হজরত মুহাম্মদের (সা.) এর পক্ষ থেকে ছিল একটি বিস্তৃত পরিকল্পনা। জনসাধারণের সকল নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পাবলিক প্লেসের নিরাপত্তার বিষয়টি ছিল সেই পরিকল্পনার একটি অনিবার্য অংশ। যা আজকের প্রবন্ধে বিভিন্নভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করব।

সময়ের পরিবর্তনে প্রতিনিয়ত জীবনের সকল দিক হচ্ছে উন্নত আর আধুনিক। একসময় মানুষ জীবনের প্রয়োজনে ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহার করত। আর প্রযুক্তির এই উৎকর্ষের যুগে জীবনকে আরো দ্রুততর গতিশীল করতে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন দ্রুতগামী যানবাহন পরিবহন। এই পরিবহন গুলো যেমন আমাদের জীবনকে করেছে আধুনিক ও সহজ ঠিক তেমনি ভাবে এই যান্ত্রিক সভ্যতা কখনো কখনো আমাদের জীবনকে করে তোলে বিষাদময়, তৈরি করে বেদনাবিধুর অধ্যায়।

যেমন পত্রিকার পাতা খুললেই প্রতিদিনের খবর হয়ে দাঁড়িয়েছে সড়ক দুর্ঘটনা। প্রতিদিন অসংখ্য পরিবার হারাচ্ছে তাদের পরিবারের কাছের মানুষদেরকে। প্রতিদিন দেখতে দেখতে এখন গুরুত্ব হারাতে শুরু করেছে এই ধরনের খবর গুলি আমাদের কাছে। যেহেতু ইসলাম সাধারন কোন ধর্ম নয় বরং একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থার নাম । একজন মানুষের জীবনের সব অধ্যায় নিয়েই কথা বলেছে ‘ইসলাম’। দিয়েছে যুগান্তকারী দিকনির্দেশনা সমাজ পরিবর্তনে রেখেছে অবিস্মরণীয় অবদান। তাই কুরআন এবং সুন্নাহর আলোকে নিরাপদ সড়ক নির্মাণে আমাদের কি করনীয় আমরা তা জানার চেষ্টা করব।

সড়কের নিরাপত্তায় আমাদের দায়িত্ব কি তা বুঝার স্বার্থে। সড়কে দেখা চরিত্র গুলি আগে বুঝে নেই। আর তা হল পথচারী, ড্রাইভার, যাত্রী, ট্রাফিক। এবার আমরা কুরআন ও সুন্নাহ এর আলোকে এই চরিত্রগুলোর ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলো।এবং সমস্যা ও সমাধানগুলো আমরা তুলে ধরব ইনশাল্লাহ।

আল্লাহ তাআলা আদেশ করেছেন, ‘এবং তোমরা আল্লাহরই ইবাদাত কর এবং তাঁর সাথে কোন বিষয়ে অংশী স্থাপন করনা; এবং মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার কর এবং আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন, দরিদ্র, সম্পর্কবিহীন প্রতিবেশী, পার্শ্ববতী সহচর ও পথিক এবং তোমাদের দাস-দাসীদের সাথেও সদ্ব্যবহার কর; নিশ্চয়ই আল্লাহ অহংকারী আত্মাভিমানীকে ভালবাসেননা।’ [সুরা নিসা: ৩৬)] উল্লিখিত আয়াতে পথচারী ও পাশের যাত্রী-সহচরদের সাথেও ভাল ব্যবহারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতের জন্য আমাদের নবী মুহাম্মদ সা আমাদের সড়কের অধিকারগুলি আদায় করতে বলেছেন, ‘রাস্তার অধিকার পূরণ করুন।’ যেহেতু তিনি জাওয়ামিউল কালিম (স্বল্প বাক্যে অধিক অর্থবোধক বাক্যের অধিকারী)। অল্প কথায় অনেক বিষয়ে তিনি বলতে পারতেন।

‘সড়কের অধিকার’ গুলি বলতে কি বুঝায়?

১। ট্রাফিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া।
২। ড্রাইভিংয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহার না করা।
৩। উল্টো পথে না চলা।
৪। দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ রাখ।
৫। কাউকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা।
৬। ইভটিজিংসহ রাস্তায় ঘটা যেকোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ও ভালো কাজে উৎসাহ প্রদান করা।

অনেক সময় অনেকের হাতে ভারী ব্যাগ থাকে বোঝা থাকে যা নিয়ে গাড়িতে উঠতে কষ্ট হয়। আবার অনেক সময় বাচ্চা থাকায় আরোহন বা নামতে অসুবিধা হয়। তখন আমরা সেই ভারি ব্যাগ/বোঝা বা বাচ্চা নিজের হাতে নিয়ে ওই ব্যক্তির কষ্টটুকু লাঘব করে দিতে পারি। এটি ও কিন্তু রাস্তার হক।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তিকে সাওয়ারিতে ওঠানো বা তার সামানা বহনে সহযোগিতা করাও একটি সদকা।’ (বুখারি : ২৮২৭)

অনেক সময় মানুষ রাস্তায় ছিনতাই চুরির শিকার হয়। অন্যান্য অনেক ধরনের বিপদের মুখোমুখি হয়। তখন এগিয়ে যাওয়াটা সেটাও রাস্তার হক। আবার কখনো কখনো অনেক পথচারী যারা রাস্তা পার হতে পারেন না তাদেরকে পারাপারের সহযোগিতা করাও রাস্তার হকের অন্তর্ভুক্ত।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মুসলমানরা পরস্পর ভাই ভাই। কেউ কারো প্রতি জুলুম করবে না এবং শত্রুর কাছে হস্তান্তর করবে না। যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করবে, আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করবেন। যে কোনো মুসলমানের একটি কষ্ট লাঘব করবে, আল্লাহ তার কিয়ামতের দিনের একটি কষ্ট লাঘব করবেন।’ (সহিহ বুখারি: ২৩১০)

অনেক সময় দেখি। ড্রাইভার একদিকে অদক্ষ-অযোগ্য অন্যদিকে ফিটনেসবিহীন গাড়ি। এই দুই মিলে রাস্তা কে একেবারে ভয়াবহ করে তুলছে। সে তার এই দুই হাত দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে যা তার নিজের জন্য ও অনিরাপদ। তার গাড়িতে ওঠা যাত্রীদের ও পথচারী সকলের জন্যই সে জীবনের জন্য সে ভয়ঙ্কর ও অনিরাপদ এক পরিস্থিতি তৈরি করে।

এই ধরণের কর্মকান্ড আল্লাহ এবং রসূলের নির্দেশ এর বিরুদ্ধে যায়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় কর এবং নিজ হাতে নিজদেরকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না। আর সুকর্ম কর। নিশ্চয় আল্লাহ সুকর্মশীলদেরকে ভালবাসেন।’ (আল বাকারা: ১৯৫)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলমান তো সে-ই, যার জবান ও হাত থেকে অন্য মুসলমানরা নিরাপদ থাকে।’ (সহিহ বুখারি : ১০)

ড্রাইভিং করার সময়, হর্ন এবং গতি কেমন হওয়া উচিত? কুরআন আমাদেরকে এভাবে নির্দেশ দেয়, ‘ভূপৃষ্ঠে দম্ভ ভরে (অহংকারী স্টাইলে) বিচরণ করনা, তুমিতো কখনই পদভরে ভূ-পৃষ্ঠ বিদীর্ণ করতে পারবেনা এবং উচ্চতায় তুমি কখনই পর্বত সমান হতে পারবেনা।’ (সুরা বানী ইসরাইল ৩৭)

হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, এক ব্যক্তি দু’টি চাদর পরিধান করে অহংকারের সাথে চলছিল। ফলে তাকে যমীনে ধসিয়ে দেওয়া হয় এবং সে কিয়ামত পর্যন্ত ধসেই যেতে থাকবে।’(মুসলিম: কিতাবুল লিবাস)

পৃথিবীতে ‘অহংকারী স্টাইলে’ হাঁটার অর্থ কী? এটি শরীরের প্রতিটি অঙ্গভঙ্গির জন্য প্রযোজ্য যা একজনের অহংকার প্রদর্শন করে এবং অন্যকে অপমান করে। যদি কেউ গাড়ি চালাচ্ছে এবং কেউ অন্যকে যেতে দেয় না বা কেউ অকারণে গাড়ির হর্ন বাজায়, তাহলে এটিও সেই ব্যক্তির মতোই যে পৃথিবীতে অহংকার নিয়ে হাঁটছে।

আক্রমণাত্মক চালকদের সাথে আচরণ প্রসঙ্গে কুরআনে আছে, ‘আর রহমানের বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং অজ্ঞ লোকেরা যখন তাদেরকে সম্বোধন করে তখন তারা বলে ‘সালাম’।’ (সুরা ফুরকান ৬৩)

পবিত্র কোরআন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্দেশনা দিয়েছে। যখন অজ্ঞ লোকেরা ভাল লোকদের সম্বোধন করে (উস্কানিমূলক আচরণ-কথা বলে)। তখন ন্যায়পরায়ণ ঈমানদার শান্তির মনোভাব নিয়ে উত্তর দেয়। আমরা যখন রাস্তায় গাড়ি চালাই, তখন আমরা এমন কিছু ড্রাইভার পাই যারা ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলে না। একইভাবে অত্যন্ত উগ্র এবং দুঃসাহসী মানুষ আছে।যারা গাড়ি চালানোর সময়, ট্রাফিক নিয়ম লঙ্ঘন করে রাস্তার উল্টো পাশে বা বিপরীত লেনে গাড়ি চালায়।

কেউ কেউ ‘নো পার্ক’ এরিয়ায় তাদের যানবাহন পার্ক করে। আর অল্পতেই যানজট তৈরি হয়। আবার কিছু মানুষ নিজেরাই ভুল করে, কিন্তু একই ভুলের জন্য অন্যদের উপদেশ দেয়। এসবই একধরনের মানসিক বিপর্যয়। যা আমাদেরকে ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

উপরে উদ্ধৃত আয়াত আমাদের শেখায় কিভাবে এই ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়; এবং আমাদেরকে কাঁটার বিপরীতে ফুল দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। নতুবা সবাই যদি ঝগড়া করি। তাহলে পরিস্থিতি কখনোই স্বাভাবিক হবে না। আর সড়ক কখনোই নিরাপদ হবে না। অনেক সময় দোষী ব্যক্তি গলা উঁচু করে কথা বলেন অথচ যিনি চুপ আছেন তিনি একেবারেই কোন অপরাধ করেন নাই। এখানে মনে রাখতে হবে যে ‘কয় সে বড় নয়, যে সয় সে বড় হয়’।

সড়কের মাঝখানে যদি কথার প্রতি উত্তর দিয়ে ঝগড়া করতে চাই।তাহলে অল্প মুহূর্তের মধ্যেই পুরো সড়কে যানজট লেগে যাবে।সেখানে এড়িয়ে যাওয়াটাই আয়াতের শিক্ষা। যেমনটা উল্লেখিত আয়াত আমাদেরকে শিখিয়েছে।

হর্ন বা বেল বাজানো। অযথা হর্ন বাজানো একদম অনুচিত। আরবরা তাদের উটের গলায় ঘণ্টা ঝুলিয়ে রাখত। যখনসবাই মিলে দলবেধে পথ অতিক্রম করতো। সেগুলোর ধ্বনি বেজে উঠতো। নবী (সা.) এটাকে অপছন্দ করতেন। আজকাল, অনেক মোটর বাইক এবং গাড়িতে এমন হর্ন আছে যা খুবই শ্রুতিবিধুর-বিরক্তিকর ও ভীতিকর। যা সুন্নাহর চেতনা পরিপন্থী। তাদের মধ্যে কেউ কেউ অকারণে হর্ন বাজায় যা অন্যদের ক্ষতি বা অসুবিধার তৈরি করে। অনেকেই হঠাৎ আঁতকে উঠেন।এমন হঠাৎ কাউকে ভয় দেখানো হারাম।

তাবেঈ ইবনে আবী লায়লা (রহ.) বলেন, আমাকে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সাহাবীগন বর্ণনা করেছেন যে- তারা (সাহাবীরা) রাসূল (সা.) এর সাথে একবার রাতে সফর করছিল। এক রাতে তাদের-ই একজন ঘুমিয়ে পড়েছিল। এমন সময় তাদের অপর সঙ্গী একটি রশির দিকে এগিয়ে গেল, যা ঐ ঘুমন্ত সাহাবীর কাছে ছিল, এরপর সে তা হাতে নিল। তখন-ই ঘুমন্ত সাহাবী ঘুম ভেঙ্গে উঠে দড়ি হাতে তার উপর আরেকজনকে দাঁড়ানো দেখে ভীষণভাবে ভয় পেয়ে গেল। তখন রাসূল(স.) বললেন, ‘কোন মুসলমানের পক্ষে হালাল নয়, যে অনর্থক অন্য মুসলমানকে ভয় দেখাবে।।’ [আবু দাউদ, মিশকাত; হাদিস নং- ৩২৭৬।।

হাঁটা বা যানবাহন চালানোর সময় গতি কেমন হবে তা পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে। সাধারণ ক্ষেত্রে সড়ক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত সকল গতি সীমা অনুসরণ করা উচিত। যদি বিপুল সংখ্যক যানবাহনের কারণে রাস্তায় যান চলাচল বা রাস্তায় দুর্ঘটনার কারণে ধীরগতি হয়, তাহলে যানবাহনকে ধীর গতিতে চালাতে হবে। তবে হ্যাঁ উল্টোটাও হতে পারে। যেমন ধরুন পরিষ্কার রাস্তায়, যদি ধীর গতিতে গাড়ি চালানো হয়। তাহলে পিছনের যানবাহনগুলির জন্য বিষয়টি অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে।সেখানে অবশ্যই সড়ক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গতিসীমা অনুসরণ করে দ্রুত চালানো উচিত।

এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআন বলছে, ‘আর রহমানের বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং অজ্ঞ লোকেরা যখন তাদেরকে সম্বোধন করে তখন তারা বলে ‘সালাম’।’ (সুরা ফুরকান ৬৩) ‘নম্রতার সাথে চলার’ মানে হল একজনের গাড়ি মাঝারি গতিতে চালানো এবং অন্যরা যাদের খুব তারা আছে। তাদেরকে আগে যাওয়ার সুযোগ দেয়া ।

আসুন এবার সড়কে নবীজি (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের হাটা ও ড্রাইভিং (উট পরিচালনার) অনন্য উদাহরণ দেখি। ভ্রমণের সময়, রাসুল (সা.) এর সাহাবীরা তাঁর সামনে হাঁটতেন না। শুধুমাত্র যেখানে কোন বিপদ বা সামনে থেকে শত্রুদের আক্রমণ করার ভয় ছিল সেখানেই সামনে থাকতেন। কেন সামনে থাকতেন না? উদ্দেশ্য ছিল রাসূল (সা) এর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা।

‍‍‌‍”নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতের জন্য আমাদের নবী মুহাম্মদ সা আমাদের সড়কের অধিকারগুলি আদায় করতে বলেছেন, ‘রাস্তার অধিকার পূরণ করুন।’‍‌‍‍”

একবার আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) এর উট পথভ্রষ্ট ছিল এবং নবীর উটকে ছাড়িয়ে গেল। অন্যান্য সাহাবীরা বিষয়টিকে নেতিবাচকভাবে নিয়েছিলেন এবং ওমর (রা.) তার সন্তানকে ভবিষ্যতের জন্য এমনটা না করে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু নবী (সা.) এটাকে নেতিবাচকভাবে নেননি এবং ওমর (রা.) কে সংযত করেন।

ওমর বিন যায়েদ (রা.) বিদায় হজের যে দৃশ্য তুলে ধরেছেন। তাতে তিনি রাসুল (সা.) এর হাঁটার গতি বর্ণনা এভাবে করেছেন। যে,যখন পথ পরিষ্কার ছিল। রাসুল (সাঃ) দ্রুত গতিতে হাঁটতেন। অন্যথায়, তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতেন। (বুখারী)

অতিরিক্ত গতিকে আল্লাহর রাসুল অপছন্দ করতেন।এমনকি নামাজ যাওয়ার ক্ষেত্রেও গতিসীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যখন নামাজের ইকামাত দেয়া হয়, তখন তোমরা নামাজের জন্য দৌড়ে যেও না। বরং ধীরস্থির ও শান্তভাবে যাও। অতঃপর নামাজের যতটুকু পাবে তা আদায় করবে আর যে টুকু ছুটে যাবে সে টুকু আদায় করবে। নিশ্চয়ই তোমাদের কেউ যখন নামাজের জন্য ইচ্ছা করে চলতে থাকে তখন সে নামাজ অবস্থাতেই আছে বলে ধরা হয়।’(বুখারি ও মুসলিম)

তাড়াহুড়া বা দ্রুতগতি এটা মানুষের সৃষ্টিগত বিষয় হলেও একটি নিন্দনীয় স্বভাব। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘মানুষ সৃষ্টিগতভাবে তাড়াহুড়াপ্রবণ, অচিরেই আমি তোমাদের আমার নিদর্শনাবলি দেখাব; কাজেই তোমরা তাড়াহুড়া কর না।’ (সুরা আম্বিয়া : ৩৭)

কোরআনের অন্যত্র এটাকে মানুষের দুর্বলতারূপে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘মানুষ অত্যন্ত তাড়াহুড়োপ্রবণ।’ (সুরা বনি ইসরাইল : ১১)

তাড়াহুড়া অনেক সময় ক্ষতি ডেকে আনে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ধৈর্য ও স্থিরতা আল্লাহর পক্ষ থেকে আর তাড়াহুড়া শয়তানের পক্ষ থেকে।’ (তিরমিজি : ২০১২)

যত্রতত্র পার্কিং ও সড়ক দখলের অনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং নিষিদ্ধ স্থানে যানবাহন পার্ক করাও অগ্রহণযোগ্য। গাড়িচালক এবং পথচারীদের একে অপরকে সম্মান করা উচিত; বিশেষ করে নারী, বৃদ্ধ এবং শিশুরা দোকান-বাড়ির সামনে যে ফুটপাত তা ব্যবহার করে।অনেক সময় আমরা আমাদের গাড়ি-মোটরবাইক গুলো সেখানে পার্ক করলে তাদের হাটতে কষ্ট হয়। আর যেকোনো কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেয়া ঈমানের অংশ। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেছেন, ‘পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করা’ (মুসনাদ আহমেদ)

যেহেতু আমরা আগেই উল্লেখ করেছি নবীজি ছিলেন জাওয়ামিউল কালিম। অল্প বাক্যে তিনি অনেক কথা বলতে পারতেন। নবীজি এই হাদিসে শুধুমাত্র ‘কষ্টদায়ক’ একটা শব্দ ব্যবহার করে বহু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। যেমন অনেক দোকানদার আছেন দোকানের সামনে পন্যের পসরা সাজিয়ে রাখেন।যেখানে মানুষ হাঁটাচলা করার জায়গা ছিল সে জায়গাটা দখল করে রাখেন অনেকেই অনাকাঙ্ক্ষিত কষ্ট দেয়। এসব কষ্টইদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া ঈমানী দায়িত্ব।

অনেক সময় আমরা দেখি বাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করতে গিয়ে সড়ক দখল করা হয় এবং অবৈধভাবে ফুটপাতের মধ্যে বিভিন্ন দোকান বসে। সেই স্থানগুলোকে দখলমুক্ত করতে গিয়ে বিভিন্ন সময় পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় ও দখলমুক্ত করা যায়না বিভিন্ন অদৃশ্য চাপের কারণে। অথচ এই ধরণের সড়ক দখল করা ইসলামের দৃষ্টিতে যেমন অন্যায়। তেমনভাবে মানুষের জন্য নিরাপদ সড়ক নির্মাণে ভূমিকা রাখা ও সওয়াবের কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘একবার রাস্তার ওপর একটি গাছের ডাল পড়ে ছিল, যা মানুষের জন্য কষ্টদায়ক ছিল, অতঃপর এক লোক তা সরিয়ে দিল। এর ফলে আল্লাহ তাকে জান্নাত দান করেছেন।’ (সহিহ বুখারি : ৬২৪)

আলোচ্য প্রবন্ধে স্পষ্ট হলো যে, গাড়ি চালানোর সময় বা রাস্তায় হাঁটার সময় আমাদের অবশ্যই ধৈর্য, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা, নম্রতা অবলম্বন করতে হবে। আমাদের অবশ্যই ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে সমস্ত ট্র্যাফিক নিয়ম এবং বিধি মেনে চলতে হবে এবং রাস্তাঘাট বা ফুটপাতে সর্বদা একে অপরকে সম্মান করতে হবে। আল্লাহ তাআলা ভাল কাজে আমাদের সবাইকে এক হয়ে কাজ করার আদেশ দিয়েছেন।

‘হে মুমিনগণ! সৎকর্ম ও খোদাভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা কঠোর শাস্তিদাতা।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ০২)

নিরাপদ সড়ক বিনির্মাণ সরকারের একার পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়। আপনি, আমি, প্রশাসন ও সরকারের সবাই মিলেই পারি একটি সুন্দর ও নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে। আসুন সবাই মিলে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে কাজ করি।আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাওফিক দান করুন। আমিন

লেখক: খতীব, আল্লামা জালালুদ্দিন রুমি (রহ.) জামে মসজিদ, চট্টগ্রাম

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com