১০ই আগস্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ২৬শে শ্রাবণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ১১ই মহর্‌রম, ১৪৪৪ হিজরি

পথ, পাথর ও ফুল

  • কাউসার মাহমুদ

পথ:

বিস্মৃত প্রতিটি পদক্ষেপ—আমাদেরই তিরোহিত অতীতের অনুবর্তিতা। যত লক্ষ ক্রোশই অতিক্রান্ত করে আসি না কেন, সমস্ত ঘুরে ওই একটিমাত্র বিস্ময় আকীর্ণ পথের ধারেই থামতে হয়। এত কোলাহল, এত বিজড়িত শব্দের উলুধ্বনি জীবনে—তবু কোনোদিনই পথের মায়া ত্যাগ করা যায় না। যেন শুরু শেষ, আদি অন্ত সবটাজুড়ে আমাদের যে পরিভ্রমণ—তাতে এ পথই একমাত্র নিখাঁদ বন্ধু। ফলে সংসারের দীর্ঘ এ যাত্রায় পথেপথে ডালা ভরা আনন্দ এলে, সেইসাথে অঞ্জলিভরা দুঃখও আসে ঢের।

অপরূপ দৃশ্যের মুখোমুখি হলে, দৈবাৎ কি’বা প্রায়শই বিরূপ চিত্র-চরিত্রের সাক্ষাতও মেলে এ পথেই। যেন এমন যে, অচৈতন্যের মত পৃথিবীর বুকে ঘুরছি, ঔদাস্য ঘিরে রাখা একটা আশ্চর্য যাপনের মধ্যে বেঁচে আছি। অথচ, যে পথে ফেলে আসা পদচ্ছাপের গভীর অঙ্কিত দাগ এখনও অমলিন, এখনও অগ্নিবাণের মত জ্বলজ্বলে রঙীন—সেই পথ, সেই স্মৃতিময় ধুলোপড়া সরণির সমূহ ছায়া, মনোলোভা আভা থেকে সম্পূর্ণ গৃহশূন্য।

প্রকৃত এ এক অজ্ঞতা : যা এমন বেখেয়ালি যে, নিজের হৃদয় থেকে স্বেচ্ছায় মুছে ফেলা হয়। যদিও সমস্ত জীবনধরে স্বেচ্ছা বা অনিচ্ছায় মানুষ এ পথের কাছেই আনত থাকে। বারবার ফিরে আসে। সুতরাং এ পথই মূলত মানুষের এমন অলঙ্ঘ্য এক দরজা; জন্মের আশীর্বাদে যাতে পৃথিবীতে আসা, তারপর কেবল ওই নির্দিষ্ট পরলোকই এর শান্ত সমাপ্তি।

তাই আজকাল এমন হয়েছে, যখনই কোনো রাস্তা অতিক্রম করে যাই—অদৃশ্য এক বিভ্রম ঘিরে ধরে। আনমনা হয়ে ভাবি, এই পথ পৃথিবীর কোন দিকে চলে গেছে? কোথায়ইবা এর শেষ! কত মানুষ, পশুপাখি, যান্ত্রিক গাড়ি এই পথ মাড়িয়ে গেছে! যারা গেছে তাদের কেউকেউ বোধহয় এই পথে আসাযাওয়া করে। বিপরীতে যারা একবারই পেড়িয়ে গেছে— হয়তো কোনোদিনই এইখানে, এই ধূসর রাস্তার প্রাণহীন নির্জনতায় ফিরবে না। আহা! কারো না ফেরার মত এতোটা করুণ, এমন বিষন্নতা—বোধকরি কোনো শুন্যতা, কোনো বিমর্ষতার মাঝেই নেই।

মূলত মানুষ তো চলেই যায়। পথেরাও বহু যুগ, বহু শতাব্দী অতিবাহিত করে বৃদ্ধ হয়। কিন্তু মানুষ ও পথের এই যে নিবিড় জড়াজড়ি—তাই জ্বাজ্জল্য হয়ে থাকে। তাই অঙ্কিত হয় বিস্মৃতির অমল অন্ধকারে। কোনোদিন অস্তমান সূর্যের ম্রিয়মাণ আলোটি দেখতে দেখতে সে কথা মনে পড়ে৷ অথবা কোনো অবোধ্য চিত্রের দ্বিধাজড়িত একটি ভাবালুতাই আমাদের সম্মুখে তা প্রস্ফুট করে তোলে। যেন এমন যে, অতিক্রান্ত সেইসব মধুময় স্মৃতিগুলো আমরা ধূপছায়ার মতো দেখছি। কিন্তু আমাদেরই চোখের কিনারে জেগে থাকা অস্পৃশ্য দুঃখের মতো তা স্পর্শ করতে পারি না।

পাথর:

এ এক আশ্চর্য মনোযোগই বলা চলে। শক্তিমান সংলাপের মতো এর শব্দরা প্রভাস্বর। যেন যখনই বিকেলে খানিক পায়চারি করতে বেরুই, কিংবা প্রবল অধ্যবসায় বাড়ির সম্মুখে দণ্ডায়মান পাহাড়টির চূড়ায় উঠে কোনো একটি পাথরের ওপর স্থির বসি—তখন, হ্যাঁ ঠিক তখনই, এমনকি যতবার পাথরের নিকটবর্তী হই; প্রতিবার মস্তিস্কের তাবৎ অনুবল কেড়ে নিয়ে আবুল হাসানের ওই একটি লাইনই বাজতে থাকে, ‘সে এক পাথর আছে কেবলি লাবণ্য ধরে, উজ্জ্বলতা ধরে আদ্র, মায়াবী করুণ।’

কোনো কোনোদিন তা এমনই প্রবলভাবে বাজে, এরপর আর স্থির থাকতে পারি না। জায়গা বদলাই, হাঁটি, এখানে ওখানে বসি। পাহাড়ের খাঁজকাটা অমসৃণ ঢালু পথ বেয়ে যে কটি সবুজ ঘাস গজিয়েছে, তাই দেখে ফিরে আসি। যেন অস্থির অপ্রকাশ্য ভীষণ এক মনোবেদনা গম্ভীর জড়িয়ে ধরে। দীর্ঘকায় পাথরসমূহের অতিশয় দৃশ্যাবলী এমনই প্রতাপী; যা দেখে মনের অচঞ্চল অবস্থাটি আরো ঘনিয়ে ওঠে। এসময় অবস রমণীর মত একদৃষ্টে চেয়ে থাকি পাথরের দিকে। যদিও এই দৃষ্টিপাত অবসন্ন, কিন্তু এর যে গভীর মনোযোগ—কখনও কখনও তা প্রস্তরীভূত শরীরের বিবিধ কারুকাজ আবিস্কার করে ফেলে। তখন মনে হয়, কত রঙ কত আঁকিবুঁকি তাতে খোদাই হয়ে আছে৷ বন, বৃক্ষ, তরুলতার সাথে কত জনযুদ্ধ, কত বীরবাহুর রক্তবিন্দু, ঢাল-তলোয়ার সম্ভ্রমে অঙ্কন করা হয়েছে। ভারি আশ্চর্য লাগে এসবে!

মূলত কোনো বস্তুর দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকার এই এক আনন্দ বটে। কল্পনার দেউরিতে যাকিছু আসে, এর সবই একটা অস্পৃশ্য দুর্বোধ্য চিত্রের আকারে চোখের ওপরে ছেয়ে যায়। তারপর একটি পলকের অপেক্ষা মাত্র। আখিঁ দুটি এক হলো, অমনি সমস্ত ভেঙেচুরে কোনো পরাবাস্তব জগতে তা আমূল অদৃশ্য হয়ে গেল!

এছাড়াও আরো কত কী আশ্চর্য ঘটনা ধরে রাখে এই সংঘবদ্ধ পাথরের বিরাট চাতাল—তা যতোটা না বর্ণনার; তারচেয়ে অধিক চাক্ষুস দর্শন ও উপলব্ধির। যেমন একবার হলো কী, আমাদের এই জরাজীর্ণ দালানটির স্নানাগার, হেঁসেল, মসজিদ, দোকানপাট সমস্তই যেহেতু মিউনিসিপালিটির সরাসরি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পাইপটির সাথে সংযুক্ত নয়; তাই প্রায়শই এ নিয়ে বিশ্রী, নোংরা এক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। কোনোক্রমে একবার পাইপের মুখ আটকে গেলে, দিন দুই দাঁতমুখ চেপে এরই যন্ত্রণা ভোগ করা লাগে। এই নিয়ে কত কী আলাপ হলো! কিভাবে এর একটা বিহিত করা যায় তাই নিয়ে বহু কথা চললো।

অবশেষে বিস্তর ভেবেচিন্তে এই সিদ্ধান্ত হয়: একটা মোটর বসিয়ে, ওই দিয়ে জলনিষ্কাশন করা হবে পাহাড়ের ওপরে। কিন্তু হায়! এই প্রস্তরে কোথায়ইবা জল যাবে। যেখানেই ফেলা হয় তা আর নীচে যায় না। পাহাড়ের গা বেঁয়ে, নোংরা কটুগন্ধ নিয়ে বরাবর নেমে আসে রাস্তায়। মোটকথা যাচ্ছেতাই অবস্থা। এই যখন হাল; শেষতক দালানের মালিক-সৌদি বেটা নিয়ে এলো বোমাবারুদ। চারপাশ বন্ধ করে ওই ফাটালো একদিন। কিন্তু অবস্থা অপরিবর্তনীয়। এই প্রবল প্রতাপ ভেঙ্গে এক টুকরো সুরঙ্গ বের করার জো নেই কারো। সমস্ত জায়গাজুড়ে শুধু পাথর আর পাথর। সুতরাং রণ ভঙ্গ দিয়ে সেখানেই কাজ বন্ধ হয়। এর কয়েক বছর পরের ঘটনা : আমারই খালাতো ভাই। কার ওয়াশের দোকান চালায় সে।

একদিকে জল কিনে আনে তো অন্যদিকে পয়সা দিয়ে আবার তা ফেলবারও মুসিবত। দেখা যায় হপ্তা না যেতেই গাড়ি ধোয়ার জল ফেলতে আরও শ খানেক রিয়াল লাগে। এ অবস্থায়, একরকম দিশেহারা হয়েই সে ঐ নিষ্কর্ম পড়ে থাকা মোটরখানা নিয়ে বসে। গোছগাছ করে আমাকে সঙ্গে নয়ে পাহাড়ে ওঠে একদিন। অসংখ্য পাথরের সঙ্কুচিত ফাটল পরখ করে অবশেষে একটি জায়গা মেলে। তার চারিধারজুড়ে কিছু আগাছা বেড়ে উঠেছে।

বৃহৎ দুটি বাবলার গাছও আছে নিকটেই। যেন বৃষ্টি পেয়ে অনিচ্ছায় বেড়ে উঠেছে তারা। সেখানে সেই অন্ধকার, সংকীর্ণ পাথরের ফাটলে আমরা আমাদের পাইপটা বসালাম। সেই থেকে আজ অবধি তিন বৎসর হতে চললো। ওই সঙ্কুচিত সুরঙ্গের বাইরে কোনোদিন একফোঁটা জল গড়াতে দেখিনি। রোজ এত এত মানুষের ব্যবহৃত সেই অজস্র জল কোথায় যে যায়? তার হদিস পাইনি। তাই এখানকার লোকমুখে আজকাল শোনা যায়, একশ বৎসর আগে এই পর্বতের পূব পার্শ্বে গামেদি গোত্রের নির্জন এক কূপ ছিল। পাথরের ফাটল থেকে সুরঙ্গটি সোজা ওই প্রাচীন কূপটির মুখেই গিয়ে ঠেকেছে বোধহয়!

ফুল:

কী নাম গো তোমার সখী? কেন যে এভাবে ফুটে থাকো, কেন যে অমন বর্ণিল পাপড়ি মেলে সেজে থাকো, বুঝি না! তোমার নাম কি মায়াবতী, বিমুগ্ধা, অমরাবতী? তুমি কি স্বর্গের বিস্ময়! অবতার, অপ্সরীদের নন্দন নোলক! নাকি মর্ত্যের বুকে বিধাতার পাঠানো সমস্ত সুন্দরের প্রতীক! তুমি কি খুবই পলকা, নাজুক লহরির মত অমনই বিষন্ন মোলায়েম! তুমি বুঝি এর সবই অথবা ব্যখ্যারও অধিক তোমার প্রকৃত স্বরুপ।

নইলে কেন এমন নিস্তেজ হয়ে পড়ি? তোমার সম্মুখে দাঁড়ালে কেন এই বিশ্রাম ঘিরে ধরে? যেন অনন্তকাল ধরে তোমারই ঠোঁটের দিকে নির্বাক তাকিয়ে থাকি। ভাবি, এই শোভা এই বিশুদ্ধ অবয়ব কোথা থেকে পেলে! কোথা থেকে এলো তোমার এই বাহারি রঙ! তোমার বুকের কাছে এত প্রজাপতি, এত ফড়িঙেরা এসে ঘুরে যায়—তুমি কি তাদের মাতা, বোন, সহধর্মিণী?

তুমি কি নৃত্য করো, ভৈরবী গাও? নইলে তোমার অবয়বজুড়ে এই যে নৃত্যসঙ্গীত—কোথা থেকে আসে এর সুর! বাতাস পেলেই তুমি মগ্ন হও। সমস্ত দেহ মেলে আলোর তলে ঘুমিয়ে পড়ো। শান্ত বায়ুর কোলে ঢলে ঢলে কী করে পাঠাও ওই রাগিণীর সুর, সুগন্ধ ও নির্ভার মমতা।

  • লেখক: কবি ও অনুবাদক

 

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com