৩রা ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ২৭শে রবিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

পালিত বেয়াদবদের কাছে এক অসহায় বাবুনগরী

শাহ মুহাম্মদ উয়াইমির ❑ ‘কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডগুলোর কেন্দ্রীয় পরীক্ষা চলছে। বোর্ড পরীক্ষা ছাড়াও প্রতিটি কওমী মাদ্রাসায় সালানা এমতেহান চলছে। আর একথা বলতে দ্বিধা নেই যে, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মৌলিক কর্মী কওমী মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষক। ঠিক এই সময়ে মোদি বিরোধী আন্দোলনে যারা রাজপথে হেফাজতের কর্মসূচি চাচ্ছেন, বুঝতে পারছি না তারা কোন যুক্তিতে এই বিষয়টা নিয়ে ফেতনা ছড়াচ্ছেন।’

উপরের কথাগুলো মুফতি সালাহউদ্দিন মাসুদ নামক জনৈক ফেসবুক আলেমের। কয়েকদিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি এই আশংকা প্রকাশ করেছেন। আশংকার কারণ তৃতীয় পক্ষ। ফেসবুকার আলেম মুফতি সালাহউদ্দিন মাসুদ হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব, বলিষ্ঠ ওয়ায়েজ মাওলানা মামুনুল হকের ঘনিষ্ঠ একজন মানুষ। তিনি অনেকদিন পরে হলেও বাস্তব কথাটি অকপটে স্বীকার করেছেন। অথচ এতোদিন হেফাজত নেতারা উঁচু গলায় বলে এসেছেন, তৌহিদি জনতাই হেফাজতের কর্মী। তবে শাল্লার ঘটনার পর তৌহিদী জনতাকে অস্বীকার করেছে হেফাজত।

হেফাজতে ইসলামের জন্মলগ্ন থেকেই তাদের মিটিং, মিছিল আন্দোলনের মূল চালিকা শক্তি কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। যার বাস্তব প্রমাণ ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের আন্দোলন। বাস ট্রাক ভর্তি করে সারা বাংলাদেশের কওমী মাদ্রাসা ছাত্রদেরকে মতিঝিলে জড়ো করা হয়েছিলো। সেখানে নাবালক শিশুদের উপস্থিতিও ছিলো চোখে পড়ার মতো যা আন্দোলনের পরেরদিন ভোরবেলা কয়েকটা টেলিভিশনের ক্যামেরায় ধরা পড়ে। যেসব মাদ্রাসা তাদের সংবিধান অনুযায়ী ঐ দিনের আন্দোলনে সাড়া দেয়নি তাদেরকে আওয়ামী লীগের দালাল বলে কোনঠাসা করে রাখা সহ অনেক হয়রানি করা হয়েছে।

গত ২৭ মার্চ হেফাজতে ইসলাম হরতাল ডেকে ত্রাস সৃষ্টি করেছে সারা বাংলাদেশে। একটা অরাজনৈতিক দল হরতাল ডাকতে পারে কি না অথবা সেই অধিকার তাদের আছে কি না সেই আলাপে আমি যাচ্ছি না। বলতে চাচ্ছি, হেফাজত হরতাল ডেকেছে এবং পালনও করছে কিন্তু তাদের কর্মী ছিলো কারা? মুফতি সালাহউদ্দিন মাসুদ তো স্বীকার করেছেন হেফাজতে ইসলামের মৌলিক কর্মী মাদ্রাসার ছাত্র শিক্ষকরা সুতরাং ২৭ মার্চের হরতাল কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদেরকেই করতে হয়েছে।

হরতালে দেখলাম ছোট ছোট ছাত্রদেরকে দিয়ে রাস্তায় বেঞ্জের উপর কুরআন শরীফ রেখে গাড়ি চলাচল বন্ধ করা হয়েছে।

ফলাফল, ১৯ জন নিরস্ত্র ছাত্রের লাশ আমাদেরকে দেখতে হলো। খুবই দুঃখজনক। কোমলমতি শিশুদেরকে রাজপথে হরতাল পালন করানোর জন্য নামানো হলো অথচ হরতাল কাকে বলে সেটাই ভালোমতো জানে না তারা। কওমি মাদ্রাসায় পড়ুয়ারা বেশিরভাগই দরিদ্র মানুষের ছেলে। হুজুরের নির্দেশ অমান্য করে জাহান্নামে যাওয়ার মতো সাহস তাদের নেই।যেকারণে পড়ালেখা বাদ দিয়ে রাজপথে নামতে একপ্রকার বাধ্য। ২৬ মার্চ হাটহাজারী আন্দোলনে একটা আট নয় বছর বয়সী ছেলের চোখ আহত হওয়ার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। বেশভূষায় মনে হয়েছে, ঐ ছাত্র কোন এক দিনমজুরের ছেলে। যার আর্থিক শক্তি নেই এই ঘটনার বিচার চাওয়ার মতো। আর হুযুরদের বিরুদ্ধে বললে তো জাহান্নামের টিকেট নিশ্চিত।

অনেকেই ফেসবুক প্রোফাইলে ছবিটা দিয়ে ছেলেটার প্রতি সহমর্মিতা দেখিয়ে সরকারের সমালোচনা করছেন অথচ ঐ ছেলেটাকে ‘আলিফ’ ‘বা’ পড়ার টেবিল থেকে উঠিয়ে রাজপথে যারা নামালো তাদের কোন সমালোচনা করছেন না। ২৭ মার্চের হরতালে দেখলাম ছোট ছোট ছাত্রদেরকে দিয়ে রাস্তায় বেঞ্জের উপর কুরআন শরীফ রেখে গাড়ি চলাচল বন্ধ করা হয়েছে। যেসব শিক্ষিত মানুষের ছেলে কওমী মাদ্রাসায় পড়ে তারা আগেভাগে হুজুরদেরকে বলে দেয়, আমার ছেলেকে যেন মাদ্রাসার বাহিরে যেতে না দেওয়া হয় অথবা তারা আন্দোলনের আগেভাগে ছেলেদেরকে বাসায় নিয়ে যান। আমি যেহেতু একটা কওমি মাদ্রাসার দায়িত্বে আছি সুতরাং এসব আমার নিজ চোখে দেখা। দরিদ্র ঘরের ছেলেদেরকেই হেফাজত নেতারা বারবার মাঠে নামাচ্ছেন এবং মার খাওয়াচ্ছেন।

২০১৩ সাল থেকে নিয়ে আজতক হেফাজতে ইসলাম অনেকগুলো আন্দোলন করেছে। আন্দোলনে নেমে হেফাজত নেতাদের একজন ছেলে হতাহত হয়েছে বা সামান্য ব্যাথা পেয়েছে এমন কোন খবর দেখা যায়নি বরং এক নেতা গ্রেফতারের ভয়ে লন্ডনে যেয়ে হেফাজতের নামে ভিক্ষাবৃত্তি করে সেগুলো নিজের পেটে চালান করে দিয়েছেন এমন খবর এসেছে।

হেফাজতে ইসলামের ইতিহাস ঘাটলে ভালোর চাইতে মন্দের পাল্লাটাই ভারী বেশি থাকবে। কোমলমতি ছাত্রদেরকে ব্যবহার, তৃতীয় পক্ষ থেকে সহায়তা নেওয়া, চাপের মুখে নেতাদের বিদেশ পালিয়ে যাওয়া সহ আরো অনেক মন্দ কাজ । আল্লামা আহমদ শফী রহমাতুল্লাহি আলাইহির জীবদ্দশায় পাতি নেতাদের এই অপকর্মগুলো করার ক্ষেত্রে হয়তো বেগ পেতে হয়েছে কিন্তু এখন আর বেগ পেতে হবে না কারণ হেফাজত এখন মুরুব্বিহারা দল। ২৭ মার্চ হরতালের দিন সন্ধ্যায় হেফাজতে ইসলামের আমির জুনায়েদ বাবুনগরীর গাড়ি আটকে দিয়ে হেফাজত কর্মীরা বেয়াদবি করে প্রমাণ দিয়েছে বাবুনগরীকে তারা মানে না।

হেফাজতের একাংশের মুরুব্বি এখন বিশিষ্ট ওয়ায়েজ মাওলানা মামুনুল হক। কবে যে হেফাজত কর্মীরা তার গাড়িও আটকে দেয় আমি সেই টেনশনে আছি। হেফাজত সমর্থক একজন আলেম ২৬ মার্চ রাতে বাবুনগরীকে ইঙ্গিত করে ফেসবুকে লিখেছেন, এখন আর হেকমত চলে না। হেফাজত কর্মীদের চরম বেয়াদবির কারণে কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির আল্লামা আব্দুল আউয়াল সাহেব পদত্যাগ করেছেন। আমি জুনায়েদ বাবুনগরীকে অনুরোধ করবো, সম্মান নিয়ে মরতে চাইলে এখনই হেফাজত থেকে বিদায় নিন। তা না হলে আপনার পরিণতি খুবই খারাপ হবে। আব্দুল আউয়াল সাহেব থেকে শিক্ষা নিন।

সেদিন অনেককেই দেখেছি জাহেলি যুগের মানুষদের মতো একজন নেতা চেয়ে আল্লাহ তায়ালার কাছে হাহাকার করে ফেসবুকে পোস্ট দিতে। আমি একজনের পোস্টে কমেন্ট করলাম, নেতা তো আছেই তারপরেও যদি আপনাদের নেতা লাগে তাহলে গভীর রাতে তাহাজ্জুদের নামাজে এই হাহাকার করলে ভালো হতো না? তিনি রিপ্লাই দিয়েছেন, মিয়া, ফাইজলামি করেন! ফাইজলামি হোক কিম্বা সত্যিই, সবচেয়ে বড় কথা, কোন দলে যখন মুরুব্বি না থাকে তখন অধঃপতন হতে সময় লাগে না।

আরও পড়ুন: হেফাজতে ইসলামকে বিলুপ্ত ঘোষণা করার সময় কি ঘনিয়ে এসেছে?

আল্লামা আহমদ শফী রহমাতুল্লাহি আলাইহির ইন্তেকালের পরে হেফাজতে ইসলাম এখন সম্পূর্ণ মুরুব্বিহারা। কেউ কাউকে মানতে পারছেন না। বারবার উল্টাপাল্টা সিদ্ধান্ত নেয়ার দরুন মাদ্রাসা ছাত্ররা মার খাচ্ছে। হেফাজতের ঘাড়ে পা দিয়ে তৃতীয় পক্ষ ফায়েদা লুটছে এবং কওমি মাদ্রাসার সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে যা কোনভাবেই কাম্য নয়।

আগামী দুই এপ্রিল শুক্রবার হাইয়াতুল উলইয়ার কেন্দ্রীয় পরীক্ষা পিছিয়ে দিয়ে হেফাজতে ইসলামের বিক্ষোভ কর্মসূচিতে কোমলমতি ছাত্রদেরকে ব্যবহার করার কথা ইতোমধ্যে আমাদের কানে এসেছে। ছাত্রদের অভিভাবকদের কাছে আমার করজোড় আবেদন, আপনারা আপনাদের ছেলেদেরকে এই মুহুর্তে মাদ্রাসা থেকে বাসায় নিয়ে যান তা না হলে আখিরাতে আপনার এই সন্তান তৃতীয় পক্ষ থেকে গোপনে টাকা খাওয়া তার উস্তাদকে এবং আপনাকে ক্ষমা করবে না। আল্লাহ পাক আমাদেরকে হেফাজত করুন।

লেখক: শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com