শাহ মুহাম্মদ উয়াইমির : গত ৮ বছর ধরে কওমি মাদ্রাসা কেন্দ্রিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে হেফাজতে ইসলাম। কিন্তু ঐক্যের প্রতীক হিসেবে যে হেফাজতের উত্থান, সেই হেফাজতই আজ কওমি অঙ্গনে নানা বিভেদ আর গ্রুপিং এর জন্ম দিয়ে আসছে। অনেক প্রবীনকে এড়িয়ে একটি সুনির্দিষ্ট যুবক শ্রেণীকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে সাবেক আমীর হযরত মাওলানা আহমদ শফী সাহেব রহ. এর ধোঁয়াশাপূর্ণ ইন্তেকালের পর থেকেই। সমস্যা হচ্ছে, এখনও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করায় হেফাজতের পদস্খলনে গোটা কওমি অঙ্গনই বারবার বিপদের মুখে পড়ে যাচ্ছে।
কওমি মাদ্রাসার বৃহত্তর স্বার্থের দিকে খেয়াল করে অতিসত্বর হেফাজতে ইসলামকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হোক। গুটিকয়েক নেতার কারণে ইদানীং জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে হেফাজতে ইসলামের সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে, যা কোনভাবেই কাম্য নয়। হেফাজতে ইসলাম কওমি মাদ্রাসা সংশ্লিষ্ট দল। হেফাজতের বদনাম মানে সমগ্র কওমি মাদ্রাসারই বদনাম। সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলাধীন শাল্লা থানার একজন হিন্দু যুবককে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এবং বাড়িঘরের উপর যে নৃশংস হামলা হয়েছে সেটা বাংলাদেশের প্রত্যেকটা জাতীয় পত্রিকার লিড নিউজ হয়েছে এবং সেখানে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব, বিশিষ্ট ওয়ায়েজ মাওলানা মামুনুল হকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
উলামায়ে কেরামকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে
যারা হামলা করেছে তারা মাওলানা মামুনুল হকের অনুসারী এবং তাদের মাথায় হেফাজতে ইসলামের নাম সম্বলিত ব্যান্ড দেখা গিয়েছে। উক্ত হামলার পর থেকে একদিকে যেমন স্পর্ষকাতর ইস্যু ‘সংখ্যালঘু নির্যাতন’ নিয়ে দেশেবিদেশে প্রশ্ন তৈরী হয়েছে, অপরদিকে হেফাজতে ইসলামকে কেন্দ্র করে পুরো কওমি মাদ্রাসার উপরই প্রভাবশালী জনগোষ্ঠীর ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অনেকেই বক্তা মামুনুল হক এবং তার দল হেফাজতে ইসলামকে নিষিদ্ধের দাবী জানাচ্ছে। সুতরাং কওমি উলামায়ে কেরামকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আজকে হেফাজত নিষিদ্ধের দাবী উঠেছে, আগামীকাল হয়তোবা কওমি মাদ্রাসা নিষিদ্ধের দাবী উঠতে পারে, তখন বিপদ আরো বাড়বে। নিজেদের মতো করে সমাধান করার মত সুযোগ আর নাও পাওয়া যেতে পারে।
হেফাজতে ইসলামকে আরেকটি কারণে বিলুপ্ত করা উচিত, বর্তমানে হেফাজতের নেতৃবৃন্দের মধ্যে বাসিরত তথা দূরদর্শিতা বলতে কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই। বক্তা মামুনুল হকের ইদানীংকার কর্মকান্ডে সেটা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠছে। শাল্লায় তার অনুসারীরা হামলা করেছে বুধবার সকালে, আর তিনি তার অনুসারীদের নসীহত করেছেন বৃহস্পতিবার সকালে। অর্থাৎ পুরো ২৪টি ঘন্টা পর তার বোধোদয় ঘটেছে।
অথচ তিনি ইচ্ছা করলে তৎক্ষনাৎ লাইভে এসে সবাইকে শান্ত থাকার নির্দেশ দিতে পারতেন অথবা নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে পারতেন। সেটা না করে তিনি হয়তোবা নিজের প্রিয় জানবাজ অনুসারীদের এই কর্মকাণ্ডের পুরো বিষয়টা উপভোগ করেছেন। কালক্ষেপণ করে একদিন দেরিতে তার অবস্থান ব্যাখ্যা করায় এই সন্দেহটা আরো গাঢ় হয়। আমরা আমাদের আকাবীরে দেওবন্দের দিকে তাকালে সুস্পষ্ট দেখতে পাই যে, ব্যক্তি কিম্বা গোষ্ঠী বিপদে পড়লে অথবা কথা-কাজের দ্বারা ফেতনা ফেসাদ তৈরি হলে তৎক্ষনাৎ শান্তিপূর্ণভাবে মিমাংসা করতে। কিন্তু মাওলানা মামুনুল হকের কান্ড দেখলে বোঝা যায় দিনদিন তিনি আকাবীরদের পথ থেকে দূরে সরে তৃতীয় পক্ষের কথামতো আচরণ করছেন। আর তৃতীয় পক্ষ কারা সেটা আমাদের কাছে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট।
মাত্র কয়েকমাসের ব্যবধানে মাওলানা মামুনুল হক কয়েকবার হেফাজত তথা কওমি অঙ্গন বা হুযুর সমাজকে বিপদে ফেলেছেন। রচনার সংক্ষিপ্ততার স্বার্থে কেবল দুটো উল্লেখ করছি।
এক.
সাজাপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর মুক্তি দাবি। সামান্য হালুয়া-রুটির বিপরীতে তিনি আলেম-গায়রে আলেম নির্বিশেষে দাড়িটুপি ওয়ালা সবাইকে বিপদে ফেলে দিয়েছিলেন।
দাড়িটুপি মানেই রাজাকার এই অপবাদ থেকে বহুকাল পর মুক্তি পাওয়ায় জামায়াতের গাত্রদাহ থেকেই মাওলানা মামুনুল হকের এই কাণ্ড। জামায়াতের কর্মীদের কাছে তো দাড়ি রাখাটাও একটা রাজনৈতিক পদক্ষেপ। ফলে খুব সহজেই দাড়িটুপি ছেড়ে তারা আমাদের বিপদ উপভোগে নেমে পড়তে পারবে।
এই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রটি আঞ্জাম দিয়েছেন হেফাজত নেতা মাওলানা মামুনুল হক।
দুই.
ভাস্কর্য বিরোধি আন্দোলনে সবার লক্ষ্য ছিল যেখানে আলোচ্য ভাস্কর্যটি সরানো, সেখানে মাওলানা মামুনুল হক উল্টাপাল্টা কথা বলে সুকৌশলে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগকে আলেমদের উপর ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা চালিয়েছেন। কেউ যদি সেই সময়টা বর্তমানে বসে ভালভাবে বিশ্লেষণ করে, তখনই মামুনুল হকের দ্বৈতচেহারা তার সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করবে।
শায়খুল হাদীস রহ. এর সন্তান মামুনুল হক আসলে কার পক্ষে কোন লক্ষে কাজ করেন, তা নিয়ে আমাদের প্রত্যেকের ভাবা উচিত।
হেফাজতে ইসলামের অতীত ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় সংগঠনের নেতৃবৃন্দ কোন কাজ করেছেন আর তার পিছনে তৃতীয় পক্ষের ষড়যন্ত্র ছিলো না এমনটা হয়নি। হেফাজতের সাবেক আমির,বরেণ্য বুজুর্গ আলেম আল্লামা আহমদ শফী (রহ.) বৃদ্ধ হলেও তৃতীয় পক্ষের ষড়যন্ত্র বুঝতেন, কিন্তু বাঁধা দেওয়ার মতো শক্তি তার ছিলো না। বার্ধক্যজনিত বয়সের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে প্রত্যেকটা কাজে তাঁকে ব্যবহার করা হয়েছে। আল্লামা শফি সাহেবকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে হত্যার করে তৃতীয় পক্ষ মূলত হেফাজতে ইসলামকে পঙ্গু করে দিয়েছে এবং তাদের পছন্দমতো লোকজনকে হেফাজতের নেতৃত্বে নিয়ে এসেছে। যিনি হেফাজতের স্বর্ণযুগে হেফাজত নেতা হিসেবে কোন ফোকাস পাননি, তিনি শফী সাহেবের মৃত্যুর পরে এক লাফে দলের যুগ্ম মহাসচিবের মতো বিশাল বড় একটা পদ পেয়ে গেলেন। সন্দেহ জাগার মতো বিষয়। এমনকি, হযরতের ইন্তেকাল পূর্ব পরিস্থিতিতে তার কথাবার্তাগুলোও আমাদেরকে সুস্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। সুতরাং বর্তমানের হেফাজতে ইসলাম যে একটা গোষ্ঠীর ক্রীড়নকে পরিনত হয়েছে সেটা আর ব্যাখ্যা করার অবকাশ রাখে না।
কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতির সময় তৃতীয় পক্ষ বিষয়টা ভালোভাবে নেয়নি। তারা হেফাজতে ইসলামের সর্বজন শ্রদ্ধেয় আমির আল্লামা শফী সাহেব (রহ.) ব্যাঙ্গচিত্র একে সোশ্যাল মিডিয়ায় অপমানিত করেছে। তারা কওমি মাদ্রাসার উন্নতি, অগ্রগতি কোনকালেই ভালো চোখে দেখেনি। কিভাবে কওমি মাদ্রাসার সর্বনাশ করা যায় দিনরাত সেই চিন্তায় তাদের সময় কাটে। কওমি মাদ্রাসার বদনাম কিম্বা সর্বনাশ করার জন্য তাদের হাতে এখন একটাই অস্ত্র সেটা হচ্ছে, হেফাজতে ইসলাম। হেফাজতে ইসলামের বদনাম যদি করতে পারে তাহলে সেটা কওমির ঘাড়ে ফেলানো যাবে, কারণ হেফাজতের নেতৃবৃন্দ কওমি মাদ্রাসার আলেম।
সুতরাং কওমি মাদ্রাসার কর্ণধারদের এখনই সজাগ হতে হবে এবং অতিসত্বর হেফাজতে ইসলামকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে তৃতীয় পক্ষের ষড়যন্ত্র নষ্যাৎ করে দেওয়া হোক।
লেখকঃ তরুণ আলেম
মতামত বিভাগে প্রকাশিত লেখার দায় লেখকের


