ফয়জুল্লাহ আমান- এর তিনটি কবিতা

ফয়জুল্লাহ আমান- এর তিনটি কবিতা

নিসঙ্গ ডাহুক

একাকী আলো আঁধারে আচ্ছন্ন হয়ে রয়ে গেলাম অবসন্ন নীরব নিসঙ্গ ডাহুকের মত
ভিড়ের ভেতর চলতে হচ্ছে রহস্যময় নির্জনতায়
অসমাপ্ত সাধনার দিকে তাকিয়ে মনে হয় এই হাহাকারেই মগ্ন থাকবো পড়ন্ত বেলা
এক জীবনে ঘুচল না সেই চিরকালীন সুদীর্ঘ নিঃসঙ্গতা
বীরভোগ্য জীবন তবু উপভোগ করে গেছি হে আকাশ অনন্ত নিঃসীম
সাধনার সাগর সন্তরণ তবু তো হলো হে অনন্ত জীবন
হৃদয়ের চতুরঙ্গ সবুজ স্বপ্নীল হয়নি আজও
বর্তমানকে ভেঙে টুকরো করি অভূতপূর্ব সুন্দর এক আগামীর নেশায়

ঢাকার পথগুলি চুপচাপ শুয়ে আছে বুকের ভেতর নির্বাচনকালীন চরম বিক্ষোভ নিয়ে
বিদ্যালয় খেলার মাঠ বিনোদনকেন্দ্র ভাগাড় এবং দুঃখী সুখী মানুষের বাড়ি ঘর
মক্তব, প্রার্থনাকেন্দ্র অগণন কল কারখানা অফিস আদালত দোকানপাট গার্মেন্টস
জলপাই গাছে বসে থাকা শালিখ চড়ুই ও কাক
গাছতলায় শ্যাওলাজমা মাটিতে তেলাপোকা, বিছা, কীটপতঙ্গ সবাই
সব কিছু এক আকাশের তলে নিবিড়ভাবে বসবাস করছে
প্রকৃতির কঠোর নিয়মে মন্দের সঙ্গ ভালো এভাবেই মিশে আছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য
বিলাপ না করেও
সার সার আনন্দ বিষাদ প্রেম মমতা বিদ্বেষ বিবাদ
কদাকার শত্রুতা বিষণ্ন ঔদাসিন্য ঊষ্ণ অধীর দীর্ঘশ্বাস সোনালী স্বপ্ন অনেক বিস্ময়কর কল্পগল্প এবং মনের নানান অনুভূতি অন্তরঙ্গ জড়াজড়ি করে একান্তভাবে পড়ে থাকে এখানে এই বিচিত্র সময়ে

দীর্ঘ অতীতের পর দীনান্ত আনে শান্ত সন্ধ্যা
মুক্ত স্বাধীন দুই চোখে একসাথে ভরে রাখি পৃথিবীর সমগ্র সত্তা
বিস্তৃত দিগন্তে হিরন্ময় সত্যের জ্যোতি খোদাই করি চিত্রকরের ন্যায় প্রতিনিয়ত
ইতিহাসের অন্তিম পর্ব রচনার ভার অবশেষে আসে নির্জনতাপ্রিয় আমার দৃঢ় স্কন্ধে।
প্রেমিক ফরহাদের মত পাথুরে পাহাড়ের বুকে চালাই দুর্বার শাবল
এখান থেকে একদিন সহস্র ধারায় প্রবাহিত হবে প্রেমের নহর
জীবনসুধা ও শান্তির অমিয় ধারাগুলো এই এখান থেকে গড়িয়ে যাবে দূর সভ্যতার শেষ প্রান্তে সরস সজীব শাখা পল্লবে।

রোদের প্লাবন

শীতের শুষ্কতা ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত শরীরে পৌষের পূর্ব থেকেই
উগ্র চিন্তায় ডুবে আছে ডোবা নালা
আবদ্ধতায় সমাচ্ছন্ন সব মনের বিল চেতনার ঝিল মস্তিষ্কের জালাভূমি
মেঘে মেঘে ছেয়ে যায় বাঙলার বিরাট আকাশ
অন্তরপাড়ায় বিপ্লবের ডাক দেবার মত কন্ঠ নাই
হৃদয়ের ব্যথা সব মুছে গেছে নব নির্দয়তার রূঢ় রূপান্তর দেখে
তবু এখানে এই আসরে প্রদীপের মত জলে সংকল্প
নতুন দিনের প্রতিধ্বনি শোনা যায় আমার বুকের গহীনে
সপ্তর্ষি ফুটে ওঠে আঁধারে আচ্ছন্ন নীলিমে
দু’একটি বকুল ফুলের সুগন্ধিতে মাতোয়ারা হয়ে থাকি সারাটা বেলা
অলস দুপুরে উদাস চোখে সক্রেতিসের ন্যায় সেই পরম তত্ব খোঁজার ঢংয়ে চেয়ে থাকি মহাবিশ্বে
হায় পৃথিবীতে যদি আর একবার সূর্য উঠত
সূর্যকে তাহলে অন্ধকারের ভয়ংকর গল্প শোনাতাম
অন্ধকার কী যে দুঃসহ তা হয়ত দিনের আলোয় যারা বাস করে তারা জানে না
গোলাপী ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে ভুলে থাকি যাতনায় ক্লিষ্ট রিয়েলিটি
হে কঠিন বাস্তব
আরব্য রজনীর পরাবাস্তব গল্পের মায়াবী সন্ধ্যায় একটি বিকাল ঘুরে এসো
বাঙালীর অস্থির আত্মায় শান্ত হিমেল কল্পনার রংধনু এঁকে দাও মাধুরী মিশিয়ে
শীতের সকাল ফুরিয়ে আমার উঠানে নামুক রোদের প্লাবন
আত্মার কলুষ মুছে স্বচ্ছতার তরে সমাপ্ত হোক বাঙালির সহস্র বর্ষের সাধনা।

বিশ্বাসের সেঁজুতি

এক খণ্ড সবুজে দাঁড়িয়ে আছি
ইট পাথর কাঠ কংক্রিটে মোড়া দানুবে শহরে একটু মৃত্তিকাস্পর্শ
একটি ধ্যানী কাক অর দুইটি গর্বিত দোয়েল ছাড়া এখানে কাউকে দেখছি না
শূন্যতার হাত ধরে বসে আছি
শীতের হিমেল হাওয়া ছাড়া আমার কোন ভাষা নেই
আমার কথাগুলি বলে দিচ্ছে মুক্ত আকাশ
নীরব ঘাস আমার মনের ভাবনাগুলো গেথে চলেছে নিরস ঢাকার বুকে
অনেক তত্তকথার সমাবেশ ছিল একসময় হৃদয়পুরে
প্রকৃতির পরতে পরতে দেখি সব জটিলতা হয়েছে সরল
প্রাণের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সবুজ চেতনার উদ্দামতা
স্বপ্নের মত সুন্দর আমার দেশ
বুড়িগঙ্গা থেকে ব্রক্ষপুত্র
উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিনে বঙ্গসাগরিকা
আমার মুক্ত সবুজ বিরাট ভূখণ্ড
আকাশ উপুড় করা মেঘমুক্ত আলো
হাতিয়া থেকে হিলি
সুন্দরবন থেকে পার্বত্যাঞ্চল
সবখানে সবুজের বন্যা
আজ এই শূন্য ঘাসে বসে নতুন এক বাঙলায় চোখ রাখি
মনে হয় প্রতিটি প্রাণে জালতে হবে বিশ্বাসের সেঁজুতি
আমাদের হতে হবে একটি রোমাঞ্চিত রাত অথবা
রৌদ্রকরোজ্জল দিন
খোরাসান থেকে আন্দালুসিয়া
বাগদাদ থেকে আনাতোলিয়া
আলোজ্বলা অতীত ও বর্তমানকে মেলানো এক নতুন সময়
এই নির্জন বিষণ্ন সবুজের মত সুখ খুঁজতে হবে সর্বত্র
এক অনন্য বাঙলার উদার সুরভি নিয়ে আমাদের হাজির হতে হবে আগামী প্রভাতে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *