৫ই আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ২১শে শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ২৫শে জিলহজ, ১৪৪২ হিজরি

বহু বিবাহ বিধান ও পাশ্চাত্যের নারীবাদ

  • ফয়জুল্লাহ আমান

ইসলামে বহু বিবাহ সম্পর্কে কী বলা আছে? এসম্পর্কিত ইসলামী দৃষ্টিকোণ খুঁজে পেতে খুব বেগ পেতে হবে না। কারণ এ বিষয়ে পবিত্র কুরআন শরীফে স্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে। কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন, “আর যদি তোমরা এতিম মেয়েদের সাথে ইনসাফ করতে না পারার আশংকা করো তাহলে যেসব মেয়েদের তোমরা পছন্দ করো তাদের মধ্য থেকে দুই দুই, তিন তিন, বা চার চারজনকে বিয়ে করো। অথবা তোমাদের অধিকারে যেসব দাসী আছে তাদেরকে বিয়ে করো। বেইনসাফির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এটিই অধিকতর সঠিক পদ্ধতি।” (সুরা নিসা, আয়াত: ৩)

আয়াতের শুরুতেই এতিম মেয়েদের কথা বলা হয়েছে। তার কারণ আয়াতটি যখন নাযিল হয় তখন অনেক মেয়ে এতিম হয়েছিল। এ আয়াতগুলি নাযিল হবার সময়কাল ছিল ওহুদ যুদ্ধের অব্যবহিত পর। ওহুদ যুদ্ধে সত্তর জন সাহাবি শহিদ হন। যাদের অনেকের একাধিক স্ত্রী ছিল। ফলে শতাধিক নারী বিধবা ও এতিম হয়ে যায়। এজন্যই একাধিক বিয়ের অনুমতি সম্বলিত আয়াতটিতে এতিমদের কথা বলা হয়েছে। একইভাবে এ সুরার কিছু পরের দিকে নারীদের বিভিন্ন সমস্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানেও এই সব বিধবা ও এতিম মেয়েদের কথা তুলে ধরা হয়েছে।

“লোকেরা মেয়েদের ব্যাপারে আপনার কাছে ফতোয়া জিজ্ঞেস করে, বলে দিন, আল্লাহ তাদের ব্যাপারে তোমাদেরকে ফতোয়া দেন এবং একই সাথে সেই বিধানও স্মরণ করিয়ে দেন, যা প্রথম থেকে এই কিতাবে তোমাদের শুনানো হচ্ছে। অর্থাৎ এই এতিম মেয়েদের সম্পর্কিত বিধানসমূহ, যাদের হক তোমরা আদায় করছো না। এবং যাদেরকে বিয়ে দিতে তোমরা বিরত থাকছো আর যে শিশুরা কোনো ক্ষমতা রাখে না তাদের সম্পর্কিত বিধানসমূহ। আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, এতিমদের সাথে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ইনসাফের নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকো এবং যে কল্যাণ তোমরা করবে তা আল্লাহর অগোচন থাকবে না।” (সুরা নিসা, আয়াত: ১২৭)

প্রথম আয়াতের সম্পূরক আয়াতটিও পড়ে নেওয়া যাক- “স্ত্রীদের মধ্যে পুরোপুরি ইনসাফ করা তোমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তোমরা চাইলেও এ ক্ষমতা তোমাদের নেই। কাজেই এক স্ত্রীকে একদিকে ঝুলিয়ে রেখে অন্য স্ত্রীর প্রতি ঝুঁকে পড়বে না। যদি তোমরা নিজেদের কর্মনীতির সংশোধন করো এবং আল্লাহকে ভয় করতে থাকো, তাহলে আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম করুণাময়।” (সুরা নিসা, আয়াত: ১২৯)

সংসারের কর্তা কুরআনের ভাষ্য অনুসারে পুরুষ। ইরশাদ হচ্ছে- “পুরুষ নারীর কর্তা। এজন্য যে, আল্লাহ তাদের একজনকে অন্য জনের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। এবং এজন্য যে, পুরুষ নিজের ধন সম্পদ ব্যয় করে।” (সুরা নিসা, আয়াত: ৩৪)

পুরুষ যখন সংসারের দায়িত্বশীল তখন তাকে অবশ্যই তাঁর স্ত্রীর ভালো মন্দের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। স্ত্রীকে ভালো বাসতে হবে, স্ত্রীর হক আদায় করতে হবে, এবং তার ভরণ পোষণের পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। সে প্রথম স্ত্রী হোক বা দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ স্ত্রী হোক; সব ক্ষেত্রেই পুরুষকে তার স্ত্রীর পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। স্বাভাবিকভাবে একজন পুরুষ একজন স্ত্রীই গ্রহণ করবে। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে একাধিক বিবাহের সুযোগ রয়েছে। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াত থেকেই এটি বোঝা যায়।

যেমন আরেকটি আয়াত দেখুন- “আর যদি তোমরা এক স্ত্রীর জায়গায় অন্য স্ত্রী আনার সংকল্প করে থাকো, তাহলে তোমরা তাকে স্তুপীকৃত সম্পদ দিয়ে থাকলেও তা থেকে কিছুই ফিরিয়ে নিয়ো না। তোমরা কি মিথ্যা অপবাদ দিয়ে ও সুস্পষ্ট জুলুম করে তা ফিরিয়ে নেবে?” (সুরা নিসা, আয়াত: ২০)

এক স্ত্রীর স্থানে অন্য স্ত্রী আনার কথা বলা হচ্ছে, অথচ আরেকটি বিয়ে করে দুই স্ত্রীকেই তো একসাথে রাখতে পারে? পারে, কিন্তু সাধারণভাবে সবাই দুই স্ত্রীকে নিয়ে সংসার চালাতে পারে না। আর্থিক সঙ্গতি থাকলেও একাধিক স্ত্রীকে নিয়ে সংসার করা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। সে দিকে ইঙ্গিত রয়েছে এ আয়াতে। এই আয়াতগুলো সামনে রাখার পর নারীবাদ, ইসলাম, মুসলিম নারী ও পশ্চিমা নারী সম্পর্কে তুলনামূলক সংক্ষীপ্ত আলোচনা করা যাক।

যখন থেকে ইসলামকে অপছন্দ করা শুরু করলো মুসলিমরা, তখন থেকেই মুসলিম নারীদের যে বৈশিষ্ট্য ছিল তা হারাতে শুরু করলো।

এক সময় নারীর বিষয়টিই ছিল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মাঝে বিভেদ রেখা। ইসলামী বিশ্ব ও পশ্চিমা বিশ্বের মাঝে পার্থক্য নির্ণিত হতো নারী দিয়ে। বরং পৃথিবীর অন্য সব সমাজ থেকে মুসলিম সমাজকে পৃথক করতো নারী তার রক্ষণশীলতা ও আত্মমর্যাদা দিয়ে। পশ্চিম কখনও আশা করতো না, পুরো মুসলিম বিশ্বে একজন নারী বেপর্দা চলা ফেরা করবে, এটা একেবারেই অসম্ভব ও অকল্পনীয় ছিল। যখন থেকে ইসলামকে অপছন্দ করা শুরু করলো মুসলিমরা, তখন থেকেই মুসলিম নারীদের যে বৈশিষ্ট্য ছিল তা হারাতে শুরু করলো। ইসলামি চেতনা হারানোর পর মুসলিম উম্মাহর প্রথম যে পরিবর্তন তা ছিল নারীদের পর্দাহীনতা।

ইসলাম নারীকে যে সম্মান দিয়েছে পৃথিবীর কোনো ধর্ম কোনো মতাদর্শ নারীকে সে সম্মান দিতে পারেনি। অন্য কোনো মতাদর্শের পক্ষে এমন সম্মান দেওয়া সম্ভব নয়। পশ্চিমে নারী অধিকার নিয়ে যেধরনের সাহিত্য রচিত হয় তা দেখলে মনে হয় তারা বুঝি নারীকে উপাসনা করে। নারীকে যেন দেবী বানিয়ে রেখেছে। যেন তারা নারীর এবাদত করে। চরম পূজনীয় মনে করে। তাদের গল্প উপন্যাস ও সাহিত্যে নারীর আসন সর্বোচ্চ রেখেছে বলে ভ্রম হয়। মূলত এসবই ধোকা। নারীকে তারা ভোগ্য পণ্যের অধিক কোনো মূল্য দেয়নি। এটাই বাস্তব ও চরম সত্য।

ইসলামের উপর ফেমেনিস্টদের সবচেয়ে বড় আপত্তি এটাই, ইসলাম বহু বিবাহের বিধান দিয়ে নারীর অসম্মান করেছে। কিন্তু আমি খুব সংক্ষেপে বলতে চাই, বরং বহু বিবাহের বিধান অস্বিকার করে তারা নারীকে চরম অসম্মানের পথ করেছে। ইসলাম বহু বিবাহের বিধান দিয়েছেই নারীর সম্মান রক্ষার্থে। একটি বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরলে বিষয়টি পাঠক সহজেই অনুধাবন করতে পারবেন-

বর্তমান বিশ্বে প্রতি একশ জন পুরুষের জন্য একশ পাঁচ জন নারী রয়েছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছি আপনাদের। তো যদি একশ জন পুরুষ একশ জন নারীকে বিয়ে করে। আর পাঁচ জন নারীকে, একাধিক বিয়ে অবৈধ মনে করে, কেউ বিবাহ না করে, তাহলে এই পাঁচজনের অবস্থা কী হবে? তারা স্বামী ছাড়া কীভাবে জীবন কাটাবে? এর সলুশন পাশ্চাত্য দিয়েছে এভাবে, এই নারীরা সেজে গুজে পথে বের হবে। হিজাব বা পর্দা থেকে বিরত থাকবে। পুরুষদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করবে। আর মেকআপ ও প্রসাধনীর দ্বারা দুর্বল মনের কামুক পুরুষকে কাছে টানবে। রাতের পর রাত বিভিন্ন নাইট ক্লাবে রিসোর্টে পার্টি সেন্টারে এবং কখনো পথে ঘাটে যেখানে সেখানে পছন্দের পুরুষ সঙ্গীর মনোরঞ্জন করবে। এভাবে তার যৌন ক্ষুধা নিবারিত হবে। তারপর যখন যৌবন শেষ হবে তখন চরম অবহেলিত এক জীবন নিয়ে কুরে কুরে মরবে।

পক্ষান্তরে ইসলাম বলছে শতকরা পাঁচজন পুরুষ এই অবশিষ্ট পাঁচজন নারীকে একাধিক বিয়ের অনুমতির সুযোগ নিয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় বিবাহ করে তাদেরকে স্ত্রীর মর্যাদা দিবে। তাদের সম্পূর্ণ দায় দায়িত্ব গ্রহণ করবে এবং ভালোবাসা দিয়ে তাদের জীবনকে আনন্দ ফুর্তি ও প্রফুল্লতায় ভরিয়ে দিবে। এ ক্ষেত্রে যেই নারীদের স্বামীরা এই দ্বিতীয় বিয়ে করবে তাদের জন্য এটি কষ্টকর একটি বিষয়। কারণ সে তার স্বামীর ভালোবাসায় কাউকে ভাগ দিতে চায় না।

কিন্তু এই ত্যাগ স্বীকারেরও এক স্বাদ রয়েছে। সে যখন বুঝবে আমার ত্যাগে একটি মেয়ের, যে আমার মতই এক নারী, তার জীবনটা নষ্ট হওয়া থেকে বেঁচে যাচ্ছে, এই ভেবে সে একসময় আনন্দই উপভোগ করবে। আর তাদের ভেতর হৃদ্যতার একটা সম্পর্ক গড়ে উঠা একেবারে অসম্ভব নয়। গার্ল ফ্রেন্ড হয়ে থাকার চেয়ে সে যে দ্বিতীয় বউ হয়ে থাকছে তা প্রথম স্ত্রীর জন্য যেমন, দ্বিতীয় স্ত্রীর জন্যও সুখকর। যদি সে বিয়ে না করে তাকে ফাকি দিয়ে ওই মেয়েটার সাথে অবৈধ সম্পর্ক গড়ে তুলতো তাতে তার স্বামী এবং সেই মেয়েটি উভয়েই পাপে জড়িয়ে পড়তো।

দ্বিতীয় বিবাহ না করে যদি সে অবৈধ সম্পর্কে জড়াতো তাহলে যে ক্ষতি হতো-

১. নিজের পবিত্রতা নষ্ট করতো।
২. ঐ মেয়েটির সতিত্ব নষ্ট করতো।
৩. স্ত্রীর ক্ষতি করতো নিজের পবিত্রতা নষ্ট করার কারণে। কারণ সে একটা লুইচ্চার স্ত্রী। এটা তার জন্য একটা দাগ।
৪. এছাড়া এমন নষ্ট স্বামীর স্ত্রীও বেশি দিন নিজেকে সতী সাধ্বি রাখতে পারবে না। স্বামীর উপর প্রতিশোধ নিয়ে সেও পরকিয়ায় জড়াতে পারে। এভাবেও সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
৫. এভাবে সে তার স্বামীকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তার বউ একটা নষ্ট চরিত্র।
৬. অবৈধ সম্পর্কে জড়ানো মেয়েটা যদি বিবাহিতা হয় তাহলে তার স্বামীরও ক্ষতি করলো।
৭. দুপক্ষের সন্তানদের ক্ষতি করলো।
৮. দ্বিতীয় মেয়েটা বিবাহিতা হলে তার সন্তানদের‌ও দুর্ণাম ও সম্মান বিনষ্ট করল।
৯. দুপক্ষের (বরং তিন/ চার পক্ষের) আত্মীয় স্বজনের দুর্নাম হবে।
১০. এই ব্যাভিচারের কারণে রোগ জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার আশংকা।

এতগুলো ক্ষতির বদলে দ্বিতীয় বিবাহের অনুমতি দেওয়া হলে কেবল একটিই ক্ষতি, আর সেটি হচ্ছে স্ত্রী একটু নাখোশ হবে। তার মনোকষ্টের কারণ হবে। কিন্তু এই কষ্ট দূর করা সম্ভব। পক্ষান্তরে প্রথম পরিস্থিতে যেসব ক্ষতি তা দূর করা কোনো অবস্থাতেই দূর করা সম্ভব নয়। প্রথমা স্ত্রীর সম্মান নষ্ট হচ্ছে না। কারণ তার স্বামী ইসলাম যে একাধিক বিবাহের অধিকার দিয়েছে সেই অধিকার প্রয়োগ করেছে। এটা ঠিক একাধিক সন্তানের মত। প্রথম সন্তানের আদর কমিয়ে দেয় দ্বিতীয় সন্তান তাই বলে কি দ্বিতীয় সন্তান অকল্যাণকর হয়?

নারীবাদিরা একটা কথা বড় করে বলে থাকে যে, নারী তো পুরুষের সমান হলো না। হ্যা, নারী কখনও পুরুষের সমান নয়। পুরুষ কখনও নারীর সমান হতে পারে না। পুরুষের অনেক ঊর্ধ্বে নারী। আকৃতিতে আল্লাহ নারীকে ছোট করেছেন, কিন্তু মর্যাদায় ছোট করেননি। ইউরোপীয়রা নারীকে পুরুষের সমান করার জন্য হাই হিল জুতা দিয়েছে। কিন্তু এই হাই হিল জুতা পরে যদি সে পুরুষের সাথে দৌড়ায় তাহলে কিছু দূর যাবার পরেই উষ্ঠা খেয়ে পড়বে। ইসলাম বলেছে নারীর পায়ের নিচে বেহেশত। তাকে হিল দিয়ে উচু করার দরকার নেই। সে এমনিতেই উচুতে। সব পুরুষের জান্নাত তাদের মায়েদের পায়ের নিচে।

এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো। নারী পুরুষ পরস্পরের সম্পূরক। একজন অপরজনের পোষাক। তাদের প্রত্যেকের দৈহিক ও আত্মিক প্রশান্তির জন্য জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করতে হবে পরস্পরকে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, আল্লাহর নিদর্শনাবলীর মধ্যে একটি নিদর্শন হচ্ছে; তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতে তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের নিকট প্রশান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও সহানুভূতি সৃষ্টি করেছেন; নিশ্চয় চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য এতে নিদর্শন আছে। (সুরা রুম, আয়াত: ২১)

এ আয়াতে আল্লাহর এক বিস্ময়কর কুদরতের কথা বলা হয়েছে। পৃথিবীতে নারী পুরুষ সমান সংখ্যক দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক নারীর জন্যই পুরুষ এবং প্রত্যেক পুরুষের জন্যই নারী রয়েছে। কখনও এমন হয় না যে, পুরুষ বা নারীর সংকট দেখা দিয়েছে। পর্যাপ্ত হারে নারী পুরুষ দিয়ে রেখেছেন আল্লাহ তায়ালা। চাহিদা অনুসারে যোগান এটি একটি বড় কুদরত। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে যে নারী পুরুষের সংখ্যার সামান্য কম বেশ দেখা যায় হতে পারে তা কৃত্রিম সংকট এবং মানুষের নিজেদের কোনো ভুলের কারণে এমনটি হচ্ছে।

যাই হোক, একাধিক বিয়ে করলে যে সব নারী স্বামী পাবে না এটি মৌল কারণ নয়। কারণ যখন নারীর সংকট দেখা দিবে তখন নারীদের মূল্যও বেড়ে যাবে। কেউ ইচ্ছে করলেই একাধিক বিয়ে করতেও পারবে না। নারীর আত্মমর্যাদা তাকে কোনো পুরুষের দ্বিতীয় স্ত্রী হতে বাধা দেয়, অনন্যোপায় না হলে সে তাতে সম্মত হয় না। কাজেই একাধিক বিয়ের অনুমতি দিলেই যে জনে জনে এই মহতী কর্মে ঝাঁপিয়ে পড়বে বিষয়টি মোটেও এমন নয়। কুমারী মেয়ের সংখ্যা কমে যাবার আশঙ্কা দেখিয়ে এজন্য বহু বিবাহ নিষিদ্ধ করা যায় না। বাবার সাথে ছেলে বাজারে গিয়েছে। অসংখ্য মানুষ দেখে দুঃশ্চিন্তায় পড়ে যায় ছেলে, বাবা! এত মানুষ, রাতে ঘুমানোর জন্য বালিশ পাবে কোথায়? বাবা বলে, অন্যদের বালিশ নিয়ে তোর এতো চিন্তা করতে হবে না।

সব অবস্থায় যদি একাধিক বিয়ে করা উত্তম কাজ হতো তাহলে রাসূল সা. যৌবনের পঁচিশ/ ত্রিশ বছর, জীবনের একান্ন বা বাহান্ন বছর বয়স পর্যন্ত কেন এই উত্তম কাজটি করলেন না?

এই গল্পের মতো আমাদের ভাবিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে এটাও সত্য, নবীজী সা. ও সাহাবিদের যুগে পুরুষ সংকট দেখা দিয়েছিল। বহু নারী বিধবা হয়ে পড়েছিল। রোম পারস্যের যুদ্ধে লাখ লাখ পুরুষ যুদ্ধে মৃত্যু বরণ করেছিল। এই পরিস্থিতিতেই সাহাবিরা একাধিক বিয়ের বৈধতাকে কাজে লাগিয়েছিলেন। সেসময় এই বৈধতা না থাকলে এই লাখ লাখ নারীদের ব্যবস্থাপনা অসম্ভব হয়ে পড়তো।

সুরা নিসার আয়াতটিও নাযিল হয়েছে ওহুদ যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে। যখন অনেক সাহাবি শহীদ হয়েছিলেন। বহু বিধবা ও এতিম নারীতে ভরে গিয়েছিল মদীনা মুনাওয়ারা। তো আমাদের ভারসাম্যপূর্ণ একটি অবস্থানে থাকতে হবে। ইসলামে প্রতিটি বিষয়েই এমন মধ্যমপন্থা রয়েছে। একেবারে অস্বীকার করা যাবে না আবার সর্বাবস্থায় এই বহু বিবাহকে একটি উত্তম কাজ বলেও চালানো যাবে না। কারণ রাসূল সা. প্রথম স্ত্রী হযরত খাদিজা রা. বেঁচে থাকা অবস্থায় দীর্ঘ পঁচিশ বছর অর্থাৎ জীবনের পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত আর কোনো স্ত্রী গ্রহণ করেননি। হযরত খাদিজা রা.-এর মৃত্যুর পর বাস্তব কিছু প্রয়োজনে অনেকগুলি স্ত্রী গ্রহণ করেছিলেন। সব অবস্থায় যদি একাধিক বিয়ে করা উত্তম কাজ হতো তাহলে রাসূল সা. যৌবনের পঁচিশ/ ত্রিশ বছর, জীবনের একান্ন বা বাহান্ন বছর বয়স পর্যন্ত কেন এই উত্তম কাজটি করলেন না? এ বিষয়টি আমাদের সামনে রাখতে হবে। তাহলে এ বিধানের অপব্যবহার থেকে আমরা আশা করি রক্ষা পেতে পারব।

লেখক: খতিব, শিক্ষক, গবেষক

আরও পড়ুন: প্রকৃত মুসলিম | ফয়জুল্লাহ আমান

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com