২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৮ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৪ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

বিধ্বস্ত কওমী অঙ্গন, কিন্তু কেন?

ফাইল ছবি

  • আমিনুল ইসলাম কাসেমী

‘ইলম যদি শিখতে চাও কওমীতে যাও। আমল যদি দেখতে চাও কওমীতে যাও। আদব-আখলাকওয়ালা মানুষ যদি পেতে চাও কওমী মাদ্রাসাতে যাও। বীর মুজাহিদ এর কীর্তিগাঁথা যদি শুনতে চাও কওমী তথা দেওবন্দী মাদ্রাসায় চলে যাও।’ এমনটাই ছিল কওমী মাদ্রাসার  আসলরুপ। কওমী মাদ্রাসার ঐতিহ্য। কিন্তু এখন কি খুঁজে পাওয়া যাবে কওমী মাদ্রাসার সেই সোনালী ঐতিহ্য? এখন কি কোথাও দেখা যাবে কওমী মাদ্রাসার সেই গৌরবময় কীর্তি? মনে হয় সেই ঐতিহ্য আমরা  হারিয়ে ফেলেছি। এখন আর সেই দিন ফিরে আসছে না, বরং ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যাচ্ছে আমাদের এই শিক্ষাব্যবস্থা।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বড় বড় ইসলামী স্কলারগণ মন্তব্য করছেন, ‘কওমী মাদ্রাসা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে।’ সেই আসল ঐতিহ্য আর বাকি নেই। যা কিছু  আছে সবই এখন উপরে উপরে। কওমী অঙ্গন থেকে সেই রুহানিয়্যাত বিদায় নিয়েছে। এসব মাদ্রাসা থেকে যেমন দিনে দিনে আহলে ইলম এর সংখ্যা কমছে, তেমনি কমে যাচ্ছে আমলওয়ালা, আদব-আখলাকওয়ালা ছাত্র-শিক্ষক।

দারুল উলূম দেওবন্দ যে নজরিয়্যায় প্রতিষ্ঠিত, দেওবন্দ মাদ্রাসা ও এর পুরোধাগণ যে সব চিন্তা-চেতনা লালন করে আসছেন, সেসব চিন্তা-চেতনা বিদায় হয়ে গেছে এসময়কার বহু কওমী মাদ্রাসা থেকে। আকাবির-আসলাফগণ যে মেযাজ নিয়ে এই এদারা কায়েম করেছেন, সেসব থেকেও ছিটকে পড়েছে হালজামানার আলেম সমাজ। বিশেষ করে কওমী মাদ্রাসাতে যে বিষয় নিয়ে আমরা গর্ব করতাম, যে বিষয়ের দৃষ্টান্ত মানুষ দিতো, সেই আদব-আখলাক, আমল, সেটাও এখন অধরা। ছাত্ররা আদব, আখলাক হারিয়ে ফেলেছে। আমল নেই অধিকাংশ কওমী মাদ্রাসাতে। যেখানে প্রতিটি মাদ্রাসা ছিল একটি খানকা, তালীমের পাশাপাশি খানকাতে আমল জিন্দা থেকেছে, বড় পরিতাপের বিষয়, এই সময়ে আমরা যেন সবকিছু হারাতে বসেছি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বিধ্বস্ত। আমাদের আখলাক ও চরিত্রের চরম অবনতি। কিন্তু কেন এই অবস্থা? কী কারণে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার এমন বেহালদশা?

যদি একটু গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করা যায়, পুরো বিষয়টা তাহলে আমাদের সামনে ফুটে ওঠবে। বিশেষ করে নিম্নোক্ত কয়েকটি বিষয়ের দিকে তাকালে আমাদের সামনে অনেককিছু স্পষ্ট হয়ে যাবে।

এক. রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ:

কওমী মাদ্রাসার মধ্যে রাজনীতি প্রবেশ করার পর থেকে শিক্ষক ছাত্রদের মাঝে রাজনৈতিক লোভ-লালসা কাজ করছে। প্রথম যখন রাজনীতি প্রবেশ করে, তখন এমন অবস্থা ছিল না।

কিন্তু ধীরে ধীরে কিছু কিছু রাজনীতিবিদ নেতার মাঝে পদ-পদবী, এমপি- মন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন এমনকি, ক্ষমতার মসনদে বসার বাসনা জেগে ওঠে। যার কারণে সেসব মাদ্রাসা কেন্দ্রীক নেতারা ছাত্রদের যথেচ্ছা ব্যবহার করতে থাকে। ছাত্রদের তালিমের প্রতি জোর না দিয়ে রাজনৈতিক প্রোগ্রামের প্রতি বেশী জোর দেওয়া হয়। যার কারণে লেখাপড়ার প্রতি ছেলেদের অনিহা ভাব জন্মে। কিছু ছাত্র পড়াশুনা করলেও তা হয় নামকেওয়াস্তে। কারো যোগ্যতা পয়দা হয় না। মিছিল-মিটিং, হরতাল-অবরোধ করতে করতে কিতাবের সাথে নেসবাত কম থাকে। আর এই বেপরোয়া রাজনৈতিক প্রোগ্রামে যেতে যেতে ছাত্ররা আদব-লেহাজ ভুলে গেছে। ওরা রাজপথে যেমন প্রতিপক্ষের উপর চড়াও হয়, মাদ্রাসার অভ্যন্তরে স্বীয় উস্তাদদের উপরেও চড়াও হতে দ্বিধাবোধ করে না।

দুই. আখলাক-চরিত্রের চরম অবনতি:

প্রথমত, উন্নত চরিত্রের শিক্ষকের অভাব। রাজনৈতিক ময়দান চষে বেড়ানোয় কোন আদবী-আখলাকী মানুষ তৈরী হয়নি গত অন্তত দুই দশকে। সেকালের ছাত্ররাই এখন উস্তাদ হয়েছে। ওদের থেকে ছাত্ররা কোন ফায়দা হাসিল করতে পারে না।

দ্বিতীয়ত, যে সব শিক্ষক আছে, তাদের ভালো মানুষের সাথে নেছবাত নেই। নেসবাত শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সাথে। খালেছ আল্লাহওয়ালা মানুষের সাথে তাদের সম্পর্ক কম। তাদের মেযাজ শুধু রাজনৈতিক মিশন।

তিন. বিত্তবৈভবের পিছু ছোটা:

কিছু মানুষের উদ্দেশ্যই শুধু টাকা কামানো। লিল্লাহিয়্যাত নেই। আগে যেরকম কওমী মাদ্রাসার শিক্ষকগণ আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে মাদ্রাসায় পড়াতেন, দুনিয়াবী কোন চিন্তা-ফিকির তাদের মাথায় আসত না। কিন্তু এখন কেউ আর লিল্লাহিয়্যাত নিয়ে পড়াতে চায় না। শিক্ষকদের মাঝে এমন কিছু লোক আছে, যারা শুধু টাকা খোঁজে। টাকা কম হলে তিনি নেই। আবার কেউ কেউ তো, যেখানে টাকা বেশী পাওয়া যায় সেখানে গিয়ে ওঠেন।  সেটা যদি শিক্ষাবর্ষের মধ্যখানেও হয়, সে চলে যায়। প্রতিষ্ঠানের-ছাত্রদের বিপদে ফেলে টাকা কামানোর জন্য এক শিক্ষাবর্ষের মধ্যখানে অন্য প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ওঠে।

চার. মাদরাসাকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর:

টাকা কামানোর উদ্দেশে আজকাল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। যেমন মহিলা মাদ্রাসা, প্রাইভেট মাদ্রাসা। এদের নিয়্যাতই থাকে টাকা কামানো। সেই উদ্দেশে মাদ্রাসার গোড়পত্তন করা হয়। একারণে ফায়দা হয় না ছাত্র/ ছাত্রীদের।

পাঁচ. নিজের সুনাম-সুখ্যাতি প্রতিষ্ঠার বাসনা:

সব কিছুতে ভাইরাল হওয়া অনেকের উদ্দেশ্য। নিজের সুনাম-সুখ্যাতির জন্য মাদ্রাসায় পড়ানো। বড় কিতাব পড়ানোর আশা। নিজেকে সবার উপরে নিয়ে যাওয়ার মাকসাদ। কিন্তু আমাদের কাজের মাঝে লিল্লাহিয়্যাত নেই। মাদ্রাসা গড়ার পিছনে থাকে নিজের নাম ফোটানো। এসব অর্জন করতে গিয়ে অন্য কাউকে সহ্য করতে না পারা। যেকারণে মাদ্রাসা নিয়ে তুমুল ইখতেলাফ চলে। গ্রুপিং দেখা যায়। এক প্রতিষ্ঠান নিয়ে দুই গ্রুপের টানাহেঁচড়া। কাজগুলো লিল্লাহিয়্যাত নিয়ে হলে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় না।

ছয়. আদর্শ ও চিন্তাচেতনায় চির ধরা:

আমাদের চিন্তা-চেতনার মাঝে চির ধরেছে। আকাবির-আসলাফ যে দর্শন নিয়ে সামনে অগ্রসর হয়েছেন, তাঁরা যে চিন্তা-চেতনা লালন করেছেন, আমরা সেটার অনুসরণ করতে পারছি না। বরং আমরা বাতিলের কাছে নতিস্বীকার করে ফেলেছি। কোন কোন ক্ষেত্রে বাতিলের সাথে যেন প্রীতি গড়ে তোলেছি। যেকারণে হক ও বাতিলের মাঝে পার্থক্য থাকছে না।

সাত. ঐক্যের নামে হক-বাতিলের সংমিশ্রণ:

রাজনীতি করতে গিয়ে আমরা হক-বাতিল গুলিয়ে ফেলেছি। এক সময় দেওবন্দী মাদ্রাসার আলেম- তালেবুল ইলমগণ বাতিল শক্তির ব্যাপারে সতর্ক থাকত, কিন্তু রাজনীতি করতে গিয়ে ঐক্য গড়ার নামে সব গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। এখন আর কেউ বাতিলের ব্যাপারে মুখ খোলে না।

মোটকথা, এরকম বহু কারণে আমাদের শিক্ষাঙ্গন বিধ্বস্ত। কওমী মাদ্রাসার সেই ঐতিহ্য আর নেই। দিনে দিনে যেন আরো অধঃপতনের দিকে যাচ্ছে। এমন অবস্থায় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে বাঁচানোর চেষ্টা করে যেতে হবে। নচেৎ, কওমী মাদ্রাসাকে যদি বাঁচানো না যায়, তাহলে দেশ ও জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হবে।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে বাঁচাতে হলে প্রথমে দেশের শীর্ষ আলেমদের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। কওমী মাদ্রাসার যে উসুল রয়েছে, সে উসুল অনুযায়ী চালানো দরকার। প্রতিটি মাদ্রাসা যেমন একটা খানকা ছিল, তেমন পরিবেশ আবার কায়েম হোক। ছাত্রদেরকে বাইরের পরিবেশ থেকে ফিরিয়ে  মাদ্রাসার গন্ডির মধ্যে নিয়ে আসা প্রয়োজন। সেই সাথে আখলাকে হাসানায় কীভাবে এদের গড়ে তোলা যায়, এই ফিকির করা চাই। ছাত্রাবস্থায় সকল রাজনৈতিক কর্মকান্ড থেকে দূরে থাকাটাই এই সময়ের শ্রেয় কাজ। মাদ্রাসা বাঁচাতে এখন সকলকে ঐক্যবদ্ধ ভাবে তালিমের প্রতি জোর দিয়ে অন্যান্য চিন্তা ভাবনা ছেড়ে দিতে হবে। আশা করা যায় আমরা আবারও সেই সোনালী অতীত ফিরে পাব, ইনশাআল্লাহ।

লেখক: কওমী মাদ্রাসার শিক্ষক ও কলামিষ্ট

আরও পড়ুন: কওমি মাদরাসার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বন্ধ হোক

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com