২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ১০ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ২৮শে সফর, ১৪৪৪ হিজরি

বুকে শোক নিয়ে মানুষের জন্য কাজ করছি : প্রধানমন্ত্রী

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পিতা, মাতা, ভাই হারিয়ে বুকে ব্যথা নিয়ে এগিয়ে চলছি। আমি সবাইকে নিয়ে রাজনীতি করছি, আমি কারও বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে চাই না। আমি বিচারে বিশ্বাসী। এ চক্রান্তের নেপথ্যে কারা এক দিন বের হবে। জানি না আমরা দেখে যেতে পারব কি না। আমি সব শোক নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। আমি তো নীলকণ্ঠ হয়ে বেঁচে আছি।’

গতকাল বুধবার রাতে শোকাবহ আগস্টের শেষ দিনে সংসদে ১৪৭ বিধিতে আনা প্রস্তাবের সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন সংসদ নেতা। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা আলোচনা শেষে প্রস্তাবটি সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এ সময় সংসদে বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্যরা অনুপস্থিত ছিলেন। তবে সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও অন্যান্য দলের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন এবং তারা আলোচনায় অংশ নেন।

সংসদ অধিবেশনের শুরুতে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী কার্যপ্রণালি বিধির ১৪৭ বিধিতে প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাবে বলা হয়, ‘ঘৃণ্য খুনিচক্র ও চক্রান্তকারী গোষ্ঠী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে ১৫ আগস্টে নিষ্ঠুর ও নির্মমভাবে হত্যা করেছিল, তাদের প্রতি তীব্র ঘৃণা জানাচ্ছি। কিন্তু চক্রান্তকারীদের প্রেতাত্মারা এখনো ক্ষান্ত হয়নি। আজও তারা ঘৃণ্য তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে পুনরায় রাষ্ট্র ক্ষমতায় ফিরে এসে ইতিহাসের চাকাকে ঘুরিয়ে দিতে। তাদের এ ঘৃণ্য চক্রান্তকে সফল হতে দেওয়া যায় না। ইতিহাসের পাদদেশে দাঁড়িয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ সব শহীদকে বিনম্রচিত্তে ও শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি। বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সব চক্রান্তকে ব্যর্থ করে দেওয়ার শপথ গ্রহণ করছি। ২০২২ সালের আগস্ট মাসে একাদশ জাতীয় সংসদের উনবিংশতম অধিবেশনে এই হোক প্রত্যয় দৃঢ় ঘোষণা।’

আলোচনার শুরুতে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের কথা তুলে ধরতে গিয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমি শোক বুকে নিয়ে সেদিন দেশে এসেছিলাম। এ দেশের মানুষের জন্য কিছু করার জন্য। আমি বারবারই ভাবতাম এ দেশের মানুষের জন্য কিছু করতে হবে। কারণ আমার বাবা এ দেশের মানুষের জন্য সারাটা জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। আমি মানুষের জন্য কাজ করে যাব। কিন্তু আমার চলার পথ সহজ ছিল না। আমি জানি মরতে তো এক দিন হবেই কিন্তু মরার আগে আমি মরতে রাজি ছিলাম না।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি সবসময় বিচারে বিশ্বাসী। আমি কোনোভাবেই কোনোদিন প্রতিশোধ নিতে চাইনি। আইনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার করেছি। যারা সরাসরি হত্যার সঙ্গে জড়িত তাদের বিচার হয়েছে। কিন্তু ১৫ আগস্টের চক্রান্ত শুধু আমাদের বিরুদ্ধে নয়, এটা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়, আমাদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে, ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে, আদর্শের বিরুদ্ধে। কিন্তু এ ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে যারা জড়িত ছিল আমি বিশ্বাস করি এক দিন বেরিয়ে আসবে।’

তিনি বলেন, ‘১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড একজন রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করা নয়, একটি আদর্শকে হত্যা করা হয়েছে। দেশের ইতিহাসে অন্যায় অবিচার ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সংঘটিত হয়েছিল।’

বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্যে ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার কাছে অবাক লাগে যারা খুনিদের ক্ষমতা দিয়ে মন্ত্রী বানায়, গণতন্ত্রকে হত্যা করে সেনাশাসন আনে। এদের সঙ্গে কীভাবে অনেক মানুষ চলে গেল? আমরা বাবা-মা-ভাই সব হারিয়েছি। আমরা মামলা করতে পারিনি, বিচার চাইতে পারিনি। তাদের নিয়ে ক্ষমতায় বসায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে গিয়ে কথা বলে। আর তারাই হয়ে গেল প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি।’

সংসদ নেতা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনীতে একের পর এক ক্যু হয়েছে। বহু সেনা অফিসারকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। অনেকের লাশ পায়নি। ঢাকা জেলে প্রতিদিন দশ-বিশটা করে হাজার হাজার সেনা অফিসারকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। মামলার নামে প্রহসন হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর মামলা দেওয়ার ঘটনাও হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ড স্বাধীনতাবিরোধী ও যাদের আমরা পরাজিত করেছি তাদের হাত ছিল।’

তিনি বলেন, ‘দেশের মানুষের জন্য আমি প্রাণপণ চেষ্টা করে চলেছি। কিন্তু সমালোচনা অনেকে করে চলছেন। যেখানে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে বাংলাদেশ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ না, সেখানে দেশের কিছু সংস্থা বলে যাচ্ছে আমাদের নাকি অনেক ঝুঁকি রয়েছে।’

আলোচনায় অংশ নেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা আবুল কালাম আজাদ, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, বিরোধীদলীয় উপনেতা জিএম কাদের প্রমুখ।

‘জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন থাকবে’ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বর্তমানে দেশে মজুদকৃত জ্বালানি তেল দিয়ে ৩০ থেকে ৩৫ দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। নিরবচ্ছিন্নভাবে দেশে জ্বালানি তেল সরবরাহ অব্যাহত থাকবে। গতকাল বুধবার সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে এ কথা বলেন তিনি। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা আরও বলেন, জ্বালানি তেলের চাহিদা পূরণ করা একটি চলমান প্রক্রিয়া। বিদেশ থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহের জন্য ছয় মাসভিত্তিক চুক্তি হয়ে থাকে। বর্তমান চুক্তির মেয়াদ ডিসেম্বর পর্যন্ত। মজুদকৃত জ্বালানি তেল দ্বারা ৩০ থেকে ৩৫ দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে এবং এ সময়ের মধ্যে জ্বালানি তেল নিয়ে দুটি জাহাজ দেশে এসে পৌঁছবে অর্থাৎ নিরবচ্ছিন্নভাবে দেশে জ্বালানি তেল সরবরাহ অব্যাহত থাকবে। গত ১৬ আগস্ট পর্যন্ত দেশে জ্বালানি তেলের মজুদের পরিমাণ পরিশোধিত ৬ লাখ ২০ হাজার ১৪৮ টন, অপরিশোধিত ৮১ হাজার ৮৪৬ টন; মোট ৭ লাখ ১ হাজার ৯৯৪ টন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) দেশের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে পরিশোধিত জ্বালানি তেল হিসেবে ডিজেল, জেট ফুয়েল, অকটেন, ফার্নেস অয়েল ও মেরিন ফুয়েল এবং অপরিশোধিত জ্বালানি তেল হিসেবে এরাবিয়ান লাইট ক্রুড ও মারবান ক্রুড অয়েল আমদানি করে থাকে। জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে চাহিদা বিবেচনায় আগস্ট মাসে প্রায় ৩ লাখ ২৫ হাজার টন ডিজেল, ৫০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ৫০ হাজার টন অকটেন এবং সেপ্টেম্বরে প্রায় ৩ লাখ টন ডিজেল, ২০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ৫০ হাজার টন ফার্নেস অয়েল ও ২৫ হাজার টন অকটেন আমদানির সূচি চূড়ান্ত করা হয়েছে।’

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র বাংলাদেশ সফরে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে গণচীনের বাজারে ১ সেপ্টেম্বর (আজ) থেকে ৯৮ ভাগ বাংলাদেশি পণ্যের শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকারের ঘোষণা দেয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ওই সফর উভয় দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় ফোরামে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতাকে আরও সুসংহত করবে এবং বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার কৌশলগত অংশীদারিত্বকে অধিকতর শক্তিশালী করবে আশা করা যায়।’

গ্রুপ বাড়ানোর জন্য আলতু-ফালতু লোক দলে ঢোকাবে না, ছাত্রলীগকে প্রধানমন্ত্রী : জাতির পিতার আদর্শ বুকে নিয়ে তার হাতে তৈরি সংগঠন ছাত্রলীগ বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এ প্রত্যয় ব্যক্ত করে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ছাত্রলীগ জাতির পিতার হাতে গড়া সংগঠন। এত বড় একটা সংগঠন তার মধ্যে কিছু কিছু তো…। আমরা ক্ষমতায় আছি বলে অনেকেই ভেতরে ঢুকে যায়। ঢুকে নিজেরাই গোলমাল করে। বদনামটা ছাত্রলীগের ওপরে পড়ে। ছাত্রলীগকেও সতর্ক থাকতে হবে সংগঠন করার সময় গ্রুপ বাড়ানোর জন্য আলতু-ফালতু লোক দলে ঢোকাবে না। তাতে নিজেদের বদনাম, দলের বদনাম, দেশের বদনাম।’

গতকাল দুপুরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ছাত্রলীগকে সতর্ক থাকতে হবে কারণ পেছনে তো আমাদের লোক লেগেই আছে, লেগেই থাকে। ছাত্রদল যত অপকর্ম করে গেছে সেটা নিয়ে কথা নেই। কিন্তু ছাত্রলীগের একটু হলেই বড় করে দেখা হয়। এজন্য নিজেদের ঠিক থাকতে হবে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘পঁচাত্তরের পর তো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছিল অস্ত্রের ঝনঝনানি, বোমাবাজি। আমরা সেখান থেকে ফিরিয়ে এনেছি। যখন খালেদা জিয়া বলল, ছাত্রদল দিয়েই নাকি আওয়ামী লীগকে সিধা করে দেবে। অর্থাৎ ছাত্রদের হাতে অস্ত্র দেওয়া জিয়াউর রহমান শুরু করেছিল। আমি ছাত্রলীগের হাতে কাগজ-কলম-বই তুলে দিলাম যে আগে লেখাপড়া শিখতে হবে। শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতিকে কেউ সেবা দিতে পারে না। জ্ঞানের আলো ছাড়া কাজ হবে কীভাবে? আমি সেটাই চাই। ছাত্রলীগের মূলনীতিতে শিক্ষা এক নম্বরে আছে। শিক্ষার দিকে সবাইকে নজর দিতে হবে।’

সরকারপ্রধান বলেন, ‘করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা। উন্নত দেশগুলো হিমশিম খাচ্ছে। তাই আমাদের প্রত্যেকের সাশ্রয়ী হতে হবে। বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে, পানি ব্যবহারে মিতব্যয়ী হতে হবে। এক ফোঁটা পানি যেন অপচয় না হয়। লন্ডনে বলে দিয়েছে গোসল করতে পারবে না কেউ। গাড়ি ধুতে পারবে না। সেখানে এ অবস্থা। আমাদের আগে থেকে সতর্ক থাকতে হবে ওরকম অবস্থায় যেন পড়তে না হয়। আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ইউরোপ সব দেশে ভয়াবহ পরিস্থিতি।’

ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘অহেতুক ঘোরাঘুরি করার দরকার নেই। নিজেদের খাবার নিজেদের উৎপাদন করতে হবে। ছাত্রলীগ ধান কাটায় সাহায্য করেছে, দরকার হলে ধান রোপণেও সাহায্য করতে হবে। এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে।’

ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়ের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় আরও বক্তব্যে রাখেন ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সঞ্জিত চন্দ্র দাস ও সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com