নিজস্ব প্রতিবেদক ● সারাদেশেই বিভিন্নভাবে সরকারের বিপুল পরিমাণ জমি বেহাত হয়ে গেছে। তবে বর্তমান সরকার বেহাত সরকারি জমি উদ্ধারে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। সে লক্ষ্যে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয়েছে। মূলত ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে কিংবা অবৈধ স্থাপনা গড়ে সরকারি জমি দখল করা হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্থানীয় প্রভাবশালীরাই অবৈধভাবে সরকারি জমি দখল করেছে। এর সাথে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও জড়িত। আর সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের নির্লিপ্ততা ও অনীহায় ভূমি, জলমহালসহ সরকারি সম্পত্তি অব্যাহত রয়েছে। একইভাবে বেদখল হচ্ছে গির্জা, মন্দির, গোরস্তানসহ বিভিন্ন অর্পিত সম্পত্তিও। তাছাড়া ওসব ভূমির মালিকানা নিয়েও চলমান রয়েছে কয়েক হাজার মামলা। এমন পরিস্থিতিতে বেহাত সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ভূমি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সূত্র মতে, সারাদেশে সরকারের খাসজমির পরিমাণ প্রায় ১৭ লাখ ৫৫ হাজার ২১ একর। তার মধ্যে প্রায় ৭ শতাংশ জমিই সরকারের দখলে নেই। কোনো কোনো জমির মালিকানা নিয়ে আবার মামলাও চলছে। এমন অবস্থায় ভূমি মন্ত্রণালয় বেহাত হওয়া সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে জেলাপর্যায়ে একটি কমিটি করেছে। আর ওই কমিটির গৃহীত কার্যক্রমের ফলে ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার একর সরকারি জমি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। যদিও তা বেদখল হওয়া সম্পত্তির তুলনায় খুবই নগন্য। তবে বর্তমানে ভূমি ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নে ভূমি সম্পর্কিত প্রায় সব খাতই ডিজিটালাইজ হচ্ছে। তাতে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আসছে। তাছাড়া ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল পদ্ধতি প্রবর্তন ও বিরোধ নিষ্পত্তিতেও জনসচেতনতা তৈরিসহ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এই সংক্রান্ত আরো কয়েকটি কর্মসূচিও শিগগিরই শুরু করা হবে। সেগুলো বাস্তবায়ন হলে সরকারি জমি বেহাত হওয়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে সরকারি খাসজমির মধ্যে প্রায় ১৬ লাখ ৩২ হাজার ১৭০ একর সরকারের দখলে রয়েছে। তার মধ্যে ঢাকা বিভাগের (বর্তমান ময়মনসিংহও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত) ৮৭ শতাংশ, চট্টগ্রামের ৯৪ শতাংশ, রাজশাহীর ৯০ শতাংশ, বরিশালের ৮৫ শতাংশ, সিলেটের ৯৭ শতাংশ এবং খুলনা ও রংপুর বিভাগের ৯৯ শতাংশ খাসজমি সরকারের দখলে রয়েছে। বাকি জমি কোনো না কোনোভাবে বেহাত হয়েছে। ওসব জমি উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি বেহাত হওয়া সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি সরকারি জমি উদ্ধারে আরো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সাম্প্রতিক বৈঠক থেকেও সুপারিশ করা হয়েছে। একই সাথে বেহাত জমি উদ্ধার কার্যক্রম জোরদারে জেলা প্রশাসকদের পরামর্শ দিয়ে পত্র পাঠানো হচ্ছে। তাছাড়া বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত সারাদেশে বেদখল হওয়া সরকারি সম্পত্তি উদ্ধার-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনও সংসদীয় কমিটিতে উপস্থাপন করা হয়। তাতে দেখা যায়, এখন পর্যন্ত সারাদেশে ৯ হাজার ৯৪৯ দশমিক ৩৫ একর জমি উদ্ধার করে সরকারের আয়ত্তে নেয়া হয়েছে।
সূত্র আরো জানায়, বিভাগওয়ারি হিসাবে খুলনা থেকে সবচেয়ে বেশি বেহাত সরকারি জমি উদ্ধার হয়েছে। ওই বিভাগ থেকে বেদখল হওয়া ২ হাজার ৪৭৮ একরেরও বেশি জমি উদ্ধার করা হয়েছে। তারপরই রয়েছে বরিশাল বিভাগ। ওই বিভাগ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭৪৯ একর জমি। সিলেট বিভাগের বেদখল হওয়া জমির মধ্যে ১ হাজার ৬০৫ একরেরও বেশি উদ্ধার করা হয়েছে। ঢাকা বিভাগ থেকে উদ্ধার হয়েছে ১ হাজার ৫৬০ একরের বেশি জমি। চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে উদ্ধারকৃত জমির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ২৫৬ একর। রংপুর ও রাজশাহী বিভাগ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে যথাক্রমে ৮৮৪ ও ৩২৮ একরের বেশি জমি। আর নবগঠিত ময়মনসিংহ বিভাগ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৮৫ একরের বেশি বেহাত জমি। তবে সাত বছরে প্রায় ১০ হাজার একর সরকারি ভূমি উদ্ধার করলেও সেক্ষেত্রে বিভিন্ন মহলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ ২০০০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ভূমি সংক্রান্ত ১১ হাজারের বেশি মামলায় সরকারপক্ষ হেরে গেছে। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দ্রুত তৎপরতার অভাব, সরকারপক্ষের আইনজীবীদের গাফিলতি, দখলদারদের সাথে সমঝোতা ও সময়মতো আপিলের কাগজপত্র না পাঠানোসহ বিভিন্ন দুর্বলতায় প্রতি বছরই বড় আকারের সরকারি সম্পত্তি বেহাত হচ্ছে। অথচ তার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।
এদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভূমি ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান পদ্ধতিগত জটিলতার কারণেই সরকারি সম্পত্তি বেহাত হচ্ছে। কারণ বিদ্যমান বেশির ভাগ মৌজা নকশার ক্যাডাস্টাল সার্ভে (সিএস) নকশা, স্টেট অ্যাকুইজিশন সার্ভে (এসএ) নকশা, রিভিশনারি সেটলমেন্ট (আরএস) নকশার দাগ অস্পষ্ট। অনেক আগে তৈরি ওসব নকশার কাগজ দুর্বল হয়ে বিকৃতি ঘটেছে। ফলে জমির পরিমাণ ও সীমানা নির্ধারণ জটিল ও কঠিন হয়ে পড়ে। নকশা ও বাস্তব পরিমাপে পার্থক্য দেখা দেয়। তাতে মালিকানার বিরোধ নিষ্পত্তিতে জটিলতা বাড়ে। তাছাড়া নকশার প্রতিলিপি ব্যবহার ও বিতরণের বিষয়টিও জটিল। মূল কপি মাত্র একটি হওয়ায় এর প্রতিলিপি ত্রুটিযুক্ত হওয়ারও আশঙ্কা থাকে। ওসব কারণই মূলত সরকারি সম্পত্তি বেহাত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।
অন্যদিকে বেহাত সরকারি সম্পত্তি প্রসঙ্গে ভূমি মন্ত্রণালয় সংক্রানবত সংসদীয় কমিটির সভাপতি রেজাউল করিম হীরা জানান, বেহাত হওয়া সব সরকারি সম্পত্তি অচিরেই উদ্ধার করা হবে। আইনি জটিলতার সুযোগ নিয়ে ভূমি ও বন মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে কতিপয় ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও স্থানীয় প্রভাবশালী সরকারের সম্পত্তি বিভিন্নভাবে হাতিয়ে নিয়েছে। বর্তমান সরকার অর্পিত সম্পত্তিসহ সব ধরনের ভূমি জটিলতা নিরসনে কাজ করছে। ভবিষ্যতে সরকারি সম্পত্তি যাতে কোনোভাবে বেহাত না হয় সেদিকেও নজর রাখা হবে।


