১৭ই জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ৩রা মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৩ই জমাদিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

মাদক বিরোধী আদর্শে ইসলাম | ২য় পর্ব

মাদক বিরোধী আদর্শে ইসলাম | ১ম পর্ব

মাহতাব উদ্দীন নোমান : আল্লাহর পক্ষ থেকে আয়াতের মাধ্যমে অকাট্যভাবে মদ হারাম হওয়ার পরেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাদক সেবন থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা অব্যাহত রেখেছেন। তিনি মদের সাথে সাথে এমন সকল বিষয়কেও হারাম করেছেন, যেগুলো মদের মতো মস্তিষ্ক বিকৃতকারী। এর উৎস আঙ্গুর বা খেজুর, অথবা অন্য যাকিছুই হোক, সবই হারাম।

এসম্পর্কে হযরত আয়েশা রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যে পানীয়ই মাদকতা সৃষ্টি করে তা হারাম’। (বুখারী হাদীস নং- ২৪২ মুসলিম হাদীস নং- ২০০১)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবু দারদা রা. কে বলেন, তুমি মদ পান করো না, কেননা তা সকল অনিষ্ঠের মূল। (ইবনে মাজা, হাদীস নং -৩৩৭১)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘মদ, তা পানকারী, পরিবেশনকারী, বিক্রেতা, ক্রেতা, উৎপাদক, যে উৎপাদন করায়, সরবরাহকারী এবং যার জন্য সরবরাহ করা হয়, এদের সকলকে আল্লাহ তাআলা লানত করেছেন ‘। (আবু দাউদ হাদীস নং- ৩৬৭৪, তিরমিযী হাদীস নং- ১২৯৫, ইবনে মাজাহ হাদিস নং- ৩৩৮০)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদেরকে মদ সম্পর্কে সতর্ক করার জন্য বিভিন্ন সময়ে উপদেশ দিতেন এবং পূর্ববর্তী যুগের ঘটনা উদাহরণ স্বরূপ পেশ করতেন।

হযরত উসমান বিন আফসান রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা মাদকদ্রব্য পরিত্যাগ করো, কেননা এসব নানারকম অপকর্মের উৎস। তোমাদের পূর্ববর্তী যুগে এক আবেদ ছিল। এক দুশ্চরিত্রা নারী তার প্রেমে পড়ে যায় ও তাকে কাছে পেতে সে তার এক দাসীকে সেই আবেদ ব্যক্তির নিকট প্রেরণ করে তাকে (এক বিষয়ে) সাক্ষ্য প্রদানের জন্য ডাকতে পাঠায়।

তখন সেই আবেদ ব্যক্তি সাক্ষ্য প্রদানের জন্য দাসীর সাথে ঐ মহিলার ঘরে আসলো। সে যখনই কোন দরজা অতিক্রম করত, দাসী পেছন থেকে সেই দরজা বন্ধ করে দিত। এভাবে সেই আবেদ ব্যক্তি অতি সুন্দরী এক নারীর সামনে এসে উপস্থিত হলো।

মহিলাটির সামনে ছিল একটি ছোট বাচ্চা এবং এক পেয়ালা মদ। সেই নারী আবেদকে বলল, আল্লাহর শপথ! আমি আপনাকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডেকে পাঠাইনি। বরং এজন্য ডেকে পাঠিয়েছি যে, আপনি আমার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হবেন অথবা এই মদ পান করবেন অথবা এই বাচ্চাকে হত্যা করবেন। আবেদ বলল, আমাকে এক পেয়ালা মদ দাও। সেই নারী তাকে এক পেয়ালা মদপান করালো। তখন সে আবেদ বলল, আরও দাও…

এভাবে সেই আবেদ আর থামল না। শেষ পর্যন্ত সেই আবেদ নারীটির সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হল এবং উক্ত বাচ্চাকেও হত্যা করল।

অতএব তোমরা মদ পরিত্যাগ করো। কেননা আল্লাহর শপথ, মদ ও ঈমান কখনো একত্রে অবস্থান করতে পারে না। এর একটি অপরটিকে বের করে দেয়। (নাসায়ী, হাদিস নং- ৫৬৬৬)

সমাজে শিকড় গেড়ে বসা এমন সমস্যাগুলোর সমাধানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক অভিনব পন্থা অবলম্বন করেন। তিনি মাদকাসক্ত ব্যক্তির জন্য তওবার দরজা চিরতরে বন্ধ করে দেননি, আবার তাদেরকে একেবারে নির্ভয়েও ছেড়ে দেননি। তিনি সকলকে সতর্ক করার জন্য ইরশাদ করেছেন,

যে ব্যক্তি মদ পান করে এবং মাতাল হয়, ৪০ দিন পর্যন্ত তার নামাজ কবুল হবে না। এ অবস্থায় সে মারা গেলে জাহান্নামে যাবে। আর যদি সে তওবা করে, তবে আল্লাহ তাআলা তার তওবা কবুল করবেন।

পুনরায় সে মদ পান করলে ও মাতাল হলে ৪০ দিন পর্যন্ত তার নামাজ কবুল হবে না। এই অবস্থায় মারা গেলে জাহান্নামে যাবে। আর যদি এ অবস্থায়ও তওবা করে তাহলে আল্লাহ তওবা কবুল করবেন। এরপরও সে যদি মদ্যপানে লিপ্ত হয়, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাকে অবশ্যই ‘রাদগাতুল খাবাল’ পান করাবেন।

আরও পড়ুন: মাদক বিরোধী আদর্শে ইসলাম | প্রথম পর্ব

সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! ‘রাদগাতুল খাবাল’ কি ? নবীজী বললেন, জাহান্নামীদের দেহ থেকে নির্গত পুঁজ ও রক্ত। (আবু দাউদ, হাদীস নং-৩৬৮০, তিরমিযী, হাদীস নং- ১৮৬২, ইবনে মাজা, হাদীস নং-৩৩৭৭)

তিনি কখনো কখনো মদ্যপায়ী ব্যক্তিকে মদ্যপানের কারণে শাস্তিও দিয়েছেন। যেমন হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদ্যপানের ক্ষেত্রে খেজুর গাছের ডাল এবং জুতা দিয়ে আঘাত করেছেন। (বুখারী, হাদীস নং- ৬৭৭৩, মুসলিম, হাদীস নং-১৭০৬)

এছাড়া মানুষের স্বাস্থ্যের উপর মাদকের ক্ষতিকারক প্রভাবের কথা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুরুত্বের সাথে বর্ণনা করেছেন। একবার এক সাহাবী তাঁর কাছে এসে মদকে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করার অনুমতি চেয়ে ছিলেন। তিনি তাকে বলেছিলেন, নিশ্চয়ই এটা (মদ) ব্যাধি, ব্যাধিনিরাময়ক (ঔষধ) নয়। (মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং- ১৮৮৭৯, ইবনে হিব্বান, হাদীস নং- ২০৬৫)

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে, যারা মদ্যপানে অভ্যস্ত তারা খুব সহজেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। যেমন লিভার ব্লক হয়ে যাওয়া। এর কারণ হলো, মদ লিভারের দেহকোষকে ধ্বংস করে ফেলে। সেখানে চর্বি জমায়। এছাড়া মদের কারণে পরিপাকতন্ত্রের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা ও দুরবস্থার সৃষ্টি হয়। তখন মানুষ তার স্বাভাবিক খাদ্য চাহিদা হারিয়ে ফেলে। পুষ্টিহীনতা ও ভিটামিনের ঘাটতি দেখা দেয়। স্নায়ুর ওপর ভীষণ চাপ পড়ে। ফলে স্নায়ুবিক দুর্বলতা দেখা দেয়। হার্টের মাংসপেশিতেও খারাপ প্রভাব ফেলে এবং রক্ত গঠনের বিভিন্ন উপাদানেও সমস্যা দেখা দেয়। (উসওয়াতুল লিল আলামিন অনুবাদ ; পৃষ্ঠা নং ৩১৪)

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে, আমাদের পরিবারকে, আমাদের সমাজকে ও আমাদের রাষ্ট্রকে এই সকল ধ্বংস থেকে হেফাজত করুক। আমীন।

লেখকঃ খতীব ও শিক্ষক

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com